মোহনা দুদিন ধরে স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে প্যাকিং সারছে। বেদ মুম্বাই থেকে ব্যাঙ্গালোরে ট্রান্সফার হয়েছে। মোহনাও ওখানে একটা স্কুলে জয়েন করবে। আলমারি থেকে জামা কাপড়গুলো বের করে গোছানো হয়ে গেছে। বাসনপত্রও মোটামুটি প্যাক হয়ে গেছে। অল্প কিছু বাসন দুদিনের রান্না-খাওয়ার জন্য রাখা আছে। এবার শুধুমাত্র ফার্নিচারগুলো খুলে নিলেই হয়ে যাবে। পরশু প্যাকারস এর ছেলেরা এসে মাল নিয়ে যাবে।।
বেদকে চার্জ হ্যান্ড ওভার করতে হচ্ছে বলে ও খুব ব্যস্ত। গোছানোর পুরো কাজটাই মোহনাকে একা হাতেই করতে হচ্ছে।
কলিংবেল বাজতেই মোহনা দরজা খুলে দিল। বেদের আজ ফিরতে অনেক রাত হল। বেদ ডিনার করে ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে এসে বসল। ওরা রোজ অফিস থেকে ফিরে দুজনে ব্যালকনিতে বসে গল্প করে, চা কফি খায়।
বেদ লক্ষ্য করল মোহনা সব সময় হাসি খুশি থাকলেও আজ মুখটা একটু গম্ভীর।
—কি হলো শরীরটা কি খারাপ?একা একা গোছাতে হচ্ছে খুব চাপ হয়ে গেছে না? একবার ডঃ মেহতার এপয়েন্টমেন্ট করবো?
মোহনা একটু হাসল।
—না ঠিক আছি।
–আজ মুডটা অফ মনে হচ্ছে? না, এত দিনের সংসার ছেড়ে যেতে হচ্ছে বলে মন খারাপ?
—–কোনটাই নয়।
—–তাহলে তোমার মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন?
মোহনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—তোমার পুরোনো আলমারি থেকে একটা ডাইরি পেলাম। সেখানে তোমার স্কুল জীবনের অনেক ছবির মধ্যে একটা বিশেষ ছবি পেলাম। মেয়েটি কি তোমার ছোটবেলার গার্লফ্রেন্ড ছিল?
বেদ চমকে উঠলো। অনেক দিনের পুরনো ক্ষত চাগাড় দিয়ে উঠল।
মোহনা বেদের চমকানো আর চুপ করে যাওয়াটা লক্ষ্য করেছিল। বলল,
—-না বলতে চাইলে বোলো না। এটা এখনকার দিনে এমন কিছু ব্যাপার নয় যে তোমাকে লোকাতে হবে।
বলে মোহনা উঠতে যাচ্ছিল। বেদ মোহনার হাত চেপে ধরে বসাল।
—- যেও না বসো। এটা আমার জীবনের ভালোলাগার, ভালোবাসার কিন্তু দগদগে ঘায়ের মত। অনেকবার ভেবেছিলাম তোমায় বলবো। বলা হয়নি। আসলে এই ঘটনাটা আমি মনে করতেই চাই না। আজ যখন তুমি সবটাই দেখেছো। তাহলে তোমাকে বলতে অসুবিধা নেই। তখন শিলঙে বাবার পোষ্টিং ছিল। আমি শিলং-এ স্কুলে পড়াশোনা করতাম। ওখানেই একজন গারো মেয়ে রিংচি সাংমার সাথে আমার বিশেষ বন্ধুত্ব হয়। আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম। নোট দেওয়া-নেওয়া করতে করতে কখন যে মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। প্রতিদিন স্কুল শেষ হলে ওকে আমার সাইকেলে চাপিয়ে দূরে দূরে পাহাড়ী এলাকায় চলে যেতাম। কখনো কোনো পাহাড়ি ঝর্নার জলে পা ঢুবিয়ে বসে থাকতাম। কখনো নদীর পাড় ধরে হাঁটতাম। পাহাড়ে যখন ঝুপ করে সন্ধে নামতো তখন জোরে সাইকেল চালিয়ে ফিরে আসতাম। খুব সুন্দর সময় কাটিয়েছি সেই সময়। এভাবেই চার বছর কেটে গেল।
বেদ বলতে থাকল,
—তখন হায়ার সেকেন্ডারি সবে শেষ হয়েছে। প্ল্যান করছি কিভাবে এর পর দেখা করবো। কারণ বাবার পোষ্টিং কলকাতায় হয়ে গেছে। আমার পরীক্ষার জন্যই অপেক্ষা করছিল মা বাবা। ফলে আমায় তখন কলকাতা ফিরতেই হবে। আমাদের দুজনের খুব মন খারাপ। এই সময় খবর পেলাম রিংচি অসুস্থ। অন্যান্য বন্ধুদের সাথে ওকে দেখতে গেলাম। শুনলাম ওর ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। ওর মাঝে মাঝে মাথা যন্ত্রণা করতো। কিন্তু সেটা যে এত বড় ব্যাপার হয়ে যাবে কেউ ভাবেনি। রিংচি আমার কাছে খুব কাঁদলো। আমি তখন দিশাহারা – একদিকে প্রেমিকার অসুখ ,সঙ্গে চিরজন্মের বিচ্ছেদের সম্ভাবনা, আর অন্যদিকে ক্যারিয়ার। কলকাতার কলেজে এডমিশন নেবো।
