অসুর

আমাদের সবার মধ্যে নাকি একটা অসুর আছে। অসুরটাকে মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হয়। একটু সাবধানে থাকতে হয় যাতে অসুরটা জেগে না উঠতে পারে। খানিক সুযোগ পেলেই ফাঁকফোকর গলে অসুরটা মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর সর্বনাশী ঘূর্ণিঝড়ের মতন তান্ডব চালায়, আছড়ে-পিছরে ফেলে দেয় আশপাশের সবকিছু। আবার, এভাবে নষ্টের খেলা খেলতে খেলতে একটা সময় দম ফুরিয়ে শেষ হয়ে যায় নিজেই! অসুরটা জেগে উঠলে সবকিছু শেষ করে দেয়, সঙ্গে নিজেকেও…

ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে উল্কাবেগে ছুটে চলা গাড়ির বাঁদিকের জানলার ধারে বসে হাওয়ার এলোপাথাড়ি আঁচড় খেতে খেতে এই কথাগুলোই নিজের মনে বিড়বিড় করছিল হিন্দোল। একটা প্রশ্ন ওকে ভেতর থেকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। উত্তর না মেলা পর্যন্ত ওর শান্তি নেই। হিন্দোল জীবনে কোনোদিন হারতে শেখেনি। অন্যের কাছে মাথা নোয়াতে ও নারাজ। কিন্তু যদি কেউ নিজের কাছেই হেরে যায়, তখন? এই হারের স্বাদ হিন্দোলের কাছে নতুন। কালোমেঘের চাইতেও বেশি তেঁতো। হিন্দোল তাই অস্থির। কিভাবে মুছবে এই হারের গ্লানি? ভিতরের অসুরটা যদি সত্যিই জেগে ওঠে, কি উপায়ে দমিয়ে রাখবে তাকে? প্রশ্নের জটাজাল হিন্দোলের ভিতরে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে অবিরাম। ওকে স্বস্তি দিচ্ছে না।

এমনিতে হিন্দোল ছেলেটা সদা চনমনে, উচ্ছ্বাস উত্তেজনায় টগবগাচ্ছে। মনের ভিতরে কোনো চিন্তা দানা পাকালেও তার ছাপ ও চোখেমুখে পড়তেই দেয়না। আগে কেউ নাম জিজ্ঞাসা করলে জেমস বন্ড স্টাইলে বলতো, “আমি হিন্দোল, হিন্দোল বসু।” অবশ্য আজ আর তার প্রয়োজন পড়ে না! আজ হিন্দোল বসুকে কে না চেনে? জনপ্রিয় বাংলা টিভি চ্যানেলের তুরুপের তাস “ডান্স বেঙ্গল” রিয়েলিটি শোয়ের উইনার হিন্দোল বসু! মাত্র সতেরো বছর বয়সেই সে সেলিব্রেটি। সামনেই এদের হিন্দি চ্যানেলে সম্প্রচারিত অল ইন্ডিয়া রিয়েলিটি-শো “ডান্স ইন্ডিয়া”তে যোগ দিতে যাবে পশ্চিমবঙ্গের উইনিং পার্টিসিপেন্ট হিসেবে। সেই অডিশন রাউন্ড থেকেই প্রতি রবিবার সন্ধ্যা সাতটায় টিভির পর্দায় চোখকে চুম্বকের মতন সেঁটে বসে থাকা সাধারণ বাঙালি দর্শকদের নয়নের মণি হিন্দোল। বিচারকরা তাকে পছন্দ করেছেন তো বটেই, উপরন্তু হাজার হাজার মানুষ ভোট দিয়ে হিন্দোলকে জিতিয়েছে। মাত্র তিন মাসেই সে পাঁচ ফুট দশের রোগা-পাতলা সাধারণ টিন-এজার থেকে একলাফে স্টার হয়ে গেছে। আজ সে টিভির পর্দায় নিয়মিত মুখ। বাংলা-ইংরেজি খবরের কাগজে প্রায়ই ছাপা হচ্ছে তার সাক্ষাৎকার, সঙ্গে পাতাজোড়া ঝলমলে রঙ্গিন ছবি। রিয়েলিটি শো জেতার পর প্রায় ছয়-সাত মাস কেটে গেছে, কিন্তু একটা দিনও ছুটি নেই হিন্দোলের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগুনতি শো করার ডাক এসেছে তার কাছে। সেও পাখির মতন উড়ে বেরিয়েছে এ-শহর থেকে ও-শহর। শরীরে ক্লান্তি এলেও মনে তা ঠাঁই দেয়নি। ক্লান্তি আসে আসুক, লক্ষীও তো আসছে ঘরে! টাকার মূল্য হিন্দোলের চেয়ে ভালো কে বোঝে?

