শ্যামল বৃষ্টি দেখতে খুব ভালোবাসে, হয়ত দেখার থেকে বৃষ্টি শুনতে বেশী ভালোবাসে। কাকেরা কি অভিমানী টাইপস হয়? এমনি এমনি বৃষ্টি ভেজে? এইসব ভাবনা ভিড় করে চা খেতে খেতে।আজ রবিবার নয় তাই খুব বেশী ভাবুক হওয়া চলে না। যদিও মাসের দু-সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই দু-দুটো লেট মার্ক হয়েছে। তিন নম্বরের বার হলে একদিনের স্যালারি! একেই খামখেয়ালী স্বভাব তার উপর এত অফিস পলিটিক্স, আয়ত্বে আসেনি চরিত্রের। তার উপর ইনসিকিউরিটি কাজ করে এই বুঝি বসের ঘরে ওর খিল্লি হবে।
গ্যারেজে সাইকেল রেখে প্লাটফর্মে আসতে বিপদ সংকেত দিচ্ছে লাল প্লাটফর্ম ঘড়ি 08:07! ঠাকুর প্লিজ K-4কে আজ লেট করিয়ে দাও। পর মুহূর্তে মনে পড়ে উনি নিজেকে এগনস্টিক মনে করেন। তার তো উচিত নয় ঠেকায় পড়লে ঈশ্বরকে স্মরণ করা। যাইহোক, প্লাটফর্মে ভিড় আছে যেটা স্বস্তি!ট্রেন আসে দু-এক মিনিটেই।
আজকাল যেন ডেলি প্যাসেঞ্জার দলে তার বনতি হচ্ছে না। উৎপলের সাথে তার আগে বেশ ভালোই কথা হতো, কলেজ লাইফ থেকেই ছেলেটা বেশ রঙীন কথা বলে। কিন্তু বাকিদের মধ্যে অনেকের নিমন্ত্রণ থাকলেও শ্যামলের নাম কাঁচি করতে হয়। যা আক্কারা বাজার! কোথায় ‘আচ্ছে দিন’ এল দাদা। কিন্তু উৎপলের আর্থিক অবস্থা তো খারাপ নয়,বাবার তো ভালোই…
কিন্তু কাল রাতে যখন তুহিনদা ‘K-4 passengers’-দলের ফটোগুলো পোস্ট করছিলো তখন চরিত্রের মনে অবুঝ বাচ্চার মত রাগ কাজ করছিলো। তাকে অনেকেই বাদ দিয়েছে। উৎপল আর নতুন কি। ছেলেবেলাতেও এমন অনেক হয়েছে। আজকে কানে হেডফোন গুঁজে একদিকে সেঁধিয়ে ছিলো শ্যামল। বিশেষ রা কাড়েনি ট্রেনে।
সাবওয়ে থেকে বেরোতে ছাতা খুলতে হলো। বৃষ্টিতে একটা সিগারেট হলে বেশ হতো।কিন্তু না মৌতাতের সময়ও নেই, তাছাড়া, হালকা কাশিও ইদানীং হচ্ছে, আগে ছিলো না। এই বৃষ্টিতে ঘোষেদের পুকুরে কত সাঁতার কেটেছে। একবার তো…থাক কি হবে ছেলেবেলার কথা ভেবে।
বাসে উঠতে চিঁড়ে চ্যাপ্টা ভিড়। তার মধ্যে কনডাক্টার বলে ‘সাইড দিয়ে এগিয়ে যান’। কনডাক্টার চেনা, একই মুখ রোজ রোজ দেখতে হয় তো। খোঁচা খোঁচা দাড়ি, থুতনিতে একটা ছোট্ট কাটা দাগ, চরিত্রের যেমন কপালে আছে একটা। যাইহোক, আজকের মধ্যে যেভাবে হোক গৌতমদাকে রিপোর্টের কাজটা নামিয়ে দিতেই হবে, এই গৌতমদাই একমাত্র নার্সিংহোমে এসেছিলো যখন মায়ের গলব্লাডার ধরা পড়লো। দুঃখ হলে একের পর এক দুঃখ একের উপর এক ঝাঁপ দেয় কেন? এক সাথে বেরোতে চায়, দমকা হাওয়ার মতো।
আজ সবকিছু ভালোই হচ্ছে। হাওড়া ব্রীজ পেরোনোর সময় দেখা হলো না বৃষ্টিতে বিদ্যাসাগর সেতু কতটা ঝাপসা। কেরানী বোঝাই লঞ্চগুলো কিভাবে ধীর গতিতে এগোয়,লঞ্চ থেকে এই লাল নীল বাসগুলোর সার্কাস বেশ মজার লাগে। ইস্, ওর অফিস যদি Strand road-এ হতো; বেশ হিংসা হয় ওদের উপর যারা টিফিন বক্স ঝুলিয়ে লঞ্চে ওঠে।
