প্যারাসিটামল

টেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল আনজুম। এমন ধুলোহীন নির্মল নীলাকাশ তাদের কলকাতা শহরে সে কেন, তার বাপ ঠাকুরদ্দাও দেখেনি কোনোদিন। যতদূর চোখ যায় কেবল সুউচ্চ পর্বতচূড়ার দল সগর্বে মাথা তুলে বিরাজমান। দূরের পাহাড়গুলোর মাথা সবই সাদা, আর কাছেরগুলো চোখ জোড়ানো সবুজ। সবুজের গায়ে জায়গায় জায়গায় চোখে পড়বে আগুনরঙা লালের ছোপ। ওগুলো আসলে একরকম পাহাড়ি লাল ফুল। গ্রামবাংলার ধান ক্ষেতের মতোই হিমালয়ের এই প্রান্তে পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে কেটে চাষ করা হয় এই ফুল। ধানের মতই লম্বা এর শীষ। নামটা কি যেন বলেছিল গাইড আরমান ভাইয়া? নাহ্। মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। ভাইয়াকেই আরেকবার জিজ্ঞাসা করতে হবে। আরমান ভাইয়াই বলেছিল এই দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী গ্রামের লোকেরা এই ফুলের শীষ গুঁড়িয়ে আটা বানিয়ে, সেই আটার রুটি গড়ে। “গমের আটার সুন্দর রিপ্লেসমেন্ট!”, মনে মনে ভাবল আনজুম।

বিকেল মোটে পাঁচটা বাজে। কিন্তু এরই মধ্যে শরীর জাপটে ধরতে শুরু করেছে হিমালয়ের হিমশীতলতা। শুধু ফ্লিস্ পড়ে আর কাজ হচ্ছে না, এবার ফিদার জ্যাকেটটা চাপাতেই হবে।

“এই আনজুম, এদিকে আয়… চা এসে গেছে।” হাঁক পাড়ল তন্ময়।

-“হ্যাঁ তোরা নিয়ে নে। আমি আসছি এক্ষুনি।” গলা চড়িয়ে জবাব দিল আনজুম।

গোধূলি বেলার আমেজে মোড়া মায়াবী আকাশের দিকে শেষ একটা দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে আলতো পায়ে টেন্টের দিকে এগিয়ে গেল আনজুম। ফোরম্যান টেন্টের ভিতর ওর বন্ধুরা ততক্ষনে জাঁকিয়ে বসেছে। সঙ্গ দিচ্ছে ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর সোয়াবিন দিয়ে বানানো অদ্ভুত একটা খাবার। এক চামচ চেখে দেখল আনজুম। সঙ্গে সঙ্গেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “বাহ্! দারুন খেতে তো।” সত্যিই ওদের কুক উপিনজি রাঁধেন বেশ। অবশ্য এগারো হাজার ফুট উচ্চতায়, হিমালয়ের এই প্রত্যন্ত প্রান্তে, টেন্টের উষ্ণতায় বসে, সারাদিনের পরিশ্রমে শ্রান্ত দেহ নিয়ে মুখে যা দেবে তাই অমৃত।

আনজুম ও তার তিন বন্ধু মিলে ট্রেকিংয়ে এসেছে কুমায়ুন হিমালয় এক দুর্গম ভ্যালিতে। ওঠানামা মিলিয়ে পাঁচ দিনের ট্রেক। আজ ওদের চতুর্থ দিন। চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় মূল উপত্যকাতে ট্রেক করে ওঠার পর এখন ওরা চলেছে ফিরতি পথে। আজ ওদের তাঁবু পড়েছে একটা নাম-না-জানা নদীর পাশেই, চ্যাপটা ঘাসের চাদরে। এই জায়গাটায় দাঁড়ালে খানিক নিচেই ছবির মতন ছোট্ট একটা গ্রাম চোখে পড়ে। নাম গেঙ্গার। মাঝেমধ্যেই আনজুমদের ক্যাম্পসাইটের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে স্থানীয় মহিলা, পুরুষ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, দুরন্ত কিশোর, লাজুক কিশোরীরা। মাথায় প্রায় প্রত্যেকেরই অন্তত তিরিশ কিলোর বোঝা। এখন অক্টোবর চলছে। শীত আসন্ন। তাই শীতের কথা ভেবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী, পশুখাদ্য ও জ্বালানি মজুত করে চলেছে এরা নিরন্তর। কখনো চোখে পড়ছে গলায় ঘন্টা বাঁধা, টুংটাং শব্দ করতে করতে চলে যাওয়া মালবাহী খচ্চরের দল, আবার কখনো সাদা-কালো ভেড়ার পাল। পাথুরে মেঝের ওপর দিয়ে সশব্দে বয়ে চলা নদীর স্ফটিকস্বচ্ছ জলে পাথর ছোঁড়ার খেলা খেলছে কচিকাঁচার দল। তাদের পোশাক-আশাক, তাদের নিরাভরণ ঘটনাবিহীন জীবনের মতই বিবর্ণ।

