এ কোন শিক্ষার আলোয় পৃথিবী আজ !

মানুষের ইতিহাসে শিক্ষা ছিল আলো—যে আলো অন্ধকার ভেদ করে সভ্যতার পথে নিয়ে গেছে মানবসমাজকে। অরণ্যচারী মানুষের গুহা থেকে নগরসভ্যতা, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, কুসংস্কার থেকে বিজ্ঞান—এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপে শিক্ষাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ আজ, একবিংশ শতাব্দীর এই তথাকথিত “জ্ঞানযুগে” দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—এ কোন শিক্ষার আলোয় পৃথিবী আলোকিত হচ্ছে? যে শিক্ষা মানুষকে আরও মানবিক করবে, নাকি যে শিক্ষা মানুষকেই ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে?

আজকের পৃথিবীতে শিক্ষা সর্বব্যাপী, প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুতগতিসম্পন্ন। কিন্তু সেই শিক্ষার ফল কী? ক্রমবর্ধমান হিংসা, যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস, সামাজিক বৈষম্য, মানসিক অবক্ষয়—সবই কি শিক্ষার অভাব, না কি বিকৃত শিক্ষার ফল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে বের করাই আমাদের এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য:-

প্রাচীন কালে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রগঠন। মানুষকে ভালো মানুষ করে তোলা, সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা—এই ছিল শিক্ষার লক্ষ্য। জ্ঞান মানে ছিল আত্মোপলব্ধি, আত্মসংযম ও দায়িত্ববোধ। শিক্ষা মানুষকে শেখাত—কীভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে অন্যের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হয়।

কিন্তু আধুনিক কালে শিক্ষার সংজ্ঞা বদলে গেছে। আজ শিক্ষা মানেই চাকরি, উপার্জন, প্রতিযোগিতা ও সাফল্য। নৈতিকতা, মানবিকতা, সহানুভূতি—এসব যেন পাঠ্যক্রমের বাইরে। ফলে আমরা পাচ্ছি দক্ষ কর্মী, কিন্তু পাচ্ছি না পূর্ণ মানুষ।

জ্ঞান বনাম প্রজ্ঞা:-

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞানের অভাব নেই। ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা, তথ্যভাণ্ডার—সবকিছু মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রজ্ঞা কোথায়? জ্ঞান মানুষকে শক্তিশালী করে, কিন্তু প্রজ্ঞা মানুষকে সংযত করে। জ্ঞান মানুষকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু প্রজ্ঞা শেখায় সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।

আজ আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার আলোয় দাঁড়িয়ে আছি, যা মানুষকে শেখাচ্ছে কীভাবে জয়ী হতে হয়, কিন্তু শেখাচ্ছে না কীভাবে মানবিক হতে হয়। ফলস্বরূপ জ্ঞানী মানুষ বেড়েছে, কিন্তু মানবিক মানুষ কমেছে।

প্রতিযোগিতার বিষবাষ্প:-

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অন্ধ প্রতিযোগিতা। ছাত্রজীবন আজ এক দৌড়—ভালো নম্বর, ভালো কলেজ, ভালো চাকরি, ভালো বেতন। এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়লে মানুষ নিজেকেই ব্যর্থ মনে করে। ফলে বাড়ছে হতাশা, অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা।

শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মুক্তির পথ, অথচ আজ তা অনেকের কাছে মানসিক কারাগার। প্রশ্ন জাগে—এ কোন শিক্ষার আলো, যা মানুষের মনে এত অন্ধকার সৃষ্টি করে?

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়:-

শিক্ষিত সমাজেই আজ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি, প্রতারণা ও নৈতিক স্খলন দেখা যায়। ডাক্তার রোগীকে ব্যবসার পণ্য বানাচ্ছে, শিক্ষক জ্ঞানের বদলে নম্বর বিক্রি করছে, প্রশাসক ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। এরা সবাই শিক্ষিত, ডিগ্রিধারী। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—শিক্ষা যদি মানুষকে নৈতিক না করে, তবে সেই শিক্ষা কিসের? কেবল ডিগ্রি আর সার্টিফিকেটের আলোয় কি সমাজ আলোকিত হয়?

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা তার সংকট:-

প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ভার্চুয়াল ল্যাব— এই সবই শিক্ষার পরিসরকে বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তি শিক্ষাকে যান্ত্রিকও করে তুলেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানবিক সম্পর্ক ক্ষীণ হয়েছে, সংলাপের জায়গায় এসেছে স্ক্রিন।

শিক্ষা যদি কেবল তথ্য আদান-প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মানুষকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে না। প্রযুক্তির আলো যদি মানবিক উষ্ণতা না আনে, তবে সে আলো শীতল ও কঠোর হয়ে ওঠে।

শিক্ষা যুদ্ধবাজ পৃথিবী:-

আজকের পৃথিবী এক অপ্রত্যাশিত দ্বন্দ্বে আবদ্ধ। একদিকে বিজ্ঞানের চরম উন্নতি, অন্যদিকে ভয়াবহ যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ। পারমাণবিক বোমা, রাসায়নিক অস্ত্র, ড্রোন যুদ্ধ—সবই শিক্ষিত বিজ্ঞানীদের হাতের সৃষ্টি।

যে শিক্ষা মানুষকে জীবন রক্ষা করতে শেখানোর কথা, সেই শিক্ষাই আজ মৃত্যুর যন্ত্র তৈরি করছে। এই আলো কি সত্যিই আলোর মতো, নাকি তা আগুনের মতো, যা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়?

