একটা সাধারণ চিঠি

প্রিয় ম্যাম,

           প্রথমেই বলে দিই যে চিঠি লেখাটা আমার আসে না, কারণ দরকার পড়েনি কোনোদিন লেখার। বাংলা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের- “তোমার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন চলছে তা জানিয়ে তোমার বন্ধুকে একটি চিঠি লেখ” জাতীয় চিঠির বিষয়টা আলাদা। পরীক্ষার হলে এতগুলো নম্বরের প্রশ্ন তো আর ছেড়ে আসা যায় না! তাই লিখতে হয় বাধ্য হয়ে। পড়াশোনা বাদ দিয়ে যেটুকু প্রয়োজনমাফিক লেখালিখি সেটা আজকাল হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক কিংবা টেক্সট মেসেজেই হয়ে যায়। তাই আজকে আমার এই চিঠিটা কতটা সাধারণ হতে চলেছে তা নিজেই বুঝে নিন! তাহলে আর বিশেষ ভণিতা না করে সোজা আসল প্রসঙ্গে আসি। (বানান ভুল চোখে পড়লে প্লিজ নিজগুণে গুনে ক্ষমা করে দেবেন।)

বাঁচবো না- এইটুকু স্থির ছিল। বাঁচবো না কেন, লেজুড় ধরে এ প্রশ্ন আসবেই। তাই শুরুতেই খোলসা করে দিই। বাঁচার ইচ্ছেই ছিল না। আচ্ছা, জীবনে আছেটা কি বলতে পারেন? সুখ-শান্তি, হাসি-আনন্দ- এসবের মধ্যে একটারও পাল্লা খানিক জোরদার হলে নাহয় দ্বিতীয়বার ভেবে দেখতাম। কিন্তু নাহ! ঠাম্মি ঠাকুরঘরের তকতকে করে মোছা মেঝেতে কেচে ফর্সা করে রাখা আসনের উপর বসে জোড়হাত করে চোখদুটো বুজে ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিমায় যাঁকে অথবা যাদের দিনরাত বিড়বিড় করে ডেকে চলেছে, তাঁরা কিন্তু ভীষণ কিপটে! ওনাদের হাত দিয়ে কারোর জন্য দুটো ভালো কিছু বেরোয় না কখনোই। বেরোয় কোনগুলো? যত রাজ্যের পচা-বাসি ব্যাপার-স্যাপারগুলো, খানিকটা কালিবাবুর বাজারে বেলা বারোটার পরে মেলা শুকনো-বাসি সবজির মতন। এই যেমন ঠাম্মির শরীর- ভালো থাকে কালে-অকালে; খারাপটাই আজকাল স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে ঘরে বসে অসুস্থ শরীর নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত হয়ে বাঁচার মধ্যে কি আদৌ কোনো আনন্দ আছে? আমার তো মনে হয় না। কিংবা ধরুন বাপি আর মায়ের মুখদুটো- সবসময়ই গোমড়া। রামগরুড়ের ছানারাও বোধহয় এর চেয়ে কম মুখভার করে থাকত! বাপির অফিসের ঝামেলা বাপি স্টিলের খালি লাঞ্চবক্সটার মতই নিজের অফিসব্যাগে পুরে বাড়ি ফেরত আনে প্রতিদিন। আকাশে আজকাল যেমন সারাবছরই কালো মেঘের দেখা মেলে আর ঋতু মানেই বর্ষা, মায়ের মাথার উপরেও সবসময় কিসব অদৃশ্য চিন্তারা ভেসে বেড়ায় আর পান থেকে চুন খসলেই চোখ দিয়ে তার ভাগীরথী বয়। আচ্ছা বলুন তো, পিসি যদি পিসোকে ডিভোর্স দিয়ে পিসোর ওই  দজ্জাল মাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাদের এখানে এসে থাকেই তাতে মা-বাপির এত আপত্তি কেন? এটা যেমন বাপির বাড়ি, আমার বাড়ি, তেমন পিসিরও তো বাড়ি! যবে থেকে পিসির এই আগমন বার্তা এসেছে, মা-বাপির নিত্য অশান্তিটা ডেয়ারি মিল্কের দামের মতনই উত্তরোত্তর বাড়ছে প্রতিদিন। নিউজে দেখাচ্ছে আলুর দাম নাকি আজকাল খুব বেড়েছে। অবশ্য ওটা আবার ঠিক আমার ডিপার্টমেন্ট নয়, তাই তুলনাটা টানলাম না। আসলে বাড়ির বাজার যা করার বাপিই করে কিনা!

