সহধর্মিণী

সামনে রাখা ছবিটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে মতিলাল। চোখে চশমা, পরনে নতুন ধুতি, খালি গায়ে একটা সুতির চাদর জড়ানো। তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা। বসে আছে ঠিকই কিন্তু সামনে কি হচ্ছে দেখছে না। মানুষ চোখ দিয়ে দেখে না। চোখ দিয়ে জগতের আলো ঢোকে ঠিকই কিন্তু দেখে মানুষের মন। তাই মন যদি অন্যদিকে থাকে চোখের সামনে ঘটা জিনিসও মানুষ দেখতে পায় না। মতিলাল দেখছে অতীতকে। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে পুরনো দিনের টুকরো টুকরো দৃশ্য। আজ রাধারানীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, ধুপের গন্ধ, হোম যজ্ঞের ধোঁয়ায় এক পবিত্র আবেশ তৈরি হয়েছে। নেড়া মাথায় অনেকগুলো ছেলে বসে শ্রাদ্ধের কাজ করছে। সবাই ওরা রাধারানীর সন্তান। এদের কাউকেই সে পেটে ধরেনি কিন্তু এরা সবাই আজ মাতৃহারা। সবাই আজ মাথা মুড়িয়ে মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করছে। মতিলালের দুচোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে আর মুখে নানা রকম অভিব্যক্তি খেলে যাচ্ছে। কখনো বেদনার চিহ্ন ফুটে উঠছে আবার মাঝে মাঝে মুখে হাসির ঝলক দেখা দিচ্ছে। যেমন বাচ্ছারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেয়ালা করে ঠিক তেমনই। অতীত ও বর্তমানের মাঝের ব্যবধান খুব সামান্যই। দুদিন আগেও যাকে বাড়ির মধ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত সে আজ তিনি কোথাও নেই। কেউ না থাকলেই তার প্রকৃত অভাব বোধ করা যায়। মতিলাল আজ পদে পদে তার অভাব অনুভব করছে। আর কোনদিন তাকে দেখতে পাবে না এটা ভেবেই বুকটা হু হু করছে। মনে একটা কথাই বড় বাজছে – বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল ও। মাত্র চল্লিশ বছরের জীবনের তিরিশ বছরই মতিলালের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল সে। তিরিশ বছর আগের কথা মনে পড়ে মতিলাল হেসে ফেলল। তখন পনেরো বছর সবে পূর্ণ করেছে। একদিন মতিলাল মায়ের কাছে বায়না ধরল বিয়ে করবে। ছেলের এমন বায়না শুনে মা খুব একটা রাগ করলেন না বরং একটু প্রশ্রয়ই দিলেন। বাবাকে ধরে বললেন, “হ্যাঁ গা শুনছো, তোমার মতির এবার বিয়ে দিতে হবে তো?” বাবা বিহারিলাল একটু অবাক হয়ে গেলেন।

“বিয়ে? তা হঠাৎ বিয়ের কথা কেন?”

“ওসব আমি জানি না বাপু, তুমি পাত্রী দেখ।”

মায়ের জেদে পাত্রী দেখা শুরু হল। কিছু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে শেষে চুঁচুড়ার বৈদ্যনাথ সিংহ রায়ের কন্যা, নয় বছরের রাধারানীর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হল।

অদ্ভুত কথা, যে দিন রাধারানী ধরাধাম ত্যাগ করল সেইদিনও ছিল ২২শে অগ্রাহায়ণ। এবং তাদের বিয়ের দিনটাও ছিল ২২শে অগ্রাহায়ণ। বিয়ের আগে মতিলাল কখনও রাধারানীকে দেখেনি। বাবা মা ঠিক করেছেন, সেটাই যথেষ্ট। মতিলাল তখন বিয়ে করতে পারলেই বাঁচে। বিয়ের দিনেও ভালভাবে কনেকে দেখতে পায়নি। সেই দিনটা এমন ঘোরের মধ্যে কেটেছিল যে কি কি ঠিক হয়েছিল সেদিন আজ মতিলালের স্পষ্ট মনে পরে না। তাদের প্রকৃত শুভদৃষ্টি হয় বিয়ের পরদিন। দিদিমা তাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন নববধূর সামনে। বালিকা বধূর সাথে প্রথম চোখাচোখি হল মতির। মতি দেখল সুন্দর সুকোমল মুখমণ্ডলে ডান চোখের ওপরে ও নীচে একটা কালচে জড়ুলের দাগ। চাঁদের কলঙ্কের মত মুখমণ্ডলের শোভা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ওই দাগ। বালিকা বধূ স্বামীকে দেখে অল্প হেসে ছুটে পালিয়ে গেল। মতির বুকের ভেতরে কিরকম একটা শিহরণ খেলে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে তার স্ত্রীকে পেল না। এরপর একবছর রাধারানী বাপের বাড়িতেই রইল। দু-একবার উৎসব উপলক্ষে শ্বশুরবাড়ি এল বটে কিন্তু মতির সঙ্গে সামনা সামনি  কথা হল না। এক বছর পর রাধারানী শ্বশুরবাড়িতে পাকাপাকি এল। মতির তখন আনন্দ ধরে না। নিজেকে বেশ বড় বড় মনে হচ্ছিল। তাদের আলাদা শোয়ার ঘর স্থির হল। দাম্পত্য জীবনের সুখে দুজনে বিভোর হয়ে গেল। দুজন দুজনকে ছাড়া এক দণ্ডও থাকতে পারে না। জীবনে যেন কোন সমস্যা নেই, দুঃখ নেই।  যৌবনের পুরোপুরি স্ফুটনের আগেই আদিম আনন্দে দুজনেই গা ভাসিয়ে দিল। মতি তখন চুঁচড়োর ট্রেনিং সেন্টারের ছাত্র। বই নিয়ে শুধু সেখানে যায় আর আসে। পড়াশোনায় আর মন নেই। রাধারানী মতিকে চোখে হারায়। বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা হলেই তার এক কথা- “তুমি বাবাকে বলে দাও, তোমায় পাঠানোর ইচ্ছা নেই।” মতিও তাই বলে দিত। যখন একান্তই পাঠানোর দরকার হত তখন বিদায়ের সময় রাধা মতির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলত, “এক মাসের বেশি যদি আমায় থাকতে হয় তবে আমি মরেই যাব।” মতিও বলাই বাহুল্য এক মাসের বেশি কোনদিনই রাধাকে বাপের বাড়ি থাকতে দিত না। কিন্তু সব জিনিসেরই শেষ আছে।  মধুচন্দ্রিমার সময় শেষ হয়ে গেল। দিন কাটতে লাগল। বছর ঘুরতে লাগল। একান্নবর্তী পরিবারের কাজে রাধারানীকে জুড়ে যেতে হল কলুর বলদের মত। নতুন বউ সে আর নেই, ফলে, আস্তে আস্তে গঞ্জনা, মুখ ঝামটাও শুরু হয়ে গেল। রাধারানীর বাবা যে অতি অল্পেই মেয়েকে পার করেছেন সেই খোঁটাও শুনতে হত। মতি দেখতে পেত, শুনতে পেত, কিন্তু তার কিছু করার ছিল না। তখন সে নেহাই ছাত্র, রোজগার করে না, ফলে প্রতিবাদের মুখ ছিল না। রাধা তার কাছে অনুযোগ করলে উল্টে সে রাধার ওপরই বিরক্ত হত। রাধারানীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলত বাড়ির কাজ তো করতেই হবে। কোন বৌ বাড়ির কাজ করে না? অতিরিক্ত কাজের লোক ছাঁটাই করে দেওয়া হল। ছোট বৌ কাজের জন্য যখন আছেই, তখন ঝি-কে মাইনে দিয়ে কি হবে? এইভাবে দিন যেতে লাগল।

