“কি রে, অফিস যাবি না? সারে আটটা বাজে তো।”
মায়ের ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসল পলাশ।
সারে আটটা মানে আজও অফিস লেট! নিজেকে নিজে খিস্তি দিল মনে মনে।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল পৌনে আটটা সবে।
“উফ, মা, পৌনে আটটা সবে।”
রান্নাঘর থেকে মা বলে উঠল,
“রেডি হও, লেট হয়ে যাবে,নিজের তো দায়িত্ব নেই,সব দায় যেন আমার। আসুক তোমার বউ, দেখবো কত করে। আমিও হাল ছেড়ে বাঁচি।”
মনে মনে প্রমাদ গুনল পলাশ, ‘এইরে, এখুনি ঝুরি ঝুরি অভিযোগ শুরু হবে।‘
চেঁচিয়ে মাকে খেতে দিতে বলে সে ঢুকল স্নান ঘরে। স্নান করতে করতে মায়ের অভিযোগ শুনতে থাকল পলাশ। যদিও সেটা নতুন না, রোজ মায়ের ঝুলিতে এরকম হাজার অভিযোগ জমা থাকে। খেতে দিতে দিতে মা বলল,
“প্রেশারের ওষুধ শেষ – এক সপ্তা থেকে বলছি, মনে থাকে না তোমার। আর মনে থাকবেই বা কেন, আমি তো দাসী এ বাড়ির! তোমার বাবাও তাই মনে করতো, এখন তুমিও তাই মনে করো।”
পলাশ বলল,
“উফ মা, একটু শান্তিতে খেতে দাও। রোজ রোজ এক কথা বলতে এত ভাল লাগে তোমার ?”
“হ্যাঁ আমি তো বেশি কথা বলি, সেই, ঠিক আছে আর বলবো না।”
“হ্যাঁ একটু শান্তিতে থাকতে দাও, তোমার অভিযোগ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত।”
“হ্যাঁ, শুনো না আর, এই আমি চুপ করলাম।”
বলে মা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। পলাশ নিজের থালাটা সরিয়ে অফিস বেরিয়ে পড়ল। অফিস এসে খেয়াল করল মানিব্যাগটা আনা হয়নি।
রোজ মা আসার আগে বাড়িয়ে দেয়, আজকে আর রাগ করে আসেনি।
কাজের দিকে মন দিল পলাশ,৩ মাসের টার্গেট এখনো কমপ্লিট করেনি তার টিম।
তার এখন মাথায় অনেক চাপ। কাজের চাপে যে কখন দুটো বেজে গেছে খেয়াল করেনি পলাশ। পাশের টেবিলের অশোকের ডাকে তার টনক নড়ল, ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স বের করতে হবে।
গিয়ে দেখল মা আজকে টিফিনও দেয়নি। এবার খুব বিরক্তি হল পলাশের।
সব কিছুতে বাড়াবাড়ি। ঠিক আছে, আজকে সেও বাইরে খাবে।
তখনই মনে পড়ল আজকে সে মানিব্যাগই আনেনি। বাইকে যা তেল আছে কোনমতে বাড়ি পৌঁছে যাবে। আর আজ খাওয়া জুটবে না। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কাজে মন দিল সে।
মা একবার ফোনও করল না আজ। একটু মন খারাপ হল পলাশের। ঠিক আছে করতে হবে না।
হঠাৎই পকেটে রাখা মুঠো-ফোন হুট করে বেজে উঠল। রত্নাদির ফোন; রত্নাদি পলাশের বাড়ি কাজ করে প্রায় ১০ বছর, সে কেন ফোন করছে?
“হ্যালো!”
“ভাই তোমার বাড়ির বেল বাজাচ্ছি, মাসীমা দরজা খুলছেন না।”
“না না, আর ক’বার বাজাও, ঘুমাচ্ছে হয়ত।”
“আমি আধ ঘণ্টা থেকে বাজাচ্ছি, মাসীমার শরীর খারাপ হল না তো? তুমি এসো না একটু…”
বুকটা কেঁপে উঠল পলাশের, বাড়ি পৌঁছে পলাশ দেখল পাশের বাড়ির কজন ভিড় করেছে দরজার সামনে। ব্যাগে রাখা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে দৌড়ে গেল মায়ের ঘরে।
দরজা ঠেলে ঘরে গিয়ে দেখল মা খাটে অচেতন অবস্থায় পড়ে।
মাকে ICU-তে ভর্তি করে ওয়েটিং এরিয়াতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল পলাশ। বারবার তার মনে একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হতে থাকল,
“মা তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে আসো, তোমার সব অভিযোগ আমি শুনবো।”
মায়ের রোজ করা অভিযোগগুলোই আজ যেন পলাশের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে।
মায়ের অভিযোগ শোনার জন্য আজ সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কিছু অভিযোগ শুধু অভিযোগ না, বরং সম্পর্কের যোগসূত্র – সেটা বুঝতে পলাশের একটু সময় লেগে গেছিল, কিন্তু এবার সে সব সামলে নেবে।
পরের দিন মায়ের হাত ধরে সে খালি বলল,
“এবার থেকে দু-বেলা নিয়ম করে আমায় তোমার অভিযোগ জানাবে, না হলে আমার খুব কষ্ট হয় মা।”
মা অস্ফুট স্বরে বলল,
“পাগল ছেলে।”
Author : Gopa Chatterjee

(Khukuchatterjee54@gmail.com)
Teacher, Homemaker and Author

Awesome story
Darun really touched my soul.
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।
গদ্যরেখা ঋজু পথ ধরে এগিয়েছে। ভাল শৈলী! 🙂
খুব ভালো লাগলো।
শব্দ-র তরফ থেকে ধন্যবাদ! পাশে থাকবেন।
Very touching.
Thank you! Inspiring words for the author and the magazine.