এ নাহয় গেল বড়দের সমস্যার কথা। এবার আসল প্রসঙ্গে আসি। আমার জীবনটাও একেবারে ভালো চলছে না বিগত কিছু সময় যাবৎ। সেই যে গতবছর মেইন রোডের পাশে একটা বড় পুকুরে আমাদের স্কুলবাস উল্টে গেল, মরতে মরতে বাঁচলাম- সেই যে পায়ে চোট পেলাম, ডান পা টা আর কিছুতেই ঠিক হলো না। গোড়ালিটা সেই যে বেঁকে গেল আর কিছুতেই সোজা হলো না। কত ডাক্তার দেখানো হলো কলকাতার ঝাঁ-চকচকে সুপার স্পেশালিটি নার্সিংহোমে, এতলা-ওতলা কত পেরোলাম, বাঁদিকের লিফ্ট-ডানদিকের লিফ্ট কত চড়লাম, কত ভাড়া করা গাড়ির তেল পুড়লো, বাপির গাঁটের কড়ি খসলো, মুখ গোমড়া থেকে আরো গোমড়া হল, মায়ের চোখের জলের বন্যা বইল। কিন্তু বাঁকা পা সোজা হলো না। “জন্মের মতন খোঁড়া হয়ে গেল মেয়েটা! কে বিয়ে করবে ওকে?”- মায়ের এই বিলাপ শুনতে শুনতে আমার কানে তালা লেগে গেল। কত বোঝালাম “মা রিলাক্স… আমি সবে ক্লাস ইলেভেন। অনিতার দিদির এখন আঠাশ বছর চলছে। দিব্যি আছে। সেই এখনো বিয়ে করল না আর তুমি আমায় নিয়ে ভাবছো?” কিন্তু কে শোনে কার কথা! অবশ্য আমার কথা এবাড়িতে কেউ শুনেছেই বা কবে? “ছুটি” গল্পে রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, বয়ঃসন্ধির বালকের মুখে “আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথা মাত্রেই প্রগলভতা।” আমার অবস্থা তথৈবচ!

সত্যি বলতে কি, মন খারাপ যে আমারও হয়না তা নয়। তবে আমি খোঁড়া বলে বর জুটবে না এই ভেবে নয়, বরং এটা ভেবে যে নিজের কোনো দোষ না থাকতেই অদ্ভুত একটা জীবনভরের শাস্তি পেলাম। শাস্তি নয় তো কী? ছুটতে পারি না, জোরে হাঁটতে গেলে কষ্ট হয়, দেখতে খারাপ লাগে, পছন্দের জুতোগুলো পরতে পারিনা। সেদিনের দুর্ঘটনায় কাগজে খানিক হইচই হয়েছিল বটে। চিকিৎসার খরচ পাব এরকম কিছু আমারও কানে এসেছিল। কিন্তু বছরের শুরুতে করা “রেজোলিউশন”-এর মতন সেসব কত ঘটনাই ঘটবে ঘটবে করে আর ঘটল না। কয়েকজন স্টুডেন্টের বাবা-মা নাকি মামলা করেছিলেন। আমার বাপি আবার শান্তিপ্রিয় ছাপোষা মানুষ! বাপি ও পথ মাড়ালো না। কত লোক উপদেশ দিল, “মেয়েকে নিয়ে মুম্বাই যাও, চেন্নাই যাও…” ইত্যাদি। আমার বাপির আবার মেয়েকে দূর-দূরান্তে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই কিনা তাই সে পথও আর মাড়ানো হলো না। ডান গোড়ালি আমার বেঁকেই রইল। আমাকেও বাধ্য হয়ে এই নতুন অঙ্গবিকৃতির সাথে অভ্যস্ত হতে হলো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে চাপা দুঃখটা, ক্ষোভটা রয়েই গেল। ভূগোল বইতে যখন আগ্নেয়গিরির ভিতরে থাকা লাভা নিয়ে পড়ি, মনে হয় আমার বুকটাই একটা ছোটখাটো আগ্নেয়গিরি। টের পাই ভিতরে কিছু একটা জ্বলছে ধিকিধিকি, একদিন সব ভেঙেচুরে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়।

