সংযোগ

ঘটনাটা নিতান্তই সাধারণ।

হয়তো লিখে রাখবার মতনও নয়। আমাদের মাছ-ভাতের ঘড়ি ধরা জীবনের একরঙা যাত্রাপথে নেহাতই হঠাৎ চোখে পড়া উজ্জ্বল বেগুনি কিংবা চকচকে কমলার মতন – আচমকা নজরে পড়লে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। হয়তো বাড়ি ফিরেও ওই চোখ আটকে যাওয়ার কথাটা মনে পড়ে যায়; রাতে খাবার টেবিলে মাংস-রুটি চিবোতে চিবোতে বাড়ির লোকের কাছে গল্প করে বলা যায়, “জানো তো, আজ রাস্তায় একটা লোক এমন একটা রঙচঙে জামা পড়েছিল না. . .”। আবার গল্পটা কাউকেই না জানিয়ে বেমালুম চেপে গেলেও জীবনের গতিময়তায় বড় একটা প্রভাব পড়ে না। কোনোদিন কোনো লালচে-গোলাপি মায়াবী বিকেলের আবেগ-আকুল ক্ষণে ছাদের প্রিয় কোনটায় চায়ের কাপ হাতে বসে প্রাকৃতিক শোভা নিরীক্ষণ করতে করতে ঘটনাটা মনে পড়ে গেলেও যেতে পারে; কিংবা গোপন সিন্দুকে সযত্নে জমানো সোনার গয়নাগুলোকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখার মতন করে ঘটনাটা একা একা মনে করে তার স্বাভাবিকতা বা অস্বাভাবিকতার ওজন মাপাও যেতে পারে।

সেদিন একাই চলেছিলাম পাহাড়ি পথে লোকাল বাসে চেপে সমতল ছেড়ে অসমতলের নেশায়। শিলিগুড়ির হংকং মার্কেটের সামনে থেকে গ্যাংটকগামী বাসের টিকিট আগেই কেটে রেখেছিলাম। বাসে টুরিস্ট বলতে জনা দু-তিন। বাদবাকিরা সকলেই স্থানীয়। সাধারণত গ্যাংটকের মতন জনবহুল টুরিস্ট স্পটে লোকাল বাসে চড়ে আজকাল সচরাচর কেউ যায় না। গেলেও অন্তত আমার জানা নেই। অধিকাংশই আসে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি বুক করে। সোলো ট্রাভেলার বা কলেজপড়ুয়া বা উঠতি বেড়িয়ের দলেরা আবার চড়ে বসে শেয়ার্ড ক্যাবে, যার ভাড়া রিজার্ভড গাড়ির চেয়ে অনেকটাই কম। এতে পকেটে যেমন চাপ কম পড়ে, তেমনই পাহাড়ি প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে দিব্যি সুন্দরভাবে গন্তব্যে পৌঁছেও যাওয়া যায়। আমি অবশ্য এই দুই পথের কোনোটাতেই যাইনি। গ্যাংটকের “লিটল বাডস হাই স্কুল”- এর তরফে হিস্ট্রি টিচার চেয়ে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিটা যেমন হঠাৎই চোখে পড়ে গেছিল, তেমনই তিন ধাপের নরম-গরম অনলাইন ইন্টারভিউ পর্ব পেরোনোর পরেরদিনই কর্মস্থলে হাজির হওয়ার সাহসী সিদ্ধান্তটা আমার আদতে শান্তশিষ্ট মনটাকে ততোধিক চমকে দিয়েছিল। নাহ, স্কুলের তরফে আমায় বাছাই হওয়া মাত্রই কাজে যোগ দেওয়ার জন্য কোনোরকম চাপ দেওয়া হয়নি। তাড়া আসলে আমারই। যে থাকতে চায় তার গতি তো দুপুরবেলা বাড়ির পাঁচিলের ওপর গা এলিয়ে শুয়ে থাকা আলসি বেড়ালের মতন; যে পালাতে চায় তারই যত তাড়া। আমি তাই এখানে থেকে নিঃশ্বাস বন্ধ হবার পরিবর্তে ছুটে ছুটে নিঃশ্বাস নেওয়ার নিজস্ব পন্থায় বেশি বিশ্বাসী ছিলাম। যেইনা সুযোগটা এল ওমনি তাকে টপাস করে গিলে নিলাম। চাইলে অবশ্যই একটা শেয়ার্ড ক্যাব নিতে পারতাম। কিন্তু আমায় যে তখন অ্যাডভেঞ্চারে পেয়েছে। নতুনকে খোঁজার অভিযানের সমস্তটাই একটু অন্যরকম হতে হবে বইকি! তাই আর গাড়ির চক্করে না গিয়ে সোজা বাসে উঠে পড়লাম। দরজার পর তিনটি সারি ছেড়ে চতুর্থ সারির ডান দিকের সিটটা বাগিয়ে ফেললাম। সঙ্গের বড় রুকস্যাকটা ওপরে তুলে দিয়ে ছোট কিটব্যাগটা কোলের ওপর আলতো করে ফেলে জানলার বাইরে চোখ মেলে ধরলাম।

এখনও ফেড হয়ে যাওয়া জিন্সের উপরে ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট পড়ে আছি। মন অপেক্ষারত কখন টিশার্টের ওপরে হুডি পড়ার দেশে পৌঁছাব।

তখন বাঁ হাতের রুপোলী ব্যান্ডের ঘড়িতে পাক্কা সাড়ে নটা বাজে। ঘন্টা চারেকের পথ। বাসে ওঠার আগেই বাসস্ট্যান্ডের অনতিদূরে একটা খাবারের দোকান থেকে চিকেন স্যান্ডউইচ, মাফিন আর একটা এক লিটারের জলের বোতল কিনে নিয়েছিলাম। সঙ্গে বেশ কিছু চকলেটও। সরকারি বাস, তাই সপ্তাহের মধ্যভাগে বাসের যাত্রীদের সিংহভাগই স্থানীয়। কারও বাড়ি গ্যাংটক আবার কেউ নামবে পথেই কোনো পাহাড়ি লোকালয়ে। কেউ হয়তো শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়িতে কোনো কাজে এসেছিল। এখন কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। বেশ কিছু অল্পবয়সী কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েও আছে। আবার শ্রমিক শ্রেণীর মানুষও কিছু আছে। ছোট্ট বাসটা মানুষের ভিড়ে, তাদের  মৃদুমন্দ কথাবার্তায়, হাসিগল্পের আওয়াজে গমগম করছে। আমি যে তাদের চিনি এমনটা নয়, কিন্তু তাদের বেশভূষা দেখে এবং তাদের দিক থেকে উড়ে আসা টুকরো-টাকরা কথাবার্তা শুনে তাদের পরিচয় মোটামুটি একটু আন্দাজ করাই যায়।

শিলিগুড়ি শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস ছুটল হাওয়ার বেগে। ইতিমধ্যে ড্রাইভার সজোরে গান চালিয়ে দিয়েছে। সামান্য যন্ত্রানুষঙ্গে মন উদাস করা মিষ্টি সুরে নেপালি গান। শুনতে মন্দ লাগল না। তখন দুপাশে শহুরে দৃশ্যপটের একঘেয়েমি কাটিয়ে ধীরে ধীরে গাছপালার পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। বাড়িঘর, যানবাহন এবং ঝাঁ-চকচকে সব শপিং মল পিছনে ফেলে সবুজের আরামদায়ক উপস্থিতি চোখ ও মন দুইকেই শান্ত করতে লাগল। খোলা জানলা বেয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়া দামাল হাওয়ার দাপটে এলোমেলো হয়ে গেল চুল।  কিন্তু হাওয়ার অবাধ্যতা বেশ ভালোই লাগছিল। সে হাওয়ায় যেন বাঁধ ভাঙার আনন্দ মিশে ছিল; আর ছিল হাওয়ার মতন করেই অবাধ্য, চঞ্চল হয়ে ওঠার মাতাল হাতছানি। ক্রমেই সমতলের সোজা রাস্তা ছেড়ে বাসটা ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে ওঠা সর্পিল রাস্তায় পড়ল। সঙ্গী আকাশী নীল জলের খরস্রোতা চঞ্চলা তিস্তা। সে যেন পাকদন্ডী বেয়ে অমরাবতীর পথে এগিয়ে চলা এই ছোট্ট বাসটার পথ প্রদর্শনকারী বিশ্বস্ত বন্ধু। জানলা বেয়ে তখন যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। বাস যত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে, ততই দূরের পাহাড়ের ধোঁয়াশামার্কা চেহারাটা ক্রমশ আরো স্পষ্ট হয়ে ঘন সবুজে পরিণত হচ্ছে। গহীন অরণ্যেমোড়া পাহাড়চূড়াগুলো সগর্বে মাথা তুলে বিরাজমান; যেন আমরা যে স্বর্গলোকে চলেছি ওরাই সেখানকার দ্বারপাল। চোখ জুড়িয়ে আসছিল। বাসের দুলুনি আর হাওয়ার ঝাপটায় আরামপ্রিয় মনটা একটু ঝিমিয়ে মতন গেছিল। অগত্যা মুখটা জানলার কাছ থেকে সরিয়ে এনে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেললাম।