পরিবেশ ধ্বংস শিক্ষার ভূমিকা:-

আজ পরিবেশ বহুল সংকটে জর্জরিত। বন উজাড়, নদী দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন—সবকিছুর মূলে রয়েছে মানুষের অসচেতনতা ও লোভ। অথচ এই মানুষরাই শিক্ষিত, প্রযুক্তিবিদ, উন্নয়নকামী।

শিক্ষা যদি মানুষকে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল না করে, তবে সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পাঠ না থাকলে শিক্ষার আলো অন্ধকারই ডেকে আনে।

সামাজিক বৈষম্য শিক্ষার ব্যর্থতা:-

শিক্ষার কথা ছিল সমতার পথ। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা আজ বৈষম্যের হাতিয়ার। ধনী-গরিবের শিক্ষা ব্যবস্থায় আকাশ-পাতাল ফারাক। ভালো স্কুল, ভালো কলেজ, ভালো সুযোগ—সবই সীমাবদ্ধ কিছু মানুষের জন্য।

ফলে শিক্ষা সমাজকে একত্রিত না করে আরও বিভক্ত করছে। এই আলো কি সত্যিই সবার জন্য, নাকি কেবল বিশেষ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত?

নৈতিক শিক্ষা: হারিয়ে যাওয়া পাঠ:-

আজকের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান আছে, গণিত আছে, প্রযুক্তি আছে—কিন্তু নৈতিক শিক্ষা কোথায়? সততা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ—এসব কি পরীক্ষায় আসে? না এলে সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

শিক্ষা যদি কেবল মস্তিষ্ক গড়ে তোলে, হৃদয় গড়ে না তোলে, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। হৃদয়হীন মস্তিষ্ক পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।

নতুন শিক্ষার আলো কেমন হওয়া উচিত:-

আমাদের দরকার এমন এক শিক্ষা, যা মানুষকে মানুষ করে তুলবে। যে শিক্ষা বিজ্ঞান শেখাবে, কিন্তু মানবতা ভুলিয়ে দেবে না। যে শিক্ষা প্রতিযোগিতা শেখাবে, কিন্তু সহযোগিতার মূল্য বোঝাবে। যে শিক্ষা উন্নয়ন শেখাবে, কিন্তু ধ্বংসের পথ দেখাবে না।

শিক্ষার আলো হওয়া উচিত উষ্ণ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক। সেই আলোতে মানুষ শুধু সফল নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠবে।

শিক্ষকের ভূমিকা:-

শিক্ষক কেবল পাঠদাতা নন, তিনি পথপ্রদর্শকও। শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও আচরণ শিক্ষার্থীর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু আজ শিক্ষকতাও অনেক ক্ষেত্রে পেশামাত্র হয়ে উঠেছে।

শিক্ষকের হাতে যদি আদর্শের আলো না থাকে, তবে শিক্ষার্থীর হাতে কেবল তথ্যের প্রদীপ ধরিয়ে দিলে চলবে না।

পরিবারের শিক্ষা:-

শিক্ষার প্রথম পাঠশালা পরিবার। কিন্তু আজ পরিবারও ব্যস্ত, বিচ্ছিন্ন ও যান্ত্রিক। সন্তান বড় হচ্ছে স্ক্রিনের আলোয়, অভিভাবকের আলোয় নয়।

পারিবারিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, শিষ্টাচার—এসব না শিখলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আত্মশিক্ষা আত্মসমালোচনা:-

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও এক শিক্ষা আছে—আত্মশিক্ষা। নিজেকে প্রশ্ন করা, নিজের ভুল স্বীকার করা, নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে পারা — এগুলি ভীষণভাবে জরুরী।

যে শিক্ষা মানুষকে আত্মসমালোচনার সাহস দেয় না, সে শিক্ষা মানুষকে অহংকারী করে তোলে।

আজকের পৃথিবী সত্যিই আলোকিত—বিদ্যুতের আলোয়, স্ক্রিনের আলোয়, বিজ্ঞানের আলোয়। কিন্তু মানবিকতার আলো কি ততটাই উজ্জ্বল? নাকি সেই আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে?

“এ কোন শিক্ষার আলোয় পৃথিবী”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে। শিক্ষা আমাদের কী বানাচ্ছে—মানুষ, না কেবল যন্ত্র? সভ্য, না কেবল শক্তিশালী?

যে দিন শিক্ষা মানুষকে আবার মানুষ করে তুলবে, সে দিনই পৃথিবী সত্যিকারে আলোকিত হবে। তার আগে পর্যন্ত এই প্রশ্ন আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়তেই থাকবে—এ কোন শিক্ষার আলোয় পৃথিবী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা “অসন্তোষের কারণ” নামক প্রবন্ধে শিক্ষার প্রকৃত রূপের বর্ণনা যেভাবে করেছেন তা সত্যিই বর্তমান যুগে এসেও প্রশংসনীয় এবং সঠিক, “আমাদের শিক্ষাকে আমাদের বাহন করিলাম না, শিক্ষাকে আমরা বহন করিয়াই চলিলাম”।

রচনা – ডক্টর শুভজিৎ ঘোষ

Leave a Reply

Discover more from Shobdo

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading