“দাদা, কি ব্যাপার ? আপ প্ল্যাটফর্মে এত ভিড় কেন ?”
অমরেশদা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আপ প্ল্যাটফর্মের দিকে, আমার প্রশ্নে একটু বিস্মিত হল । “সাইকেলের দোকানে কিছু শুনতে পেলি না ?”
“না, আসলে কাটোয়া লোকাল মিস করলে যে রক্ষে নেই! তাই, যা হোক করে সাইকেল রেখে, হাঁপাতে হাঁপাতে এলাম, দেখছো তো ?”
“ও আচ্ছা, না সেরকম কিছু না, ওই ইদানীং যে ভিখিরিটা আপ প্ল্যাটফর্মে বসে গান গাইত, সে আজ সকালে মারা গেছে। গানের গলাটা তো বেশ ভালো ছিলো, তাই হয়ত লোকজন গেছে দেখতে। অবশ্য, শুনলাম মৃত্যুটা নাকি আকস্মিক।”
“অপঘাতে? রেলে কাটা পড়েছে নাকি? ও তো হাঁটা-চলা করতে পারতো না, তাই না?”
“হ্যাঁ, প্রতিবন্ধী ছিল, দুটো পা পুরোপুরি অকেজো। একেবারেই অনাহুত অতিথি ছিল, তবে, অপঘাত নয়। খুব ভদ্রভাবেই, তবে একটু আচমকা মারা গেছে।”
এর মধ্যে কাটোয়া লোকাল এসে হাজির হল ডাউন প্ল্যাটফর্মে – ইচ্ছে ছিল সদ্যমৃত বৃদ্ধকে একবার দেখে আসি, সে আর হল না।
এই ট্রেনটার একটা বিশেষত্ব হল, একবার উঠে পরে দাঁড়িয়ে যেতে পারলে হাওড়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত। বেশিরভাগ দিনই এক পায়ে দাঁড়াতে হয়, আজ যদিও দ্বিতীয় পা ব্যবহারের সুযোগ হল। অমরেশদা আগে উঠেছিল, তাই কিছু দূরে দাঁড়াল – অমর, অজয়, মানিক কাউকে দেখতে পেলাম না। আমার বাঁদিকে দাঁড়িয়ে একজন, মাঝ-বয়স্ক ব্যাঙ্কের কেরানি। একদম সামনের দুজন মিষ্টির দোকানের কর্মচারী, ডান দিকে একজন স্কুলের পড়ুয়া। আর পিছনে, অর্থাৎ, আমার বৃহৎ ব্যাগের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে একজন ডাকবিভাগের কর্মী। এদের সবাইকে আমি চিনি, একই শহরের বাসিন্দা, একসঙ্গে যাতায়াত করি। কিন্তু খুব ভালোভাবে চিনি না, কেবল মুখ চেনা, নাম জানি না। এরা সবাই আমার সঙ্গে একসঙ্গে ফেরে। আমার, অমরেশদার, আর এদের সবার মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটা সংযোগ-সূত্র আছে – আর তা হল গান! আমরা সবাই গান ভালোবাসি, বিকেলে ফেরার ট্রেনে কোন ভিখিরি গান গাইতে উঠলে তাদের সাহায্য করে থাকি। যদিও, যে ভিখিরিটা আজ গত হয়েছে, তার গান আমরা একটু বেশিই পছন্দ করতাম। প্রতিদিন আপ প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থেকে নেমে, ওই ভিখারির কণ্ঠে রবি ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, নজরুল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, হেমন্ত, সতীনাথ ইত্যাদি সবার গান শুনতাম, আর বলাই বাহুল্য, খুব উপভোগ করতাম। আশ্চর্যভাবে, ওই ভিখারির গান বিভিন্ন পেশা, বিভিন্ন মেধা, বিভিন্ন বয়স, বিভিন্ন জাত, বিভিন্ন ধর্মকে অনায়াসে জুড়ে দিত।
বেশ মনে পরে একদিন হঠাৎ রজনীকান্তকে নিয়ে বকবক আরম্ভ করল।