“কি কঠিন এদের জীবনযাত্রা, অথচ কি সহজ!”, আনজুম মনে মনে ভাবল। নেই শহুরে জটিলতা, আধুনিকতার রেশ ধরে আসা কৃত্রিমতা। তবুও কাঠিন্যের বেড়াজালেই কোথাও রয়েছে একটা শান্তির সুতো, আনজুমদের মতন দূর শহরের বাসিন্দারা হাজার খুঁজলেও যার নাগাল হয়তো পাবে না। আচ্ছা, আনজুম যদি এখানকার মেয়ে হত তবে সেও নিশ্চয়ই সকাল-বিকেল এমনি পরিশ্রম করত? পরনে থাকত একটা ধূলিমলিন ফুলহাতা কুর্তা-কামিজ, তার উপরে চাপানো সুতো ওঠা একটা পুরনো ময়লা সোয়েটার। খড়ের মতোন উস্কোখুস্কো চুলগুলো জড়ানো থাকতো লাল ফিতে দিয়ে। কপালে থাকতো টিপ, কানে সস্তার দুল। পায়ে পাম্প শু জাতীয়, প্রায় ছিঁড়তে বসা জুতো। হয়তো বড় দাদা বা দিদির থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। পিঠে কাঠের কিংবা খড়ের বোঝা চাপিয়ে, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে তরতরিয়ে নেমে আসত গ্রামে। পথে যদি দেখা হতো কোনো শখের ট্রেকিং দলের সাথে, তাদের থেকে চেয়ে নিত রঙিন কাগজে মোড়া ক্যান্ডি। নিজে খেতো, সোয়েটারের পকেটে রেখেও দিত কিছু ভাইবোনেদের জন্যে। মেষপালকদের দলের সাথে দেখা হলে আদর করে কোলে তুলে নিত সাদা তুলোর পিণ্ডগুলোকে। খুব খারাপ হত কি সেই জীবন?

-“কিরে পাগল, নিজের মনে কি ভাবছিস? তুই যে থেকে থেকে কোথায় হারিয়ে যাস কে জানে।”, পিছন থেকে এসে সহসা ওর মাথায় চাঁটি মেরে সুহাস বলল। ভাবনার জাল কেটে বেরিয়ে এলো আনজুম। বলল, “নাহ্ কিছু না। আজ রাতে কি খাওয়াবে রে?”

তন্ময় বলল, “কে জানে। তবে যাই খাওয়াক, ওই আলুহীন পাঁচমিশালি সবজির তরকারিটা যেন না খাওয়ায়।”

সুহাস বাঁকা হেসে প্রশ্ন করল, “আর যদি ওটাই রান্না হয়ে থাকে আজও তাহলে তোর উপোস  তো, তন্ময়?”

-“উপোস নয়, একে বিদ্রোহ বলে। আমি উপিনজির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব। পাঁচমিশালি বোরিং সবজি চলছে না চলবে না।”

-“থাক না তন্ময়, বিদ্রোহটা বরং নিজের বাড়ির রান্নাঘরে মায়ের সামনে করিস। এখানে এসব করেও লাভ নেই। যা বানিয়ে দেবে না খেলে বিষ চাইলেও পাবিনা।”, আনজুম বলল।

-“তোরা সব কাপুরুষের দল।” তন্ময়ের মুখ বেজার।

-“হ্যাঁ, সে তো বটেই। আর আপনি হলেন পরম সাহসী সেই পুরুষ তিনি মাকড়সা দেখলেও ভয় পান!”, দেবোজিতের কথায় হো-হো করে একসঙ্গে হেসে উঠল সবাই।

ক্রমে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। গেঙ্গার গ্রামে জ্বলে উঠলো আলো। বাইরে শীতলতার পারদ ঊর্ধ্বগামী। তবে টেন্টের ভিতরে চার বন্ধুর নির্ভেজাল আড্ডা ভুলিয়ে দিচ্ছে মেরুদন্ডের শিরশিরানিকে। অনতিদূরেই কিচেন টেন্ট থেকে উপিনজি আর আরমান ভাইয়ের উচ্চস্বরে স্থানীয় ভাষায় গালগল্পের আওয়াজ ভেসে আসছে।

তন্ময় বলল, “আনজুম, একটা গান কর না। এমন নিঝুম পরিবেশে গান শোনার মজাই আলাদা।”

দেবোজিত সবচেয়ে হুজুগে, হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো- “হোক হোক, গান হোক। আমরা বরং বাইরে গিয়ে বসি।”

-“না না। বাইরে যা ঠান্ডা, আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোবে না! এখানেই হোক। তোরা কিন্তু জয়েন কর আমায়।”  আনজুম গান ধরল “ইয়ে রাতে ইয়ে মওসাম, নদীকা কিনারা, ইয়ে চঞ্চল হাওয়া…”

সুহাস একটা স্টিলের টিফিন কৌটো নিয়ে তালে তালে বাজাতে শুরু করল।

ভালোই জমে উঠেছিল গানের আসর। একের পর এক হয়ে চলেছিল নতুন-পুরনো হিন্দি-বাংলা নানান গান। এমন সময় বাইরে একটা অচেনা গলার গোঙানি শুনে তাল কেটে গেল ওদের। উপিনজি আর আরমান ভাইয়ার গলাও পাওয়া যাচ্ছে। হোলোটা কি এই সময়? কেউ চোট-টোট পায়নিতো? টেন্টের চেন খুলে বেরিয়ে এল চারজন। অন্ধকারে মনে হোলো ওদের তাঁবুর সামনেই বড় পাথরটায় হেলান দিয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আছে একটা লম্বা কাঠামো। টর্চের আলো ফেলতেই প্রকট হল স্থানীয় একটি লোক। পাশে আবার বিশাল কাঠের বোঝা রাখা। সুহাস জিজ্ঞাসা করল, “কেয়া হুয়া হ্যায় ইনকো আরমান ভাইয়া? অ্যায়সে কিঁউ লেটে হুয়ে হ্যায়?”

আরমান উত্তর দিল, “ম্যায় তো আপ লোগো কো হি বুলানে আ রহা থা জি। ইনকো ইতনা সর দর্দ হো রহা হ্যায় কি চল হি নহি পা রহে।”

আরমানের থেকেই জানা গেল লোকটার বাড়ি গেঙ্গার গ্রামে। বোঝাই যাচ্ছে কাঠ সংগ্রহ করে দিনের শেষে বাড়ি ফিরছিল। লোকটা মাথায় হাত চেপে ধরে ইশারায় আনজুমদের বোঝাতে চেষ্টা করল যে ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চোখ মুখ বেঁকে গেছে। তবুও সে ওদের দিকে চেয়ে অস্ফুটে বলার চেষ্টা করল, “কুছ দাবাই সাব…”

আনজুম সুহাসকে বলল, “লোকটার মাথায় হাত দিয়ে একবার দেখ না জ্বর আছে কিনা। শুধু মাথা ব্যাথা বলে তো মনে হচ্ছে না।” ওর কথা মতো সুহাস এগিয়ে গিয়ে লোকটার কপালে হাত ছোঁয়াতেই আঁতকে উঠলো- “একি! এর তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে একেবারে। কিছু ওষুধ না দিলে লোকটা উঠেই দাঁড়াতে পারবে না।”