মতি দেখতে পেত রাধারানীর অনুযোগ মিথ্যা নয়। সে সকাল থেকে রাত অব্ধি বাড়ির কাজ করে। কিন্তু মতি কিছু বলতে পারত না। পরিস্থিতির কাছে সে অসহায় হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। রাধারানীর পরনের কাপড়ও ক্রমশ মলিন হতে থাকল, কিন্তু নতুন কাপড় কেউ কিনে দিল না। একদিন রাতে ঘরে গিয়ে মতি দেখে রাধা একটা ছেঁড়া শাড়ি পড়ে আছে। মতি সব বুঝেও জিজ্ঞাসা করল, “তোমার আর শাড়ি নেই?” রাধা একটু কুণ্ঠিত হয়ে বলল, “অন্য দুটো শাড়ি ভিজে আছে।” মতির এই কথা শুনে মাথা গরম হয়ে গেল। অনেকদিন যে সহ্য করেছে, আর নয়। মতি রাগে গরগর করতে করতে বলল, “কালই আমি এর একটা বিহিত করব।” রাধারানী চমকে উঠল, “দোহাই তোমায়, এটা নিয়ে বাড়িতে কোন কথা বোলো না।” কিন্তু মতি ঠিকই করে নিয়েছিল এবার তাকে কিছু বলতেই হবে। রাধার আজকের বেশ তার সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে। বহুদিন থেকেই দেখছে রাধার যেমন আদর পাওয়ার কথা সেটা সে পাচ্ছে না। কাল বাড়িতে কথাটা না তুলে সে জলস্পর্শ করবে না। রাধারানী মতির মুখ দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে রইল। বার বার মতিকে নানাভাবে ভোলানোর চেষ্টা করল। মতি মুখে হ্যাঁ-না কিছু বলল না। সকালে উঠেই সে গটমট করে উঠোনে গিয়ে হাজির হল। বাড়ির উঠোনে মা কাপড় শুকতে দিচ্ছিলেন। কোন রকম ভণিতা না করে মতি সরাসরি মাকে জিজ্ঞাসা করল, “মা তোমার ছোট বৌমাকে কাপড় কিনে দাও না কেন? দেখতে পাও না ছেঁড়া কাপড় পরে থাকে?” বৌদি কলতলায় ছিলেন। এক বুড়ি ঝি বাসন মাজছিল। আরও দু-একজন প্রতিবেশিনী  সেখানেই ছিল। মতির কথা শুনে মা কয়েক মুহূর্ত থমকে গেলেন। সবাই ফিরে মতির দিকে চাইল। কেউ যেন এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। রাধারানী মতির আগেই ঘুম থেকে উঠে বারান্দা ঝাঁট দিচ্ছিল। সে সম্ভাব্য ঝড়ের ভয়ে যেখানে ছিল সেখানেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মা মতির দিকে ফিরে বেশ ঝাঁজের সাথে উত্তর দিলেন, “তুই কি রোজগার করিস যে তোর বৌ জোড়া জোড়া কাপড় পড়বে? বৌয়ের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব তার স্বামীকে নিতে হয়।” আর কোন কথা না বলে তিনি শূন্য বালতি নিয়ে কলঘরের দিকে হন হন করে হেঁটে চলে গেলেন।  মতি বিদ্যুৎপৃষ্টের মত সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল। অপমানে-অভিমানে তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। কল্পনার নরম বিছানা থেকে বাস্তবের রুক্ষ মেঝেতে এসে পড়ল। তার বলার মত কিছু রইল না। মাথা নিচু করে চুপচাপ ঘরে ফিরে এসে বিছানায় বসল। রাধারানীও ছুটে এসে মতির পাশে দাঁড়িয়ে মতিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “তুমি চিন্তা কোরো না, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। বাবা তো পুজোতে কাপড় দেবেনই।” মতির কানে এই মুহূর্তে কোন কথা ঢুকছে না। হতাশা তাকে অনুভূতি-শূন্য করে দিয়েছে। অপমান তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে মতি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর টেবিল থেকে বইগুলো নিয়ে উঠোনে সব টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। রাধারানী চমকে উঠল, “এ কী করলে? বই ফেলে দিলে কেন?” মতিলাল বলল, “পড়াশোনা তো খুব হচ্ছে। আর নয়, এবার আমি রোজগার করবো। তোমার দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন পালন করবো।” মতি চাকরির সন্ধান শুরু করল। কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতায় একটা চাকরি জোগাড় করল। সকালে বেরোয় আর রাতে ফেরে। সারাদিন বাড়িতে থাকে না। রাধারানীর অবস্থা কিছুমাত্র বদলাল না। সারাদিন সে যে খেটে যেত মতি তা দেখতে পেত না। এদিকে চোদ্দ বছর বয়েসে রাধারানী গর্ভবতী হয়ে পড়ল, কিন্তু তাতেও তার রোজনামচা বদলাল না। তার কোন যত্নই হয় না। রাধারানী যে নিজের যত্ন করবে এমন মেয়ে সে নয়। বাপের বাড়ি থেকে মা যদি কারোর হাত দিয়ে কিছু খাবার পাঠায়, সে কে কি বলবে এই ভেবে সবার সামনে খেতে লজ্জা পায়। একা একা ঘরে খাবার মেয়ে সে নয়। মতি রাতে ফিরলে দুজনে মিলে কিছু খায়। বাকিটা গরুর ডাবায় ফেলে আসে। সে যেমন বাড়ির কাজ করে যেত তাই করে যায়। মতি রাধারানীর অবস্থা বুঝে বাপের বাড়ি পাঠানোর কথা বললেই সে বলে, “না তোমায় ছেড়ে যাবো না, আমি চলে গেলে তোমার কষ্ট হবে। আমি এখানে বেশ আছি।” গর্ভবতীর যে পুষ্টি ও বিশ্রাম পাওয়ার কথা সে কিছু পেল না। শেষে গর্ভের আট মাসের মাথায় মতি জোর করে তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিল। যথাসময়ে রাধারানী কন্যা সন্তান প্রসব করল। কিন্তু মতিলালের বাড়িতে কেউ কোন রকম আনন্দ প্রকাশ করল না। মতিলাল কানাঘুষোয় শুনল বাড়ির মেয়েরা  মুখ বেঁকিয়ে বলাবলি করছে, “ছোট বৌ মাটির ঢিবি বিইয়েছে”। মেয়ের যখন ছ’ মাস বয়েস রাধারানী শ্বশুরবাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরেই পুরনো জোয়ালে জুড়ে গেল। মতির কিছু করনীয় নেই। রোজগারের তাগিদে তাকে কলকাতায় যেতেই হবে। ছোট্ট মেয়েকে দেখাশোনার কেউ নেই। খিদের জ্বালায় কেঁদে কেঁদে মেয়ে নেতিয়ে পড়ে, কিন্তু রাধারানীর কাজ থেকে ফুরসত নেই। বাপের বাড়িতে যেটুকু চেহারা ফিরেছিল তাও ঝরে গেল কয়েকদিনে। তার খাবার-দাবার ঠিক মত জোটে না। বুকের দুধও হয় না একরত্তির পেট ভরানোর মত। মতি বাড়ি ফিরে দেখতে পেত দিন-দিন তার স্ত্রী কন্যা ক্ষীণকায় হয়ে যাচ্ছে।  মতি মনে মনে কাঁদে আর ভাগ্য বিধাতার ওপর সব ছেড়ে দেয়। মেয়ের বয়েস দশ মাস হল। রোগা মেয়ে খুব ভোগে। তবু বাবাকে দেখে হেসে ওঠে। বাবা বাড়ি ফিরলে হামা দিয়ে বাবার কাছে এগিয়ে আসে। মতি আদর করে পিকলু বলে ডাকে। পিকলুর দুদিন হল খুব শরীর খারাপ। একদিন মতি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখে দশাসই কৃষ্ণবর্ণ এক লোক তার একরত্তির মেয়ের ওপর ঝাড়ফুঁক করছে। ধুনোর ধোঁয়ায় দম আটকে যাচ্ছে তার। সে ওঝার সামনে মেঝেতে শুয়ে পিকলু তারস্বরে কেঁদে চলেছে আর ওঝা মন্ত্রপূত জল নিয়ে কচি মুখে ঝাপটার পর ঝাপটা দিচ্ছে। মতিলাল এই বীভৎস দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল। রাধারানীও সমানে কেঁদেই চলেছে। মতি বুঝল বাড়ির লোকদের বিরুদ্ধে রাধারানী কিছু বলতে পারেনি। নয়ত এই ওঝাকে কিছুতেই সে মেয়ের কাছে আসতে দিত না। মতি গিয়ে বলে, “কি হচ্ছে এসব?” বাড়ির সকলে বলল, “ও মেয়েকে ডাইনে পেয়েছে তাই ওঝা ডাকা হয়েছে।” মতি চিৎকার করে বলল- “বন্ধ কর এসব।” তারপর মেয়েকে বুকে তুলে ঘরে চলে গেল। সারারাত মেয়েকে বুকে করে কাটালো দুজন। কেঁদে কেঁদে একসময় পিকলু চুপ হয়ে গেল। ভোরে ওরা দেখল মেয়ের কোন সাড়া শব্দ নেই। মতি বুঝে গেল তার পিকলু আর কোনদিন হামা দিয়ে জুতো টেনে আনবে না। ডিবে থেকে পান নিয়ে মুখে গুঁজে দেবে না। রাধারানীকে পাথর করে দিল এই ঘটনা। এক সপ্তাহ ধরে দুজনে ক্রমাগত কেঁদে গেল দুজন। এরপর মতির জীবনে এলো বিরাট পরিবর্তন। মতির আর কিছু ভাল লাগে না। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। দিন যায় রাধারানী যন্ত্রবৎ সংসারের কাজ করে যায়। নিত্যদিন কার সাংসারিক অশান্তি লেগে থাকে। মতি আপিস থেকে ফিরে তার কিছুটা শুনতে পায়। সে কিছুই বলে না। বলার সময় কোথায়? আবার সকাল হলেই তো ছুটতে হবে কলকাতা। ক্লান্ত শরীরে শুয়ে পড়ে। বাড়ির বৌ-ঝিরা বলাবলি করে নতুন বৌ তুকতাক জানে, স্বামীকে একদম ভেড়া করে রেখেছে। বৌকে শাসন করার ক্ষমতা নেই। একদিন বাড়ি ফিরে মতি দেখে বাড়ির পরিবেশ থমথমে। রাধারানী বিছানায় শুয়ে আছে। মতি জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে?” রাধা বলল, “কিছু না।” মতির বুঝতে বাকি রইল না সংসারে কিছু একটা অশান্তি হয়েছে। রোজকার এই অশান্তি তার ভাল লাগে না। সে কোনদিকে যাবে? স্ত্রীর অবস্থা সে বুঝতে পারে, কিন্তু তার কিছু করার নেই। স্ত্রীর হয়ে কিছু বললে স্ত্রৈণ বলে বাড়ির লোক হাসাহাসি করবে। তাছাড়া তার রোজগার এমন কিছু বেশি নয় যে পৃথক হয়ে যাবে। রাধারানীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মতি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে বলল, “মা কি হয়েছে?” মায়ের মুখ গম্ভীর। তিনি বললেন, “তোর বৌকেই জিজ্ঞাসা কর।” বৌদি সেখানেই ছিলেন, তিনি বললেন, “ঠাকুরপো তোমার বৌ আজ মায়ের মুখে মুখে চোপা করেছে। তার ওপর সারাদিন অন্নজল স্পর্শ না করে সেই যে ঘরে ঢুকেছে, সারাদিন ঘর থেকে বেরোয়নি।” মতির মাথায় আগুন জ্বলে গেল। সব রাগ গিয়ে পড়ল রাধারানীর ওপর। সে ছুটে ঘরে গিয়ে রাধারানীর গলা টিপে ধরে বলল, “সব দোষ তোমার। যত অশান্তির মূলে তুমি।” রাধারানী মতির এই রূপ কোনদিন দেখেনি। সে বিস্ময়ে অভিমানে অবাক হয়ে গেল। বলল, “ওগো তুমি ছাড়া এ বাড়িতে আপন আমার কেউ নেই। তুমি আমাকে এরকম করলে আমি কি করে বাঁচব?” মতি তখন নিজের মধ্যে নেই। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে রাধারানীকে হ্যাঁচকা দিয়ে ঠেলে দিয়ে বলল, “তবেই মরেই যাও!” রাধারানী দেওয়ালের ওপর আছড়ে পড়ল। তার মাথাটা দেওয়ালে সজোরে ঠুকে গেল। জোরেই আওয়াজ হল। বাড়ির ভেতর থেকে মা চেঁচিয়ে উঠলেন। “কি হল? ও কিসের আওয়াজ?” মতি স্ত্রীকে আঘাত করেই সম্বিত ফিরে পেল। সে হতবম্ভের মত দাঁড়িয়ে পড়ল। এ কি করল সে? এই অসহায় পতিব্রতা স্ত্রীর ওপর হাত তুলল! অপরাধবোধে সে স্থবির হয়ে গেল। রাধারানী তাড়াতাড়ি মতির হাত দুটো ধরে বলল, “ওগো তোমার পায়ে পড়ি। বাড়িতে বোলো তুমি মুগুর ভেজে রেখেছো।” মা ছুটে এলেন, “হ্যাঁ রে মতি ও কিসের আওয়াজ হল?” মতির মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। রাধারানী বলল, “মা ও কিছু না। আপনার ছেলে মুগুরটা মেঝের ওপর রাখলো তাই ওরকম আওয়াজ হলো।” মা সংশয়ের দৃষ্টিতে দুজনকে দেখে চলে গেলেন। মতির দু চোখ দিয়ে জলের ধারা পড়ছে – রাধারানীর মুখটা ধরে তার কপালে চুমু খেয়ে সে বলল, “আমায় ক্ষমা করো।” তারপরই জড়িয়ে ধরে চুম্বনে চুম্বনে রাধারানীকে ভরিয়ে দিল।

মেয়ের মৃত্যুর পর সেইদিনই তারা প্রথম মিলিত হল। রাধা পতি নিষ্ঠ পত্নীর মত স্বামীর সঙ্গ দান করল কিন্তু মতি আগের মত সুখ পেল না। মনটা বিষাদে ভরে গেল। মনে শান্তি না থাকলে কিছুই ভাল লাগে না। মতি একটা আধার খুঁজছিল যেখানে মনটাকে রেখে শান্তি পায়, কিন্তু কি সে আধার তা সে জানে না।

সেই সময়ে বিবেকানন্দের মৃত্যু হয়েছে, তখন তাঁকে নিয়ে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। মতিও সেই আলোচনা শুনে ও রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়ে অভিভূত হয়ে পড়ল। সে বুঝল প্রকৃত মনের শান্তি পাবে আধ্যাত্মিকতায়। মনে শান্তির জন্য সে নানা দিকে ছুটে যায়। যখন যে সাধু সন্ন্যাসীর খোঁজ পায় তাঁদের চরণে আশ্রয় নেয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে মোহভঙ্গ হয়ে আবার ফিরে আসে। মনের মত গুরু পায় না। একবার এক তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে এক পীঠের শ্মশানে গিয়ে উপস্থিত হল। অমাবস্যার রাতে তন্ত্রাচারের নামে যা দেখল তাতে তান্ত্রিকের প্রতি সব ভক্তি উবে গেল। সে দেখল তন্ত্র সাধনার নামে চলছে অবাধ ব্যভিচার। মতি পারলে তক্ষুনি পালিয়ে বাঁচে কিন্তু রাতের অন্ধকারে ফেরার উপায় ছিল না।। পরের দিন ভোর হতে না হতেই সে বাড়ির পথ ধরল। বাড়ি ফিরে মুখ চুন করে রাধারানীর সামনে এসে দাঁড়াল। সব কথা রাধাকে না বলা অব্ধি শান্তি পেল না। সব শুনে রাধারানী বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি আর কোথাও যেও না এখানেই যা করার করো।” মতির জবাব দেওয়ার মত কিছু ছিল না। সে নিজেই জানে না কোথায় কীভাবে শান্তি পাবে। সেই রাতে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করতে লাগল। রাধাকে বলল, “জানো আমার খুব ইচ্ছা এমন একটা জীবন নেবো যেখানে ভোগের আকাঙ্ক্ষা ম্লান হয়ে যায়। তুমি যদি আমার সহায় হও তবে বাঁচি।” রাধারানী স্বামীর দিকে চেয়ে হাসল। “তুমি যা চাইবে আমি সব সময় তোমার পাশে আছি।” বেশিদিন গেল না একটা সুযোগ এসে গেল।  একদিন সকালে মতির বাবা খবর নিয়ে এলেন কাছের চণ্ডী মন্দিরে এক সাধু এসেছেন। এই সাধু উপনয়নের সময় সেই যে ঘর ছাড়া হয়েছিলেন তারপর ত্রিশ বছর হিমালয়ে কাটিয়ে এই প্রথম বাংলায় ফিরেছেন। মতি এইরকম গুরুই খুঁজছিল। সে ঠিক করল সেই সাধুর কাছেই দীক্ষা নেবে। বাড়িতে সেই সন্ন্যাসীকে আমন্ত্রণ জানানো হল। সস্ত্রীক সাধুর কাছে মন্ত্র নিল সে।  সাধনা শুরু হল। নানা রকম আচার-নিয়মকানুন চালু হল। মতি নিষ্ঠা সহকারে বেশ কিছুদিন নিয়ম পালন করল, কিন্তু ক্রমশ ভোগ প্রবৃত্তিতে সাধনায় ছেদ পড়তে লাগল। যৌন আকর্ষণ সে কাটাতে পারছিল না। কিন্তু সংগমের পরই তার মন খারাপ হয়ে যেত। মনে হত সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে আধ্যাত্মিক জীবন অন্যদিকে দাম্পত্য জীবনের ইন্দ্রিয়সুখ। কোন পথে যাবে এই দ্বন্দ্ব মতি বয়ে বেড়াতে লাগল। সে মনে করত দুদিক রাখতে গেলে কিছুই হবে ন্‌ কিন্তু কিছুতেই কোন একদিকে সে মন দিতে পারত না।

মতি খুব সহজেই লোকের সাথে মিশে যায়।  মনকে ব্যস্ত রাখার জন্য কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সে থিয়েটার পার্টি তৈরি করল। সন্ধে বেলা বাড়ি ফিরে সঙ্গীদের নিয়ে বাড়ির বৈঠকখানায় থিয়েটার চর্চা করে কাটাতে লাগল। কোলাহলে সন্ধ্যেগুলো মুখর থাকত। রাধাও খুব খুশি। স্বামী  অন্তত নজরের সামনে বাড়িতে আছে, আনন্দে আছে। এই ভাবে দু-তিন বছর কেটে গেল। ইতিমধ্যে মতিলালের মাও দেহ রাখলেন। সেই সময় বঙ্গভঙ্গের রেশ ধরে বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত হল। মতি লোকজন নিয়ে থাকতে ভালবাসে। স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে মতি ‘সৎপথালম্বী সম্প্রদায়’ নামে একটা দল তৈরি করল। অনেক ছেলেপুলে জুটে গেল। বয়স্করাও অনেকে এলেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে তাদের নিয়ে মেতে উঠল। মৃতদেহ সৎকার, গরিবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, বন্যায় ত্রাণ দেওয়া- সব কাজে তারা এগিয়ে যেত। লোকের থেকে চাঁদা তুলে গরিবদের সাহায্য করত। সে বছর রাখী বন্ধন উৎসবের দিন মতি তার দলবল নিয়ে সারা সকাল চন্দননগর ঘুরে গান গেয়ে লোকেদের থেকে দেশের কাজের জন্য চাঁদা তুলে বেড়াল। শেষে দলবদল নিয়ে বাড়িতে এসে হাজির হল।

রাধারানী জানত তার স্বামী আজ একটা উৎসবে মেতেছে, কিন্তু এটা জানত না যে সে বাড়িতে দলবল নিয়ে হাজির হবে শেষে। তখন বেশ বেলা হয়েছে; মতিলাল তার ছেলেদের নিয়ে বাড়ির চত্বরে জমা হয়ে হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিল। রাধারানী অন্দরমহলের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল মতির সঙ্গে একজন লোক খুব হেসে হেসে কথা বলেছে। এই ব্যক্তিকে আগে দেখেনি রাধা। মতিলাল অন্দরমহলে এসে বলে, “কিগো শুনছো, ছেলেরা সবাই সকাল থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ক্লান্ত। তুমি ওদের কিছু খেতে দিতে পারো?” রাধারানী স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু রাগ দেখিয়ে বলল, “তুমি দুনিয়া শুদ্ধু লোককে পাড়া ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে, আর আমায় তাদের দুম করে খাবার ব্যবস্থা করতে হবে?  আগে থাকতে বলে রাখতে পারো না?” মতিলাল হেসে বলল- “তুমি তো অন্নপূর্ণা। আমি জানি তোমার কাছে ঠিক খাবার জুটে যাবে”। রাধারানী বলে, “যাও আর মিষ্টি কথায় ভোলাতে হবে না, ওদের একটু অপেক্ষা করতে বলো। দেখি কি করতে পারি। তা ঐ ভদ্রলোক তোমার নতুন বন্ধু বুঝি?”