হালকা তন্দ্রার আভাস পেরিয়ে গভীর ঘুমে ঢুকব ঢুকব করছি এমন সময় হঠাৎ প্রচন্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক কষে বাসটা সশব্দে থেমে গেল। বাস্তবের পৃথিবীতে ফিরে এলাম এক ঝটকায়। আরামের ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় বিরক্ত যে একটু হয়েছি তা বলাই বাহুল্য। চোখদুটো একটু কচলে পরিষ্কার করে নিয়ে জানলার বাইরে মুখ বের করে দেখি বাস যে জায়গায় থেমেছে সেখানে একটা কালো তেরপল টাঙ্গানো চায়ের গুমটি ছাড়া আর কিছুই তেমন নেই। একটা শতাব্দীপ্রাচীন কেটলিতে চা হচ্ছে আর পাশে নানান সাইজের প্লাস্টিকের বয়ানে নানা ধরনের বেকারি বিস্কুট রাখা। স্থানীয় এক মহিলা চা বানাচ্ছেন এবং খরিদ্দাররাও সকলেই এখানকার লোকাল। রাস্তা সারাইয়ের মজুর-টজুর হবে হয়ত, মনে মনে ভাবলাম। এই জায়গা থেকে বাসে যারা উঠবে তারাও নিশ্চয় ওই স্থানীয়ই হবে। কিন্তু উঠল নীল জিন্স আর কালো ফুলহাতা টি-শার্ট পরা এক সুদর্শন তরুণ। আমার চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোটই হবে। তার চেহারাখানা এক্কেবারে উত্তর-পূর্ব ভারতীয়দের মতনই নেপালি ছাঁচে ফেলা। মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রং বেশ ফর্সা, মাথার চুলগুলো ঈষৎ অবিন্যস্ত এবং চোখগুলো ছোট ছোট। বুকে ঝুলছে কেতাদুরস্ত সানগ্লাস। বাঁ হাতের লাল-কালো রঙের স্মার্টওয়াচটাও বেশ চোখে পড়ার মত। ছেলেটার পিঠে আমারই মতন একটা ন্যাপসাক ও পায়ে স্নিকার জুতো। ওর পোশাক, রোদচশমা থেকে শুরু করে জুতো এবং ঘড়ি সবই যে বেশ দামি তা আর বলে দিতে হয় না। দেখলেই বোঝা যায় যে প্রতিটা জিনিসই কোনো ভালো দোকান বা ওয়েবসাইট থেকে সময় নিয়ে বাছাই করে কেনা। ছেলেটার সর্বাঙ্গে শৌখিনতার ছাপ বর্তমান। তবে শৌখিন হলেও মুখের ভাবে কিন্তু কোনো ঔদ্ধত্য নেই। কিন্তু ছেলেটার চোখমুখে কি যেন একটা আছে। চোখের বাদামি মণিগুলো যেন বড্ড অস্থির – ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলে তবেই বোঝা যায়। একবার ক্ষণিকের জন্য তাকালেও অদ্ভুত এক কৌতুহল উদ্রেক করে ওর মুখটা।

মনে মনে ভাবলাম, এই মাঝরাস্তায় অনামী জায়গায় এমন শৌখিন যুবকের কী কাজ থাকতে পারে? অবশ্য উত্তরটাও সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় চলে এল। নিশ্চয় ফটোগ্রাফার। এসব নাম-না-জানা জায়গা যেখানে অধিকাংশ টুরিস্টই গাড়ি থামিয়ে ভিড় বাড়ায় না, সেখানেই তো লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির অনাবিষ্কৃত সব মণিমাণিক্য। ছেলেটা সম্ভবত এখানে তিস্তার পাড়ে গিয়ে ছবি তুলছিল। ইতিমধ্যে আমার বাঁ পাশে লং স্কার্ট ও ঢোলা শর্ট কুর্তা পরা, ঝোলা ব্যাগ কাঁধে নেওয়া যে স্থানীয় ভদ্রমহিলা বসেছিলেন তিনি উঠে যাওয়ায় জায়গাটা ফাঁকাই ছিল। দেখলাম কালো টিশার্ট এদিক ওদিক তাকিয়ে অবশেষে আমারই পাশে এসে ধপ করে বসে পড়ল।

বাস আবার চলতে শুরু করেছে আগের গতিতে। ড্রাইভার-ভাই একের পর এক নেপালি গান বাজিয়েই চলেছে। এখন আবার মাঝেমাঝে জোর গলায় সেসব গানে গলাও মেলাচ্ছে। যাত্রীদের অধিকাংশই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কানে হেডফোন গুঁজে নিজেদের পছন্দের গান শুনছে। কেউ কেউ আবার অনুচ্চস্বরে গল্প করছে নিজেদের মধ্যে। আঁকাবাঁকা রাস্তায় তিস্তা কখনও ডান দিকে পড়ছে, আবার মোড় ঘোরার পর চলে আসছে বাঁয়ে। শুধু গাছপালাই নয়, চোখে পড়ছে টুরিস্ট ও লাগেজ বোঝাই গাড়ির দল এবং ওঠানামায় মগ্ন স্কুটার ও বাইক। পাহাড়ের সবুজের মাঝে তারা এনে দিচ্ছে হরেক রঙের ছোঁয়া।

এমন সময় জল খাব বলে ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করতে করতে আড়চোখে দেখলাম ছেলেটাও নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করেছে। জল খেয়ে বোতলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলেও ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলাম না। আকাশী বেসের ওপরে সাদা দিয়ে নকশা করা হার্ডকভারে বাঁধানো সুন্দর ডায়েরিটার মাঝামাঝি একটা পাতা খুলে কালো পেন দিয়ে কী সব আঁকিবুকি কাটতে শুরু করে দিয়েছে। ওর এই কৌতূহলোদ্দীপক কর্মকাণ্ডে চোখগুলো ওর ডায়েরির পাতাতেই আটকে গেল। নিজের অজান্তেই কখন যেন জানলার গায়ে হাত রেখে হাতে গাল ঠেকিয়ে গোল গোল চোখে ওর আঁকিবুকি কাটা দেখতে শুরু করে দিয়েছি সরাসরি। এই পাহাড়ি রাস্তায় চলন্ত বাসের ঝাঁকুনিতেও ছেলেটার হাত কাঁপল না দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়ে গেলাম। ছেলেটা দক্ষ হাতে সাদা পাতায় পেন দিয়ে কয়েকটা দাগ কাটল। তারপর অবাক হয়ে দেখলাম ওটা একটা মানুষের মুখ হয়ে গেছে- একটা মেয়ে এলোচুলে চোখ বন্ধ করে রয়েছে। মেয়েটার মুখের একটা দিকই ও এঁকেছে। দেখে মনে হল আমি যেমন চোখ বন্ধ করে হাওয়া খাচ্ছিলাম, এই মেয়েটা যেন তেমনই চোখ বুজে হাওয়ায় ভাসছে। আমায় অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে ছেলেটা এবার সরাসরি আমার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, “ভালো হয়েছে?”

আচমকা প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে গেছি। প্রশংসাসূচক সঠিক শব্দগুলো খুঁজে না পেয়ে আলতো হেসে সম্মতির ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়লাম।

“আমার দিদি, বুঝলেন। খানিকটা আপনারই মত দেখতে। আপনাকে দেখে হঠাৎ দিদির কথা মনে পড়ে গেল।” ছেলেটার বাংলায় পাহাড়ি ভাষার টান সুস্পষ্ট।

বোধহয় সিকিমি ছেলে বাংলা জানে; কিংবা প্রবাসী বাঙালিও হতে পারে। আমি অবশ্য কোনো মন্তব্য করার আগেই ছেলেটা বলল, “আমার দিদি আর আমি খুব ক্লোজ। একদিকে সবসময় খুনসুটি চলছে, আবার অন্যদিকে তেমনি গলায় গলায় ভাব। দিদিকে আমি আমার সব সিক্রেটস বলি ছোট থেকে। ক্লাস টেস্টে কোন সাবজেক্টে গ্রেড বাজে এসেছে, কলেজের ক্রাশের সাথে মেসেঞ্জারে কি কথা হলো কিংবা বাবা-মাকে লুকিয়ে ফ্রাইডে নাইটে বন্ধুর বাড়িতে পার্টিতে যাব কিভাবে. . . এমনই সব কথা। আ’ম ভেরি ফ্রেন্ডলি। তবে বাইরের বন্ধু-বান্ধবদের চাইতেও দিদির সাথে বন্ধুত্বটাই আমার সবচেয়ে বেশি।”

ছেলেটা  নিজের জীবনকাহিনী আউড়ে যাচ্ছে গড়গড়িয়ে। কিন্তু এত ব্যক্তিগত তথ্য আমায় কেন দিচ্ছে? অবশ্য শুনতে মন্দ লাগল না। অন্য সময় হলে হয়তো যেচে পড়ে আলাপ করার চেষ্টায় একটু বিরক্তই হতাম। কিন্তু আজকের অবস্থাটা ভিন্ন। এতক্ষণ একা একাই চুপচাপ প্রকৃতি দেখতে দেখতে চলেছিলাম। তাই গড়গড়িয়ে কথা বলা ছেলেটার স্বতস্ফূর্ত বক্তব্য শুনতে শুনতে অল্পসল্প ভেসে আসা একঘেয়েমির টুকরোগুলো উবে গেল। আমি বরাবরই কইয়ে কম, শ্রোতা বেশি ভালো।  আমি তো একাই সফরে চলেছিলাম। একজন কথা বলার মতন সফরসঙ্গী হলে ক্ষতি কী?

ছেলেটাই এরপর প্রশ্ন করল, “দিদি আপনি কি গ্যাংটক যাচ্ছেন?”

মনে মনে বললাম, নিরুদ্দেশ বলে কোনো জায়গা থেকে থাকলে সেখানে যেতে পারলেই ভালো হতো, মুখে ছোট্ট করে “হ্যাঁ” বললাম।

-“ঘুরতে নাকি কাজে? আসলে আপনাকে দেখে ঠিক টুরিস্ট বলে মনে হচ্ছে না, তাই আর কি. . .”

-“নাহ, ঘুরতে নয়। ওখানে একটা স্কুলে জয়েন করেছি টিচার হিসেবে। সেজন্যই যাচ্ছি।”

-“তাই নাকি? কংগ্রাচুলেশনস!”