আনজুম আর দাঁড়ালো না। ঝড়ের মতো ছুটে গিয়ে টেন্ট থেকে নিজের কমলা রঙের ওষুধের বাক্সটা নিয়ে চলে এলো। ওকে ওদের দলের একরকম মেডিসিন ব্যাংকই বলা যায়। এমনিতেই পাহাড়ে এলে, বিশেষত ট্রেকিংয়ে এলে সব রকম প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়ে আশাই নিয়ম। আনজুম কোন ওষুধই বাদ রাখেনি। গা গোলানো, বমি, মাথাব্যথা, লুজ মোশন, থেকে শুরু করে সর্দি-কাশি, কাটাছেঁড়া – সকল প্রকার পথ্যই ওর এই কমলা রঙের “প্যান্ডোরাজ বক্সে” মজুত। দ্রুত হাতে বাক্স থেকে বের করে আনলো প্যারাসিটামলের পাতা। ফাইল কেটে একটা ট্যাবলেট বের করে ওষুধ ও জলের বোতল এগিয়ে দিল লোকটার দিকে। বলল, “ভাইয়া ইয়ে দাবাই লে লিজিয়ে। বুখার অর সর দর্দ দোনো কম হো যায়েগা।” লোকটার যেন ওষুধ খাওয়ারও শক্তি নেই। আরমান ভাই ওকে ওষুধটা খাইয়ে দিলো। তারপর লোকটাকে উঠিয়ে ধরে ধরে নিয়ে চলে গেল নিজেদের টেন্টের দিকে। আজ রাতটা এখানেই থাকুক, কাল সকালে না হয় গ্রামে ফিরবে।

আনজুমরা নিজেদের টেন্টে ফিরে এসে বসলো। “সত্যি! কিরকম জীবন না? জ্বর হয়েছে বুঝতেও পারেনি। কারণ মাথায় চিন্তা, ওই বিরাট বোঝাটা নিয়ে গ্রামে ফিরতে হবে সন্ধের মধ্যে।” দেবোজিত স্লিপিং ব্যাগের ভিতর পা গলাতে গলাতে বলল।

-“এদের শরীর কিন্তু আমাদের চাইতে বহুগুণ বেশী মজবুত। সহজে রোগনাড়া কাবু করতে পারে না। এই লোকটার নিশ্চয়ই জ্বর আগে থেকেই ছিল। ওষুধ খায়নি, তাই আজ এক্সট্রিম পয়েন্টে এসে নুয়ে পড়েছে।” আনজুম মন্তব্য করল।

-“আরে ওষুধ পেলে তো খাবে। একটাই হেল্থ সেন্টার, তাও আবার এখান থেকে ষোলো কিলোমিটার নিচে। জ্বর গায়ে যাওয়া কি মুখের কথা?” সুহাস বলল হেডটর্চের আলোটা নিভিয়ে।

ওদের আলোচনা চলতে থাকে জোরকদমে অসুস্থ লোকটাকে নিয়ে। ক্রমে তা মোড় ঘুরিয়ে চলে যায় দেশের দুরাবস্থা, দারিদ্র, কর্মসংকট পেরিয়ে রাজনীতির দিকে। পাহাড়ের কোলে জাঁকিয়ে বসে ঠান্ডা। রাত গভীর হয়। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা বাড়ে।

পরদিন সকালে মুখ ধোয়ার পর ওরা আরমান ভাইয়ের টেন্টে উঁকি দিয়ে দেখল লোকটা নেই। প্রশ্ন করে জানা গেল তার জ্বর কমে যেতে সে নাকি ভোর হতে না হতেই কাঠের বোঝা মাথায় চাপিয়ে গ্রামে চলে গেছে। লোকটা ওদেরকে কিছু না বলেই চলে গেছে শুনে আনজুমের শহুরে মূল্যবোধ একটু আহত হল বইকি। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বলল, “এ কেমন লোক রে বাবা। ওষুধ দিয়ে সাহায্য করলাম, যাওয়ার আগে একটা শুকরিয়াও বলে গেল না?”