“হ্যাঁ, আজই দেখা গেল। কোত্থাও কিছু নেই হঠাৎ রাস্তায় আমায় জড়িয়ে ধরে বলে কিনা, তোমাকেই আমি খুঁজছি। ওর নাম শ্রীশ, বেশ ছেলে”। রাধারানী অন্দরমহলে খাবারের ব্যবস্থা করতে চলে গেল। বাড়ির লোকেরা এসবে একটু বিরক্ত হয়। একেই সংসারে টানাটানি, তারপর মতিলালের জন্য বাইরের লোকের উৎপাত লেগেই আছে। রাধারানী কুণ্ঠিত হয়, কিন্তু স্বামীকে কিছু বলতে পারে না। মতিলালের সেসব দিকে হুঁশ থাকে না। এর পর থেকেই মতিলাল নিরীহ সমাজ সেবা থেকে ক্রমশ স্বদেশী কাজে জড়িয়ে পড়ল।

রাধারানী বুঝতে পারে মতিলালের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে; আজকাল সে সব কথা খুলে রাধারানীকে বলে না। তার ভয় হয়। সে বাইরের জগত সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানে না; তার শুধু একটাই ধ্যানজ্ঞান – স্বামীর মঙ্গল। মতিলালকে সে কিছুতে আটকায় না, কারণ সে স্বামীর মধ্যে একটা উদ্ভূত উন্মাদনা দেখে। কোন কিছু একটা নিয়ে সে থাকতে চায়, তাই থাকুক।   মতিলালের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে। অফিস থেকেই ফিরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। ছুটির দিনে সারাদিন বাড়ি থাকে না। গভীর রাত ছাড়া রাধারানী স্বামীকে একা পায় না। একদিন রাতে সে বলে, “আছা, তুমি সারাদিন যা করো, সে দেশের কাজই হোক বা সাধনার কাজই হোক, আমায় একটু করে শুনিও।” মতি শুধু হুঁ বলে। স্ত্রীর কথা শুনে মতিলাল ভাবে সত্যিই তো – তার স্ত্রী খুব বেশি পড়াশোনা না করলেও তার স্বাভাবিক বুদ্ধি আছে। মতি কত মূর্খের কাছে কত ভাষণ দিয়ে আসে, অথচ স্ত্রীকে কিছু বলে না। মনে মনে তার অনুশোচনা হয়। সে  ঠিক করে স্ত্রীর কাছে কিছু গোপন করবে না। রাধারানীর দিকে ফিরে তাকে জড়িয়ে ধরে। দুজনের শরীর একে ওপরের সঙ্গে মিশে যায়।

ইন্দ্রিয় সুখ চরিতার্থ করে মতি চিৎ হয়ে শোয়। শরীর অবসাদে ভেঙ্গে পড়ে, একটা অজানা তীব্র অনুশোচনায় মন দগ্ধ হতে থাকে। যেন ভীষণ কোন পাপ কাজ করেছে। চোখ বুঝে শুয়ে থাকে সে, চোখের কোণ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে। রাধারানী তাই দেখে মর্মাহত হয়। এ আজ নতুন নয়। কিছুদিন ধরেই সে খেয়াল করছে মতি প্রথমে যতটা আকুল হয়ে তার কাছে আসে, শেষে ঠিক ততটাই মনমরা হয়ে পড়ে। রাধারানী আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করে, “কি হলো?” মতিলাল জবাব না-দিয়ে চুপ করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। রাধারানীর নিজেকে অপরাধী মনে হয়। মতির গালে হাত বুলিয়ে তার মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “বলো কি হলো?” মতি বিরক্তির সঙ্গে তাঁর হাতটা সরিয়ে দেয়। রূঢ় স্বরে বলে, “তোমায় না ছাড়লে আমার মুক্তি নেই।”

কথাগুলো রাধারানীর কানে গরম সীসার মত প্রবেশ করে। আহত হয়ে সে বলে, “ও কথা বোলো না, আমাকে মেরে ফেলো কিন্তু ছেড়ে যাওয়ার কথা বোলোনা। আমি কি করেছি? তুমি যা চাও তাই তো করো। আমার মত নাও না।” মতিলাল উত্তর দেয় না। চোখ বন্ধ করে নিজের মনে দগ্ধায়। কেন সে এরকম বার বার করে ফেলে সে জানে না! তার স্ত্রীর কোন দোষ নেই সে জানে, কিন্তু তবু, প্রতিবারই যত রাগ রাধারানীর ওপর পরে। নিজের ব্যর্থতার শাস্তি সে রাধাকে দিয়ে আরও বেশি অনুশোচনায় কষ্ট পেতে থাকে। রাধারানী নীরবে চোখের জল কাপড়ে মোছে। তার যৌবন, সন্তান সুখের থেকেও স্বামী বড় – এটা কি তার স্বামী বোঝে না? সে তার জীবন বলিদান দিতে পারে স্বামীর জন্য, তার সামনে ইন্দ্রিয় সুখ বা সন্তান সুখ তো কিছুই নয়।

এক শনিবারে এক বন্ধু এসে মতিকে সকালে ডেকে নিয়ে গেল। সারাদিন মতি বাড়ি ফিরল না। এরকম প্রায়ই হয় তাই রাধারানী যেমন কাজে ব্যস্ত থাকে তেমনই রইল সারাদিন। সন্ধ্যে হয়ে গেল, তবু ফিরল না। রাধারানীর চিন্তা শুরু হল। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। রাধারানীর ছটফটানি শুরু হয়েছে, তার চিন্তা হচ্ছে রাগ হচ্ছে। এ কেমন আক্কেল! সেই সকালে বেরিয়ে এখনও ফেরার নাম নেই।

রাত তখন অনেক হয়েছে। বাড়ির সবাই শুয়ে পড়েছে।  রাধারানী সদর দরজায় হাল্কা টোকা শুনল। রাধারানীর চেনা ডাক।  ঘরে প্রদীপটা মিটমিট করে জ্বলছিল, সারারাতই জ্বলে। রাধারানী আজ ঠিকই করে রেখেছে দু এক কথা শুনিয়ে গায়ের জ্বালা মেটাবে। এমন মানুষও  হতে পারে! সারা দিন কাজ। ছুটির দিনেও হয় বন্ধুবান্ধব নয় সাধু-সন্ন্যাসী। নিজের স্ত্রীর দিকে তাকানোর একটুও সময় তাঁর নেই। শুধু রাতটুকু সে পায় স্বামীকে, তাও ভোর-ভোর উঠতে হয়। সারাদিন খেটেও অনেক গঞ্জনা মুখ বুঝে সহ্য করে, স্বামীকে যে বলবে তারও উপায় নেই। সব সময়ে কিছু একটা নিয়ে মেতে আছে সে। রাধারানী বিছানা ছেড়ে প্রদীপটা উস্কে দিয়ে দরজা খুলে দিতে যায়। মতিলাল কিছু না বলে চুপচাপ ঘরে এসে ঢুকে মেঝেতে রাখা পেতলের ঢাকোনটা খুলে খেতে বসে। রাতের খাবার চাপা দেওয়া থাকে। কারণ মতির বাড়ি ফেরার ঠিক থাকে না। রাধারানীকে বলা আছে বেশি রাত হয়ে গেলে খেয়ে নিতে।

রাধারানী কিছু না বলে চুপচাপ স্বামীর পাশে বসে হাতপাখাটা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। মতিলাল খেতে খেতে বলতে লাগল, “জানো, আজ শ্মশানের অশ্বত্থ গাছের তলায় এক সাধু এসেছেন। সারাদিন সেখানেই ছিলাম। অদ্ভুত তাঁর চোখের দৃষ্টি। তাকালেই সম্মোহিত হতে হয়। কাল থেকে আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। হয়ত বা সারারাত ফিরলামই না। ওনার স্মরণে থাকব।” রাধারানী কথার কোন রকম উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। মতিলাল খাওয়া থামিয়ে রাধারানীর দিকে তাকিয়ে বলল “কি হলো? কিছু বলছো না যে?” রাধারানীর ভেতরে ভেতরে রাগের বাষ্প ঘনীভূত হচ্ছিল। সে মুখ বন্ধ রেখে সেই বাষ্পকে রোধ করে রেখেছে। স্বামীকে সে দেবতা বলে জ্ঞান করে কিন্তু মাঝে মাঝে তার পক্ষে ধৈর্য ধরে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু বলবে না ভেবেও মাঝে মাঝে সে কিছু কথা বলে ফেলে এবং পরে চোখের জলে হৃদয় জুড়োয়।

“কী গো, কী হলো?”

“কিছু না।”

“তাহলে কথা বলছো না যে?”

“কী আর বলব? তোমার রোজকারের বাই। আজ এই সাধু তো কাল ঐ সন্ন্যাসী। এ আর নতুন কি?”

মতিলাল এরকম প্রত্যুত্তর আসা করেনি। একটু আহত হয়ে সে বলল, “না, ইনি অন্যদের মত নন। এতদিনে আমি সত্যিকারের একজন সাধকের সন্ধান পেয়েছি। তার প্রমাণ আজই পেলাম। জানো আজ কি দেখলাম?”

“কী?”

“বাবাজী একটা যজ্ঞ করছিলেন, আমি তার পাশেই বসে ছিলাম। হঠাৎ একটা কাঠ কয়লা ছিটকে এসে ওনার হাতে পড়লো। অঙ্গারের টুকরো চামড়া পুড়িয়ে দিতে লাগলো, কিন্তু উনি একটুও নড়লেন না, বা কাঠকয়লার টুকরোটা ফেলে দিলেন না। চুপ করে সেই দিকে তাকিয়ে রইলেন যতক্ষণ না শরীরের রসে অঙ্গারটি নিভে যায়। আমি বললাম, একি করছেন! উনি বললেন, সহ্যের পরীক্ষা করছি। ওনার মুখে বেদনার কোন চিহ্ন ছিল না। তখনই বুঝলাম ইনি কোন সাধারণ পুরুষ নন। তাই ঠিক করে নিলাম এনার কাছে মন্ত্র নেব।”

রাধারানী কৌতূহল ভরে জিজ্ঞাসা করল, “মন্ত্র নেবে? কি মন্ত্র নেবে?” মতিলাল বলে আমি বাবাজীকে বললাম, “বাবাজী আমায় আপনার শিষ্য করুন। তখন উনি বললেন, কাল যেতে। কাল জানাবেন কি করতে হবে।” পরের দিন মতিলাল বাবাজীর কাছে থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এল। তখন বিকেল, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। মতিলাল বলল “বাবাজী আমায় কোন মন্ত্র দিলেন না।”

রাধারানী বলল, “কেন?”

“জানি না। উনি আমার মুখ দেখে বললেন, তোমার মন্ত্রের দরকার নেই। যদি পারো ব্রহ্মচর্য পালন করো। ওতেই নাকি আমার মুক্তি। আমি ভেবে দেখলাম বাবাজী ঠিক ধরেছেন। এখন তোমার কি মতামত বলো।” রাধারানী বলল, “তুমি আমায় আনন্দমঠ পড়ে শুনিয়েছিলে না? সতীর পতি বড়, তার থেকেও বড় পতির ধর্ম। তোমার পথই আমার পথ। তুমি যা চাও তাই হবে।”  মতির আনন্দে চোখে জল এসে গেল। সে ডায়রির পাতায় লিখে রাখল আজ ১৭ই জুন ১৯০৬, রবিবার। আজ থেকে ব্রহ্মচর্য পালনের প্রতিজ্ঞা করলাম।

রাধারানী যা মন থেকে একবার স্থির করে নেয় তা করে ছাড়ে – এমনই তার জেদ। সেও মনে মনে ভেবে রেখেছে এবার সে তার স্বামীকে আর হতাশাগ্রস্ত হতে দেবে না। দু-সপ্তাহ কিছু না করে কেটেছে, কিন্তু রাধারানী তার স্বামীর ব্যবহারে এক অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছে। রাতে এপাশ ওপাশ করে কাটাচ্ছে। সেদিন রাতে রাধারানী চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুমোয়নি। মতিলালের উলটো দিকে পাশ ফিরে রয়েছে। হঠাৎ সে বুঝল তার পিঠে তার গরম নিশ্বাস পড়ছে। ক্রমশ মতিলালের শরীর তার শরীর স্পর্শ করছে। রাধারানী কাঠ হয়ে শুয়ে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে আজ কিছুতেই সে কোনরকম আবদার প্রশ্রয় দেবে না। সে জানে এতদিনের অভ্যাস হঠাৎ করে পরিবর্তন করা খুব কষ্টের, কিন্তুর স্বামীর ভালোর জন্যই তাকে কঠোর হতে হবে। তার বাহুর ওপর স্বামীর গরম হাতের স্পর্শ পেল। তবুও সে কোন কথা না বলে চুপ করে শুয়ে রইল।

“ঘুমোলে নাকি?”

“না।”

মতি এবার আরও এগিয়ে গিয়ে রাধার পিঠে তার ঠোঁট ঠেকালো। 

রাধারানী ধীর অথচ দৃঢ় স্বরে বলল, “ব্রতর কথা মনে আছে তো?”