-“থ্যাঙ্ক ইউ”, আলতো হেসে বললাম।

 -“আগে গেছেন গ্যাংটক নাকি এই প্রথমবার?” ছেলেটা আবার মুখ খুলল।

-“এর আগে বারদুয়েক গেছি বেড়াতে। একবার কলেজে পড়াকালীন বন্ধুদের সাথে আর একবার ফ্যামিলি নিয়ে।”

 -“বাহ্! সত্যিই গ্যাংটক ইস বিউটিফুল। আমার নিজের বাড়ি বলে বলছি না, যে একবার আসে সে বারবার ফিরে আসতে চায়। ডোন্ট ইউ থিংক সো?”

-“অবশ্যই। শুধু গ্যাংটক কেন, গোটা সিকিমটাই একেবারে ছবির মতন। সত্যিই একবার এলে বারবার ফিরে আসার জন্য মন টানে। তা তুমি কি গ্যাংটকেই বড় হয়েছো?” আমি আলাপচারিতায় ঢোকার চেষ্টা করলাম।

ছেলেটা টি-শার্টের স্লিভগুলো কনুই অব্দি গোটাতে গোটাতে ঈষৎ গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, “আমার জন্ম কলকাতার হাসপাতালে, কিন্তু বড় হওয়ার বেশিরভাগটাই গ্যাংটকে। ক্লাস এইটে পড়াকালীন কালিম্পংয়ের বোর্ডিং স্কুলে চলে যাই‌। বোর্ডস দিয়েছি ওখান থেকেই। ছুটিছাটায় নর্থইস্টের যত হিল স্টেশনস আছে সব চষে বেড়াই। কেউ যদি একটু অফবিট জায়গা পছন্দ করে যেখানে ট্যুরিস্টদের দাপাদাপি কম, তাহলে আমার চাইতে ভালো ট্যুর গাইড বোধহয় আর পাবে না। আমার কলেজ অবশ্য সিকিমেই। এখন ফাইনাল ইয়ার চলছে। আর মাস কয়েকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।”

-“তারপরে কি প্ল্যান, মাস্টার্স?”

-“নাহ, আর পড়ব না। কোনোদিনই খুব একটা পড়াকু ছিলাম না। স্টুডিয়াস আমার ভাইবোনেরা। দিদি ছাড়া এক দাদাও আছে আমার- আমাদের তিন ভাইবোনের সবার বড়। ও তো খুবই সিরিয়াস। ম্যানেজমেন্ট পাশ করার পর এখন বাবার ব্যবসা সামলায়। আমাকেও ইভেন্চুয়ালি ব্যবসাতেই ঢুকতে হবে। তবে ফ্যামিলি বিজনেস থাকলেও আমার আসল ইন্টারেস্ট ছবি আঁকায়। কাজ যা করতে হবে করবো, তবে ছবি আঁকাটা আমি ছাড়তে পারব না।”

-“তুমি কি আঁকা নিয়েই পড়ছো এখন?”

-“একেবারেই উল্টো। আঁকায় তো প্রাণ আছে। আমার সাবজেক্টে প্রাণ ছাড়া আর সবকিছু আছে- একাউন্টেন্সি। বাবার ইচ্ছে! বুঝতেই তো পারছেন- যার পয়সায় খাওয়া-পরা, দামি ঘড়ি, দামি জুতো, দামি দামি গাড়ি চড়া, খানিকটা বয়স অব্দি গিয়ে তাকে মানতেই হয়।” এই বলে ছেলেটা একটা শুকনো হাসি ছুঁড়ে দিল। ওর আদতে সাবলীলভাবে বলে দেওয়া শব্দগুলোর পিছনে গা ঢাকা দিয়ে থাকা বোবা যন্ত্রণার আঁচ ভালোই পেলাম। বড়লোক বাবার আদুরে ছেলেদের আমরা প্রায়শই বখে যেতে দেখি। কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে কোথাও যেন একটা আঘাত পাওয়া শিশুর সারল্য লুকিয়ে আছে। ওর ওই অস্থির চোখের মণির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে দূর বিদেশে পড়তে যাওয়া নিজের ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। মনটা কেমন যেন মায়ায় ভরে উঠল। হঠাৎ আরো বেশি করে ইচ্ছে হতে লাগল এই ছেলেটার জীবনের গল্প শোনার জন্য।

এরপরে আমি প্রশ্ন করলাম, “তা কিসের ব্যবসা তোমাদের?”

-“হোটেলের।  গ্যাংটক, পেলিং, রাবাংলা-  সব জায়গায় আমাদের হোটেল আছে। ওয়েস্টবেঙ্গলেও আছে। পাহাড় সমুদ্র দু’জায়গাতেই। দার্জিলিং, কালিম্পং আবার ওদিকে আপনাদের দীঘা। ইনফ্যাক্ট আমরা তো ওড়িশাতেও ঢুকে পড়েছি এখন। এই রিসেন্টলি পুরীতে আমাদের নতুন হোটেলের ইনোগুরেশন হয়ে গেল।”

-“বাব্বা, বিরাট ব্যাপার তো!” আমার এই মন্তব্য শুনে ও হেসে ফেলল। তারপর বলল, “সবই বাবার হাতে গড়া। আমার দাদু প্রথম শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক এসে একটা ছোট্ট হোটেল খুলেছিলেন। পরে জায়গাটায় মন বসে যাওয়ায় ওখানেই সেটেল করে যান। পাহাড়কে উনি সত্যিই ভালবাসতেন, পরিবেশ সচেতন ছিলেন। তখনকার দিনে অর্গানিক ফার্ম টাইপের একটা জায়গা কিনেছিলেন। আর আজ সেখান থেকেই আমাদের যাবতীয় অর্গানিক প্রডিউস আসে। দাদুর পরে আমার বাবা হাল ধরার পর থেকেই ব্যবসা বাড়তে থাকে। গ্যাংটকের সীমানা ছাড়িয়ে প্রথমে রাবাংলা, তারপর পেলিং তারপর দার্জিলিং- এইভাবে একটু একটু করে আমাদের সাম্রাজ্যবিস্তার হয়। আপনি নিশ্চয় হোটেল বুক করার আগে ইন্টারনেটে গিয়ে রেটিং-রিভিউ সব চেক করেন? দেখবেন আমাদের সব হোটেল-রিসোর্ট অধিকাংশ ওয়েবসাইটেই চারের ওপর রেটিং পেয়েছে।”

কথাবার্তার মাঝে বেলা বেড়েছে নিজস্ব ছন্দে। সূর্য মাথার আরেকটু উপরে উঠেছে। তবে উচ্চতাবৃদ্ধির ফলস্বরুপ সূর্যের তাপের প্রাবল্য তেমন একটা বোধ হচ্ছে না; বরং পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাসটা নব উদ্যমে খেলা করে যাচ্ছে। খিদেটা এতক্ষন সেভাবে অনুভব করিনি। কিন্তু এবার পেটের ভেতর থেকে গুরগুর আওয়াজ পেলাম। অগত্যা দেরি না করে ব্যাগ থেকে স্যান্ডউইচের প্যাকেটটা বের করলাম‌। যে সহযাত্রীর প্রতি ভ্রাতৃস্নেহ অনুভব করতে শুরু করেছি তাকে ভদ্রতার খাতিরে অন্তত একটু কিছু অফার করতেই হয় নিজের ভাগ থেকে। ভাগ্যিস শিলিগুড়ির দোকান থেকে একটার জায়গায় দুটো স্যান্ডউইচ কিনেছিলাম! নিজেই নিজেকে বাহবা দিলাম সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। ছেলেটাকে স্যান্ডউইচ অফার করতে ও দ্বিরুক্তি না করে খুব খুশি হয়েই সেটা নিয়ে নিল। আহা বেচারী! আমার মতন ওরও বোধহয় খুব খিদে পেয়েছিল, কিন্তু ওঠার আগে কিছু কিনে উঠতে পারেনি, মনে মনে বললাম। খেতে খেতেও কথাবার্তা চলতে থাকল।

-“আমি আসলে কোনোদিনই বিজনেস মাইন্ডেড ছিলাম না বুঝলেন। হিসেব-নিকেশ, ট্যাক্সের মারপ্যাঁচ, ইত্যাদি ব্যবসার খুঁটিনাটি কোনোদিনই বুঝিনি। আমাকে ছুটিছাটায় অনেক সময়ই বাবা আর দাদা মিলে আমাদের কোনো কোনো হোটেলে পাঠিয়েছে বিষয়গুলোর সঙ্গে একটু পরিচিত হতে, কাজের পদ্ধতি হাতেকলমে শিখতে। আমিও না করিনি। গেছি সেসব জায়গায়। কিন্তু যাবার পরে আর কাজে না ঢুকে সুযোগ পেলেই কেটে পড়েছি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে। চুপচাপ কোনো নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বসে নিজের ভালোলাগার ধ্যান করেছি।” এরপর ও পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল, “আমার আঁকা কয়েকটা ছবি দেখবেন দিদি?”