হিন্দোলের মতে, যার টাকা নেই দুনিয়া তাকে দাম দেয় না। আজ ওর ঘরে টাকা আসছে, তাই মানুষের সঙ্গ, মনোযোগটাও হরলিক্সের সাথে ফ্রি পাওয়া প্লাস্টিকের বোতলের মতই চলে আসছে লেজুড় ধরে! হিন্দোলও কড়ায়-গন্ডায় বুঝে নিচ্ছে অর্থ ও জীবনের হিসেব। সাফল্য আর অর্থ যেন আজ হিন্দোলের কাছে মিলেমিশে একাকার। মাঝেমাঝে ও ভাবে, টিকিয়াপাড়ার অন্ধকার গলির ভাড়াবাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে ঘর থেকে কেউ যেন চিলের মতন ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে এসে ওকে বসিয়ে দিয়েছে নাম-যশ ও অর্থের গগনচুম্বী মিনারে। আর হিন্দোল তার সিংহাসনে বসে তাড়িয়ে উপভোগ করছে এই সুখস্বপ্নের স্বাদ। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই নিজের টাকায় সল্টলেকে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে হিন্দোল। টিকিয়াপাড়ার ঘুপচি ঘর ছেড়ে উঠে এসেছে অভিজাত এলাকার সুসজ্জিত আবাসনে। রিয়েলিটি শো থেকে গ্র্যান্ড প্রাইজ হিসেবে একটা অলটো গাড়িও পেয়েছে। মাস মাইনে দিয়ে ড্রাইভার পুষছে। আপন গর্বে হিন্দোলের মাঝেমাঝে আত্মহারা লাগে! হবে নাইবা কেন? ওর বয়সী কটা ছেলের ক্ষমতা আছে এত কিছু করার? হিন্দোল মনে মনে বলে, “আজ আমি এই জায়গায় এসেছি পুরো নিজের দমে। এখন হিন্দোল বসুর অনেক দাম।” টিকিয়াপাড়ার এঁদো গলি, বাবার ছেড়ে চলে যাওয়া, মায়ের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালানো, নাকে-মুখে চাড্ডি গুঁজে ট্রেনে ঘেমো লোকেদের ধাক্কা খেয়ে, বাসে ঠায় দাঁড়িয়ে কলকাতায় ডান্স ক্লাসে যাওয়া, রেশনের মোটা চালের ভাত, সন্ধ্যেবেলায় লোডশেডিং-এ হাতপাখার হাওয়া খাওয়া- এসবই এখন অতীত। আজকের এই ঝকঝকে বাস্তবে হিন্দোল খুউউব সুখী। অতীতজীবনের দুঃস্বপ্নের ছায়াটুকুও নিজের উপর পড়তে দিতে ও নারাজ। আর মাত্র মাসদেড়েকের মধ্যেই “ডান্স ইন্ডিয়া”র শুটিং শুরু হয়ে যাবে। হিন্দোলকে তাই উড়ে যেতে হবে স্বপ্ননগরী মুম্বাইতে। হিন্দোল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেইদিনের। “ড্যান্স ইন্ডিয়া”র সোনালী ট্রফি আর পঞ্চাশ লাখ টাকা ওর চাইই চাই!

রোজ সকালে স্নান করার পর চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আয়নায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিজেকে দেখা হিন্দোলের পুরনো অভ্যেস। একটা সময় টিকিয়াপাড়ার বাড়ির বাথরুমের ছোট্ট আয়নায় দেখতো আর এখন নিজের ঘরের বড় আয়নায় দেখে। আজকাল ও প্রায়ই নিজেকে এভাবে দেখতে দেখতে ভাবে, ঠিক কোন দিক থেকে ওকে দেখে “উদ্ধত” মনে হয়? প্রথমদিকে শোয়ের সেটে ফট্ করে মুখ খুলতে ভয় পেত। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝল যে দর্শকের মন পেয়ে গেছে, তখন ব্যাস! আর হিন্দোলকে পায় কে?! একের পর এক ধাপ টপকে যত জয়ের দিকে এগিয়েছে, স্বগৌরবও চড়চড় করে বেড়েছে হিন্দোলের। যে ছেলে বাড়ি থেকে স্টিলের টিফিন কৌটোয় খাবার নিয়ে অডিশন দিতে এসেছিল, সে আজ মনের মতন খাবার ফরমাসের সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে না পেলে তুলকালাম করে। সেটেও সবাই ওকে মাথায় তুলে রাখত। শোয়ের টিআরপি ও একাই বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা ওর ভরপুর সব পারফরম্যান্স দিয়ে! শো চলাকালীন তিন মাসে কম কেরামতি তো দেখায়নি হিন্দোল। প্রায় প্রতি এপিসোডেই নিত্যনতুন ডান্স ফর্ম দেখিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করেছে। কনটেম্পোরারী, হিপ-হপ, সালসা, সাম্বা কী না করেনি ও! একটা এপিসোডে তিরিশ ফুট উঁচুতে ঝুলন্ত রিংয়ে একটা থেকে অন্যটায় টুক করে লাফিয়ে গিয়ে গানের ছন্দে শরীর ভাসিয়ে দর্শক থেকে বিচারক সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আবার একটা এপিসোডে “এক দো তিন” গানটার সাথে অবিকল মাধুরীর মতন সেজে বলিউড স্টাইলে এমন নাচল যে সকলে হেসে কুটোপাটি। তিন ফাইনালিস্ট – অর্ঘ্য বিশ্বাস, মানালি সেন আর হিন্দোলের মধ্যে হিন্দোলই যে জয়ের টুপি পরবে, সেকথা শেষের দিকে সকলেই একরকম বুঝে গেছিল। হিন্দোল জানে, বিচারক ও দর্শক উভয়ই ওকে চেয়েছে জয়ী হিসেবে। কেবল পরিশ্রমই নয়, মিডিয়াতে নিজের “র‍্যাগস টু রিচেস” ইমেজটা ধরে রাখতে প্রাণপাত করেছে। তবুও ওর মনের ভেতর আজও একটা বিষয় খচখচ করে। ওদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিচারক- নৃত্যগুরু শিল্পী আচার্য, উনি যে কেন হিন্দোলকে পছন্দ করতেন না ও আজও বোঝে না। হিন্দোলের ডান্স টিচার ধর্ম স্যার ওকে বারংবার বলেছে, “ভার্সেটাইল হ হিন্দোল, বুঝলি? ভার্সেটাইল না হলে রিয়েলিটি শো জিততে পারবি না। দেখছিস না মানালির ভারতনাট্যম দেখতে দেখতে লোক কেমন বোর হয়ে গেছে? নেহাত জাজেসরা ওকে বেশি নাম্বার দিচ্ছে তাই, নাহলে পাবলিক ভোটে ও কোনোদিন এতদূর আসতে পারে? তুই আমার কাদামাটি রে হিন্দোল! সাধারণ পাবলিক ডান্সের ‘ডি’ও বোঝেনা। যেসব ফর্মের বাপের জন্মে নামই শোনেনি, তুই যখন সেগুলোই করে দেখাবি, দেখবি কেমন জলের মতন ভোট পাচ্ছিস!” হিন্দোলও ধর্ম স্যারের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছে। একই নৃত্যশৈলী নিয়ে পড়ে না থেকে নানারকম করার চেষ্টা করেছে, অলরাউন্ডারের মতন। তা সত্বেও শিল্পী আচার্যকে ও কোনোদিনই খুশি করতে পারেনি! সেমিফাইনাল এপিসোডে উনি কমেন্টস দিতে গিয়ে বললেন, “নৃত্য এক কঠিন সাধনা। কোনো নৃত্যশৈলী অনুকরণ করলেই কেবল হয়না, আত্মস্থ করতে হয়। এবং তা সময়সাপেক্ষ। হিন্দোল অনেক নতুন কিছু করার চেষ্টা করছে। চেষ্টাটা ভালো, কিন্তু বিষয়টা এখনো আত্মস্থ করার পর্যায়ে পৌঁছয়নি।” হিন্দোলের ভারী রাগ হত ওনার কথায়। শিল্পী আচার্যর নিজের জমানা তো শেষ। বাজার একেবারে ডাউন। তাইতো পয়সার জন্য রিয়েলিটি শোয়ের জাজ হয়ে এসেছে! তবুও শুধু খুঁত ধরবে। হাসি মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বুকের ভিতর ছুরি বসিয়ে দেবে একেবারে। আসলে শিল্পী আচার্যর পছন্দের প্রতিযোগী ওই মানালি। আজ হিন্দোল ভাবে, “দেখ এবার মজা! তোদের দু’জনকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জিতলাম তো আমিই।” আমিত্বে ভেসে হিন্দোল স্বপ্নালু বাস্তবে উড়ে বেড়ায়। মাটির গন্ধ ওকে আর ছুঁতে পারে না।

মানালি হিন্দোলকে শোয়ের সেটে প্রায়ই পিছন থেকে “ঘমান্ডি” বলতো! শিল্পী আচার্যও একবার ওকে বলেছিলেন “নামযশ অনেক পাবে হিন্দোল, কিন্তু অহংকার কোরো না। নৃত‍্য তোমায় অনেক দেবে, কিন্তু কেড়েও নিতে পারে অনেক কিছু।” ওদের যে কিসের এত হিংসে ওকে নিয়ে! “একজন কৈকেয়ী আর অন্যজন মন্থরা”, হিন্দোল মনে মনে আওড়ায়। এই যে হিন্দোলরা- শোয়ের সব প্রতিযোগিরা মিলে পুরুলিয়া ঘুরতে এল ডিসেম্বরের শীতে একটা “গেট টুগেদার” ট্রিপে, কি এমন দাবিটা করেছিল ও? হিন্দোলের রাতের ঘুম মন্দ হলে শরীর খারাপ লাগে, আর এরা তো বেড়াতে এসে সারারাত হুল্লোড় করবে। তাই ও আলাদা ঘর চেয়েছে। এই রণপার মত লম্বা ঠ্যাংদুটো নিয়ে ও স্করপিও গাড়ির মাঝখানে কিভাবে বসবে? তাই একটু বায়না করেছিল ওকে সামনে বসতে দিতে। ও জানে যে অর্ঘ্যদা ওর চাইতেও লম্বা। কিন্তু ও তো বয়েসে বড়, আবদারটা কার রাখা উচিত, ওর না হিন্দোলের? এক ভদ্রলোকের বাড়ির প্রাইভেট কনসার্টে ওরা পারফর্ম করবে। কিন্তু এসব ছোটখাটো অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে ও কেন সময় নষ্ট করতে যাবে? হিন্দোল বসু কি এতোই মামুলি?! ওরা জানেনা, কত বড় বড় জায়গা থেকে ডাক আসে ওর কাছে? হিন্দোল তাই সটান না করে দিয়েছে। আর এইসব ছোটখাটো ব্যাপারেই কিনা হিন্দোল “নাক উঁচু” হয়ে গেল! ওর নাকি আজকাল মাটিতে পা পড়ে না। হিন্দোল ভাবে, “আগে তোরা একটা কিছু জিতে দেখা, তারপর নাহয় আমার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে আসিস!” ওরা সেদিনটা রাগ করে হিন্দোলের সাথে কথাই বলেনি। অবশ্য হিন্দোলও যায়নি বরফ গলাতে। মরুক গে! অতো বন্ধুপ্রীতি ওর নেই। ওদের যদি শখ হয় অযোধ্যা পাহাড়ের ওপর থেকে একসাথে ঝাঁপ দেওয়ার, হিন্দোলও দেবে? ও হিন্দোল বসু। ওর একটা ভ্যালু আছে। ও ওর মতন চলবে। পোষালে ভাল, না পোষালে ওর বয়েই গেল!

বেড়ানোর সময়টাতে অবশ্য ভালোই আনন্দ করেছে হিন্দোলরা একসাথে। যেদিন এল এখানে, তারপরের দিনটা গাড়িতে করে পাহাড়ের ওপর ঘুরে বেড়িয়েছে। পাহাড়ের গায়ে শাল-মহুয়ার জঙ্গলের ভিতরে বিছানো আঁকাবাঁকা সর্পিল ধুলোমাখা রাস্তা বেয়ে চলে গেছে নিত্যনতুন জায়গায়। কোথাও চারদিকে পাহাড়-জঙ্গলের পাঁচিলের মধ্যে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে নীলজলা লেক, আবার কোথাও পাথরের উপর থেকে ঝিরিঝিরি ঝর্ণাধারা নিচে এসে লাফিয়ে, ঝোরা হয়ে বয়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোনোখানে। কোথাও জঙ্গলের বুক চিরে এসে মন মাতাচ্ছে পাখির কিচির-মিচির, আবার কোথাও খাদের ধারে দাঁড়ালে চোখ জুড়াচ্ছে চারদিকটা। সবই ঠিক চলছিল। কিন্তু গোল বাঁধলো সন্ধ্যেবেলায়  মুখোশ গ্রাম দেখতে গিয়ে। মুখোশ গ্রামের ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ওদের কানে এল, কলকাতা থেকে নাকি কোন এক নামি নৃত্যশিল্পী এসেছেন। তাঁর আবদারে আজ ছৌ নাচ হবে। সম্পূর্ণ টাকাটা উনিই দিচ্ছেন। বহু মানুষ ভিড় করেছে সেখানে। একথা শোনার পর হিন্দোলের দলেরও সবাই ওমনি হুরমুড়িয়ে চলল দেখতে কোন নামজাদা নৃত্যশিল্পী এসেছেন। ওর যাবার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। আচ্ছা, ওরাও তো সকলে নৃত্য জগতেরই লোক, ওদেরও যথেষ্ট নামডাক হয়েছে ইতিমধ্যেই, এরকম হ্যাংলার মতো ছুটে যাওয়া কি ওদের মানায়? কে না কে এসেছে, হোলোই বা সে নামজাদা, অমনি গিয়ে ভাব জমাতে হবে? কিন্তু বিরক্ত হলেও হিন্দোল মুখে কিছু না বলে ওদের পিছু পিছু চলল। ওর আর ভরসন্ধ্যেবেলা কথা কাটাকাটি করার ইচ্ছে হোলো না। খানিকটা হেঁটে গিয়ে দেখা গেল গ্রামের শেষ মাথায় একটা খোলা জায়গার একপাশে ছৌ নৃত্যশিল্পীরা তাদের রঙচঙে জামাকাপড় আর বিরাট বিরাট সব মুখোশ গলিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে নৃত্যানুষ্ঠানের জন্য। আর অনতিদূরেই ধুলোর মেঝেতে চেয়ার পেতে ধবধবে সাদা শাড়ি আর মাটির গয়না পরে হাসিমুখে বসে আছেন কাঁচা পাকা চুলের এক দীর্ঘাঙ্গী প্রৌঢ়া – স্বয়ং শিল্পী আচার্য! ওনার পাশেই চেয়ারে ওনারই বয়সী দু-তিনজন বসে। কিছু মানুষ তাঁদেরকে ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শিল্পী আচার্যকে দেখে হিন্দোলের বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠলো। ইচ্ছে হল একছুটে পালিয়ে যায় এখান থেকে। বেড়াতে এসেও কিনা ওনারই মুখোমুখি হতে হল ওকে! উনি তো আর যে-সে মানুষ নন, সাক্ষাৎ হিন্দোলের যম! দেখতে পেলেই এক্ষুনি দারুণ সব মিষ্টি কথার ছুরি বসিয়ে দেবেন বুকে। কিন্তু হিন্দোল পিঠটান দেওয়ার আগেই মানালি, অর্ঘ্য, তমালরা হই-হই করে ছুটে গেল ওনার কাছে। উনিও ওদের দেখতে পেয়ে একেবারে আহ্লাদে আটখানা! চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবাইকে কাছে ডেকে আদর দিচ্ছেন, নানারকম প্রশ্ন করছেন, “তোরা সব কেমন আছিস? ভালো করে প্র্যাকটিস করছিস তো?”- এইসব। ওরাও গদগদ হয়ে কথা বলছে ওনার সাথে। মুখ থেকে সকলের একেবারে মধু ঝরছে! হিন্দোলের গা জ্বলে গেল সেই দৃশ্য দেখে। ও নিমপাতা গেলার মতন ঢোঁক গিলে দাঁড়িয়ে রইল জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে। ততক্ষনে অবশ্য হিন্দোলের দিকেও ওনার চোখ পড়েছে। হাসিহাসি মুখে হাত বাড়িয়ে বললেন, “কি হিন্দোল, এসো আমার কাছে?” অগত্যা হিন্দোল নিমরাজি ভঙ্গিমায় টুকটুক করে হেঁটে গিয়ে শিল্পী আচার্যর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। উনি ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “সহনশীল হও, নিরহংকার হও, উন্নতি করো, এই আশীর্বাদ করি।” ওনার কথাগুলো হিন্দোলের গায়ে দেশলাইয়ের ছেঁকা দিলো। এরপর ওনারই আমন্ত্রণে ওরাও বসে গেল ছৌ নাচ দেখতে।