মতি ধাক্কা খেল। কোন কথা না বলে সরে গেল। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুল। নিজের কাছে সে অপরাধী হয়ে গেছে। সে ভাবেনি রাধারানী তাকে বাধা দেবে। নিজের শপথ এত তাড়াতাড়ি ভাঙ্গতে যাওয়ার জন্য নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল তার। কিন্তু এতদিনের অভ্যাস, যা জীবের স্বাভাবিক ধর্ম, তা দুম করে ছাড়াও তো সোজা কথা নয়। যৌবনের শুরু থেকেই যে কাজ করে এসেছে তা আচমকা বন্ধ করা যে এত কষ্টকর তা তো ব্রত গ্রহণের সময় বোঝেনি। সে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল। সে কি ভুল করে ফেলল। তার মাত্র তেইশ বছর বয়েস, স্ত্রীর সতেরো। এখনও সারাজীবন পরে আছে। ব্রহ্মচর্যের ব্রত পালনে বাড়াবাড়ি করে ফেলল না তো? সারারাত তার ঘুম এল না। রাধারানী ভোর ভোর উঠেই বাড়ির কাজে লেগে গেল। তার স্বভাবই হচ্ছে ভোর ভোর উঠে বাড়ি ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করা। কোথাও সে কোন রকম ময়লা সহ্য করতে পারে না। ছোটবেলায় সেই যে লক্ষ্মীর পাঁচালী শুনেছিল – “সকালবেলা ছড়া-ঝাঁট, সন্ধ্যাকালে বাতি, লক্ষ্মী বলে তার ঘরে আমার বসতি।” সেই নিয়ম সে প্রতিদিন মেনে চলেছে। তাছাড়া রান্নাও তো চাপাতে হবে। মতিলালকে খেয়ে অফিসে বেরোতে হবে। মতি আগের রাতের ঘটনা নিয়ে আর কোন কথা বলল না। স্নান করে এসে দেখল ধোপদুরস্ত পোশাক বিছানায় রাখা। রাধারানী নিজে যেমন তেমন থাকলেও মতির পোশাক-আশাকের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখত। বিয়ের পর মতিলালকে কেউ কোনদিন এক জামা-ধুতি পর পর দুদিন পড়তে দেখেনি। এরপর দু চারদিন নিরুপদ্রপেই কাটল। কিন্তু মতির ব্রহ্মচর্য পালন ধাতে সইছিল না। একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর মতি ঘরে ঢুকেই কোন ভণিতা না করে বলে দিল “দেখ আমি এই ব্রত পালন করতে পারবো না। প্রকৃতির বিধানেই জীবের মিলন হয় এবং এটাই স্বাভাবিক। পূর্ণ যৌবনে বিবাহিত হয়ে এই ব্রহ্মচর্য পালনে আমার শারীরিক অসুবিধা হচ্ছে। শরীর খারাপ লাগছে আমার।” রাধারানী কথাটা শুনেই খিলখিল করে হেসে উঠল। মতি মনে মনে কুঁকড়ে গেল। মাঝে মাঝে রাধারানী মতিকে এমন কথা শোনায় যে মতির নিজেকে ছোট মনে হয়। অবশ্য সেগুলো সবই তাকে পথে আনার জন্য। আজ এই হাসি সেই কথার কাজ করল। রাধারানী বিছানায় উঠে বসে মতির দিকে ফিরে বলল, “এই তোমার পুরুষ মানুষের মনের জোর? বড়ো মুখ করে ব্রত পালন করবে বলে সন্ন্যাসীকে কথা দিলে আর কথা রাখতে পারছো না? এরকম করলে কি করে চলবে?” মতিলালের কাছে দেওয়ার মত জবাব নেই, কিন্তু এই অসহ্য ব্রতর সাথে মানিয়ে নিতেও পারছে না। সে জানে তার একার মনের জোর এতটা নয় যে সে এই ব্রত পালন করতে পারবে। সে রাধারানীর মানসিক দৃঢ়তা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে। তার তো কোন দায় নেই। কিন্তু সে কেন এত কঠোর হচ্ছে। মতিলাল বলল, “মনকে না হয় বোঝালাম কিন্তু শরীরকে কি করে বোঝাই। তোমার স্পর্শ আমায় উত্তেজিত করে।” রাধারানী পাশ বালিশটা বিছানার মাঝে রেখে বলল, “নাও এবার আমার স্পর্শ লাগবে না, শুয়ে পড়ো।” মতি বুঝে গেলে এ বড় শক্ত ঠাঁই অগত্যা সেও শুয়ে পড়ল। পরের দিন মতি মেঝেতে একটা বিছানা করতে লাগল। রাধারানী কিছু না বলে চুপচাপ মতির কাণ্ড দেখতে লাগল। বিছানা হয়ে গেলে মতিকে বলল,

“এটার কি দরকার?”

মতিলাল বলে, “দরকার আছে। আমি মেঝেতে শোবো। তোমার পাশে শুলে আমার ব্রত পালনে অসুবিধা হচ্ছে।” রাধারানী জানে এটাও মতির একটা সাময়িক খেয়াল। সে বলে, “কিন্তু ওটিতো হতে পারে না। আমি খাটে শোবো আর তুমি মেঝেতে শোবে এ কি করে হয়। আমিও মেঝেতেই শোবো।” মতি জানে তর্ক করে লাভ নেই। রাধারানী কিছুতেই খাটে শোবে না, আবার সেও রাধাকে মেঝেতে শুইয়ে নিজে খাটে শুতে পারবে না। অতএব মেঝেতে একটু তফাতে দুটো বিছানা হল।  অনেক রাত অব্ধি মতি বিছানায় ছটফট করতে লাগল। রাধারানী জেগেই ছিল। বলল, “কি গো, এখনো ঘুমলে না যে?” মতি বিছানায় উঠে বসল। বলল, “এই ব্রত পালন অসহ্য। আমি ভেবে দেখলাম আমিই যখন ব্রত নিয়েছি তখন আমার ভাঙ্গার অধিকারও আছে। আমি এই ব্রত মানবো না।” রাধা বলে, “ও তাই বুঝি? একজন বিবাহিত পুরুষ যখন ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করে তখন কি সেটা একার বিষয় দাঁড়ায়? তার স্ত্রীর কি তাতে কোনও মত থাকতে পারে না? একা একা ব্রত নেয়া কি আর না নেওয়াই বা কি? এ ব্রত আমারও, আমি এ ব্রত ভাঙ্গবো না।” মতিলাল স্ত্রীর এরকম মানসিক দৃঢ়তা দেখে অবাক হয়ে গেল। স্বামীর জন্যই সে ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত নিয়েছিল, এখন স্বামী না চাইলেও সে স্বামীর কথা ভেবেই তার সংকল্পে স্থির রয়েছে দেখে মতিলালের মন শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। সে বলল। “তোমার এতে কোন আপত্তি নেই? এর মানে কি জানো?”

