১)
এই গল্পের মুখ্য চরিত্র রবি গাঙ্গুলি এক বিখ্যাত বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত উচ্চপদস্থ অফিসার। রবি কলকাতায় নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটায়, তার পরিবারের সাথে। স্ত্রী ইংরাজি-মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা, একটি মাত্র কন্যাসন্তান বড় স্কুলে পড়াশুনো করে। রবির জীবনে আক্ষরিক অর্থে কোন কিছুরই অভাব নেই – তিন-তিনটে বিদেশি গাড়ি, কলকাতার বুকে দু-দুটো ফ্ল্যাট, একটা বাড়ি, ব্যাঙ্কে ক্যাশের পরিমাণও বেশ অনেকটাই। অবশ্য, তার এই বিপুল প্রতিপত্তি, অর্থ-প্রাচুর্যের পিছনে তার নিজের অপরিসীম পরিশ্রমকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা উচিৎ আমাদের। আমরা শুধু উপদেশ শুনে এসেছি – পরিশ্রম করো, ফল একদিন ঠিক পাবে। কিন্তু দেখেছি কৈ? কঠোর পরিশ্রম করলে যে অবস্থার পরিবর্তন সত্যিই করা যায় তা রবিকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পরিশ্রমের সাথে ছিল এক ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। বুদ্ধি দিয়ে সে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছল-চাতুরির আশ্রয়ও নিয়েছে কখনও। শ্রিউড মানুষ রবি একের পর এক কার্যসিদ্ধি করেছে এবং ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে।
গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র, অর্থাৎ, বিশু প্রামাণিক হল তেলকলে কর্মরত এক অতি সাধারণ মানুষ। বিশুর কঠিন অর্থাভাব – স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি প্রায় সবই তার বাবা অসৎ-সঙ্গে খুইয়েছে, যা পড়ে আছে তা হল গ্রামে একখানা ছোট বাড়ি। অবশ্য, আরেকটা বস্তু বিশু খুব সযত্নে নিজের কাছে রেখেছে – তার একমাত্র কন্যা। মা-হারা মেয়ে বাবার খুব আদরের। অভাবের সংসার হলে কি হবে, বিশুর মেয়ের কোন অভাব বিশু রাখতে দেয়নি। যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে মেয়েকে ভাল করে মানুষ করার, যাতে সে একদিন দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।
গোবিন্দপুর গ্রাম। শহর কলকাতা থেকে বেশ কিছুটা দূরে জেলার এক প্রান্তে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা এই গ্রাম পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলোর মধ্যে একটা। এই গ্রামে সুখ-শান্তি অগাধ, কিন্তু দারিদ্রের আঙিনায়। মানুষে মানুষে খুব টান, ভালোবাসায় এক ফোঁটা ভাটা নেই। পুজো-পার্বণ, মেলা, চড়ক, পরব, রথ সবই যথাসময়ে হয়ে থাকে। বাড়ি-বাড়ি ভীষণ মিল। মতের অমিল হয়ত হয় মাঝেমধ্যে, কিন্তু মিটেও যায়। গোবিন্দপুরে সব মিলিয়ে প্রায় তিনশো পরিবারের বাস। গ্রামের এক পাশে বয়ে চলে নদী, মধুবনি। এই মধুবনির তীরেই একদিন গড়ে উঠেছিল এই গ্রাম, কয়েক শতক আগে। গ্রামের মানুষেরা বেশীরভাগই চাষি, তবে নদীতে মাছ ধরা, সে মাছ বাজারে বিক্রি করা এগুলোও তাদের অনেকেরই দৈনন্দিন পেশা। এই গ্রামের আরেক বিশেষত্ব হল এখানের জলহাওয়া; আশেপাশে যেন এক অদ্ভুত মায়াবী ভালোবাসার নেশা মিশিয়ে দেয়। মেঠো পথের দু-ধারে অনায়াসে বেড়ে ওঠে ছোট রঙিন ফুল। পায়ের আঘাতে বৃন্ত থেকে খসে পড়ে। আবার জন্ম নেয়, নতুনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পরে। অনেকটা গ্রামের মানুষগুলোর মত। এ গ্রামে নেই কোন সরকারি স্কুল; সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে অনেকটা পথ পেরিয়ে পৌঁছতে হয় স্কুলে। স্কুল অন্য গ্রামে। গ্রামের এহেন অবস্থার মধ্যে একদল মানুষ এ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে – বড় শহরে বড় ভাগ্য তৈরির লক্ষ্যে। আর একদল রয়ে গেছে এই আদি অকৃত্রিম জীবনেই – লন্ঠনের আলো-, কুয়োর জল-, মাঠের সবজি-, চাল-, আর মধুবনির মাছের ভরসায়। তারা ভাঙ্গে তবু যেন মচকায় না। প্রবল দারিদ্রের ছোবল বারে বারে ফিরে আসে জীবনে। ছোবল খায়, বিশ নেমে গেলে আবার তেড়েফুরে ওঠে।
রবি ছিল প্রথম দলের মানুষ। একবার গ্রাম ছেড়েছে তো আর ফিরে আসেনি। পৈতৃক জমিদারি-বাড়ি বেচে দিয়েছে, আর কোন কানেকশান যাতে না থাকে।
বিশু দ্বিতীয় দলে। নিজের সীমিত ক্ষমতা হওয়া স্বত্বেও গ্রামের মায়ার টানে এখনও লড়ে যাচ্ছে। সারা জীবনের প্রতিজ্ঞা।
২)
আজ রবিবার, কর্মব্যস্ত সপ্তাহের শেষে রবির আজ বিশ্রামের দিন। কাজের লোক একখানি চিঠি নিয়ে এলো বাবুর ড্রইং-রুমে ।
“বাবু, একটা চিঠি এসেছে, আপনার নামে।”
“চিঠি? কোথা থেকে রে? টলি-ক্লাব, না ক্যালকাটা-ক্লাব? “
“আজ্ঞে, গোবিন্দপুর থেকে এসেছে, নাম রয়েছে বিশু প্রামাণিক।”
“বিশু প্রামাণিক? আরেকবার পড়।”
“হ্যাঁ বাবু, নামটা ওই, বিশু প্রামাণিক।”
“হুম, মনে পড়েছে, কি লিখেছে ?”
“এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় যে পঞ্চম হয়েছে, সে গোবিন্দপুর গ্রামেরই মেয়ে। তার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান, আপনাকে যেতে বলেছে, বিশেষ অতিথি হিসেবে। আগামী রবিবার। “
“বিশেষ অতিথি?” একটু ভেবে ভুরু কুঁচকে রবি জিজ্ঞেস করল, “রবিবার অন্য কোন কাজ আছে ?”
“না, আপনার কোন কাজ নেই। দিদিভাইও বাড়িতে থাকবে। মায়ের অবশ্য কোথায় একটা পার্টি আছে বলছিল।”
“মায়ের কথা বাদ দে। ওর তো উইকেন্ড মানেই পার্টি। এক মাস পরে ভুলেই যায় আগের মাসে কোথায় গিয়েছিল।“
“বাবু, বলছিলাম দিদিভাইকে বলে দেখবো? যদি যায় আপনার সাথে?”
রবি গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোটবেলার সেই ছোট গ্রাম, ছোটবেলার সেই বন্ধু বিশু। আজ বড়বেলা, আজ সে মস্ত বড় মানুষ, কিন্তু তার গ্রাম আর তার বন্ধু আজও সেই একইরকম ছোট! Sometimes the most insignificant people can be the most lovable ones. রবি তার গ্রামকে ছেড়ে চলে এসেছে অনেক বছর হল। বাঙালী জীন তো! গ্রামকে ছাড়লেও নস্টালজিয়াকে ছাড়তে পারেনি।
হঠাৎ আবার আক্ষেপ হল – গ্রামের জন্য কোনদিন কিচ্ছু তো করল না। একদিন যে গ্রামে তার জন্ম হয়েছে, যার কোলেপিঠে, আদরে, আবদারে সে তার ছোটবেলা, কৈশোর কাটিয়েছে আজ সে গ্রাম তাকে আবার ডাকছে। তার ভয় হল – বিনিময়ে সে গ্রামকে কি দিয়েছে? দীর্ঘ পনেরো বছরের কঠিন বিচ্ছেদ? চেনা পরিচিত লোকের কাছে জেনেছে গ্রামের প্রতি বঞ্চনার কথা, কঠিন অবস্থার কথা। সে শুনেছে দুঃখের কথা, কিছু না-পাওয়ার কথা, কিন্তু একবারের তরেও তার মন তাকে আদেশ দেয়নি ‘কিছু করতে হবে’।
একদিন এই বিশু তার কত কাছের বন্ধু ছিল; সকাল বিকেল ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া সব একসাথে। গ্রামের অনেকেই বলত, এরা আগের জন্মে এক মায়ের পেটের ভাই ছিল। কিন্তু যে কোন সম্পর্কের এক সমস্যা আছে। একদিকে যেমন তা সুন্দর অন্যদিকে তেমন খুব জটিলও – রবির মনের মধ্যে ছিল গভীর উচ্চাশা, সীমাহীন প্রত্যাশা। আর, তার পিছনে ছুটতে গিয়ে তাকে প্রথমে ঝেড়ে ফেলতে হত তার গায়ে লেগে থাকা ‘গেঁয়ো’ তকমা। জমিদার বাড়ির ছেলে সে, গরিব চাষার ছেলের বন্ধুত্ব তাকে সবার আগে ছাড়তে হত।
উন্নতি করতেই হত তাকে – ভেঙে পরা জমিদারির সে শেষ আশা-ভরসা! প্রতি পরীক্ষার আগে নিজের মত করে রেডি হত, নিজের নোট্স নিজের কাছে রাখত। বিশু এত ভালো বন্ধু ছিল, কিন্তু কোনদিন তাকে জানতে দিত না সে কীভাবে তৈরি হচ্ছে। কলকাতা থেকে কিছু বইপত্র আলাদা করে আনাত, সেসব বিশুকে দেখাত না। আসল মুশকিল ছিল, বিশুও সমান মেধাবী যে! তার একমাত্র কম্পিটিটর! প্রতি সুযোগে সে আগে এগিয়ে যেত, বিশুকে না জানিয়ে।
বিশু নিরীহ, ভালমানুষ ছিল। বুঝত না এসব। একবার শুধু বলেছিল, “রবি, তুই যে বললি সন্ধি তুই পারিস না? দেবকুমার-বাবুর পেপারে তো সবকটা ঠিক করেছিস! ঐ যে, ‘সিংহ’ মানে ‘হিন্স যুক্ত অ’ ওটা জানলি কি করে? ক্লাসে তো শেখায়নি।“
রবি ধূর্ত, বলল, “পরিক্ষার কদিন আগে কলকাতা থেকে মেজ পিশেমশাই এসেছিলেন। উনি তো বাংলারই টিচার। কথায় কথায় বললেন, আমি নোট করে নিলাম।ব্যাস!”
এরপর কৈশোর বয়স এল। গ্রামের সমস্যা নিয়ে তখন খুব তর্জন-গর্জন। রবি আর বিশুদের ব্যাচের আরও অনেকে ছিল – দিপু, শম্ভু, যাদব, সুশীল। মেয়েদের মধ্যে কল্পনা, বিমলা। গাছ লাগানো, সবাইকে নিয়ে পিকনিক করা, ক্লাবঘর তৈরি করা, খেলাধুলো আয়োজন করা, বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অরগানাইজ করা – কিছু না কিছু লেগেই থাকত। রবি কিন্তু দলে থাকত না। সবাই তো রয়েছে – এই ধরনের মনোভাব। সবার জন্য ভাবার অন্য কেউ আছে, থাকবেও। ওর জন্য ভাবার আর কে আছে? মাকে কথা দিয়েছে, বড় হবেই। তাকে নিজের মত করে নিজেকে ভেঙে-গড়ে নিতে হবে। ‘স্বার্থপর’ বলে বলুক সমাজ। কী এসে যায়? সে ‘আত্মনির্ভর’ হতে চায়। তাছাড়া সে একা কীই বা করবে? তার আগে কি কেউ এগুলো নিয়ে ভাবেনি? বিশুর ঘরে লন্ঠন তো রবির ঘরেও তাই। প্রতিপত্তি, অর্থ, সম্পত্তি, এসব দিক থেকে দুই পরিবারের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। কিন্তু তফাৎ একটা ছিল। রবিকে বড় হতেই হবে, সবার থেকে বড়। বিশুর মনে সেই তাড়া, সেই প্রবল ইচ্ছা নেই।
রবির মনে পড়ে গেল তার পৈতের দিনগুলো – বিশু প্রতিদিন, প্রতিরাত তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিত। যখনই রবির খিদে পেত, রবির মাকে ডেকে বলত, ‘মাসিমা, রবিকে একটু ফল কেটে দিন না?’ আরও মনে পড়ল, রবি পরীক্ষায় ভালো করলে সারা গ্রামের লোকেদের সেই খবর জানানোর দায়িত্ব ছিল বিশুর। অথচ, সে নিজের কথা কাউকে বলত না। সে নিজেও দিব্বি ভালো ফল করত। অঙ্কে, বিজ্ঞানে ভালো মেধা ছিল তার, কিন্তু তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল – সে নয়, বরং রবি একদিন পড়াশুনো শিখে গ্রামের মাথা উঁচু করবে, গ্রামের মানুষজনের দুঃখ দূর করবে। কতবার ওদের সমবয়সীরা বিশুর কাছে অভিযোগ করে বলেছে – “রবি আমাদের সাথে মেশে না কেন রে? তুই বলতে পারিস তো, গ্রামে থাকলে গ্রামের জন্য কিছু করা তো উচিৎ। ক্লাবের কাজ থাকে, কতরকমের কমিউনিটি ওয়ার্ক থাকে।“ বিশু জবাবে বলত, “ও একটু অন্য ধরণের, ঠিক আমাদের মত নয়। দিন রাত পরিশ্রম করে পড়াশুনো করছে। একদিন দাঁড়াবে। তারপর দেখবি সুদে আসলে সব চুকিয়ে দেবে। তোদের কোন অভিযোগ রাখবে না। গ্রামকে ভরিয়ে দেবে। চল কাজে লাগি।“
যেদিন রবি হাইস্কুলের গণ্ডি পার করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, বিশু তার হাত দুটো ধরে বলেছিল, “রবি, গ্রামে ফিরে আসবি তো?”
রবি সেদিন বলেছিল, “সবাই তো রইল; মা, বাবা, মাসিমা, মেশোমশাই, এত বন্ধুবান্ধব। আবার তাদের নেক্সট জেনারেশান আসবে। তুই রইলি। আমার কথা বাদ দে। আমাকে অনেক দূর এগোতে হবে। অনেক দূর।”
সরল বিশু সেদিনও বোঝেনি। এরকম বিশুরা কোনদিনই বোঝে না। গ্রামের কত লোকই তো বুঝতে পারেনি। একটা আলো জ্বলতে গিয়েও নিভে গেল। কেউ কিছু বলল না। শুধু অপেক্ষা শুরু করল, আবার জ্বলবে একদিন আলো। একদিন ঠিক জ্বলে উঠবে। সেদিন অন্ধকার আর থাকবে না।
রবি সেদিন যখন এই কথাগুলো বলেছিল তার প্রিয় বন্ধুকে, তখন সে জানত না তাদের দুজনের ভাগ্যচক্র তাদের ঠিক কোন পথে নিয়ে যাবে। বিশু তার সব বাসনাগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে, পড়াশুনো অর্ধেক বাকি রেখে, সংসারের প্রবল আর্থিক অভাব মেটানোর তাগিদে তেলকলে চাকরি নিল। রবি একা এক বড় শহরে, একের পড় এক ঠোক্কর খেতে খেতে, রুঢ়, বাস্তব পৃথিবীর কঠিন আঘাতে পাথরের মত শক্ত হয়ে উঠল। একদিকে বিশু যেমন দিন দিন তার মেধাকে তিলে তিলে তেলকলের যন্ত্রে হারিয়ে যেতে দিল, অন্যদিকে রবিও ঠিক একইভাবে দিনে দিনে কর্কশ, বক্র, শহুরে জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানোর তাগিদে নিজেকে আরও আরও বদলে ফেলল। কত মানুষকে সামনে থেকে, কতজনকে আবার পিছনে থেকে ঠেলেঠুলে, ধাক্কা মেরে একটার পর একটা ধাপ এগিয়ে চলল। কাউকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করল, কাউকে কিছু পাইয়ে দিল, কাউকে আবার তৈলমর্দন করে বিপুল সাফল্য লাভ করল! বিশু অসফল ছিল। অসফলই রইল। দুজনে দুভাবে পরিণত হল।
৩)
রবিবার ঠিক সকাল দশটায় রবি গোবিন্দপুরে পৌঁছল। কলকাতা থেকে নিজের গাড়িতেই এসেছিল। নির্দিষ্ট জায়গায় হাজির ছিল তার বিশেষ বন্ধু বিশু। রবিকে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না বিশু। দুই বন্ধুর ভালোবাসা আজও একইরকম।
রবি তার কর্পোরেট জীবন কলকাতায় ফেলে এসেছে। কতবারই তো নিজেকে ভেঙেছে। আবার গড়েও নিয়েছে। আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যাক।
রবি বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বড় অপরাধ করে ফেলেছি, খুব ভুল হয়ে গেছে। এতদিন কোন খবর তোদের নিইনি।”
“না না, কিচ্ছু অপরাধ করিসনি, এই তো ফিরে এসেছিস। কি অদ্ভুত দ্যাখ? আমাদের ঠিক যেমনটা ছেড়ে গেছিলি, ঠিক তেমনটাই আমরা রয়ে গেছি। ক’দিন থেকে যাবি তো? বৌদি, মেয়ে সব ভালো আছে?”
“হ্যাঁ, সবাই ভালো আছে। মেয়েকে সঙ্গে এনেছি।“
“ও তাই নাকি? কই সে? সেই কবে ৫ বছরের জন্মদিনে দেখেছিলাম।“
গাড়ির ভিতর থেকে একটি অল্পবয়সী মেয়ের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “ড্যাড, প্লিস, কাম ইন্সাইড। খুব গরম হচ্ছে।“
বিশু এক পলক মেয়েটিকে লক্ষ্য করে দেখল। গাড়ির কাচ দিয়ে যতটুকু দেখতে পাওয়া যায়। আপাদমস্তক মায়ের মত দেখতে। বাবার রূপের কোন অংশ পায়নি। পরনে বাদামী রঙের টপ, আর ঐ রঙেরই একটা হাফ প্যান্ট।
রবি বলল, “বিলু, এই দ্যাখ, তোর বিশুকাকা। যার কথা তোকে রাস্তায় আসতে আসতে বলছিলাম।“
বিলু মাথা নাড়ল, তারপর ঘার নামিয়ে হোয়াটস অ্যাপে মন দিল।
রবি বিশুকে গাড়িতে তুলে নিল।
গাড়ি কিছুদুর যেতে রবি হঠাৎ বলে উঠল, “বিলু, ঐ দ্যাখ, দাশপাড়ার মাঠ। এখানে দাশেরা এককালে জমিদার ছিল। আমার দাদামশাই নাম করল তারপর ওরা আসতে আসতে এখান থেকে চলে গেল।“
“ও ড্যাডি, আবার স্টার্ট কোরো না। আমি এনাফ শুনেছি।“
“মাঠটা, পুকুরের পাড়টা দ্যাখ, ভালো লাগে না? শহর থেকে দূরে কি শান্তি বল তো।“
“সরি, আমার ইন্টারেস্টিং কিছু লাগছে না। আমাকে ডিস্টার্ব কোরো না। অনলাইন গেম খেলছি বন্ধুদের সাথে।“
“বিশু, শুনলি? অনলাইন গেম, হ্যাঁ? আর আমাদের সময় ছিল লাইন করে ব্রতচারী করা! কী সব দিন হারিয়ে ফেললাম।”
বিশু কী বলবে ভেবে পেল না। একটু মুচকি হেসে বলল, “এখন তো সবাই এসব খেলে। ঐ মোবাইল ফোনে কত কিছু তো করা যায়। একটা ছোট কম্পিউটারের মত।“
“মন্ডলদের বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে দেখছি পাকা রাস্তা হয়ে গেছে। যাক, এক বড় কাজ হয়েছে। পুরো গ্রামের রাস্তাই পাকা হয়ে গেছে নাকি?”
“হ্যাঁ, তা বলতে পারিস। কালী মন্দিরের দিকটা একটু বাকি। আর ঘোষ-পাড়ার দিকে এখনও কাজ শুরু হয়নি। করবে, খুব শিগগিরি হবে। ঐ নিতাই পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে এসব করছে। খুব ভালো ছেলে।“
“নিতাই কে?”
“যাদবের ছেলে। মনে আছে যাদবকে?”
“হুম, এত বড় হয়ে গেছে ওর ছেলে? অবশ্য, স্কুল পালিয়ে বিয়ে করেছিল যাদব, তখন ওর খুব অল্প বয়স। সে কি কেচ্ছা!“
“ড্যাডি, তুমি পারো! মা এসব কথা ডিজলাইক করে তুমি জানো।“ বিলুর একদম ভালো লাগছিল না।
“হ্যাঁ জানি। সেই স্মৃতিগুলো ফিরে আসছে রে, কি করবো!”
গোটা রাস্তা বিশুর সাথে বিলু একটা কথাও বলল না। সারাক্ষণ ঐ ফোন নিয়ে বসে রইল। মাঝে মাঝে ড্রাইভার ছেলেটিকে বলল, এ সি বাড়িয়ে কমিয়ে দিতে। আর বিরক্তিভাব চোখেমুখে ফুটে উঠছে দেখে বিশুও কিছু বলল না।
গাড়ির ড্রাইভারকে বিশু একটা রাস্তার বাঁ দিকে যেতে বলল। খানিক এগিয়ে একটা বাড়ি পড়ল। বাড়িটার ডান দিকে বিরাট করে আরও একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। রবি কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করল, “এত বড় বাড়ি কে বানাচ্ছে?”
রবি বলল, “বেচুবাবু গ্রামে প্রাইমারী আর সেকেন্ডারী স্কুল বানাচ্ছেন, দুটো বাড়িই ওনার। পুরো জমিটা উনি কিনে নিয়েছিলেন। এক ছেলে দিল্লি থাকে, মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করে। ঝাড়া হাত পা মানুষ, শেষ জীবনে দান ধ্যান করেই কাটাতে চান। চল, তোর জন্য বেচুদার বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা করেছি।”
রবিকে দেখে বেচুরাম গুহ খুব খুশি হল। বিশুর মালিক সে, অর্থাৎ গ্রামের তেলকলের মালিক।
“কলকাতা থেকে বড় বড় লোক আমার এখানে এসে ওঠে। কি বিশু? ঠিক তো?” বেচুবাবু দুতলার দুটো ঘর দেখিয়ে দিতে দিতে বললেন। দুটোর সাথেই লাগোয়া বাথরুম-টয়লেট।
বিশু ঘার নাড়ল।
“এই কে আছিস রে, হারু? এদিকে আয়, এই বাবুরা কলকাতা থেকে এসেছেন। আমার তো আর সময় হবে না, এদের দেখভাল করবি। এনারা কালই চলে যাবেন। দেখিস, খাতির করিস ভালো করে। এঁরা গ্রামের অতিথি।“
এই বলে বেচুবাবু একটু মুচকি হেসে গুনগুন করে একটা গান করতে করতে চলে গেল, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।‘
“এই বেচুবাবুর বাবা আমাদের জমিতে কাজ করত না?” রবি অবাক হয়ে বিশুকে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, ঠিক মনে আছে তোর। কিন্তু ভাগ্যের ফের…” বিশু কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু পারল না।
“ড্যাডি, এ কোন ইডিয়েট বাথরুম বানিয়েছে। ওয়াটার লেভেল ইজ অল রং।“ বিলু চেঁচিয়ে মেচিয়ে সারা বাড়ি রাষ্ট্র করল।
বিশুই শেষমেশ এগিয়ে এসে বলল, “বিলু মা, গ্রামের মিস্ত্রি সব ঠিকঠাক করে ফিনিশ করে উঠতে পারেনি। আমি ঐ হারুকে বলে দেব তুমি বা তোমার বাবা চান করে বেড়ুলে যেন এসে একবার বাথরুম মুছে দিয়ে যায়।“
এই বলে বিশু চলে গেল।
বিকেল পাঁচটায় বিশু এলো রবিকে নিয়ে যেতে ক্লাবের মাঠে। যাওয়ার পথে রবি প্রশ্ন করল,
“কী করি বলত বিলুকে নিয়ে? ভীষণ টেম্পার। কতো করে বললাম আসার জন্য, এলো না।”
“সময়ের ওপর ছেড়ে দে। ঐ দ্যাখ আমাদের সেই ক্লাব, মনে পড়ে?”
“মনে পড়বে না? শুরুর দিকে একসাথে হাতে করে ইট পাটকেল এনেছিলাম।“ রবির চোখের কোলে একটু জল।
“ক্লাবের মাথায় এখন নিতাই। সবাই মিলে ফান্ড তৈরি করে ক্লিনিক বানাবে। প্ল্যান অনেকদূর এগিয়েছে।“
“তুই আছিস প্ল্যানে?”
“না না, আমি কী করবো থেকে? আমি তো আর ওদের মত বড়লোক নই, হতেও তো পারলাম না। এই বেচুবাবু, নিতাই তারপর শম্ভুর ছেলেও আজকাল খুব কেউকেটা হয়েছে।“
রবি কিছু বুঝতে আরম্ভ করেছিল, “শম্ভু? মানে যাদের মুদিখানা ছিলো? ওর ছেলে?”
“হ্যাঁ, ট্রান্সপোর্টের বিজনেস করে লাল হয়ে গেছে। যাক গে, চল, ওরা ওয়েট করছে।“ বিশু রবির পিঠে হাত রেখে বলল।
৪)
মাঠে উপচে পরা ভিড়, গ্রামের পঞ্চায়েতের মাথারা সবাই উপস্থিত। রবির বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই বুড়ো হয়ে গেছে – ক্ষীণ, জীর্ণ চেহারা নিয়ে তারাও হাজির। মঞ্চে রয়েছেন শ্যামসুন্দর হাজরা, যে স্কুলে মেয়েটি পড়ত সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আর জেলার বিশেষ এক আধিকারিক। রবির জন্যও একখানি চেয়ার রাখা ছিল, সেখানে গিয়ে সে বসল, বাকিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করল। রবির চোখে আবেগ। বাকিদের চোখে কিছু নেই। আসলে সময় বড় কঠোর। এক সময়ে যা বিরাট পরবর্তীকালে সে আর পাঁচটার মতই।
চেয়ারে বসার পর-মুহূর্তে সে উপস্থিত জমায়েতের দিকে তাকাল। তার ডাক পরল প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেওয়ার জন্য। এর আগে অবশ্য সভাপতির ভাষণ শেষ হয়েছিল, এবং সে ভাষণটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। ঠারেঠোরে, কথার প্যাঁচে সভাপতি মহাশয় বুঝিয়ে দিলেন গ্রামের প্রতিপত্তি কিছুটা হলেও বেড়েছে। এখন আর গ্রাম আগের মত নেই। অনেক কিছু হয়েছে, হচ্ছে আর হবেও। মোদ্দা কথা – রবির মত যারা চলে গেছে গ্রাম আর তাদের খুব একটা মিস করে না। তবে ইভেন্ট যখন হয় তখন তাদের মত লোকেদের ডেকে আনে দেখানোর জন্য যে তাদের ছাড়াও কতকিছু করা যেতে পারে। তাছাড়া এখন তো আরও বড় ব্যাপার – গ্রামেরই মেয়ে মেধাতালিকায়। তবে এটাও ঠিক যে গোটা অনুষ্ঠানে মেয়েটির থেকে রবির প্রতি ফোকাস বেশী – একরকম দেখিয়ে দেওয়ার তাগিদ!
রবি উঠে দাঁড়িয়ে একবার খুঁজল বিশুকে, সে নেই। কে জানে কোথায়! কথা শুরু করল, একটা কাগজে লিখে এনেছিল,
“আজ এই সন্ধ্যায় উপস্থিত সকল সুধীবৃন্দদের জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ, উপস্থিত সকল গুরুজনেদের জানাই প্রণাম, ছোটদের জানাই আমার ভালোবাসা, আর উদ্যোক্তাদের জানাই আমার কৃতজ্ঞতা। আজ এখানে আসতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি, আজ ঠিক পনরো বছর পর আমি এই গ্রামের মাটিতে পা রাখলাম। এই গ্রামের গাঙ্গুলি-বাড়ির একমাত্র সন্তান আমি, এই গ্রামের সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্র আমার। জীবনের তাগিদে, পরিস্থিতির পাকেচক্রে পড়ে আমাকে একদিন এই গ্রাম ছাড়তে হয়, আর ফিরে আসতে পারিনি। আসবো আসবো করেও আসা হয়নি, হয়ত আজকের দিনটার জন্য, যেদিন এই গ্রামের এক বিশেষ মানুষকে সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। আমি তার মত, বা তার থেকেও বেশি গর্বিত। তার দুঃখ-কষ্ট, বা তার মত অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিজেকে মিলিয়ে দিতে হয়ত কোনোদিন পারিনি। প্রতিষ্ঠা অর্জন করার জন্য ছুটে ছুটে হাঁপিয়েছি অনেকবার, কিন্তু একটু জিরিয়ে নিয়েই আবার ছুটতে হয়েছে। কত দিন, কত রাত ভেবেছি এই গ্রামের কথা, কিন্তু শহরের জটিল জীবন সঙ্গে সঙ্গে এসে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে সেই ভাবনাগুলোকে। যাই হোক, চূড়ান্ত স্বার্থপর হয়ে জীবন কাটানো হয়ত এই গ্রামের রক্তে নেই, তাই আমার বন্ধু বিশুর ডাক অগ্রাহ্য করতে পারিনি। একমাত্র জমিদার বাড়ির জন্য কিচ্ছু করিনি, এ গ্রামে হাসপাতাল, স্কুল, পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানিয় জল, কোন কিছুর জন্যই কোনদিন কিছু করিনি। একদিকে এই অনুতাপ, আরেকদিকে সেই ছোট্ট মেয়েটিকে দেখার ইচ্ছা নিয়ে ছুটে এসেছি আজ আপনাদের কাছে। আমার হয়ত আরও কিছু বলার ছিল, কিন্তু থাক সেসব। এখন দিন বদলের দিন – আমি অতীত, আপনারা বর্তমান, আর ঐ মেয়েটি ভবিষ্যৎ। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করলাম।”
মঞ্চে উপস্থিত সবাই, মাঠে উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল। যেমন হয়ে থাকে আরকি।
ততক্ষণে মঞ্চে আরও দুজন এসেছিল, এক বিশু, আর একজন তারই মেয়ে গঙ্গা, যাকে আজ সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। নাম ঘোষণা করা হল, রবি অবাক হয়ে গেল জেনে যে গঙ্গা বিশুরই মেয়ে! সে কখনো ভাবেনি বিশুর মেয়েকে সম্বর্ধনা দিতেই সে এসেছে। কী আশ্চর্য! মেধাতালিকায় পদবিটা লক্ষ্য করেনি? এতক্ষন বিশুর সাথে ছিল, তাকে একবারও জিজ্ঞেস করল না! নিজেকে নিয়ে সে এত ব্যস্ত? কে কত বড়লোক হয়েছে তা নিয়েই সকাল থেকে তার দিন কেটে গেল? সেই বিশু? আর তার মেয়ে? এত বড় কৃতিত্ব অর্জন করতে পারবে? বিশু একটা চিঠি লিখেছিল বটে, ‘মা-হারা মেয়েটা পড়াশুনোয় খুব ভালো হয়েছে, আমি ওকে তোর কথা খুব বলি, লেখাপড়া শিখে তোর মত হতে বলি।’
মেয়েটি হাল্কা হাসল, প্রধান অতিথির থেকে পুরষ্কার গ্রহণ করল, সবাইকে প্রণাম করে নেমে যাচ্ছিল, হঠাৎ শ্যাম-বাবু মাইকে বললেন,
“গঙ্গা, একখানা কবিতা শোনাবি না? তোর নিজের লেখা সেই কবিতাটা? গঙ্গা খুব ভালো কবিতা বলতে পারে। শহুরে ছেলেমেয়েরা তো বাংলা ভাষা ভুলতে বসেছে! “ বলে খুব হাসলেন।
“আচ্ছা”, মেয়েটি মৃদু স্বরে বলল, তারপর মাইকের কাছে গিয়ে শুরু করল –
“এই গ্রামে দুঃখ আসে, যায় –
সবুজ ক্ষেতের আঙিনায়।
আবেশের চাদরে মোড়া আনন্দ আসে –
লুটিয়ে পরে নদীর জলে, মায়াবী ঘাসে।
আমাদের গ্রামে আছে মন, প্রাণ,
আছে সুর, আছে গান।
একবার যে আসে, মেলায়, উৎসবে –
আসতে চায় আবার, পুজোয়, পরবে।
কেউ আমাদের গরীব ভেবোনা কভু,
অন্যের ঘরে তো অর্থ আছে শুধু !
আমাদের ঘরে সব মজুত,
ভালোবাসার টান মজবুত।
তুমি এস’ আমাদের গ্রামে
থাকো আমাদের সাথে
দেখবে, যেতে পারবে না ছেড়ে
আমাদের সম্বল তোমার ভালোবাসা
কেউ নিতে পারবে না কেড়ে।।”
রবি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল মেয়েটির কাছে, তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল।
অনুষ্ঠান শেষ হলে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে গঙ্গাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, কে তোর অনুপ্রেরণা?”
“তুমি কাকু, তুমিই আমার অনুপ্রেরণা। বাবা আমাকে তোমার কথাই সারাজীবন বলে এসেছে। কিন্তু তুমি তেমন নয় ঠিক যেমনটা আমি ভেবেছিলাম।”
“কি ভেবেছিলি মা? আমি কি দোষ করলাম?”
মেয়েটি কঠিন চোখে রবির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “কবিতায় আরও চারটে লাইন ছিল, শুনবে? “
মেয়েটি ধীরে ধীরে শোনাল,
“তুমি এ গ্রাম ছেড়ে যেও না চলে,
সরল থাকতে পারবে না, হারিয়ে যাবে অতলে।
চাই না তোমার কোন উপহার –
‘তোদের সাথেই থেকে যাবো’ – বলো শুধু একবার ।। “
রবি মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকাল, তারপর মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমার, তোর বাবার, আর এই গ্রামের সফল উত্তরসূরি হলি তুই, গঙ্গা। আমরা যা পারিনি, তুই একা তা করে দেখাতে পারবি মা, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তোর মধ্যে রয়েছে ভালোবেসে কিছু করার তাগিদ। রেষারেষি, জেদাজেদি দেখে দেখে আমি ক্লান্ত।”
…………
……
…
রবির একটা ফোন এল, “রবি, ভৌমিক অনুব্রতকে খুব পুশ করছে, তুমি এসে একটা কিছু ব্যবস্থা করো। অনুব্রতর ডিপার্টমেন্টকে এগিয়ে দিলে কিন্তু আমাদের নেক্সট স্টেজে যাওয়া কঠিন। তুমি কাল ফিরছো তো? দেরি কোরো না যেন।“
রবি চুপ, শুনছে, কিন্তু উত্তর দিচ্ছে না।
“রবি, কী হল?”
“হ্যাঁ, কয়েকদিন সময় লাগবে আমার ফিরতে। চিন্তা কোরো না, কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।“
রবি গঙ্গার মাথায় হাত রেখে শেষ কথাগুলি বলল। বিশু একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
Author : Annwesh Mukherjee