জানা ছিলো আজ দিনটা মন্দ নয়, বড়বাজার পেরোতে দুটো হাফপ্যান্ট পড়া ছেলে Tea board এর কাছে বাস থেকে নামবে, ওর সামনেই। প্রায় শিকার ধরার হিংস্রতায় উইন্ডো সীট বাগে আনতে পেরেছে শ্যামল। জানলা খোলার সাহস করবে কিনা ভাবছে, সাহস পেলো না। আসে পাশে যা কংক্রিট হৃদয় মানুষ জন! একটা হাতা ভিজলে ক্ষতি কি? অগত্যা, হেডফোন। মহাকরণ পেরোতেই লেডিস সীটের একজন জানালা খুললো। যিনি খুললেন তাকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু এক চিলতে আলো। টপ করে জানালাটা খুললো শ্যামল। ইউনাইটেড টাওয়ার পার করছে বাস। ভালো কথা, এরপর রাজভবনের বৃষ্টিভেজা শ্যাওলা সিংহ, ঠায় দাঁড়ানো পুলিশ মেমোরিয়াল, রেড রোডের সামনের কৃত্রিম ঘাসে মোড়া সবুজ দানব হাতের ফোয়ারা। তারপর আরও কত কিছু, ময়দান আর কাদা মাখা ছেলেপিলের ফুটবল। তারও পর সাদা স্মৃতির ভিক্টোরিয়া। কত কাহিনীর সাক্ষী!
ঘটনাটা ঘটল জীবন দীপের আগে। আমেরিকান সেন্টারকে বাঁদিকে ফেলে বাস এগোচ্ছে। হেডফোনে ‘আও বলমা’ এ.আর.রহমান, এম টি ভি আনপ্লাগড ভার্সন। ইলিয়ট পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি পড়া মেয়ে। ডিভাইডারের ছোট ছোট পারপেল ফুলের একটা না তুলে হাতে ধরে আনমনে দেখছে।
আরে মেয়ে তো না হিজড়ে, বেশ কালো!!
কিছুই কি শুনছে না? ওর দলে আর লোকজন কই? কি নাম ওর? ওরম ভাবে দেখছে ফুলটাকে। কেউ তো দেখে না। কারোর সময় কোথায়? শ্যামলেরও চোখে পড়েনি।
আর তুই! তুই না ছক্কা! তুই…
তোকে বুঝি কেউ দেখেনি! বয়স তো খুব বেশী নয়,কেউ ভাবেনি বৃষ্টি দিনের আদিখ্যেতায়?
শ্যামলের সারাটা শরীর জুড়ে বৃষ্টি এখন! সিগন্যালে বাসটা আটকে, জানলা থেকে বৃষ্টি চোখে যতটা দেখা গেল ঐ মেয়েটা ফুলটার দিকে তাকিয়ে কানের কাছে হাত না ঘুরিয়ে ‘নজর না লাগার’ প্রার্থনা করল। শ্যামল ছাড়া আর কেউ এসব দেখেনি।
স্পষ্ট শুনতে পেল সুনীল বলছেন-
“লক্ষী মেয়ে, একবার চেয়ে চাও, আয়না দেখার মত দেখাও ও মুখের মঞ্জরী/নবীন জলের মতো কলহাস্যে একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর!”
শ্যামল চুপ,থম। অফিস নেই, লেটমার্ক নেই, কোনো ফেসবুক group নেই, বাড়িতে গঞ্জনা নেই। কেউ কারোর বস নয়। আজ বসন্ত।
ছক্কা বান্ধবী শরীর বেঁকিয়ে তালি দিতে দিতে মিলিয়ে যায়। উইন্ডো স্ক্রিনের ঝাঁটা মেলায় বৃষ্টির ফোঁটা দাগ।
শ্যামল সেদিন বাড়ি ফিরে কবিতা লিখেছিলো,অনেক বছর পর।।
Author : Arghya Alpana Ray

(arghya.r59@gmail.com)
Professional in Service Sector, Poet & Thinker