ভিখারি বলে চলেছে, “দিনটি ছিল ২৬ জুলাই। সাল ১৮৬৫। স্থান পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রাম। মাতা মনোমোহিনী দেবী ও পিতা গুরুপ্রসাদ সেনের ঘর আলো করে জন্ম নিলো এক শিশু। নাম হল তার রজনীকান্ত। ছোট্ট রজনী মায়ের সাথে সাহিত্য নিয়ে গল্প করতে ভালোবাসে; আবার বাবার লেখা বৈষ্ণব পদাবলীর কবিতাগুলিও তার খুব প্রিয়। এর পর এল জেলা স্কুল, তারপর একে একে এফ এ, বি এ, বি এল এবং সব শেষে ওকালতি – রাজশাহী কোর্টে। ছোট্ট রজনী বড় হল, অল্প সময়ের মধ্যে পেল নাম, যশ, খ্যাতি। কিন্তু, মন পড়ে রইল অন্য প্রান্তে। সেই প্রান্তে যেখানে থাকে গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য।”
মুখে চোখে অবর্রণনীয় দীপ্তি তার, বলে চলল, আর আমরা শুনতে থাকলাম, “বড় অস্থির সময়ের মধ্যে বেড়ে উঠছিল রজনীকান্ত। কলম ছিল, মনের জোর ছিল, আর ছিল ভালোবাসা। কলকাতার টাউন হলে ১৯০৫ সালের ৭ই আগস্ট এক জমায়েতে উপস্থিত সকলে বিদেশী প্রভুর তৈরি সকল প্রকার উপকরণকে বর্জন করার প্রতিজ্ঞা করে ফেলল। কিন্তু এই ভাবনা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার পথে কিছু বাধা দেখা দিল। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য দেশের তৈরি বস্ত্র ইংরেজদের বানানো জিনিসের তুলনায় নিকৃষ্ট – এরকম এক ধারনা দেশের কিছু মানুষের মনে দানা বাঁধতে আরম্ভ করল। না, এ তো ঠিক চিন্তাধারা নয়! সে দিন রজনীকান্ত উপলব্ধি করল দেশের মানুষকে অবিলম্বে একত্রিত করবার নিতান্তই প্রয়োজন। কান্ত-কবির কলম ভালোবাসা মিশ্রিত এক অপূর্ব শক্তি নিয়ে জেগে উঠল। গান হয়ে প্রকাশ পেল। সে গান আসমুদ্রহিমাচলে নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। আপামর দেশবাসী উদ্বেলিত হয়ে উঠল।”
এর পর ভিখারি তার উদাত্য কণ্ঠে গেয়ে উঠল, ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়।’
এই সেদিনের কথা, আমরা বেশ কয়েকজন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “লালন গাইতে পার ?” ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ – গাইল মন দিয়ে, তারপর গাইল, ‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে’ আর ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে বলল, “দেখলে আমি রবি আর লালন দুই-ই গাইতে পারি, গান দুটো কেমন একরকম বল’ ?”
তারপর আমাদের হাসতে হাসতে বলল, রবি ঠাকুর তো আমার বন্ধু গো, ওকে তো কত্ত চিনি। মুহূর্তের মধ্যে মনে মনে কি একটা বিড়বিড় করে একটানা বেশ সুন্দর গদ্যের ভাষায় বলে চলল,
“দিন ৭ই মে। সাল ১৮৬১। এই দিনে পৃথিবীর একপ্রান্তে এক ভয়ানক গৃহযুদ্ধ চলছে। সুদূর আমেরিকায়। আরেকপ্রান্তে এক শিশু জন্মগ্রহণ করছে। শহরের নাম কলকাতা। স্থান জোড়াসাঁকো রাজবাড়ি। শিশুর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীর ত্রয়োদশ-তম তথা শেষ সন্তান হল এই রবি। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা মানে অনেক কিছু। এই অনেক কিছুর মধ্যে রয়েছে অনেক দুঃখ, অনেক আনন্দ, অনেক হতাশা, অনেক প্রাপ্তি। যার যোগফল হল এক বিপুল আর বিশাল মাপের এক মানুষের আত্মপ্রকাশ!
রবীন্দ্রনাথ তাঁর মা’কে অল্প বয়সে হারান। বাবা দেশ দেশান্তরে বিভিন্ন কাজে ভ্রমণ করতেন। রবিও বালক- ও কিশোর-বয়সে বাবার সাথে অনেক ঘুরেছে। এই ভ্রমণগুলি থেকে রবীন্দ্রনাথ দেশ সম্বন্ধে ও দেশের মানুষ সম্বন্ধে অনেক কিছু শুনেছেন, দেখেছেন এবং অনুভব করেছেন। পরাধীন দেশের গ্লানি তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে। রাজা ও রাজধর্মের প্রতি এক সহজবোধ্য ভাবনার খুব প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। তাঁর রচিত ‘রাজা’ নাটক এই ভাবনাকে সকলের সামনে তুলে ধরে। তাঁর বিভিন্ন লেখায় একদিকে যেমন তিনি বারংবার রাজাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাঁর দায়িত্বের কথা আবার অন্যদিকে তিনি দেশবাসীকেও বারংবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন একটি দেশ তার সঠিক ভারসাম্য কীভাবে পেতে পারে সেই কথা। দৃপ্ত কণ্ঠে বলছেন মা’কে কখনো কোনোদিন কোনোভাবে কোথাও ছেড়ে যাবেন না।”
ভিখারি গেয়ে উঠেছিল সেদিনের সেরা গানটা, আজও গায়ে কাঁটা দেয়, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা!’
সেদিন তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম, লোকটা কে ? এ কোথা থেকে এলো ? একে তো যে সে লোক মনে হচ্ছে না! একদিন ঠিক করলাম, একটু আগে আগে বাড়ি ফিরব। ইঞ্জিনিয়ারিঙের ফোরথ-ইয়ার এমনিতে সেরকম চাপের হয়না, আর তাছাড়া আমি চাকরি পেয়েও গিয়েছিলাম, সুতরাং মাঝে-মধ্যে ল্যাব স্কিপ করলে কিছু হতোনা। ট্রেন থেকে নেমে দেখি দাদুর বয়সী সেই ভিক্ষুক গাইছে, ‘মহারাজা, তোমারে সেলাম’, আর তারপর, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’। পরনে একটাই জুতো, আরেকটা পায়ে কিচ্ছু নেই, পাজামাটার একটা বড় অংশ ফাটা, এক মাথা ঝাঁকরা চুল, গায়ে দুর্গন্ধ, সাদা জামাটা চতুর্দিক দিয়ে জোরা -তাপ্পি দেওয়া। বড় দাড়ির ফাঁকে মুচকি হাসি কিন্তু ঠিক বেড়িয়ে আসছে। আর ঘার নেড়ে, চোখ বুজে গান বেড়িয়ে আসছে গলা থেকে। আমি শুধু গান শুনি, বুঝি না সেরকম, তবে সেদিন ওঁর গলার স্বর শুনে মনে হল তা বঙ্গদেশের কালজয়ী সকল কণ্ঠস্বরের এক সমাহার।
আরেকদিনের কথা বলি। সেদিন বেশ একটু বৃষ্টি পড়ছে। ভিখারিকে নজরুল ভর করল। আবারও সেও ইতিহাস তুলে ধরা, আবারও সেই অকৃত্রিম কণ্ঠে গান।
“বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ২৪ মে ১৮৯৯ সালে জন্ম নিলো এক বিস্ময় বালক। পিতা কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহিদা খাতুন তাঁদের এই দ্বিতীয় সন্তানের নাম দিলেন নজরুল। বাল্যকালে পিতৃবিয়োগ ছোট্ট নজরুলের জীবনে দুঃখ বয়ে আনলো। গ্রামের মানুষ ছোট ছেলেটির মন্দ কপাল দেখে আক্ষেপ করল। তার নাম দিল ‘দুখু মিয়াঁ’। মাক্তাব, মাদ্রাসা গিয়ে সে পড়লো কোরান, হাদিথ। তারপর একটি দলের সাথে যোগ দিয়ে সে শিখলো বাংলা, সংস্কৃত, জানলো পুরাণ আর মহাভারত। ১৯১০এ হাইস্কুল, ১৯১৪এ স্কুল পাশ আর তার কয়েক বছর পর সেনাবাহিনীতে যোগদান। দেখতে দেখতে দুখু মিয়া হয়ে উঠলো এক পরিপূর্ণ যুবক, যে কিনা একাধারে সাহসী, বলিষ্ঠ, আবার অন্যদিকে চেতনাশীল ও সৃষ্টিশীল। সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে নজরুল শুরু