সুহাস ওর মনের অভিমানটা আন্দাজ করে বলল, “এটা নিয়ে এত ভাবিস না। তোর কলকাত্তাইয়া আদব-কায়দা এই জায়গায় চলে না। এখানকার মানুষরা এমনিতে অনেক সহজসরল হয়। হয়তো ওদের কাছে একজন মানুষ হিসেবে অন্য আরেকজন মানুষকে বিপদে সাহায্য করাটা স্বাভাবিক ধর্ম, যাতে ধন্যবাদের কোনো স্থান নেই। ইনফ্যাক্ট এটাই কি হওয়া উচিত নয়? কাউকে হেল্প করলে নিঃস্বার্থভাবে করবি। সবসময় রিটার্ন কিছু এক্সপেক্ট করবি কেন?”

-“বুঝতে পারছি তোর কথা। কিন্তু আমি যে সভ্যতায় বড় হয়েছি সেখানে যা স্বাভাবিক, আমার মন সেটাই এক্সপেক্ট করেছে। সাহায্যের বদলে একটা ধন্যবাদ এক্সপেক্ট করাতে আমি অন্তত দোষ দেখি না।” এই বলে দুমদাম পা ফেলে চায়ের কাপ হাতে নদীর পাশে একটা পাথরের উপর গিয়ে বসলো আনজুম। খানিকবাদেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ওরা নেমে যাবে আরো নিচে। ট্রেক শেষের পথে। আজই শেষ দিন। মন কেমনের সুর বাজতে শুরু করেছে। চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিচ্ছে, হঠাৎ আনজুমের চোখে পড়ল একদল স্থানীয় মহিলা-পুরুষ তরতরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে আসছে ওদেরই ক্যাম্পের দিকে। চায়ের কাপটা পাথরের উপর রেখে আনজুম উঠে দাঁড়ালো। ব্যাপারটা কি! ও পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দেবোজিত, তন্ময়, সুহাসও লক্ষ্য করেছে। আনজুম গুটিগুটি পায়ে এসে বন্ধুদের পাশে দাঁড়ালো। ওরা সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। মানুষগুলো ওদের দিকে আসছে কেন? এদিকে দলটা ক্রমশ আবছা থেকে আরো প্রকট হচ্ছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে ওরা আনজুমদের ক্যাম্প সাইটেই আসছে। কিন্তু কেন?

দলটা ক্যাম্পের কাছাকাছি আসতে সবার আগে যে লোকটা আছে, সে চেঁচিয়ে উঠলো, “ডাগতার সাহিবা… ডাগতার সাহিবা…”।‌  আনজুম হতবাক হয়ে বন্ধুদের মুখের দিকে তাকালো। ওরাও তাজ্জব হয়ে গেছে। কেউই কিছু বুঝতে পারছেনা।

দলটা ওদের সামনে এসে দাঁড়ানোর পর, যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল তার মুখটা পরিষ্কার হল। গতরাতের সেই অসুস্থ মানুষটা। দিব্যি চাঙ্গা লাগছে আজকে। মনেই হবেনা এ মাত্র কিছু ঘণ্টা আগেই মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছিল। লোকটা আনজুমকে দেখিয়ে স্থানীয় ভাষায় নিজের সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলল। এরপর ওদের মধ্যে থেকে একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে আনজুমের সামনে হাত জোড় করে বসে পড়ল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে ব্যক্ত করতে থাকলো তার আর্জি- “ডাগতার সাহিবা, মেরা বিবি বিমার। বুখার… দর্দ… দাবাই দিজিয়ে না…”

একজন মধ্যবয়স্ক ময়লা কুর্তাকামিজ পরা মহিলা এগিয়ে এল এরপর। বলল, “মেরেকো সরমে দর্দ ডাগতার সাহিবা…”, এই বলে নিজের মাথায় দুমাদ্দুম চাঁটি মেরে বোঝাতে চাইল, মাথায় যন্ত্রণা। একটি অল্প বয়সী ছেলে বলে উঠলো, “মেরি মা গির গয়ি। বহুৎ চোট আয়ি হ্যায় প্যায়েরমে। দাবাই দিজিয়ে না…”। একে একে প্রায় সকলেই নিজেদের সমস্যা ব্যক্ত করতে থাকলো ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে।

