অতিথি
সূর্যি তো মাথায় উপর দাঁড়িয়ে হিঃ হিঃ করে হাসছে। কখন বাজার আনবে, কখন রান্না হবে… আজ এতদিন পর ভাইটা বৌ নিয়ে প্রথম আমাদের বাড়ি আসবে।
গিন্নীর এমন চেঁচামেচিতে বিছানা থেকে উঠে কোনরকমে মুখ ধুয়ে অমলবাবু বাজারের ব্যাগ হাতে রওনা দিলেন একটু ভালো কিছু কেনার উদ্দেশ্যে।
পিছন থেকে গিন্নী–আরে চা টাতো খেয়ে যাও…
এসে খাবো, এই বলে অমলবাবু পিছন না ফিরে হাঁটতে থাকেন। কপালের ভাঁজে দুঃশ্চিন্তার রেখা বিরাজমান। শালাবাবুটি তাঁরও যে খুব পছন্দের একটি মানুষ। বিয়েতে গিন্নী, ছেলে মেয়েদের নিয়ে পুরো দশ দিন কাটিয়ে এলেও তাঁর আর সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিছুদিন আগেও তিনি যে কারখানায় কর্মরত ছিলেন সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার চাকরী হারানো মানুষের দলে তিনিও নাম লিখেয়েছেন। গোপনে একটি ভদ্রস্ত কাজ খুঁজে চলেছেন ঠিকই কিন্তু এখন তো কাজের বড়ই আকাল। বেশ কিছুদিন সবার কাছে একথা গোপন করেও রেখেছিলেন, গিন্নী বাপের বাড়ি থেকে ভাইয়ের বিয়ে কাটিয়ে ফেরার পর পরিবারকে সেকথা তিনি জানান। তারপর থেকে এদিক ওদিক টুকিটাকি কাজ করে কোনরকমে দুবেলা ডাল ভাতের জোগাড় হচ্ছে। বাজার-দরে যেভাবে আগুন লেগেছে সেটাই বা কতদিন টানতে পারবেন কে জানে।
ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বা অনান্য খরচও তো আছে…!
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি বাজারের মধ্যে মুদী ব্যবসায়ী রতনবাবুর কছে হাজির হলেন। শুনেছিলেন তিনি নাকি কড়া সুদে টাকা ধার দেন। এছাড়া যে তাঁর আর কোন উপায়ও ছিল না। ভিন্ন কারনে এর আগেও দুএকবার বন্ধু বান্ধব ও পরিচিতদের দরজায় কড়া নাড়া হয়ে গেছে। তাছাড়া বলতে গেলে প্রায় সবাই এখন খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। সে যাই হোক, আর পাঁচটা সাধারণ মধ্যবিত্তের মত রতনবাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আলু, পেঁয়াজ,মাছ, মাংস, মিষ্টি ও অনান্য প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কিনে, পুরাতন দেনার চাদরের উপর আরো একটি নতুন চাদর জড়িয়ে, মুখে খানিক হাসি নিয়ে, বাড়ি ফিরে গিন্নীর হাতে বাজার তুলে দিলেন।
গিন্নীর চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল সে তাঁর গায়ে জড়ানো ঐ অদৃশ্য চাদরটি দেখে ফেলেছে, কিন্তু না দেখার ভান করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক কাপ চা নিয়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবার তাড়াতাড়ি করে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
অমলবাবু বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে কাজী নজরুলের কয়েকটি লাইন মনে মনে আওড়ালেন…….”অভাবের দিনে প্রিয় অতিথি আসার মত পীড়াদায়ক বুঝি আর কিছু নেই! শুধু হৃদয় দিয়ে দেবতার পূজা হয়তো করা যায়, কিন্তু শুধু-হাতে অতিথিকে বরণ করা চলে না।”
লোভ
মধ্যবিত্ত সুনীল বাবু বললেন–তবে এবার মেয়েকে নিয়ে আসুন।
আকাশ ততক্ষণে যে ঘরটিতে তাদের বসতে দেওয়া হয়েছিল একনজরে সেটি দেখে নিল। অনেক পুরনো দেওয়াল, কোথাও কোথাও চুন খসে পড়েছে। সেগুলি যতটা সম্ভব আড়াল করতে কয়েকটি পুরাতন ক্যালেন্ডার ঝুলছে দেওয়াল ঘেঁষে। আছে কাঁচ দিয়ে বাঁধানো একটি ফ্রেম, তাতে হাতে সেলাই করা ‘পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম’। ঘরের এক কোণে সম্ভবত বালিশ, তোষককে একটি চাদর দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখা হয়েছে। ঘরের মাঝে তক্তার তলায় রাখা পুরানো ট্রাংক ও কিছু জিনিসপত্রর উপর আগেই চোখ পড়েছিল। তাদের বসতে দেওয়া হয়েছে তোষকের ওপর লাল ভেলভেটের চাদর দিয়ে ঢাকা সেই তক্তাটিতেই। দেখে মনে হচ্ছে চাদরটি হয়ত পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা হয়েছে। সামনে একটি প্লাস্টিকের ছোট টেবিলে দুটি কাঁচের প্লেটে রাখা সিঙ্গারা ও মিষ্টি ,তার সামনে রাখা দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার। তারই একটিতে মেয়ের বাবা বসে, আর একটিতে মেয়েকে এনে বসানো হলো। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা সুন্দর মুখশ্রীর বছর কুড়ির নীলা ও তার লাজুক চাহনি দেখে আকাশ চোখ ফেরাতে পারেনি। মনে হল নীলাই বুঝি সেই মেয়ে, যাকে জীবনসঙ্গিনী করা যায়।
দুই বাড়ির কথপোকথনে বিনা পণেই বিয়ের দিন ঠিক হল।
ফুলসজ্জার রাত…. নীলা ফুলের সাজে ঘোমটা দিয়ে সাজানো খাটে বসে। আকাশ কাছে এসে তার হাত ধরে একটি সুন্দর সোনার আংটি পরিয়ে দিয়ে তাকে চুমু দিল, বুকে জড়িয়ে নিল। নীলা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। ঘরের আলো নিভে গেল, আদর আর সোহাগ মাখামাখি করে কখন যে সকাল হয়ে গেল…। বাইরে থেকে দরজায় টোকার শব্দে তা টের পেল।
এভাবে দিন বেশ ভালোই কাটছে। কিছুদিন পর এক জোৎস্না-মাখা সন্ধ্যায় দুজনে জানলা দিয়ে বাইরের শোভা দেখছে। আকাশ সামনে বড় গাছটির পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া চাঁদের দিকে চেয়ে, আর নীলার চোখ রয়েছে ওসব এড়িয়ে, তারই পাশে সাজানো সুন্দর বড় বাড়িটির দিকে।
সে বলেই ফেলল–আমাদের যদি অমন একটা বাড়ি হত তবে কত ভালো হত। আকাশ প্রথমে একটু অবাক হল তারপর একটু হেসে নতুন বৌয়ের মন ভোলানোর জন্য বলল– ঠিক আছে লোন করে না হয় অমন একটা বাড়ি আমরাও বানাবো।
নীলা বিরক্ত হয়ে বলে — কেরানীর চাকরী করে বুঝি অমন বাড়ি হয়! জানো, আমার বন্ধু অমৃতার বর অমন একটা বাড়ি কিনেছে, মস্ত বড় অফিসার। আকাশের কথাটি শুনতে ভালো লাগলো না। সে কিছু না বলে চুপ করে শুয়ে পড়ল।
আর একদিন নীলা কথায় কথায় আকাশকে বলল– বাবা,মার সাথে একসঙ্গে বসে ওনাদের পছন্দ মত টিভি দেখতে একদম ভালো লাগে না। আমাদের ঘরে একটা টিভি থাকলে যে কি ভালো হতো।
আকাশের মনে হল, ঠিকই তো, সে অফিস থাকে। সারাদিন নীলা একা একা কিবা করবে, একটা টিভি থাকলে তার সময়টা ভালো কাটবে। দুদিন পরই একটি এল ই ডি টিভি কিনে নিয়ে এল। মা অবশ্য ঘরে ঢুকে বলে গেলেন– এভাবে খরচ না করে ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঞ্চয় করতে।
এ কথা শুনে নীলার মুখটা ভারী হয়ে গেলেও পর মুহূর্তেই, সে…কি আনন্দ।
বারেবারে চ্যানেল চেঞ্জ করছে। একবার গান, একবার সিনেমা, একবার সিরিয়াল, একবার খবর – আরো কত কি..। নীলার চোখে মুখে সে খুশি দেখে আকাশের মনে ইএমআই দেওয়ার চিন্তা ছাপিয়ে তৃপ্তি স্পর্শ করল।
এরপর ভালোই কাটছে দিন।
একদিন রাতের খাবার শেষে দুজনে শুয়ে একসাথে টিভিতে একটি হিন্দি সিনেমার গানের দৃশ্য দেখছে। নায়িকা শাড়ির আঁচল উড়িয়ে সমুদ্রের জল ছুঁয়ে ছুটে চলেছে আর নায়ক ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। নীলা তখনই বলে বসল– আর একটু বড় টিভি হলে যে কি ভালোই না হতো! অমৃতার বাড়িতে কত্ত বড় টিভি। মনে হয় যেন হলে বসে দেখছি। আকাশ খুব বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। নীলা এবার ভাবল তার বর কেরানীর চাকরী করে, কেমন করে অত বড় টিভি আনবে। সত্যি তার কথাটা বলা একেবারেই উচিৎ হয়নি।
সে এরপর কিছুদিন বেশ সতর্ক হয়ে কথা বলে।
সামনে পূজো, তাই আকাশ নীলাকে সঙ্গে করেই শাড়ি কিনতে গেল। প্রথম বছর, তাই একটা নামকরা দামী দোকানে গিয়েই নিজের সাধ্যের মধ্যে শাড়ি দেখছে। নীলার চোখ কিন্তু শোকেসে ঝোলানো দামী ঢাকাই জামদানিটার উপর।
সে বলে বসে, ওটাই ভালো। অমন একটি জামদানি শাড়ি অমৃতাকে সে পড়তে দেখেছে।
আকাশের গেল মেজাজটা গরম হয়ে। তার শাড়ি কিনে, মা বাবার জন্যও তাকে কিছু কিনতে হবে, নতুন শ্বশুর-বাড়িতেও কিছু পাঠাতে হবে।
নীলার কথায় কান না দিয়ে নিজের পছন্দ মত শাড়ি নিয়ে এবং অন্যান্য কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরল। মা সব কেনাকাটা দেখে বলল, নীলার শাড়িটা খুব ভালো হয়েছে রে খোকা, অনেক দাম নিয়েছে নিশ্চই। তবে ভালো করেছিস প্রথম বছর বৌমাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিয়েছিস।
আকাশ প্রতুত্তরে বলল–না মা তোমার বৌমার আবার এ শাড়ি পছন্দ নয়, তার তো আরো অনেক বেশী দামী ঢাকাই জামদানি পছন্দ।
নীলা একথা শুনে মনে মনে খুব রেগে গেল। সে কখন বলল,এ শাড়ি পছন্দ হয়নি। ঢাকাই জামদানিটা বেশী পছন্দ হয়েছে এটাই শুধু বলেছিল।
এবার তার মা ভীষণ বিরক্ত হয়ে রেগে বললেন– আসলে খোকা, তোর বৌ তো অনেক বড়লোকের মেয়ে, তাই আমাদের কোনকিছুই তার পছন্দ হয় না। সেদিন তো অশোকবাবুর বাড়ি (পাশের বাড়ি) নতুন বৌ দেখতে গিয়ে কি লজ্জায় পড়েছি। দামী বেনারসী, অমন সাজ, অপরূপ সৌন্দর্য – সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে তোর বউ-এর নজর আটকাল তার ভারী গয়নাতে। মাথা কাটা গেল, কেননা, সেই গয়নাতে হাত দিয়ে ধরে বলে বসল– ওমা কি সুন্দর ! আমি ওকে বলব এমন একটা গয়না কিনে দিতে। আশেপাশের সবাই তখন মুখ টিপে হাসছে। লজ্জা লজ্জা… লজ্জায় তখন মরে যেতে ইচ্ছা করছিল।
নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির মিষ্টি একটি মেয়েকে পছন্দ করে সুনীলবাবু ঘরের বৌ করে এনেছিলেন, তার মনে যে এত লোভ পুষে রাখা আছে কে জানত। পুজোর বাজারের সাথে নীলাও বাপের বাড়ি গেল। দীর্ঘদিন থাকার পরও আকাশ ফিরিয়ে আনতে গেল না।
নীলা সব বুঝেও বাড়িতে কিছু বলতে পারছে না।
বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকানাও যাচ্ছে না। কারণ, ভুলটাতো তারই। এই লোভের কবলে পড়ে হাজার হাজার আরো অনেক নীলা আজ অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। নিজের ভুল অনুধাবন করে মনকে অনেক বুঝিয়ে আকাশকে এসে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করল। আকাশ মনে হয় এই দিনটিরই অপেক্ষা করছিল। তাই, দেরী না করে বাবা মাকে জানিয়ে পরদিনই নীলাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে এল। তাদের সংসারটা সে যাত্রায় লোভের কবল থেকে রক্ষা পেল।।
রচনা – তিতাস মন্ডল