সময় তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা। ধোঁয়াটে বিকেল পার করে শীতল সন্ধ্যা জাঁকিয়ে বসেছে লালমাটির দেশে। খোলা জায়গাটায় বহু মানুষ উপস্থিত। একদিকে মাটিতে চাটাই পেতে ঢাক-ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ও মাইক নিয়ে বসে আছেন কয়েকজন লোক। শীর্ণকায় অথচ মজবুত দেহ, গায়ে নিতান্তই সাধারণ শার্ট-প্যান্টের ওপর পুরোনো ময়লা সোয়েটার চাপানো। ওদেরই মধ্যে একজন মাইকে ঘোষণা করছেন নৃত্যনাট্যের সকল শিল্পীর নাম। গানও উনিই গাইবেন। লোকটার হারগিলে চেহারা হলে কি হবে, গলার জোর আকাশ কাঁপানো। খানিকক্ষণ বাজনা বাজার পর অবশেষে নাচ শুরু হল। প্রথমে গণেশ বন্দনা, তারপর মহিষাসুরমর্দিনী নৃত্যনাট্য। গানের মাধ্যমে বলা হচ্ছে গল্প। আর সেই গল্প-গানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাচের মধ্যে দিয়ে অভিনয় করে দেখাচ্ছে শিল্পীরা। সকলেই পুরুষ। দেবী চরিত্রগুলোও পুরুষরাই করছে। বিরাট বিরাট মুখোশগুলোকে মাথায় এঁটে অবলীলায় মাটির উপর সামনে-পিছনে পরপর ডিগবাজি খেয়ে যাচ্ছে। শূন্যে লাফিয়ে শরীরে ছুঁড়ে ঘুরিয়ে আবার মাটির উপর অবিচল ভঙ্গিমায় এসে দাঁড়াচ্ছে এমনভাবে, যেন এভাবেই ওরা রোজনামচা করে। দেখতে দেখতে হিন্দোলের গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। ও হারিয়ে যাচ্ছিল এক অন্য জগতে। হাত-পায়ের মুভমেন্ট, ফ্লেক্সিবিলিটি কি দারুন, কি সাবলীল! আসার পথে অর্ঘ্যদা বলছিল, এরকম একটা অনুষ্ঠান করে যা টাকা মেলে, তাতে নাকি একজনের ভাগেই মোটে শ-দুয়েক টাকা করে পরে। এদের অনেকেই চাষবাস করে খায়। তার পাশাপাশি নাচটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে কোনোমতে। অনেকে নাকি ভালো খেতেই পায় না! হিন্দোল ভাবছিল, যাদের ভরপেট খাবারই জোটেনা, তারা এমন সাবলীল শারীরিক কসরত করে কোন যাদুমন্ত্রে? আর ওর কিনা ডায়েটচার্ট ফলো করার পরেও ক্যালোরি কন্ট্রোল করে শরীর ঠিক রাখতে নাভিশ্বাস ওঠে! লোকগুলো একবার করে ডিগবাজি খাচ্ছে আর ওদের পায়ের জোরে মাটি থেকে ধুলো উড়ছে আবিরের মতন। যে লোকটা মহিষাসুর সেজেছে তার অঙ্গভঙ্গিগুলো দেখতে দেখতে একেবারে গা শিরশিরিয়ে উঠছিল ওর। কি বীভৎস ওর মুখটা। যেন দাঁত বের করে উন্মাদের মতন গিলে খেতে চায় সবকিছু। দেবী দুর্গার মুখোশটাই সবচাইতে বড়। দুর্গার শক্তির মতোই বিশাল। যখন দুর্গা অসুর বধ করল সকলে উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল। হিন্দোলও অজান্তেই হাততালি দিচ্ছিল। এমন অনবদ্য নৃত্যশৈলিকে কুর্নিশ না করে থাকা যায়?! এরইমাঝে ওর কানে এল, পিছন থেকে শিল্পী আচার্য বাকিদের বলছেন, “মহিষাসুরমর্দিনী পালাটা সব যুগেই প্রাসঙ্গিক, কেন বলতো? কারণ আমাদের সবার মধ্যেই একটা অসুর আছে। দেবীশক্তি ও অসুরের দ্বন্দ্ব তো আসলে আমাদের ভিতরকার ভালো-খারাপের দ্বন্দ্ব। এক-একজনের অসুর এক-একরকম। কারোর অসুর ক্রোধ, কারোর অসুর কাম। কারোর অসুর অর্থ, আবার কারোর অসুর অহংকার। নিজের অসুরের সাথে নিজেকেই লড়তে হয়। অসুরটাকে মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হয়। নাহলে অসুরটা জেগে উঠে তান্ডব চালাতে পারে।” না শোনার ভঙ্গি করলেও ওনার কথাগুলো হিন্দোলের ভিতরে এসে ধাক্কা দিলো।

এরপর হঠাৎই শিল্পী আচার্য বললেন, “আচ্ছা তোমরা সকলেই নাচের ছেলেমেয়ে। আর আমাদের হিন্দোল তো চ্যাম্পিয়ন। যদি এই ছৌগানের সাথে হিন্দোল আমাদের কিছু করে দেখায় কেমন হয়?” হিন্দোল চমকে উঠল। এসব কি বলছেন এই মহিলা? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? এই অজগাঁয়ে,  গেঁয়ো লোকেদের সামনে সন্ধ্যেবেলায় ও সঙের মতন নাচ দেখাবে? কখনোই না! কিন্তু ও ‘না’ করার আগেই বাকিরা সমস্বরে “ইয়ে…” করে চেঁচিয়ে উঠলো। হিন্দোল কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেল! আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু আমি তো ছৌনাচে এক্সপার্ট নই। তাছাড়া এসব করতে তো প্র্যাকটিস লাগে।” অর্ঘ্য বলল, “আরে স্টান্টগুলো তো পারবি। কোনটার পর কোন মুভমেন্ট আসবে সেটা নাহয় তোকে একজন দেখিয়ে দেবে। ডোন্ট বি এ স্পয়েলস্পোর্ট। যা না!” শিল্পী আচার্যও বললেন, “গানের সাথে ওদের একজন নাচুক, সঙ্গে হিন্দোল। উনি যা যা করবেন হিন্দোল সেগুলো দেখে চেষ্টা করবে আর শেষে একটা ফেস-অফ্ রাখলেই হবে।” সবাই আবার সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। হিন্দোল হাত-পা নেড়ে আপত্তি জানানো শুরু করতেই ওরা ঠেলেঠুলে ওকে সামনে এগিয়ে দিলো।

ততক্ষণে গণেশ সাজা লোকটা এসে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। আবার সেই অবলীলায় একের পর এক স্টান্ট। হিন্দোলের বুকের ভিতর বিতৃষ্ণার ঝড় বইছে। ও একজন ট্রেইনড্ ডান্সার, ওকে কিনা এরকম একটা লোকের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে? লোকটা জানে এসব ওর কাছে নস্যি? বিরক্তিটা কোনক্রমে চেপে লোকটাকে দেখে অনুকরণ করার চেষ্টা করল ও। কিন্তু বারকয়েক লাফানোর পরেই হিন্দোল বুঝলো যে, বিষয়টা যা দেখতে তার চেয়েও হাজারগুণ কঠিন। স্টান্ট তো কেবল একটা নয়, লোকটা করেই যাচ্ছে একের পর এক, ঘুরেই যাচ্ছে অনবরত লাফাতে লাফাতে! হিন্দোল ওর মতন করার প্রাণপণ চেষ্টা করল, কিন্তু হঠাৎই মাথাটা যেন হালকা ঘুরে গেল। যতই পাল্লা দিতে চাইছে, ততই যেন হাঁফিয়ে যাচ্ছে। আজকাল আবার শোয়ের চক্করে টানা প্র্যাকটিসও হয় না আগের মতন। তাই কি এই হাঁফানি? মনটাও বারবার অন্য দিকে চলে যাচ্ছে ওর। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক জনতার চোখ জ্বলজ্বল করছে। দেখুক না, ওর কি? ওর তো নিজেকে প্রমাণ করার নেই এদের কাছে। তবুও কেন বারবার সেদিকেই মনটা বাঁকছে? মাথায় কেবল শিল্পী আচার্যর কথাটাই ঘুরছে-  “কারোর অসুর অর্থ, আবার কারোর অসুর অহংকার…” যতই তাড়াচ্ছে ততোই সজোরে থাবা মারছে শব্দগুলো। লোকটাও যেন ক্রমশ হিন্দোলকে হারিয়ে দিচ্ছে। ও নেচেই চলেছে আর হিন্দোল হাঁফিয়ে যাচ্ছে, গতি কমে আসছে, থেমে যাচ্ছে… অবশেষে লম্বা শ্বাস নিয়ে একটা ব্যাক ভল্ট মারতে গিয়ে দুম্ করে মাটির উপর পড়ে গেল হিন্দোল- ধুলোর জাজিমে মুখ থুবড়ে। এরপর চারপাশ অন্ধকার।

জ্ঞান ফেরার পর ও দেখল একটা বাড়ির দালানে শুয়ে আছে। ওর চোখ-মুখ ভিজে। অর্থাৎ জল ছেটানো হয়েছে। ওকে ঘিরে সকলে দাঁড়িয়ে আছে উদ্বিগ্ন মুখে। এক মহিলা এসে ওর হাতে এক গ্লাস গরম দুধ ধরিয়ে দিল। এরপর কিছু সামান্য প্রশ্নোত্তর পর্ব চলল শরীর নিয়ে। ওদের জানাল যে ও হোটেলে ফিরতে পারবে। যাওয়ার আগে শিল্পী আচার্য এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “সাবধানে বাড়ি ফিরো। সুস্থ রেখো নিজেকে। এখনও বহু পথ চলা বাকি তোমার।” হোটেলে ফিরে হিন্দোলের শারীরিক অস্থিরতা কমলেও, মনটা কিন্তু অস্থির হয়েই রইল। গলায় যেন কি একটা খচখচ করছে। একটা নাম না জানা লোক কিনা হিন্দোল বসুকে হারিয়ে দিল? কিভাবে? কেন পারল না ও? কেন পড়ে গেল ওভাবে? কেনই বা শিল্পী আচার্যর কথাগুলো ভুলতে পারছে না? তবে কি ওর মধ্যেও ঘুমন্ত অসুরটা জেগে উঠেছে? ওর অসুর কোনটা, অর্থ না অহংকার? নাকি দুটোই?

আজ লালমাটির দেশ ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা দিলেও হিন্দোল বসু বড় অস্থির। হারতে ও শেখেনি। কিন্ত আজ যে নিজের সাথে নিজের লড়াই শুরু হয়েছে। এ লড়াই জিতবে কি উপায়ে? হিন্দোল ঠিক করেছে কলকাতায় ফিরে ও সোজা শিল্পী ম্যামের কাছে যাবে। নিজেকে মজবুত করার উপায় জানতে। মহিষাসুরমর্দিনী পালা তো সবে শুরু হয়েছে! অসুর নিধন না হলে নিজের জগতে হিন্দোল শান্তি ফেরাবে কেমন করে?

Author – Amrita Das

Amrita Das, Author

7 thoughts on “অসুর

  1. আরো লিখতে থাকো। তোমার লেখা আমার খুব ভালো লাগে পড়তে।

    Liked by 1 person

  2. লেখা পড়ে খুব এ ভালো লাগলো। আর নতুন নতুন লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    Like

  3. গল্প পড়ে খুব এ ভালো লাগলো। আরো নতুন লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    Liked by 1 person

    1. নিশ্চয়ই আমরা অমৃতা কে জানাবো, আশা করব আরো লেখা আগামী দিনে আমরা শব্দ পত্রিকায় পেতে পারি!

      Like

  4. অমৃতা তোমার ‘অসুর’ গল্পটা পড়লাম। একেবারে অন্য ধরনের । দুটো মনের দ্বন্দ্ব তো চলতেই থাকে। আর সেটাকে ঘিরে গল্পটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। কলম চলতে থাকুক।

    Liked by 1 person

    1. ধন্যবাদ আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য। শব্দ কৃতজ্ঞ আপনার কাছে।

      Like

Leave a reply to sukalpa88 Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.