সোশ্যাল গ্যাদারিং-এ যেতে আমার একদম ভালো লাগে না। লাগবেই বা কি করে? যখনই দেখি আমার বয়সী আর পাঁচটা মেয়ে হাইহিল পড়ে এদিক-সেদিক উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রজাপতির মতন, আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি চাইলেও কোনোদিন এমনভাবে প্রজাপতি হয়ে ঘুরতে পারবো না। আমাকে গ্রীষ্মের দেশে সারাজীবন শীতঘুমে কাটাতে হবে অন্ধকারে। তিনতলার ফ্ল্যাটের মিষ্টুদিদি থার্ড ইয়ারে পড়ে‌। মাঝেসাঝে ছুটির দুপুরে আমার সাথে গল্প করতে আসে। আমার সাদামাটা ঘটনাবিহীন ঘরবন্দি দুপুরগুলোয় দিদি একটা দমকা বাতাস নিয়ে আসে। যত নতুন বই ও পড়ে, আমায় এসে গল্প শোনায়। ওকে একদিন ভরসা করে বলেছিলাম হাইহিল জুতো না পড়তে পারার দুঃখ। মিষ্টুদিদি আমায় বিউটি স্ট্যান্ডার্ড আর পেট্রিয়ার্কি নিয়ে কিসব লম্বা-চওড়া তত্ত্ব শুনিয়ে দিল! বেশিটাই বুঝলাম না। শুধু এইটুকু বুঝলাম যে হাইহিল পড়তে না পারা মানে অবশ্যই জীবনটাই বৃথা নয়। কিন্তু আবার অন্যদিকে ঠাম্মির ঠাকুরঘরের বেদীতে রাখা ফটোগুলোর রংচঙে দেব-দেবীদের উপর খুব রাগ হল। বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল মাথার ভিতরে- আমিই কেন? হোয়াই মি?

তাহলেই বুঝুন, এই শত কান্ডের জীবনের রচনাবলীতে পাওয়ার চেয়ে হারানোর পাল্লাটাই ভারী! কেমন করে আর বাঁচার ইচ্ছে থাকবে?

কি ভাবছেন, ঘটনার ঘনঘটা এখানেই শেষ? শুনুন তবে… এই পায়ের ব্যাপারটা হবার পর থেকেই দেখি চেনা পরিচিত কাকু-কাকিমা, জেঠু-জেঠিমারা আমায় যেন কেমন অন্যভাবে দেখে, যেন আমি আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক নই। এই যে একতলার ফ্ল্যাটের মিত্র জেঠি, আমায় দেখলে “আহা-উহু” ছাড়া কথাই বলতে পারেন না। সেদিন টিউশন পড়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছি সন্ধ্যেবেলা। বিল্ডিং এ ঢুকতে যাবো, এমন সময় হঠাৎ উদয় হয়ে বললেন, “আহারে প্রজ্ঞা, খুব কষ্ট হচ্ছে না হাঁটতে? ওপরে ওঠার আগে একটু জিরিয়ে নে না পারলে।” অবশ্য আমায় জিরিয়ে নিতে বললেও নিজের ঘরে এসে কিন্তু একবারও বসতে বললেন না। “না জেঠি, সেরম খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না।”- এই বলে হাসিমুখে সরে এলাম। একদিন পাড়ার মোড়ে বাপির অফিস কলিগ প্রবীর কাকুর সাথে দেখা। আমায় বললেন, “কিরে প্রজ্ঞা কোথায় চললি?” আমি বললাম, “এইতো কাকু আবৃত্তির ক্লাসে যাচ্ছি।” কাকু বললেন, “সে কি, সে তো সেই বোসপাড়ায়! এতটা রাস্তা হেঁটে যাবি? তোর বাবা-মা এভাবে ছেড়ে দিল? একদম না। এত টোটো ঘুরছে রাস্তায়, একটায় উঠে পড়। তুই খোঁড়া মানুষ, এতদূর হেঁটে যাবি কী করে?” আমি তাজ্জব! হেঁটে যাবো কী করে মানে? দুটো পা আছে, সে তো হাঁটবার জন্যই। সেই ছোটবেলা থেকেই প্রতি শনিবার বিকেলে হেঁটে আবৃত্তি ক্লাসে যাই। প্রায়ই কাকুর সাথে দেখা হয়। কই আগে তো কোনোদিন এমন প্রশ্ন করেননি। আমি খোঁড়া, কিন্তু শয্যাশায়ী নই। আমাকে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো দেখা যায় না? কিসে আলাদা আমি তাদের থেকে? বাকিদের ডান গোড়ালি সোজা আর আমারটা বাঁকা, এই বুঝি আমার দোষ? একদিন মামাবাড়ি গেছিলাম মার সাথে। মাসিমণিও এসেছিল। ওপরে ভাইবোনেদের সাথে গল্প করছিলাম। এক গ্লাস জল খাব বলে নিচে নেমে শুনি রান্নাঘরে লুচি ভাজতে ভাজতে মাসিমণি দিদাকে বলছে, “সত্যিই তো। খুবই চিন্তার বিষয়। একটাই মেয়ে। একেই শ্যামলা রং, তারপর এখন আবার খোঁড়া। কি যে হবে পরে কে জানে…।” আমার কান গরম হয়ে গেল। চোখ জ্বলতে লাগলো। চুপচাপ সরে এলাম।

এভাবে দিনের পর দিন ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ভাবতে লাগলাম, সবাই তো ধরেই নিয়েছে যে আমার জীবনটা শেষ, আমার আর কিচ্ছু হবে না। নিশ্বাস নিচ্ছি, তাই রোজনামচাগুলোও করতে হচ্ছে। সকালে উঠছি, স্কুল যাচ্ছি, টিউশন পড়তে যাচ্ছি, বাড়িতে পড়ছি, মিষ্টুদিদির সাথে কথা বলছি মাঝেসাঝে, খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি। ব্যাস এইটুকুই। যতদিন এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে চলবে, চালাবো। তারপর কোনো একদিন দাদুর মতন মিলিয়ে যাব নিরুদ্দেশের তেপান্তরে। কেউ খুঁজবে না, মনেও রাখবে না। সবাই আমার দিকে করুণাভরে চায়, যেন আমি কালীপুজোর রাতে বলি হবার পাঁঠা। হাঁড়িকাঠে মুন্ডুটা দিয়েই রেখেছি, শুধু কোপটা পড়ার অপেক্ষা!