-“হ্যাঁ, কেন দেখবো না! কই দেখাও. . .” আমার উত্তরে ওর চোখমুখ আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ও মোবাইলের ফটো গ্যালারি খুলল। মোবাইলটাও যে বেশ দামি তা আর বলে দিতে হয় না। এই মোবাইল কিনতে বোধহয় আমার এক মাসের স্যালারি চলে যাবে। কিন্তু আমার কৌতুহলী চোখ এটাও লক্ষ্য করল যে ওর মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। স্ক্রিনের ওপরে ডানদিকে অণুবীক্ষণীয় অক্ষরে “নো সিম” লেখা আছে। একটু আশ্চর্য হলাম বটে। তবে ওর ফোনে সিম আছে কিনা তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমার লাভ কী? তাই মন থেকে প্রশ্নচিহ্নটা একরকম তাড়িয়েই দিলাম। ও মোবাইলের গ্যালারি ঘেঁটে একটা ছবি বের করে আমার সামনে স্ক্রিনটা মেলে ধরল। মুঠোফোনের ছোট্ট পরিসরেও ওর অভাবনীয় অংকনপ্রতিভা বুঝে নিতে বেগ পেতে হয় না। ও সোয়াইপ করে একটার পর একটা ছবি দেখাতে থাকল। ছবিগুলো বেশিরভাগই সাদাকালো। আবার কোনো কোনো ছবিতে বর্ণচ্ছটাও রয়েছে। আমি যে আর্টের বড় বোদ্ধা তা নয়। এমনকি ছবি আঁকার এই বিশেষ স্টাইলটাকে কী বলে বা আদৌ এর কোনো নাম আছে কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে দেখতে দেখতে মনে হল পিকাসোর জ্যামিতিক স্ট্রাকচারে ছবি আঁকার ধরনের কিছুটা প্রতিফলন রয়েছে। সত্যিই ছেলেটা প্রতিভাবান। এমন হীরের টুকরোটাকে কিনা বাপ-দাদার চক্করে কয়লাখনিতে পিষতে হবে?!  হঠাৎ খুব মায়া হল ওর জন্য। মনটা আবারও নরম হয়ে ভারী হয়ে গেল।

-“দুর্দান্ত! সত্যিই তুমি দারুন ছবি আঁকো। আমি ছবির গুণাগুণ খুব বেশি বুঝি না, কিন্তু এ ছবির গুণগতমান যে বেশ উঁচু তা বুঝতে পারছি।”

-“থ্যাংক ইউ সো মাচ।”  ছেলেটা গদগদ স্বরে বলল।

আমি বললাম, “অনেক ছোট থেকে শিখছো নিশ্চয়ই? আঁকা নিয়ে তোমার এরপরে প্ল্যান কি?”

আমার প্রশ্নে ও এবার একটু ভাবুক হয়ে গেল। বলল, “উমম. . . ছোট থেকেই শিখতে শুরু করেছিলাম। তবে ক্লাস নাইনের পর শেখাটা আর সেভাবে কন্টিনিউ করতে পারিনি। তারপর থেকে নিজেই আঁকি নিজের ইচ্ছে মতন। দেশের নানাপ্রান্তে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশও নিয়েছি কয়েকবার। বাট অনেস্টলি স্পিকিং, ওই কম্পিটিশন-ফিশনে পার্ট নিতে আমার একেবারেই ভালো লাগেনা। দৌড়ানোর জন্য তো মাঠ-ঘাট আছে, সব জায়গায় দৌড়ানোর দরকার কি? আমার লড়াই তো নিজের সাথে, তাই না?” ছেলেটার সাবলীলভাবে বলে যাওয়া শেষ শব্দগুলোর গভীরতা যে কতখানি তা ভেবে নিজেই কেমন যেন শিউরে উঠলাম। সত্যিই তো, নিজের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা তো নিজের সাথেই। নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ঠিক-বেঠিকের মাথা ঘোরানো ঘূর্ণিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখা, বাঁচিয়ে রাখা, ভালো রাখার লড়াই। এর চেয়ে বড় লড়াই জগত-সংসারে আর হয় কি?

যাক গে, সেসব প্রসঙ্গে আর না ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু মানুষের তো জানা উচিত তোমার কথা। এক্সিবিশন করেছ কখনো?”

-“এখনো অব্দি না। তবে কলকাতায় একটা এক্সিবিশন করার বিষয়ে অল্পবিস্তর কথাবার্তা আরম্ভ হয়েছে একজনের সঙ্গে। আসলে আমি বড্ড সহজে হেরে যাই জানেন। দু’পা এগোনোর পর যদি এক পা পিছোতে হয় তাহলেই আমি খুব ডিমোটিভেটেড হয়ে পড়ি। আমার বাবা চাইলেই আমার এক্সিবিশন স্পন্সার করে দিতে পারে। নামি আর্ট গ্যালারি না পাই, কলকাতার কোনো বিলাসবহুল হোটেলে একটা বড় করে এক্সিবিশন করা খুব একটা চাপের হবে না। টাকাপয়সা কোনো ইস্যু নয় এখানে। কিন্তু আমার ভিতরে কোথাও একটা নিজেকে নিজের মতন করে প্রমাণ করার তাগিদ আছে। বাড়িতে আমার সাপোর্ট সিস্টেম বলতে একমাত্র আমার দিদি। ও ছাড়া কেউ আমার ছবি আঁকার প্যাশনটা কোনোদিন বোঝেনি। ইনফ্যাক্ট বাবা-দাদা তো ডাইরেক্টলি ওপোজ করেছে। ছবি এঁকে কি হবে? ছবি এঁকে কি এরপরে লোকের বাড়ির দেওয়াল রং করব? ছবি আঁকিয়েদের কেউ পোঁছে? এমন কত কথাই তো শুনলাম. . .এদের পয়সায় এক্সিবিশন করলে ধম্মে সইবে বলুন? আমাদের বাড়িতে রাতে খাবার টেবিলে একসাথে বসে কথা বলতে কেবল প্রফিট অ্যান্ড লস। এই পরিবেশে কী আর ছবি আঁকা যায়? তাইতো বারবার এদিক-সেদিক চলে যাই মনকে শান্ত করতে। অনেক শিল্পীরই শুনেছি অস্থিরতার মুহূর্তে সেরা সৃষ্টিটা চলে আসে। আমার আবার উল্টোটা। আমার মন শান্ত না হলে পেন্সিলের একটা আঁচড়ও কাটতে পারি না।” এই বলে ও থেমে গিয়ে উদাস দৃষ্টিতে জানলার বাইরে চাইল।

এরপর খানিকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। ছেলেটার কথা শুনে সময়টা মসৃণভাবে কেটে যাচ্ছে। তাই কথোপকথন থামিয়ে দিতে মন চাইছে না। কি বলব এরপর ভাবছি এমন সময় ও বলল, “আপনি যেন কোন স্কুলে জয়েন করেছেন বললেন?”

-“লিটল বাডস হাই স্কুল”

-“বাহ, বেশ নামকরা স্কুল তো! প্রচুর স্টুডেন্ট ওদের। ইন ফ্যাক্ট, ক্যাম্পাসটাও খুব সুন্দর আর অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি। তা আপনার থাকার বন্দোবস্ত কিছু হয়েছে?”

-“আপাতত দিনদুয়েক কোনো হোটেলে থাকতে হবে। সামনের সোমবার থেকে স্কুল কোয়ার্টারে। ক্যাম্পাসের মধ্যেই ফিমেল এমপ্লয়ীসদের থাকার ব্যবস্থা আছে।”

-“হ্যাঁ আমি শুনেছি ওদের ম্যানেজমেন্ট খুব ভালো। আপনি যেখানে থাকবেন সে জায়গায় স্কুলের গেট থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসের পিছন দিকে মিনিট দুয়েক হেঁটে সামনে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এক কিলোমিটার মত নিচে নেমে গেলে একটা পাহাড়ি ঝর্না পড়ে। গাছপালার মধ্যে জায়গাটা লুকোনো। পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নামছে সরু ঝর্না আর ঝর্নার জল যেখানে পড়ছে সেখানটায় একটা ছোট্ট ওয়াটার বডি তৈরি হয়ে গেছে। লোকবসতি নেই আশেপাশে। শুধু ঝর্নার সামনে তেরপল টাঙিয়ে নিয়ে এক বুড়ো দাদু চায়ের দোকান করেছে। অবশ্য ওটাকে দোকান ঠিক বলা চলে না। চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে গিয়ে একাই বসে থাকে চুপচাপ। লোকজন তো বড় একটা যায় না ওখানে। কেউ চাইলে কাঠকুটো জ্বালিয়ে চা বানিয়ে দেয়। আমি যখনই গেছি অনেকক্ষণ বসে ওর সাথে গল্প করেছি। একটু সেটেল করে নেওয়ার পর কখনো ঘুরে আসবেন জায়গাটায়। দেখবেন মন ভালো হয়ে যাবে।”

-“তুমি বুঝি অনেকবার গেছো সেখানে?”

-“গেছি কয়েকবার। ওদিকে আমার দিদির এক বন্ধুর বাড়ি। আমি, দিদি আর সেই বন্ধু মিলে কয়েকবার হাঁটতে হাঁটতে ঝর্না অব্দি গেছি। অনেকক্ষণ বসে থেকেছি পাথরের চাতালে, গল্প করেছি, ওদের ছবি তুলে দিয়েছি। দাঁড়ান আপনাকে আমার দিদির একটা ছবি দেখাই।” এই বলে হাতে রাখা মোবাইলের গ্যালারি ঘেঁটে একটা ছবি বের করে আমার দিকে মোবাইলটা এগিয়ে দিল। দেখলাম সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে তিরতিরিয়ে নেমে আসা ঝর্নার সামনে পড়ে থাকা বড় বড় ধূসর পাথরগুলোর একটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি মধ্যকুড়ির মেয়ে যার মুখের গড়নের সাথে আমার সহযাত্রী ভাইটির মুখের মিল সাংঘাতিক। মেয়েটির সোজা সোজা চুলের ডগা কাঁধ ছাপিয়ে নেমে গেছে আরও খানিকটা। জিন্সের উপরে ফ্লোরাল প্রিন্টের টপ পরে খালি পায়ে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। চোখেমুখে খুশি উপচে পড়ছে।

ভাইয়ের মতনই এই মেয়েটিরও চেহারাজুড়ে বিত্তের ছাপ বিদ্যমান।

আমি ফোনটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, “ভারী মিষ্টি দেখতে তোমার দিদিকে। ইনিও কি বিজনেসে আছেন?”

-“তা একরকম বলতে পারেন।”

-“ঠিক পরিস্কার হল না।”

ছেলেটা এবার মুখটা ঈষৎ গম্ভীর করে বলল, “দিদি ব্যবসাতেই যোগ দিয়েছিল। আমাদের রাবাংলার হোটেলটা ওই সামলাচ্ছিল। ওখানেই থাকতে শুরু করেছিল সেই সময়টায়। ওর কাইন্ড, লাভিং নেচারের জন্য স্টাফেরাও ওকে বেশ পছন্দ করত। বছরদেড়েক আগে একবার আমাদের ওই হোটেলে আগুন লাগে। সে এক বীভৎস ঘটনা। এমন ঘটনা আমাদের হোটেলে যে কোনোদিন ঘটতে পারে তা কেউ ভাবেনি। অগ্নিনির্বাপক সব ব্যবস্থাই ছিল। তা সত্ত্বেও কোনোভাবে আগুনটা নিচের তলায় বেশ কিছুটা অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় দিদি ওখানেই ছিল। অন্যান্য গেস্ট ও স্টাফেদের সাথে ও আটকে পড়েছিল। যাহোক, আগুন আরো ভয়ংকর রূপ নেওয়ার আগেই বিষয়টা হ্যান্ডেল করা গেছিল। এ ঘটনায় যদিও হতাহত কেউ হয়নি, দিদি তারপর থেকেই একটু ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছে। তাই ওকে বাড়িতেই এনে রাখা হয়েছে। এখনো ও বাড়িতেই আছে। নিজের মতন থাকে, আমি বাড়ি ফিরলে মাঝেসাঝে ঘুরতে বেরোই ওকে নিয়ে। যতটা সম্ভব মন ভালো রাখার চেষ্টা করি। হোপফুলি খুব শীগগিরই ও আবার কাজে যোগ দিতে পারবে।” এতদুর বলে ছেলেটা একটু যেন থম মেরে গেল।

এদিকে বাস ততক্ষণে গ্যাংটক শহরের সীমানায় ঢুকে পড়েছে। দুপাশে বাড়িঘর, দোকানপাটের পরিমাণও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। সঙ্গে বেড়েছে রাস্তায় যানবাহনের পরিমাণ। আবহাওয়ার শীতল ছোঁয়া জাপটে ধরতে শুরু করেছে। বাস থেকে নেমে হুডিটা চাপাতেই হবে।

আমি এবার বললাম, “তুমি তোমার দাদার সাথে খুব একটা ক্লোজ নও, তাই না?”

ছেলেটা ভাবলেশহীন মুখে বলল, “ক্লোজ হওয়ার সুযোগই পাইনি সেভাবে। দাদা দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে থেকে পড়াশোনা করেছে। কলেজ দিল্লিতে। অবশ্য যতটুকু সময় আমরা একসাথে কাটাতাম তাতেও ক্লোজ হওয়া যেত। কিন্তু আমাদের স্বভাবে তেমন একটা মিল নেই। ও একেবারে বাবার মত। কাজ বাদে অকাজের কথা বেশি বলে না। দায়িত্ববান, ব্যবসাটা ভালোবেসে করে। অন্যদিকে আমি খামখেয়ালি। কথা বলতে, ঘুরে বেড়াতে, নতুন মানুষের সাথে মিশতে বেশি পছন্দ করি। আর দিদির স্বভাবটা এই দুই মেশানো। অ্যামবিভার্ট বলতে পারেন। ও আমার মতন দাদারও খুব প্রিয়। আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে ও একটা সুতো বলতে পারেন। আপনার ভাইবোন নেই?”

“একটা ভাই আছে”, অভিব্যক্তিহীন স্বরে বললাম।

-“তাই নাকি? কী করে সে?”

-“পড়ছে। তোমারই বয়সী। ইউকেতে আছে এখন। সামনের বছর কোর্স কমপ্লিট হলে দেশে ফেরার কথা।”

-“তারপর কি এখানেই?”

-“মনে হয় না। আমি যতদূর জানি ওর এখানে সেটেল করার কোনো ইচ্ছা নেই। ওখানে জীবনযাত্রার মান উন্নত, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত। ইদানিং একটা ব্রিটিশ গার্লফ্রেন্ডও হয়েছে। এই পোড়া দেশে ফিরে আর কি করবে?! কিসের টানে ফিরবে? এখানে কি আছে?”

-“কেন, আপনি তো আছেন। আর আপনাদের ফ্যামিলি?” ছেলেটা ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল। মৃদু হেসে বললাম, “তোমার মত এত কানেক্টেড ফ্যামিলি আমার নয়। বাবা-মা কলকাতায় থাকেন আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে। ছেলে দেশে থাকলেও যে ওনাদের সাথে থাকবে না এই নির্মম সত্যটা ওনারা ভালই জানেন। আর এটাও জানেন যে পাখি উড়ে যেতে চাইছে তাকে আটকে রাখা যায় না। বাবা মাকে নিয়ে  আমার ভাই অতটা বদার্ড নয়। ওনারাও তেমনি ওর অনুপস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। আর আমায় বোধহয় আমার বাবা-মার তেমন প্রয়োজন নেই।”

-“একথা কেন বলছেন?”

মনে মনে বললাম, কারণ আজও সমাজের জগদ্দল পাথরের নিচে বহু বাবা-মাই মেয়েদের নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। মুখে বললাম, “মানে ওনারা এখনও যথেষ্ট সক্ষম আর্থিক-শারীরিক দুদিক থেকেই। তাই আর কি. ..” ছেলেটা এবার একটু কিন্তু-কিন্তু স্বরে বলল, “দিদি কিছু মনে করবেন না, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি। আপনি কি ম্যারেড?”

মনে মনে বললাম সেপারেটেড। মুখে বললাম, “না”। কেন যে বললাম নিজেও ভেবে পেলাম না।

-“তা সমতল ছেড়ে একা এই দূর পাহাড়ে আসা নিয়ে আপনার বাবা-মা আপত্তি করেননি?”

মুখে বললাম, “না, ওনাদের কোনো আপত্তি নেই”। মনে মনে বললাম, আমার জীবন নিয়ে ওনারা আর চিন্তিত নন। এ বিষয়ে মাথা ঘামানোটা ওনাদের কাছে আজকাল সময়ের অপচয়। আর যে মেয়ে সমাজের বাঁধাধরা নিয়ম মেনে চলে না, সে তো খারাপ মেয়ে। খারাপ মেয়ের জীবনের আর কি ভালো কি মন্দ!

এরপর আমি একটু চুপ করে গেলাম। ছেলেটা কি বুঝল কে জানে, ওই প্রসঙ্গে আর ঢুকল না। জানলার বাইরে খানিকক্ষণ নিশ্চুপ চেয়ে থাকার পর বলল, “গ্যাংটকে ঢুকে পড়েছি। নেমে যাবো আর মিনিট দশেকের মধ্যে। আপনি যে বলছিলেন হোটেলে থাকবেন, হোটেল কি বুকড আছে?”

-“নাহ, নামার পর হোটেল খুঁজবো। আসলে এত তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়ে গেলো যে হোটেল বুকিং-এর টাইম পাইনি।”

-“কিন্তু দিদি এই পিক সিজনে যে কোনো স্ট্যান্ডার্ড হোটেলে ঘর খালি পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।”

ওর কথায় সামান্য হলেও একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ল কপালে। সত্যিই নতুন জীবন শুরুর ঘোরের মধ্যে এসব বাস্তব সমস্যা মাথাতেই আসেনি। ছেলেটা বলল, “দিদি যদি আপত্তি না থাকে আপনি আমাদের রিসোর্টে যেতে পারেন। এই সময়টায় আমরাও ফুল বুকড থাকি কিন্তু আমি বললে ওরা ঠিক একটা রুম আপনাকে ম্যানেজ করে দেবে।”

-“কিন্তু তোমাদের রিসোর্টে রুমের চার্জ তো অনেক। তার ওপর আবার জিএসটি চাপবে। আমার পক্ষে এই মুহূর্তে একটু মুশকিল হয়ে যাবে।”

-“সেকি, আমি থাকতে আপনি রুম রেন্ট নিয়ে চিন্তা করছেন?! না না, ওসব একদম ভাববেন না। আপনি তো আমার দিদির মত। আমি আছি তো…” ছেলেটা হাঁইহাঁই করে উঠল।

আমি অল্প হেসে বললাম, “তুমি যে মুখ ফুটে সাহায্য করতে চেয়েছ ভাই এই অনেক। কিন্তু এবারটা মাপ কর। এখন তো আমি গ্যাংটকেই থাকব। পরে না হয় কোনো সময় গিয়ে তোমাদের রিসোর্টে একটা দিন কাটিয়ে আসব।” আমার গলার দৃঢ়তা অনুভব করেই বোধহয় ছেলেটা যেন জোরাজুরি করতে গিয়েও করল না। আমি বললাম, “কী যেন নাম তোমাদের রিসোর্টের?”

-“দ্য মাউন্টেন রিট্রিট রিসোর্ট এন্ড স্পা। যেকোনো ট্যাক্সিওয়ালাকে বললেই হবে, সবাই চেনে।”

-“কিন্তু ভাই এতক্ষণে তো তোমার নামটাই জানা হয়নি।”

-“আমার নাম আলিঙ্গন, আলিঙ্গন রায়।”

-“খুব সুন্দর নাম। একটু আনকমন।”

-“থ্যাংক ইউ। হ্যাঁ, নাম হিসেবে একটু আনকমনই বলা যায়। আমার স্কুলের সিদ্ধার্থ, বিক্রম, আদিত্যদের ভিড়ে মনে থেকে যাবার মতন নাম। আমার অবাঙালি বন্ধুরা তো ঠিকঠাক উচ্চারণও করতে পারে না। ওদের কাছে নামটা ‘আলিঙ্গন’ থেকে ‘আলিং-গান” হয়ে গেছে! কেউ কেউ আবার সুবিধের জন্য ছোট করে ‘আলি’ করে দিয়েছে।” ছেলেটা সহাস্যে বলল।

-“কে রেখেছিল নামটা?” প্রশ্ন করলাম।

-“দাদু রেখেছিলেন সব ভাইবোনের নাম। আমার দাদা অনুরাগ রায়, দিদি আদিরা। আমাদের যে হোটেলেই যান না কেন, এই তিন ভাইবোনের কোনো একজনের নাম বললেই আর ঘর পেতে অসুবিধা হবে না। আপনাকে বরং আমার নাম্বারটাও লিখে দিই। কোনো দরকার পড়লে অবশ্যই ফোন করবেন।” এই বলে ছেলেটা চটজলদি ডায়েরির পিছন পাতায় একটা ফোন নাম্বার লিখে কাগজটা সাবধানে ছিঁড়ে সযত্নে ভাঁজ করে আমার হাতে দিল। আমি কাগজটা নিয়ে ব্যাগের নিরাপদ আশ্রয়ে চালান করে দিলাম। ইতিমধ্যে বাস গ্যাংটকের বাস ডিপোয় ঢুকে পড়েছে। যাত্রীদের মধ্যে ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। যারা ঘুমিয়ে পড়েছিল তারা ঘুম ভেঙে উঠে আড়মোড়া ভেঙে নিজেদের শরীর-মনের সম্বিৎ ফিরে পেতে চাইছে। কেউ কেউ আবার এরইমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে ওপরের তাকে রাখা ব্যাগ পেড়ে পিঠে নিয়ে প্রস্তুত, যেন বাস থামবে আর তারা লাফ দিয়ে নেমে ছুটে চলে যাবে। বাসের গতি ক্রমশ মন্থর হতে হতে বাস নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর পর একেবারে থেমে গেল। যাত্রীরাও একে একে নামতে শুরু করে দিয়েছে। আমিও আমার রুকস্যাকটা পেড়ে নিয়ে পিঠে গলিয়ে নিয়েছি আর ছোট ব্যাগটা নিয়েছি সামনে বুকের কাছে। আলিঙ্গনের সঙ্গে ওর ছোট্ট ব্যাগটা ছাড়া আর কিছু নেই। অন্যান্য যাত্রীদের পিছুপিছু গিয়ে ধীর পদক্ষেপে নেমে দাঁড়ালাম নিচে। এখানে আমি আগেও এসেছি। তাই জায়গাটা একেবারে অচেনা নয়। অনতিদূরেই একটা ট্যাক্সিস্ট্যান্ড আছে। আমার প্ল্যান মোটামুটি ছকা। একটা ট্যাক্সি ধরে এমজি মার্গ নিয়ে যেতে বলব। তারপর সেখানে গিয়ে হোটেল খুঁজব আশেপাশে। যদিও পিক সিজন, কোথাও না কোথাও একটা মাথা গোঁজার আস্তানা মিলবেই। তাছাড়া আজকাল তো শুনেছি শহরের সীমানা ছাড়িয়েও প্রচুর হোটেল মাথাচাড়া দিয়েছে। এখানে না পেলে সেখানে দেখব। আর নিতান্তই কোনো ব্যবস্থা না করতে পারলে আলিঙ্গনদের হোটেল তো আছেই। অনেকেই ভাবতে পারেন যে একা একটা মেয়ে এত কিছু করবে কিভাবে। তবে এতদূর যখন বুকে বল নিয়ে চলে এসেছি, বাকিটাও আশা করি সামলে নিতে পারব।

আমি যাবার আগে আলিঙ্গনকে বিদায় জানালাম। বললাম, “আমি এবার আসি। তোমার সাহায্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ভালো থেকো।” আলিঙ্গন হাসিমুখে বলল, “আপনিও ভালো থাকবেন দিদি। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে, কথা বলে খুবই ভালো লাগলো। আপনাকে যে আজ আমার কত বকবকানি সহ্য করতে হল… সাবধানে যাবেন। কোনো অসুবিধা হলে ফোন করবেন।” আমি হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালাম।

কিন্তু কয়েক পা চলার পর হঠাৎ এক কর্ণবিদারী চিৎকারে আমার পা আটকে গেল।  বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। কি মনে হতে পিছন ফিরে তাকাতেই তাজ্জব হয়ে গেলাম। এসব কি ঘটছে এখানে?!

দেখলাম কোথা থেকে দুটো ষন্ডামার্কা লোক এসে আলিঙ্গনকে জাপ্টে ধরেছে দুদিক থেকে। ওদের মাঝে ছেলেটা একেবারে বন্দি হয়ে পড়েছে। আর আলিঙ্গন নিজেও যেন মুহূর্তেই বদলে গেছে। এ আর আমার বাসের সহযাত্রী, আঁকায় পারদর্শী, হাসিখুশি ভাইটা নয়, বরং শিকারির জালে আটকে পড়া এক হিংস্র দানব। গুন্ডামার্কা লোক দুটোর হাতে পড়ে আলিঙ্গন কাটা ছাগলের মত ছটফট করছে। উন্মাদের মত নিজেকে টেনে বের করে ফেলতে চাইছে বন্দীদশা থেকে। ওর চোখমুখ বিকৃত হয়ে গেছে। তারুণ্যের সতেজতা মিলিয়ে গিয়ে এক দানবীয় হিংস্রতা ফুটে উঠেছে। আর একটা প্রাগৈতিহাসিক চিৎকার ভেসে আসছে ওর গলা থেকে  “অ্যা অ্যা অ্যাঅ্যাঅ্যা. . .”। সে চিৎকার এক অসম সাহসী লোকের শিরদাঁড়াতেও কাঁপুনি ধরাতে পারে। ঘটনার আকস্মিকতায় ও অস্বাভাবিকতায় আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। আমার শরীরটা যেন আটকে গেছে। যা দেখছি তা আমাকে কেমন ভীত-আহত করে তুলেছে মুহূর্তেই। এমন সময় দেখলাম উদ্বিগ্নমুখে ফর্মাল পোশাক পরা এক যুবক দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এল ওদের দিকে। এর সাথেও আলিঙ্গনের মুখের মিল প্রকট। এই ছেলেটা কি তবে আলিঙ্গনের দাদা অনুরাগ? ছেলেটার সঙ্গে আরো একটা লোক আছে যাকে দেখে নার্স বলে মনে হচ্ছে। ওদের এগিয়ে আসতে দেখে আলিঙ্গনের চিৎকার আরো বেড়ে গেছে। এরইমধ্যে বাসস্ট্যান্ডে লোক জড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু কেউই কোনো প্রতিবাদ বা প্রশ্ন করছে না। সকলেই যেন আমারই মতন ভীত-স্তম্ভিত। ক্রমশ ফর্মাল পোশাকের ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে নার্সটাকে কি যেন ইশারা করল। নার্সটাও একইরকম হাট্টাকাট্টা‌। বিস্ফারিত নেত্রে দেখলাম ওর হাতে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ। ও সিরিঞ্জটা নিয়ে আলিঙ্গনের দিকে এগিয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে আমায় যেন আচমকা কোনো ভূতে ভর করল। নিজের অজান্তেই “দাঁড়াও দাঁড়াওওওও…” বলে পাগলের মতো ছুটে গেলাম ওদের দিকে। আমাকে ছুটে আসতে দেখে ফর্মাল পোশাকের যুবকসহ বাকিরা প্রত্যেকেই যারপরনাই বিস্মিত। ওরা অবাক চোখে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করছে আমার এই উদ্ভ্রান্তের মতন আগমনের কারণ। কিন্তু আমি যেন তখন আর নিজের মধ্যে নেই। উন্মাদের মতো ছুটে গেলাম নার্স ছেলেটার দিকে। ছেলেটা বোধহয় বুঝতে পারল যে আমি ওর হাতের সিরিঞ্জটা কেড়ে নিতে চাইছি। ও সিরিঞ্জসমেত হাতটা পিঠের দিকে করে একটু পিছিয়ে গেল। কিন্তু আমি ঘোরের বশে থামলাম না। ছুটে গিয়ে শরীরে যত শক্তি আছে সবটুকু দিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিলাম। আমি নিজেও পড়ে গেলাম সাথে সাথে। ফর্মাল পোশাকের ছেলেটা প্রশ্নালু দৃষ্টিতে চেয়ে সে দৃশ্য দেখল। প্রবল ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েও অবশ্য নার্সটা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফর্মাল পোশাক এগিয়ে এসে আমাকে ধরে মাটি থেকে তুলল। সেই সাহায্যকে গুরুত্ব না দিয়ে আমি উঠে দাঁড়ানোর পরে আবার ওর হাত ছাড়িয়ে সামনে ছুটে যেতে চাইলাম। আলিঙ্গন তখনও সেই শিরদাঁড়া কাঁপানো চিৎকারটা করে চলেছে। কিন্তু আমি ফর্মাল পোশাকের হাত ছাড়িয়ে যাবার আগেই নার্সটা ওষুধ ভর্তি সিরিঞ্জ ফুটিয়ে দিয়েছে আলিঙ্গনের গায়ে। ওষুধের মাত্রা নিশ্চয় ভয়ঙ্কর তীব্র। কারণ, দেখলাম ফোটানোর মুহূর্তের মধ্যেই আলিঙ্গনের ছটফটানি ও চিৎকার থেমে গেল। ও চোখ বুজে নেতিয়ে পড়ল সামনে। যারা ওকে ধরেছিল তাদের একজন ওর অচেতন দেহটা তুলে কাঁধের ওপর চাপিয়ে সামনে দাঁড় করানো স্করপিও গাড়িটার দিকে হাঁটতে লাগল। আমি আর দেখতে পারলাম না। দুহাতে চোখ ঢেকে ফেললাম।

এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পরের কথা। নতুন স্কুলে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছি ততদিনে। শনিবারের মিষ্টি সকালে বসে আছি এক নাম না জানা পাহাড়ি ঝর্নার সামনে। অনেক উঁচু থেকে জলের ধারা লাফিয়ে নেমে মাটিতে পড়ে সৃষ্টি করেছে জলাশয়। আবার সেই জলাশয় থেকে জলের একটা অংশ সুতোর মতন সরু হয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। জায়গাটার আশেপাশে জঙ্গল খুব একটা ঘন নয়। জঙ্গল একরকম এখান থেকেই শুরু হয়েছে বলা চলে। জলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় নানা আকৃতির পাথর। থেকে থেকেই একটা অচেনা পাখি ডেকে উঠছে সুরেলা গলায়। জঙ্গলের স্তব্ধতা ভেদ করে সেই ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে। জুতো খুলে পাশে রেখে খালি পায়ে পাথরের ওপর বসে আছি। সামনেই একটা উঁচু ঢিবির ওপরে ধূসর তেরপালের নিচে কাঠকুটো জ্বেলে মাটির উনুনে আমার জন্য চা বানাচ্ছে এক নেপালি বৃদ্ধ। ওনার নাম পবন বাহাদুর। মাথার ওপরে আকাশে চলছে মেঘ-রৌদ্রের বিরামহীন খেলা।

ওখানে বসে থাকতে থাকতে বারবার মাথায় ভিতরে অনুরাগ রায়ের সেদিনের বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। বাসস্ট্যান্ডের ঘটনার পর অনুরাগই সেদিন আমায় ওদের রিসোর্টে এনে রেখেছিল। আমি একটু ধাতস্থ হবার পর আমার ঘরে এসে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল। ওর ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক কি, আমাদের যোগাযোগই বা কিভাবে হল, সেদিন আমার ওরম আচরণের কারণ কী- এইসব কিছু নিয়েই কথা হয়েছিল। অনুরাগই বলেছিল যে আলিঙ্গন সুস্থ নয়, দুরারোগ্য এক মানসিক ব্যাধির স্বীকার সে। কখনো ভালো থাকে, আবার কখনও নিজেকে হারিয়ে ফেলে পুরোপুরি। যখন ভালো থাকে তখন তার মতন হাসিখুশি মিশুকে ছেলে আর হয় না। কিন্তু খারাপ থাকলে সে না নিজেকে চিনতে পারে, না অন্য কাউকে। কখনো কখনো আবার হিংস্র হয়ে ওঠে, আঘাত করে বসে নিজেকে এবং অন্যদের। সেইসব সময় ও সকলের জন্যই এক বিভীষিকা। ওকে বাড়িতেই রাখা হয় নজরবন্দি করে। একজন সর্বক্ষণের নার্স ও দুজন পাহারাদার আছে। কিন্তু এত নজরদারি সত্ত্বেও প্রতিবারই সে কোনো-না-কোনো অদ্ভুত উপায়ে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে মাঝেমাঝে পালিয়ে যায়। কোথায় যে যায় কেউ জানে না। আজ অব্দি মূলত এমন হয়েছে যে সে নিজেই চলে গেছে, পরে তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে নিজেকে হারানো অবস্থায়। আবার সুস্থ অবস্থাতেও বাড়ি ফিরেছে কয়েকবার। এমনভাবেই সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে বেরোয় যে কেউ ওকে দেখলে ভাবতেই পারবে না ও অসুস্থ। প্রতিবারই ওর খোঁজে শহরজুড়ে লোক পাঠানো হয়। অধিকাংশ সময়ই ওকে খুঁজে পাওয়া গেছে ওই বাস ডিপো থেকে, নয়তো জঙ্গলের ভিতরে ছোট্ট ঝর্নার সামনে থেকে; আবার কখনো কখনো ওদের হোটেলের সামনে থেকেও। এমনও হয়েছে যে ওরা চারদিকে খুঁজছে আর দেখা গেল ও রিসোর্টের ভেতরে বাগানে বসে ছবি আঁকছে। ওর সুস্থ চেহারাটা যতটাই সুন্দর, অসুস্থ অবস্থাটা ততটাই বিকৃত। ভালো থাকতে থাকতেই চোখের নিমেষে ওর চেহারাটা অস্থির অসুস্থতায় বদলে যায়। বিশেষত সেই সময়ে ওর দাদা, নার্স কিংবা ওর গার্ডদের দেখলে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তবে ছবি আঁকার ধাতটা ওর এখনো আছে। ওর সুস্থ এবং অসুস্থ অবস্থার মধ্যে এক অদ্ভুত যোগসুত্র হয়ে টিকে আছে ওর অংকনপ্রতিভা। এমনও হয়েছে যে কোনো বিপজ্জনক মুহুর্তে যখন ও কাউকে চিনতে পারছে না, তখনো ও আপন মনে সাদা পাতায় তুলির আঁচড়ে সৃষ্টি করে ফেলেছে সাদাকালোর মাস্টারপিস।

অনুরাগ বলেছিল, “জানিনা কেন ও আমায় শত্রু ভাবে। আমায় দেখলেই হিংস্র হয়ে ওঠে, চিৎকার শুরু করে দেয়। ওকে আটকে রাখি বলে? আমি কিন্তু ওকে কোনোদিন কম ভালোবাসিনি। হয়তো প্রকাশ করিনি কোনোদিন। আর সেটা আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন ইনএক্সপ্রেসিভ। কিন্তু ওকে নজরবন্দি করে না রাখলে একমাত্র উপায় ছিল হসপিটালে পাঠিয়ে দেওয়া যা আমরা কেউই চাইনি। আমরা চেয়েছি বাড়িতে থেকেই ওর ট্রিটমেন্ট হোক। তাইতো ওর এত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের পরেও আমরা এত বড় রিস্ক নিয়ে ওকে বাড়িতে রেখেছি।”

-“নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড বলতে? আর আপনাদের বোন? তাকে দেখলেও শান্ত হয় না? কি যেন নাম ওর… ইয়েস! আদিরা, তাই তো?” আমি প্রশ্ন করেছিলাম।

প্রশ্ন শুনে অনুরাগ কেমন যেন চমকে গেছিল। বলেছিল, “হ্যাঁ, আমার বোনের নাম আদিরা। কিন্তু ওর কথা আপনাকে কে বলল?”

-“কেন, বাসে আসতে আসতে আলিঙ্গনই বলেছিল।” আমি সোজাসাপ্টা জবাব দিয়েছিলাম।

-“ঠিক কি কি বলেছে বলুন তো আলিঙ্গন আপনাকে আমার বোনের ব্যাপারে।”

 -“অনেক কথাই বলেছে। এই যেমন আদিরাই ছোট থেকে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড, ও সব সিক্রেটস দিদির সাথে শেয়ার করে, আদিরাই নাকি একমাত্র ওর ছবি আঁকার প্যাশনটা সাপোর্ট করে- এইসব। তারপর আরো অনেক কথাই বলছিল, আপনাদের রাবাংলার হোটেলে নাকি আদিরা থাকাকালীন একবার আগুন লেগেছিল। ওই ঘটনার পর ও কাজ থেকে একটু ব্রেক নিয়ে এখন বাড়িতেই আছে।”

-“আলিঙ্গন আপনাকে আমাদের হোটেলে আগুন লাগার কথা বলেছে?”

-“হ্যাঁ বলেছে। কেন বলুন তো?”

-“না, আসলে এসব ঘটনা ওর মনে আছে এটাই আমার একটু স্ট্রেঞ্জ লাগছে। সত্যিই ও আপনাকে বলেছে যে রাবাংলার হোটেলে আগুন লাগার পর থেকে আদিরা বাড়িতে আছে?”

-“ও না বললে এসব কথা আমি কিভাবে জানব আপনিই বলুন। ইনফ্যাক্ট এটাও তো বলল যে আর কিছুদিনের মধ্যেই আদিরা হোপফুলি আবার কাজে ফিরবে। আমার একটু কনফিউজিং লাগছে বিষয়টা। আপনি এভাবে জিজ্ঞাসা করছেন কেন?”

আমার প্রশ্নে অনুরাগ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। তারপর ঈষৎ কাঁপা গলায় বলল, “যে আগুন লাগার কথা আলিঙ্গন আপনাকে বলেছে, সেই আগুনটা হঠাৎ করে লেগে যায়নি। লাগানো হয়েছিল। আর সেটা লেগেছিল রাবাংলা নয়, গ্যাংটকের এই যে রিসোর্টে আমরা এখন বসে আছি, এখানে। সেদিনও আলিঙ্গন পাহারা ভেঙে পালিয়েছিল। ওকে দুপুরবেলা যে ওষুধ দেওয়া হয় সেটা না গিলে অদ্ভুত উপায়ে ঠোঁটের নিচে রেখে দিয়েছিল। পরে ফেলে দেয়। ঘরেই পড়েছিল ট্যাবলেটটা। আমাদের মেড ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে পরদিন খুঁজে পায়। গার্ডদেরও দুপুরে একটু ঝিমুনি এসেছিল। বাড়িতে সে সময় ফ্যামিলি মেম্বাররা কেউ নেই। কোনোভাবে গার্ডদের আহত করে ও বেরিয়ে যায়। সারাদিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিল আমরা আজও জানি না। আমার লোক তখন ওকে নানা জায়গায় খুঁজছে। আর এদিকে ও সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় এই রিসোর্টে। এখানে পৌঁছে গার্ডেনের একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আগুনটা ওই জায়গা থেকেই ছড়িয়ে পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পরে আমরা বিষয়টা উদ্ধার করি। আমাদের কানেকশনের জোরে এই বিষয়টা নিয়ে পুলিশি ডামাডোল বিশেষ হয়নি। আদিরা সেদিন রাবাংলায় নয়, এখানে ছিল। ওরই এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি চলছিল তখন। আগুনে সেসব গেস্টরাই সবচেয়ে বেশি ইনজিওর্ড হয়। তবে সেদিন আগুন সময়মতো নেভানো গেলেও আমার বোনকে বাঁচানো যায়নি। শরীরের বেশিরভাগটাই পুড়ে গেছিল। দুদিন যমে-মানুষে টানাটানির পর তিনদিনের দিন আদিরা আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আলিঙ্গনকে পাওয়া গেছিল বাগানের এক কোণায়। তখন ওর হুঁশ ছিল না। ওরকম পরিস্থিতিতেও ওর কিন্তু কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি। বোধহয় মনের সব শক্তি দিয়ে আমাদের সাজানো জীবনগুলো ছারখার করে দেবার পর হুঁশ হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল।” এই বলে থেমে গিয়েছিল অনুরাগ।

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে থাকতে লক্ষ্য করেছিলাম অনুরাগের চোখের কোণে মুক্তোর মতো জল চিকচিক করছে। সে জল কি অকালে শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মত বোনের জন্য নাকি থেকেও না থাকা ভাইয়ের জন্য? অনুরাগ আরও বলেছিল, “ও বোধহয় কোনো জাদু-টাদু জানে। কিভাবে যেন কথাবার্তায়, ছলচাতুরিতে গার্ডগুলোকে বশ করে নেয়। আর কথাবার্তায় কাজ না হলে ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেয়। এই করে কতবার যে গার্ড বদলানো হল। ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরেও একবার পালিয়ে গেছিল জানেন। সেবার ওকে পাওয়া গেছিল একটা ঝর্নার ধার থেকে। ও সুস্থ থাকাকালীন ও আর আদিরা সেখানে প্রায়ই যেত। আমরা গিয়ে দেখেছিলাম একাই বসে বিড়বিড় করছে এমনভাবে যেন আদিরা ওর সঙ্গেই আছে। ও আজও বুঝতে পারে না যে ওরই লাগানো আগুনে ওর প্রিয় মানুষটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম ওকে বাড়িতে কাছের মানুষদের মাঝে রাখলে জলদি সুস্থ করে তুলতে পারব। ভেবেছিলাম ট্রিটমেন্টে থাকলে হয়তো সত্যিই আগের মতন হয়ে যাবে। কিন্তু নাহ, সমস্যা বাড়ছে বই কমছে না। আমারই ভুল! আদিরা চলে যাবার পর থেকে বাবা-মা শয্যাশায়ী। হোটেল-বাড়ি সব আমায় একা সামলাতে হচ্ছে। আমার পক্ষে নিজের মাথা ঠিক রাখাই মুশকিল হয়ে উঠছে। খুব ছোট্ট সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও আমি ডাউটফুল হয়ে পড়ি। আমার উচিত ছিল ওই ডার্ক ইন্সিডেন্টের পরেই ওকে হসপিটালে পাঠিয়ে দেওয়া। এবার দেখছি সেটাই করতে হবে। ইটস নো মোর ইন মাই পাওয়ার টু টেক কেয়ার অব হিম।”

অনুরাগের কথায় আমিও থম মেরে গেছিলাম। কেবল অস্ফুটে বলেছিলাম, “আচ্ছা ওর এই অবস্থা হল কী করে বলতে পারেন?”

-“দেখুন বেশি মেডিকেল টার্মে আমি বোঝাতে পারব না। মূলত ট্রমা থেকে বলতে পারেন। ও বরাবরই খুব সেনসিটিভ ছেলে। স্কুলে থাকতে একবার দার্জিলিং-এর কাছে খাদে ওর গাড়ি উল্টে গেছিল। ও অল্প ক’দিনে সুস্থ হয়ে উঠলেও ওর স্কুলের যে বন্ধু সঙ্গে ছিল, সে কোমায় চলে যায়। এই ঘটনার কিছুদিন বাদেই আমাদের দাদু হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।  কোইন্সিডেন্টালি, সেই সময় ও দাদুর সঙ্গেই ছিল। দাদুর মৃত্যু ও মেনে নিতে পারেনি। আবার এ ঘটনার মাসকয়েক বাদে একদিন ও আর আদিরা একসঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিল। তখন পড়ে গিয়ে আদিরা পায়ে মারাত্মক চোট পায়। এভাবে চোখের সামনে একের পর এক অ্যাক্সিডেন্ট দেখার পর থেকেই ওর মনে হতে শুরু করে যে ও বোধহয় অপয়া, অশুভ। ও যাদের ভালবাসে তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে দুর্যোগ নেমে আসে। ও নিজেকে ব্লেম করতে শুরু করেছিল। সেই শুরু…”

-“ওকে শেষবারের মতন একবার দেখা যায়?” ধরা গলায় বলেছিলাম।

অনুরাগ করুণ হাসি হেসে বলেছিল, “সেটা বোধহয় ঠিক হবে না এই মুহূর্তে। ও যদি কোনোদিন সুস্থ হয়ে ওঠে, নিশ্চয়ই আপনাকে খবর দেব। তখন না হয় এসে দেখে যাবেন।”

-“কিন্তু তখন কি ও আমায় আদৌ চিনতে পারবে?” ব্যাকুল হয়ে বলেছিলাম। অনুরাগ ফিকে হাসিটা বজায় রেখেই বলেছিল, “কেন, বলে দেবেন যে আপনি ওর দিদি। কোনো এক সুন্দর দিনে কোনো এক পাহাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে আপনাকে ও দিদি বলে ডেকেছিল।”

সেদিনের পর অনুরাগের সাথে আর দুবার মাত্র কথা হয়েছে আমার। প্রথমবার ফোন করেছিল আলিঙ্গনকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়ার খবরটা দিতে। কি ভেবে জানি না, বলেছিল আমি চাইলে একঝলকের জন্য দেখে আসতে পারি ছেলেটাকে? অদৃশ্য মায়ার টানে ভেসে গেছিলাম ওকে দেখতে। আলিঙ্গনকে যখন বাড়ির বাইরে এনে গাড়িতে তোলা হচ্ছে তখন অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখেছিলাম আমার বাসের সহযাত্রী ভাইটার আর এক অন্য রূপ। এইরূপে সে লন্ডভন্ড করে চলে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের পরে বিরাজমান নীরব হাহাকারের মত স্তব্ধ, শান্ত, স্থির। মুখে কথা নেই, কোনো আবেগের চিহ্ন নেই। শুধু চোখের বাদামি মণিগুলোতেতে একটা অব্যক্ত অস্থিরতা ঘোরাফেরা করছে। বুকটা ধক্ করে উঠেছিল ওর চাহনিতে। কিন্তু গাড়িতে উঠতে গিয়ে আমার দিকে ওর চোখ পড়ে যায় এবং আমায় দেখে ওর ম্রিয়মাণ মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। উঁচু গলায় আমাকে বলেছিল, “কিরে তুই কখন এলি রাবাংলা থেকে? বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” আমি বোবার মতন দাঁড়িয়ে ছিলাম। মুখ থেকে একটা শব্দও বেরোয়নি। ওকে ষন্ডামার্কা লোকগুলো একরকম ঠেলেঠুলেই গাড়িতে উঠিয়ে দিচ্ছিল। ও কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করেনি সেই মুহূর্তে। বরং গাড়ির অন্ধকূপে ঢুকে যেতে যেতে বলেছিল, “কিরে কী হল? কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এই দিদি… শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা? আমি একটু বেরোচ্ছি বুঝলি? ফিরতে দেরী হবে। এসে গল্প করব, ওকে? সেদিন যে স্কেচটা শুরু করেছিলাম না, ওটা কমপ্লিট হয়ে এসেছে। আমার ঘরে যা, দেখবি টেবিলের উপর রাখা আছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না এভাবে। এক্ষুনি বৃষ্টি আসবে…”

আলিঙ্গনের বিদায়ের পর অনুরাগ আরেকদিন ফোন করেছিল ভাইয়ের খবর জানাতে। কলকাতার এক নামি চিকিৎসকের অধীনে এখন রয়েছে সে। পাথরের ওপর বসে ঝর্নার স্ফটিকস্বচ্ছ জলে চোখ রেখে নুড়ি-পাথর গুনতে গুনতে নিজেকে বড্ড অস্থির লাগে আর অনুরাগের বলা কথাগুলো মাথার ভেতর নাগরদোলা ঘোরাতেই থাকে – “কোনো এক সুন্দর দিনে, কোনো এক পাহাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে আপনাকে ও দিদি বলে ডেকেছিল…”। অজান্তেই চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গাল বেয়ে নেমে আসে। অনতিদূরেই বুড়ো পবন বাহাদুরের কাঠের জ্বালের ধোঁয়া ভেসে এসে আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়। সেই ধোঁয়ার বৃত্তে দৃষ্টি হারাতে হারাতে ভাবি, আলিঙ্গন তো তোমার কেউ নয়। তবু কেন তার জন্য আমার এই মায়া? মানবমনের এ কেমন সংযোগ, এ কেমন টান? ও যেন আমার জীবনের পাহাড়ি যাত্রাপথের চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে দেখা হওয়া এক ক্লান্ত পথিক। সে হঠাৎ এল, আবার হঠাৎই হারিয়ে গেল। আচ্ছা, আলিঙ্গনকে ওর মনটা তার আলিঙ্গন ছেড়ে এভাবে চলে গেল কেন? আবার কবে ওর নিজের মনের আলিঙ্গনে ফিরবে ও? আদৌ কি ফিরতে পারবে?

Author – Amrita Das

Email – amrita.sep2@gmail.com

2 thoughts on “সংযোগ

    1. শব্দ টীম আপনাকে ধন্যবাদ জানায়। আর অমৃতাকে আমরা জানাব। খুব ভালো লাগল আপনার মতামত জেনে, পাশে থাকুন এইভাবে।

      Like

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.