করলেন তাঁর সাহিত্যিক জীবন। একে একে সৃষ্টি হল অজস্র গান, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যের মহাসমুদ্রে নজরুলের তৈরি ঢেউগুলি বিপুল প্রভাব বিস্তার করল। কলের গান, সিনেমা, নাটক – কাজী সাহেবের বিচরণ যেন সর্বত্র। আর সে চলাচল কি সহজ ও সাবলীল! নজরুলের পরিচয় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে প্রথম ঘটে ১৯১৪ সালে। তখন নজরুল স্কুলে পড়ে। এর পরে অবশ্য অনেক সাধনা, অনেক অধ্যবসায় ও অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে এই শতাব্দী প্রাচীন সঙ্গীত-বোধকে আয়ত্ত করা সম্ভব হয়েছে।”
ভিখারি গাইল, ‘উচাটন মন ঘরে রয় না।’
তারপর অমরেশদার অনুরোধে একদিন অতুলপ্রসাদ নিয়ে বলা আরম্ভ করলে। বলে কিনা, লখনউতে এ পি সেন স্ট্রীট নামকরণ না কি ওর কথামতই হয়েছিল। এ পি সেন, অর্থাৎ, অতুলপ্রসাদ সেন।
“রামপ্রসাদ সেন আর হেমন্তশশীর সংসারে ২০এ অক্টোবর ১৮৭১ সালে জন্ম নিলো এক পুত্রসন্তান। তার নাম হল অতুলপ্রসাদ সেন। অতুল ও তার চার বোন অল্প বয়সেই তাদের বাবাকে হারিয়ে তাদের মায়ের সাথে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিল। প্রথমে বিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ। তারপর দেশের কাজ। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজ। সব শেষে বিলেত যাত্রা। ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে বিবাহ, তারপর দেশে প্রত্যাবর্তন। অতুলপ্রসাদের জীবনে অনেক বাঁক এসেছিল, অনেক উপলব্ধি তাঁর জীবনের সাথে জুড়েছিল। লখনউ শহরে পাকাপাকি ভাবে ওকালতির পসার জমে উঠল এবং সেই প্রতিপত্তির হাত ধরে এল বিপুল মর্যাদা, যশ, অর্থ ও অগুনতি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য। গান বাজনার প্রতি অনুরাগ অতুলপ্রসাদের অল্প বয়সেই জন্মায়। সঙ্গীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর এক শিশুসুলভ আগ্রহ তাঁর সঙ্গীত শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করে। অবিরাম, অবিরত শিক্ষালাভের আশা তাঁকে ক্রমে একজন পরিপূর্ণ সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। লখনউ শহর অতুলপ্রসাদের জীবনে এক আশীর্বাদের মত। বিখ্যাত ব্যারিস্টার এ পি সেন যখন দিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতেন তখন তাঁর বাড়িতে সে যুগের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দিকপালেরা হাজির হতেন। যে শহর নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে সে শহর খুব সহজেই অতুলপ্রসাদকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকে আকর্ষিত করে তোলে। ঠুমরী, দাদরা, খেয়াল বাংলা গানের স্বর্ণ-ভাণ্ডারে তিনি যুক্ত করলেন। রাগাশ্রয়ী অনেক নতুন গান রচনা করলেন। সাংসারিক জীবনে খুব সুখী তিনি হয়ত কোনদিনই হতে পারেন নি, তবু, মনের গভীরে জমে থাকা দুঃখ,অভিমানকে প্রাণবন্ত সুরের আর অর্থবহ ভাষার মাধ্যমে মনের অন্দরমহল থেকে বহির্জগতে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”
ভিখারি বলল, অতুলপ্রসাদের কি দুঃখ, আর তা কেন, তা জানি নে বাপু, তবে এই গানটি জানি, গাইল, ‘যাব না যাব না যাব না ঘরে।’
আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, এত গল্প যখন শুনলাম, তাহলে দ্বিজেন্দ্রলালকে নিয়ে কিছু বলো বাবা।
ভিখারি স্মৃতির পাতা ঘেঁটে আবারও সেই গদ্যের ঢঙে বলে চলল –
“অদ্বৈত আচার্য ছিলেন চৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য তথা সহচর। প্রসন্নময়ী দেবী হলেন অদ্বৈত প্রভুর বংশধর। দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রায় ও প্রসন্নময়ীর সপ্তম সন্তানের নাম হল দ্বিজেন্দ্রলাল। ১৯ জুলাই ১৮৬৩ সালে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে এই বালকের জন্ম হয়। ছোট বয়সে দ্বিজেন্দ্র ছিল মিতভাষী, কল্পনাপ্রবণ এবং সংবেদনশীল। এবং, অপরিসীম মেধাবী। হুগলী কলেজ থেকে স্নাতক এবং প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করে দ্বিজেন্দ্রলাল বিলেতে পারি দেন। এর পর রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন ১৮৮৬ সালে। পরাধীন দেশে একদিকে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন আর অন্য দিকে চলতে থাকে তাঁর শৈল্পিক জীবনকে গড়ে তোলার কাজ। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সাহিত্যের প্রতি আকর্ষিত হন যুবক বয়সেই। একাধিক কবিতা, কাব্য, নাটক ইত্যাদি রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর নিজস্ব একটি স্থান সৃষ্টি করেন। আনুমানিক ৫০০ গান যা প্রথমে দ্বিজুবাবুর গান এবং পরে দ্বিজেন্দ্রগীতি হিসবে প্রচলিত হয় তা আজও সমানভাবে সমাদৃত বাঙালি সমাজে। সমসাময়িক কবি তথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সহিত দ্বিজেন্দ্রলালের মতবিরোধের এবং খানিক মতানৈক্যর গল্প সে যুগের সাহিত্যের ইতিহাস পড়লেই জানা যায়। দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম রচনা আর্যগাথা (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে। তারপর বিলেতে থাকাকালীনও তিনি লেখার কাজ চালিয়ে যান। অর্থাৎ, সৃষ্টিকর্তা তাঁর তারুণ্য ও যৌবনের একটা বড় অংশ সমর্পণ করেন সাহিত্যের কাজে। দেশের কাজ, দেশমাতৃকার প্রতি সহমর্মিতা এ সবও সমানভাবে চলেছে পড়াশুনো ও লেখালেখির পাশাপাশি।”
ভিখারি শুরু করল, ‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই’।
আমাদের চোখ বুজে এল, কি প্রাণ সেই মলিন বস্ত্রের অমলিন ভিখারির কণ্ঠে, ‘আমরা স্নিগ্ধ-কান্ত, শান্তি সুপ্তি ভরা, আমরা আসি বটে তবু কাহারে দি না ধরা।’
ঔৎসুক্যের উপর কাবু পেতে না পেরে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, তুমি কোথা থেকে এসেছ’, তোমার নাম কি ?”
গান শেষ হয়ে গিয়েছিল, একটু জল বেড়িয়েছিল চোখ থেকে, একটা শতচ্ছিন্ন গামছা দিয়ে তা মুছে বলল’, “আমি দূর দেশ থেকে এসেছি, আমার নাম ভোলানাথ, আমি ওনার চেলা, কৈলাসে অনেক দিন কাটিয়েছি। বোকারো, নাসিক, মায়ানমার, টোকিও, ডালাস, ডারবান, হেলসিঙ্কি, কাবুল, দুবাই, মস্কো ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে শেষে এখানে এসেছি।”
আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছিলাম না, শুধু জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি তো হাঁটতে পারো না, অত সব জায়গায় গেলে কি করে ?”
“পায়ে হেঁটে নয়, তবে হাতে হেঁটে, আর গান গেয়ে গেয়ে! বাপু, গুরুদেব কি বলেছেন মনে নেই? ‘পথ আমারে সেই দেখাবে, যে আমারে চায়’ – ‘আমার শেষ পারানির কড়ি কণ্ঠে নিলেম’, সেই শুনে নজরুল বলে দিলেন, ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে’, কিছু বুঝলে?”
আমি বুঝলাম এ অন্য গ্রহের প্রাণী, এত সহজে ধরে দেওয়ার পাত্র নয়, ফের জিজ্ঞেস করলাম, “গান শিখলে কোথায়?”
বুড়ো এবার রেগে লাল হয়ে বলল, “আমার পাঁচ পুরুষ গান গাইছে, এক পূর্বপুরুষ বাহাদুর শাহ জাফরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, ওনার গজলে সুর দিতেন, গান আমার ধমনীতে বইছে, এক পয়সা ভিক্ষা নিই না, গান না শুনিয়ে।”
ট্রেন হাওড়া পৌঁছল, ধাক্কাধাক্কিতে কোনোমতে কামরা থেকে বেড়িয়ে ফের অমরেশদাকে ধরলাম, “দাদা, কিভাবে মারা গেছে বললে না তো ?”
“শুনলাম, গত তিন দিন ধরে আর বুড়ো গান গাইতে পারছিল না। পেটের জ্বালা তো আর মেটে না! তাও চুপ করে বসেছিল, কারুর থেকে এক পয়সা নেবে না গোঁ ধরে বসেছিল। এর মধ্যে আজ সকালে আপে দূর-পাল্লার এক ট্রেন এসে থামে। একজন ঝকঝকে ছোকরা কল থেকে জল নিতে আসে। কলের কাছেই বুড়ো বসে ছিল, নড়াচড়া করতে পারছিল না। ছেলেটি নাকি গালাগাল দিয়ে বুড়োকে বলে, ‘খটখটে চেহারা নিয়ে ভিক্ষা করছে, ভগবান দুটো পা নিয়ে নিক, দুটো হাত তো দিয়েছে, অন্তত কিছু কাজ করে তো খেতে পারে!’ এ কথা যে বলা হয়েছে তা আশুর চায়ের দোকানের বনমালী নাকি কনফার্ম করেছে। এখন এই কথা শুনে বুড়ো নাকি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগে, জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। কয়েকজন প্ল্যাটফর্মের লোক হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ!”
বুড়ো কাঁদতে কাঁদতে মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমি এবং আমার ট্রেনের বাকি প্রতিবেশীরা, যাদের কথা আগেই বলেছি, সবাই অন্তত এক ফোঁটা কেঁদে নিল অমরেশদার কথা শুনে – কেউ ভিতর থেকে, কেউ বাইরে দিয়ে। এ কান্না সেই বৃদ্ধের গলার স্বরের জেরে, না তার মৃত্যুর দুঃখে, না তার শিল্পীমনের ওপর হানার দরুন, না এক নির্মল প্রতিভার মৃত্যুর অবসাদে, না এক কৃত্রিম সমাজের ক্রূরতার দাপটে, না এক অস্থির সমাজের চোখে গুনির অমর্যাদার কারণে, তা আর সেদিন আমাদের মধ্যে কেউই বুঝে উঠতে পারল না।
বুঝে উঠতে পারল না, কীভাবে কোন উপায় আমরা বঙ্গদেশের এই বিপুল সংস্কৃতিকে এক প্রজন্ম থেকে আরেকটায় ছড়িয়ে দিতে পারব। আজ শত শত কোটি এক বাবা তার ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে যেতে পারে অনায়াসে। কিন্তু সে এই ঐতিহ্য বা ইতিহাসকে কিনতে পারে না। কৃষ্টি আর সৃষ্টি বাজারে পাওয়া যায় না। তার জন্য যে দরকার সৃষ্টিকর্তার জীবনকে জানার। কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি আমরা। কোথায় সেই ভিখারিটা যার কিছু নেই, কিন্তু গল্প আছে! ইতিহাসের সঠিক দিকটাকে সারাজীবন ধরে আঁকড়ে ধরে থাকার দৃঢ়তা আছে!
রচনা – অন্বেষ মুখোপাধ্যায়