তাই শেষমেষ একদিন সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। কারোর কাছে আমার জীবনের বিশেষ একটা মূল্য নেই। তাহলে আর এই দেড়শ কোটির দেশের বোঝা বাড়িয়ে লাভ কি? ঠিক করলাম বিল্ডিংএর ছাদ থেকে ঝাঁপ দেব। প্রথমে মেট্রোর ট্র্যাক ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বিবেচনা করে দেখলাম যে মেট্রোর সামনে ঝাঁপ দিলে আবার সেই এক-দু ঘন্টার জন্য মেট্রো চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, যাত্রীদের হয়রানি হবে, কাজের ক্ষতি হবে, লোকেরা যে মরেছে তাকেই গালমন্দ করবে। কি দরকার এতগুলো মানুষের হয়রানি করে, অভিশাপ কুড়িয়ে? আমাদের এই “জীবন আবাসন” বরং অনেক ভালো স্পট। ছাদে দুপুরবেলা কেউ ওঠে না। সব ফ্লাটের বাসিন্দাদের কাছেই ছাদের একটা করে চাবি দেওয়া আছে। টুক করে কেটে পড়তে পারবো, কোনোরকম হইচই-ডামাডোল ছাড়াই। গত মঙ্গলবার দুপুরবেলাটা বাছলাম। ওই সময় বাপি অফিসে থাকে, মা টিভিতে বাঘবন্দি না সিংহবন্দি নামক অদ্ভুত একটা বাংলা সিরিয়াল দেখে আর ঠাম্মি দিবানিদ্রায়। স্কুল গেলাম স্কুলের টাইমে, নাহলে মা অহেতুক অশান্তি করবে। স্কুলে বাপির সিগনেচার নকল করে চিঠি দিলাম যে ডাক্তার দেখানোর জন্য আমায় টিফিনের সময় বাড়ি যেতে হবে। এটা শুনে আপনি চোখ পাকাতেই পারেন। কিন্তু এরকম একটা-দুটো খুচরো বাজে কাজ স্কুল লাইফে সবাই করে। যদি ভাবেন এটা গুরুতর অপরাধ, তবে আমাকে নিজের ডিফেন্সে অন্নদাশঙ্কর রায় আওড়াতে হয়- “তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো?/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো, তার বেলা?” আমার ভুলটাও খানিকটা ওই “তেলের শিশি ভাঙা”র মতই যৎসামান্য। নয় কি?

আমার পায়ের সমস্যার কথা স্কুলে কারো অজানা নয়। তাই অনুমতি পেতে অসুবিধা হল না। আসলে চিরকাল “ভালো মেয়ে”র তকমা পেয়ে আসা আমি যে বাপির সই নকল করে চিঠি লিখে স্কুল পালাতে পারি- একথা আমাদের প্রিন্সিপাল ম্যামের মাথাতেই আসেনি। প্ল্যানমাফিক টিফিন টাইমে স্কুল ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে টোটো নিয়ে বিল্ডিংএর সামনে নামলাম। মনকে প্রস্তুত করেছি আমি সারাটা দিন ধরে যে, এই পৃথিবীতে এই কয়েকটা ক্ষণই আমার শেষ মুহূর্ত। আমি অবাঞ্ছিত, তাই টাটা গুডবাই ওয়ার্ল্ড।

বুকের ভিতরটা যে একটুও কাঁপেনি তা নয়। পরীক্ষার খাতা বেরোনোর আগের দিন যেমন পেট গুড়গুড় করে, তেমনি একটা চাপা উত্তেজনা-আশঙ্কা মেশানো অনুভূতি ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছিল। ভাবছিলাম, কি লাভ হলো এই চোদ্দটা বছর পৃথিবীতে বেঁচে থেকে? কারোর মনে দাগ কাটতে পারলাম না, বিশেষ কিছু করে উঠতে পারলাম না। তাই আমার এখানে থাকাই বা কি আর না থাকাই বা কি?

গেটের সামনে নীল উর্দি পরা পাহারাদার কানাইকাকা তখন যথারীতি চেয়ারে বসে ঢুলছে। আমি ধীর পদক্ষেপে হেঁটে বিল্ডিংয়ে ঢুকতে যাব। মনে হল মরার আগে একবার আমাদের বিল্ডিং-এর পিছনের ঘাসজমিটায় থাকা ভুলো কুকুরকে একবার দেখে আসি। প্রায়দিনই ওকে বিস্কুট খাওয়াই আমি। বড় ভাল প্রাণী। যেমন ভাবা তেমন কাজ। পিছন দিকে এগিয়ে গেলাম গুটিগুটি। কিন্তু বাঙ্গালীদের স্বভাব তো! নিজের অজান্তেই চোখটা চলে গেল একতলার ফ্ল্যাটের মিত্র জেঠিদের ঘরের দিকে। পিছনের ঘরটা ওনাদের ছেলে বিট্টুদার। আমার চেয়ে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে। সামনের বছর এইচ.এস দেবে। কিন্তু একি কি করছে বিট্টুদা? ঘরের দরজা ভিতর থেকে আটকানো। খাটের উপর একটা টুল রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে উপরের ঝুলন্ত ফ্যানে একটা হলুদ ওড়না বাঁধছে বিট্টুদা।