আনজুম হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ কোন ঝামেলায় পড়লো রে বাবা! ওরা একরকম ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে যাত্রা শুরুর জন্য প্রস্তুত। এমন সময় এসব কি শুরু হল ওর সাথে! ও তো কেবল লোকটাকে ওষুধ দিয়েছিল। আর সে কিনা ওকে বানিয়ে দিলো ডাক্তার! যেন সুকুমার রায়ের, “ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল”। সুহাস আনজুমের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, “কিরে, গ্রাটিচিউড চাইছিলি না? নে, এবার পুরো পল্টন হাজির তোর সেবা নিয়ে গ্ৰাটিচিউড শো করতে।”

-“কিরে, এত ওষুধ আছে? সব দিয়ে দিলে আমাদের নিজেদের জন্য কি থাকবে?” তন্ময় প্রশ্ন করল। আরমান ভাইও এগিয়ে এসে বলল, “কেয়া বহেন, কহো তো ভাগা দু সবকো? ম্যায় কহ্ দুঙ্গা কি মেডিসিন খতম হো গয়ি হ্যায়।”

এক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে আনজুম। তারপর দৌড়ে গিয়ে টেন্ট থেকে রুকস্যাকে রাখা কমলা রংয়ের ওষুধের বাক্সটা নিয়ে চলে এলো।  মানুষগুলোর উৎকণ্ঠিত চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওকে দেখে। এদের সমস্যা মূলত জ্বর না হয় গায়েহাতে ব্যথা। কোই বাত নহি। প্যারাসিটামলেই কাজ হয়ে যাবে। আনজুমদের সবার সঙ্গেই প্যারাসিটামল আছে। তাই আনজুমেরটা শেষ হয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। আর তাছাড়া ওরাতো আজি ট্রেক করে নিচের গ্রামে নেমে যাচ্ছে। কালকেই ফিরে যাবে বড় শহর দেরাদুনে। ওষুধের প্রয়োজন পড়লে ওখান থেকে কিনে নেওয়াটা কোন ব্যাপারই হবে না।

আনজুম এরপর অভ্যস্ত হাতে একের পর এক প্যারাসিটামল পাতা থেকে কেটে কেটে হাতে দিতে থাকলো অপেক্ষারত মানুষগুলোর। বুঝিয়ে দিল কখন খেতে হবে। কিভাবে খেতে হবে।

লাইন করে এক এক জন এসে ওষুধ নিচ্ছে হাত পেতে। আর নেওয়ার পর হাতজোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে নমস্কার করছে তাদের সদ্য আবিষ্কৃত “ডাগতার সাহিবা”কে। অদূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে আনজুমের বন্ধুরা।

ওষুধ নেওয়ার পর্ব মিটে গেলেও দলটা কিন্তু থেকে গেল। আনজুমরা সব জিনিস গুছিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। হাঁটা শুরু করবে এবার। এমন সময় মানুষগুলো এগিয়ে এলো বিদায় সম্ভাষণের জন্য। যে ছেলেটি মায়ের জন্য ওষুধ নিয়েছিল সে বলল, “ডাগতার সাহিবা, ফির আয়েঙ্গে না?”  ছেলেটি আনজুমেরি ভাইয়ের বয়সী হবে। ওকে দেখে কেমন যেন মায়া হল আনজুমের। নিজের ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। এরপর একে একে সকলেই তাদের ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে বলতে থাকলো- “আপ বহত আচ্ছে হো ডাগতার সাহিবা”, “ফির আইয়েগা…” এইসব।  মধ্যবয়সী মহিলাটি এসে আনজুমের হাত ধরে বলল, ‘আচ্ছে সে যাইয়ে। হাম ইন্তেজার করেঙ্গে আপকে আনেকা।” হাত নেড়ে মানুষগুলো জানাতে থাকে শ্রদ্ধামাখা বিদায়।