—ওর পিসি তখন জার্মানিতে থাকতেন। এখবর শুনে ভারতে চলে আসেন। ওকে দিল্লী এমস-এ নিয়ে যাওয়া হল। ওখানকার ডাক্তাররা বললো ওর কোনো টিউমার হয়নি। এ কথা জানার পর ওর পরিবার ও আমরা বন্ধুরা সবাই একটু আস্বস্ত হই। কিছু দিন পর ওর পিসি ওকে নিয়ে জার্মানি চলে যায় বেটার ট্রিটমেন্টের জন্য।
—গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। দুজন কিশোর-কিশোরীর প্রেমের অপূর্ণ গল্প তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তখনো বুঝিনি ভগবান আমাদের জীবন আলাদা ভাবে লিখেছেন।
—আমি মা-বাবার সাথে কলকাতায় ফিরে আসি। ইনস্টিটিউটে এডমিশন নিই। পনেরো দিন অন্তর করে একটা চিঠি আসতো জার্মানি থেকে। আমিও ওকে চিঠি লিখতাম। ছ-মাস পর সেটা কমতে শুরু করলো। একদিন ও একটা চিঠিতে লিখলো ওর পিসির বাড়িতে ও খুব একা ফিল করতো। পিসি চাকরি করে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হতো। ওকে সারাদিন কলেজ করে একা একা কাটাতে হতো। ওখানে পিসির প্রতিবেশী বব এর সাথে আলাপ হয়। কাছাকাছি থাকার ফলে ওদের একে অপরকে ভালো লাগতে শুরু করে। ও লিখেছিলো, “বব দুদিন না আসলে খুব ফাঁকা লাগে, কষ্ট হয়, কান্না পায়। একে কি প্রেম বলে? কিন্তু আমি তো তোমাকেও ভুলতে পারিনি, তুমি বললে আমি তোমার কাছে ফিরে যেতে পারি । তুমি আমায় বলে দাও আমি কি করবো?”
—আমি তখনও ছাত্রাবস্থায়, বাবার হোটেলে খাই, বাবার পয়সায় পড়াশোনা করছি। সেই ক্ষমতা তৈরি হয়নি যে একটা মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারব। আমি চিঠিটা পড়ে খুব কেঁদেছিলাম। একটা ভালোবাসার মানুষের হাত ছেড়ে দিতে কত কষ্ট হয় সেটা সেই বোঝে। আমি ওকে লিখলাম, “সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। পরের জন্ম বলে যদি কিছু থাকে তুমি আমারই হবে। “
—গল্পটা এখানেও শেষ হতে পারত। শুধু দুটি ভালোবাসার মানুষের জন্মের মত ছাড়াছাড়ির কষ্ট থাকত।
—তারপর মাসখানেক বাদে ওর ফোন পেলাম। শিলংয়ে আসার নেমন্তন্ন করল। ওর বিয়ের রিসেপশন। গিয়েছিলাম জানো। শুধু ওকে দেখতে গিয়েছিলাম। আরো বন্ধুরা গিয়েছিলো। তখন কষ্টটা অনেক নিউট্রিলাইজ হয়ে গেছে। মনকে বুঝিয়ে ফেলতে পেরেছি, সব চাওয়াগুলো পাওয়া পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।
—রিংচি ওর বরের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো। বব খুব হাসি খুশি ছেলে। আমাদের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গেও অনেকটা সময় কাটালাম।
—তবে রিংচি আমার কাছে খুব সহজ হতে পারছিলো না। চোখে চোখ রাখতে পারছিলো না।হয়তো আমি সত্যি চলে যাবো ভাবতে পারেনি। সবার সাথে আনন্দটাও ঠিক করে এনজয় করতে পারছিলো না।
—ফেরার সময় বব হ্যান্ডসেক করে বললো, “বেটার লাক ইন ইয়োর নেক্সট লাইফ।” আমি একটু হাসলাম। রিংচির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার বাস্পীয় চোখ আমার কাছে ক্ষমা চাইছে।
—গল্পটা এখানেও শেষ হতে পারতো। ঈশ্বর কেনো বারবার আমার পরীক্ষা নিচ্ছিলো জানি না।
—–দু বছর পর আমি মুম্বাইতে জব পেলাম। একটা সিঙ্গেল অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকতাম। কৈশরের ভালোবাসা হারানোর পর প্রেম ভালোবাসার কথা আর ভাবতেও ইচ্ছে করে না। আরো দু’বছর এভাবেই কেটে গেল। মাঝে মাঝে অফিস কলিগরা আসে। সবাই মিলে রান্নাবান্না করি, বোতল খুলে বসি। উইকেন্ডে এদিক ওদিক ঘুরে আসি। এভাবেই ছুটছিল জীবন।
—একদিন রিংচির ফোন এলো। ইতিমধ্যে মোবাইল ফোন এসেছে সবার হাতে। কোথা থেকে ও আমার পার্সোনাল নাম্বারটা জোগাড় করেছিল জানি না, হয়তো অফিস থেকে।
—ফোনে খুব কাঁদলো। আমারও কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ও কি আমার জন্য কাঁদছে? না ওর বর ওকে কষ্ট দিয়েছে? কিছুক্ষণ পর বলল, “একটা গাড়ি এক্সিডেন্টে বব প্যারালাইসড হয়ে গেছে। ইম্পোটেন্ট হয়ে গেছে।”
—আমার ওকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা ছিল না। আমি চুপ করে ছিলাম। ও বলল, আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি বললাম এখন তো কলকাতা বা শিলং যাবার জন্য ছুটি পাবো না। ও বলল ও মুম্বাইতে এসেছে।
—দেখা করতে গেলাম একটা রেস্টুরেন্টে। দুজনেই চুপচাপ বসেছিলাম কিছুক্ষণ। কি বলবো, কিভাবে সান্ত্বনা দেবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “মুম্বাইতে কোনো কাজে এসেছিলে?” ও বলল, “না।”
—ইন্ডিয়ায় একমাস আগে এসেছে। মা বাবা আত্মীয়-স্বজন সবার সাথে দেখা করেছে। কাল মুম্বাই থেকে ওর ফ্লাইট। তাই ফেরার পথে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে।।
—আমি আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফিরে আসি। এক সপ্তাহ পর খবর পাই। ও আর পৃথিবীতে নেই, ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমের দেশে চলে গেছে।
—খুব কষ্ট হয় কেনো নিজের জীবন এভাবে শেষ করলো?? আর আমার সাথে দেখাই কেনো করতে এলো। আমি তো বারবার ভুলতে চেয়েছি, কিন্তু ও বারবার আমার জীবন ছুঁয়ে গেছে।বারবার কষ্ট পেয়েছি।
—এবার আমাদের গল্পটা সত্যি সত্যি শেষ হলো। কিন্তু এভাবেই শেষ হতে হলো?
বেদের গলা বুজে আসছে। মোহনার চোখেও জল। বললো,
—এতদিন একা একা এত কষ্ট পেয়েছো। রিংচির পরিণতিতে সত্যি খুব খারাপ লাগছে। কোনো কিছুর ওপরে আমাদের হাত নেই গো। অনেক রাত হয়েছে শুতে চলো। কাল আবার অফিস আছে।
—-তুমি যাও আমি একটু পর আসছি।
বেদ মনে মনে ভাবতে লাগলো।
এখন রাত দুটো কিছুতেই ঘুম আসছে না। এতদিনের দলা পাকানো কষ্টটা আবার আষ্ঠে পিষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। মনে হচ্ছে, এই ২০ তলার ব্যালকনি থেকে চিৎকার করি। মনে হচ্ছে আজ বৃষ্টি নামুক, প্রলয় আসুক, এ বুকের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিক। কিন্তু জানি এ কষ্ট ভোলার নয়। এই জনমে সম্ভব নয়।
মোহনা আমার জীবনে আসার পর থেমে যাওয়া চাকা আবার চলছে। ও মা হতে চলেছে। আমার জীবন, আমার সংসার অনেকটা পূর্ণ করেছে নিজের ভালোবাসায় যত্নে। তবুও মোহনাকে বলতে পারলাম না সেদিন কোনো রেস্টুরেন্টে নয়, রিংচি ওর হোটেল রুমে ডেকেছিল। আমি যেতে চাইনি। রিংচি বলেছিল, কাল ওর ফ্লাইট আর ওর শরীরটাও ভালো নেই আমি যেন একবার দেখা করি। সেদিনও আমায় ফিরতে দেয়নি। বলগাহীন ঘোড়ার মতো নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছিলাম ভালোবাসার স্রোতে। কৈশোরের হৃদয়ের সুপ্ত প্রেম সেদিন শরীর ছুঁয়েছিল। সারারাত ওর ভালোবাসার ওমে তপ্ত হয়েছিল আমার অতৃপ্ত হৃদয়।
সকালে আমার অফিস ছিল। ওকে বললাম ববকে ডিভোর্স দিয়ে আমার কাছে আসতে পারো। ও বলল তা হয় না। আমি ববকে এই অবস্থায় ডিভোর্স দিতে পারব না। আমি ওকে আর একটু আদর করে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম। এক সপ্তাহ পর এক বন্ধু মারফত খবর পেলাম, রিংচি সুইসাইড করেছে। ওর সুইসাইড নোটে লেখা ছিল “আই হ্যাভ টাচড দা স্কাই” ।।
লেখিকা – বৈশালী দত্ত