আমি বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে রইলাম। ভয়ে-আশঙ্কায় গলা শুকিয়ে গেল, হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে গেল। করছেটা কি ও? গলায় দড়ি দিতে যাচ্ছে নাকি? সত্যিই তাই! হলুদ ওড়নার অন্য প্রান্তটা নিজের গলায় বাঁধতে শুরু করেছে বিট্টুদা। সর্বনাশ! মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপরে আর কিছু না ভেবে পড়িমড়ি করে একছুটে, নিজের পায়ের ব্যাথা ভুলে আমি বিল্ডিংএর ভেতরে ঢুকে মিত্র জেঠিদের দরজায় পাগলের মতন করাঘাত করতে লাগলাম। প্রচন্ড বিরক্ত মুখে দরজা খুলে কিছু একটা উল্টোপাল্টা বলতে যাচ্ছিলেন উনি। আমি জেঠিকে ঠেলে ভিতরে ঢুকে উন্মাদের মতো ছুটে গেলাম বিট্টুদার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে। জেঠি ততক্ষনে বুঝে গেছেন যে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটাচ্ছে ছেলেটা ঘরের ভিতরে। আমরা দরজায় করাঘাত করে পাগলের মত চিৎকার করছি। পাশের ফ্ল্যাট, উপরের ফ্ল্যাটগুলো থেকে অনেকে নেমে এসেছে চিৎকার শুনে। আমাদের ঘুমন্ত গেটকিপারও দিবানিদ্রা ভেঙে ছুটে এসেছে। সবাই মিলে ধাক্কাধাক্কি করে দরজা ভেঙে যখন ঘরে ঢুকলো তখন বিট্টুদা উপর থেকে ঝুলছে। সবাই ধরাধরি করে নামিয়ে দিল। অ্যাম্বুলেন্স এসে ওকে নিয়ে গেল। লোকে-লোকারণ্য সারা বাড়িতে। আমার বাপিও ফিরে এসেছে অফিস থেকে। ঝড়ের মতন ঘটে গেল সবকিছু।

নাহ, বিট্টুদার কিছু হয়নি। বেঁচেই আছে সে, তবে রিকভার করতে সময় লাগবে। ডাক্তারের মতে কয়েক সেকেন্ড দেরী হলে আর তাকে বাঁচানো যেত না। আমাকেও হসপিটালে ঘুরে আসতে হয়েছে একবার পায়ের যন্ত্রণার কারণে। পরদিন সকালে থানা থেকে এক পুলিশকাকু এসে আমার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে গেছেন। আমি কিভাবে জানতে পারলাম বিট্টুদার ব্যাপারটা, আমি সেসময়ে স্কুলে না থেকে বাড়িতে কি করছিলাম, বিল্ডিং-এর পিছন দিকে কেন গেছিলাম- এসব খুঁটিনাটি প্রশ্ন। কখন যেন কথায় কথায় আসল সত্যিটা বেরিয়ে গেল। সেই পুলিশকাকুই বাপি আর মাকে ডেকে কিসব ভারী ভারী জ্ঞান দিলেন। বাপি আর মায়ের চোখমুখের ভঙ্গি বদলে যেতে লাগল শুনতে শুনতে। সেদিনটা বোবার মতন কাটলো। আমি কাউকে নিজের ব্যাপারে আর কিছু বললাম না। অবাক কান্ড, কেউ আমায় প্রশ্নও করল না। দুদিন ধরে কাদের সাথে যেন বাপির খুব ফোনালাপ চলল। তিন দিনের দিন বাপি আর মা আমায় এইখানে হাজির করল আপনার কাছে অর্থাৎ কাউন্সিলর সর্বাণী মুখার্জির চেম্বারে!

আপনার মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে জানেন তো। একটা ভালোলাগার অনুভূতি হয় আপনার কাছে এলে। আপনার এই নীল আলো জ্বলা সুগন্ধি ঘরটায় ঢুকলে, কথা বললে মনের ভিতরের আগ্নেয়গিরির গনগনে লাভাটা খানিক জুড়োয়। আপনিই পরামর্শ দিলেন এই চিঠি লিখতে, মনের সব কথা উগরে দিয়ে।

সেইমতো লিখতে শুরু করলাম। কাটাকুটি করতে করতে কয়েকটা সাদা পাতা নষ্ট করার পর কি যে হলো, দেখুন কেমন স্রোতের মতন এই এতগুলো শব্দ বেরিয়ে এলো! এই যে আমি বিট্টুদার ঘটনাটা লিখলাম, এটা লিখতে লিখতেই উপলব্ধি করলাম যে আমি আসলেই এরকম মৃত্যু চাই না। বিট্টুদার অবস্থাটা দেখুন! কি সুন্দর ফুটফুটে চেহারা, পাড়া ক্রিকেটে ওই আমাদের বিরাট কোহলি। মাধ্যমিকের পরে এক্লাব-ওক্লাব থেকে কত প্রাইজ পেল। আর এখন জ্যান্ত লাশের মতন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। মিত্র জেঠি আর জেঠুর অবস্থা বলার মতন নয়। তাছাড়া সারাক্ষণ সবাই ওদের নিয়ে কথা বলাবলি করছে। এমনিতে আমার খোঁড়া পায়ের সুবাদে আমাদের ফ্লাটটাই সবসময় লাইমলাইটে থাকে। আগে বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝছি যে, সেদিন আমি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলে আমার বাড়ির লোকের কি হয়রানিটাই না হতো! তাছাড়া এই চোদ্দ বছর বয়সে এভাবে হুট্ করে চলে গেলে আর দেখাই হতো না আদৌ ভবিষ্যতে আমার জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে কিনা। আমার নাম জানেন তো? প্রজ্ঞা অর্থাৎ পরম জ্ঞান। এমন মূর্খের মতন কাজ কি আমার মতন জ্ঞানীকে মানায়?! এমনিতেই বাপি আর মার মুখ গোমড়া সারাক্ষণ। আমি না থাকলে ওদের বোধহয় আর মুখই দেখা যেত না। সাধারণ মানুষের হয়রানি হবে ভেবে মেট্রোর সামনে ঝাঁপ দিলাম না। কি দরকার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজের বাড়ির মানুষদের হয়রান করার? আমি তো খোঁড়া পা নিয়েই দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছি। ঠাম্মি বলে, মেয়েদের নাকি হতে হয় রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী। আমি নাহয় রূপে দাঁড়কাক গুণে কাদাখোঁচাই হলাম। কার কিবা যায় আসে তাতে? আমার কিছু হলে দুনিয়ার ভারি বয়েই গেল! আমিও তাহলে নিজের মতই থাকি নাহয় দুনিয়ার মেকি করুণাকে পাত্তা না দিয়ে। খোঁড়া পা নিয়ে ফ্লাটের দরজা পেরিয়ে বোসপাড়ায় আবৃত্তির ক্লাস অবধি যখন হেঁটে যাতায়াত করতে পারছি, মনে হয় বাকি জীবনটা খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে বা মুচকে-মুচকে কিংবা হোঁচট খেয়ে- যেভাবেই হোক না কেন, একাই হেঁটে যেতে পারব। কি বলেন আপনি?

চিঠিটা খুব লম্বা আর অগোছালো হয়ে গেল না? একটা সাধারণ মেয়ের সাধারণ চিঠি আর কি! আচ্ছা, পরেরটা নাহয় আরেকটু গুছিয়ে লিখব!

                                         -ইতি

                      আপনি যাকে নাম দিয়েছেন “যোদ্ধা”।

Author: Amrita Das

Amrita Das
Writer

One thought on “একটা সাধারণ চিঠি

Leave a reply to Sukalpa Choudhury Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.