নিচের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেবোজিত ফুট কাটলো, “কিরে আনজুম, তুইতো রাতারাতি ভগবান হয়ে গেলি! কেমন লাগছে এই সুপিরিয়র পোজিশন থেকে সবকিছু?” বাকিরা হেসে উঠল ওর কথায়।

আনজুম কিন্তু নির্বাক। ওর গলায় যে অদ্ভুত অনুভুতির মন্ডটা ঘোঁট পাকিয়ে ওর কথা বন্ধ করে দিচ্ছে সেটা আসলে কি, ওর জানা নেই। খুশি, আনন্দ? নাকি কষ্ট? ওর নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে। ও যা আসলে নয়, তাই হয়ে গেছে এদের কাছে। কতগুলো সরল নিরুপায় মানুষের অজ্ঞতাকে যেন ব্যবহার করে মহান হয়ে গেছে ও। যেন এক ঠগ। কিন্তু ইচ্ছে করে তো করেনি। মানুষগুলোকে সাহায্য করতে চেয়েছে। আর কিই বা করার ছিল ওর? তবে কিসের কষ্ট ওকে ডুবিয়ে দিচ্ছে ক্রমশ? কোন কারণে চোখের কোণ চিকচিক করছে ওর? নিজের নিষ্পাপ অপরাধের কথা ভেবে, নাকি মায়াহীন স্বার্থের এই দুনিয়ায় না চাইতেই এক পৃথিবী ভালোবাসা পেয়ে যাওয়ার সুখে? আচ্ছা প্যারাসিটামল শুধু শরীরের ব্যথাই কমায়? আনজুমের বুকের ভিতর বাড়তে থাকা ঘূর্ণিটাকে কমাতে পারবে না?

মিশ্র অনুভূতির মন্ডটাকে মনেই চেপে রেখে নিচের দিকে হেঁটে চলে আনজুম, ওর দলের সাথে পা মিলিয়ে। উপরে তখন ওদের ফেলে আসা বাসস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা তৃপ্ত হাসিখুশি মুখগুলো চেয়ে থাকে নিচের দিকে, হয়তো আবার কোনো নতুন “ডাগতার সাহিবা”র আসার অপেক্ষায়।

Author Amrita Das

Amrita Das (amrita.sep2@gmail.com), Writer

7 thoughts on “প্যারাসিটামল

    1. শব্দ পত্রিকা কৃতজ্ঞ আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে। লেখিকা অমৃতা দাসের কাছে আমরা পৌঁছে দেবো আপনার কমেন্ট।

      Like

  1. মন ছুঁয়ে গেল তোমার লেখা। সত্যি বলতে কি, তোমার লেখা পড়লে চোখের সামনে ছবিটা ভেসে ওঠে।
    তোমার অনেক সুকৃতি কামনা করি।

    Liked by 1 person

    1. শব্দ পত্রিকা কৃতজ্ঞ আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে। লেখিকার কাছে আমরা পৌঁছে দেবো। একদম আধুনিক এক ন্যারেশান! আমাদের পরম প্রাপ্তি অমৃতা দাস আমাদের এত সুন্দর একটি উপহার দিয়েছেন।

      Like

  2. ভালো লাগলো পরে। আশা করি আর অনেক লেখা আসবে। লিখতে থাকুন।

    Liked by 1 person

    1. শব্দ পত্রিকা কৃতজ্ঞ আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে। লেখিকার কাছে আমরা পৌঁছে দেবো। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে অমৃতা দাস তার এত সুন্দর একটি ন্যারেশান আমাদের সকলকে গিফট দিয়েছেন।

      Like

    2. শব্দ পত্রিকা কৃতজ্ঞ আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে। লেখিকা অমৃতা দাস আমাদের পত্রিকাকে একটি সুন্দর উপহার দিয়েছেন। আমাদেরও একান্ত অনুরোধ যে উনি আরও লিখুন এবং আমরা উপকৃত হই সেই লেখাগুলি পড়ে।

      Like

Leave a reply to shobdothemag Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.