রাধারানী হেসে বলল, “হ্যাঁ জানি। এর মানে আমি আর কোনদিন মা হব না, এর মানে শারীরিক সুখ কোনদিন পাবো না। কিন্তু আমার কোন আপত্তি থাকবে কেন? সতীর পতি বড় তার ওপরে কিছু নাই। তুমি যেটা চাও সেটাই তো করছি। তুমি চাইতে গার্হস্থ্য জীবন – তোমার সাধনার অন্তরায় যেন না হয়, তাই তো আমি তোমায় বারণ করছি। আর পেটে ধরলেই কি সন্তান-সুখ পাওয়া যায়? আমিও তো পেটে ধরেছিলাম, কিন্তু সেই সুখ পেলাম? কপালে থাকলে অনেক সন্তান আমি পাবো। আর শারীরিক সুখের থেকে অনেক বড় মানসিক সুখ। বল তুমি আমায় ভালবাসো না? তোমার ভালবাসাই আমি চাই। ওটি পেলে বাকি সব কিছু তুচ্ছ।”

মতিলালের চোখ ভিজে যায়। সে রাধারানীর মুখটা দুহাতে ধরে বলে, “পৃথিবীর সব কিছুর থেকে তোমায় আমি ভালবাসি।” রাধারানীও আনন্দে কেঁদে ফেলল, তারপর মতিলালকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, “ঠিক আছে, তুমি যখন কথা দিয়েছ সন্ন্যাসীকে তখন অন্তত এক বছরের জন্য ব্রত পালন কর। এক বছর পরও যদি তোমার মনে হয় এই ব্রত পালন তোমার ভুল হয়েছে, তাহলে আমি আপত্তি করব না।” সত্যিই এই খুঁটি বড় শক্ত খুঁটি; যখনই মতিলাল ভেসে যেতে চেয়েছে তখনই খুঁটিতে বাধা অদৃশ্য রজ্জু তাকে ভেসে যেতে দেয়নি।

দিনের বেলা রাধারানীকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে এত বড় সঙ্কল্প নিয়েছে। পাড়ার বৌ-ঝিদের সাথে আগে যেমন গল্প করত এখনও তাই করে। বাড়ির সব কাজ করে। মতি রাধারানীর কথাগুলো মনে করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। মাস দুয়েক পরই পরিস্থিতি বদলাতে থাকল। জীবন অনেকটা স্থির হল। মতি আগের মত অদম্য দৈহিক আকর্ষণ বোধ করে না। তার মনে এবার বিশ্বাস জন্মেছে সে এই ব্রত পালন করতে পারবে।

মতি আরও বেশি করে রাজনৈতিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ল। রাধারানী বুদ্ধিমতী। সে স্বামীকে যেচে কিছু জিজ্ঞাসা করে না। মতিলাল যেটুকু বলে সেটুকুই শুধু শোনে। কিন্তু কানাইলাল, রাসবিহারী, শ্রীশ ইত্যাদি মানুষের সাথে তার স্বামীর ওঠাবসা দেখে বোঝে তার স্বামীও একজন প্রথম সারির স্বদেশী। স্বামীর জন্য তার গর্বও হয়, আবার যখন খবর পায় কোন বিপ্লবী গ্রেপ্তার হয়েছে, তার বুক কেঁপে ওঠে। এদিকে সংসারের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এত বড় সংসার, তার  ওপর ঝি-চাকর, সহিস কোচম্যানের মাইনে, গরুর বিচালি, ঘোড়ার দানাপানির খরচ। মতির দাদা-বাবা এই সময়ে একটা মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়লেন। বাবার চাকরি চলে গেল।  মামলার খরচ চালাতে বসত-বাড়িটা ছাড়া সবই চলে গেল। রাধারানীর অধিকাংশ গয়নাও চলে গেল। যদিও সেসব ঝামেলা মিটল কিন্তু সংসার চালানোর মত টাকা আর অবশিষ্ট রইল না। ভরসা বলতে শুধু মতির মাইনে। কিন্তু সেই অল্প টাকায় এত বড় সংসার কিভাবে চলবে মতি ভেবে পায় না। দাদারও কিছু রোজগার সেইসময় ছিল না। তিনি  নিরীহ মানুষ। মতি জানে তাকেই কিছু একটা করতে হবে।

মতির আর কলকাতায় গিয়ে কেরানিগিরি করা পোষাচ্ছিল না। সে ঠিক করল চাকরি ছেড়ে দিয়ে কিছু একটা ব্যবসা করবে। প্রথম থেকেই তার স্বাবলম্বী হওয়ার দিকে ঝোঁক ছিল। যখন সে রাধারানীকে তার মনের কথা জানাল তখন রাধার মনে আশঙ্কা তৈরি হলেও খুশি হল। স্বামীর এবার অন্তত একটু কষ্ট লাঘব হবে এবং তাকে সে একটু কাছে পাবে। এখন তো সেই সোম থেকে শুক্র সকালে বেরিয়ে যান আর সন্ধেতে ফেরেন। তারপরই আবার বেরিয়ে যান, রাতে বাড়ি ঢোকেন। তার সাথে দুটো কথা বলার সময়ই পায় না সে।

রাধারানীর সঙ্গে আলোচনা করে সে ঠিক করল কাঠের ব্যবসা করবে। রাধা বলল, “সে তো অনেক টাকার দরকার। টাকা কোথায় পাবে?” মতি বলল, “একটাই রাস্তা। বাড়ি বাঁধা দিয়ে ধার নেওয়া। কিন্তু একটাই চিন্তা। যদি ব্যবসা মার খায় তবে আমরা কোথায় যাব?”  রাধারানী দৃঢ় স্বরে বলল, “সংসার বাঁচাতে হলে এটা করতেই হবে। না-খেয়ে মরি মরবো, আমি সংসারের দিকটা সামলে নেব। তুমি ব্যবসা কর। আমার বিশ্বাস তুমি সফল হবে।” মতি যতক্ষণ না স্ত্রীর সম্মতি পায় ততক্ষণ কোন কাজে মন লাগতে পারে না।

এরপর সে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ শুরু করল। চাকরি ছেড়ে বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা ধার নিয়ে শালিমার থেকে কাঠ কিনে ব্যবসা শুরু করল। ব্যবসা হল ভাইপোর নামে। অনভিজ্ঞতার দরুন প্রথমে ক্ষতি হল তারপর ক্রমে ব্যবসা চলতে শুরু করল। কোনমতে দিন গুজরান হতে লাগল। মতিও দেশের কাজের জন্য আর একটু বেশি সময় পেল। মতি যেমন চালায় ব্যবসাও তেমন চলে। তার দাদার তেমন ব্যবসা-বুদ্ধি নেই। ভাইপোও নেহাতই ছেলে মানুষ।

মতি সক্রিয় স্বদেশী হয়েছে পাঁচ বছর হয়ে গেছে। সেই সময় এমন এক ঘটনা ঘটল যা মতির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। একদিন সকাল ছটা নাগাদ মতিলাল কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময় শ্রীশ এসে জানাল বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ চন্দননগরে এসেছেন আশ্রয়ের খোঁজে, কিন্তু আশ্রয় পাননি। মতিলাল অরবিন্দবাবুর বক্তৃতা শুনেছিল। অরবিন্দ তখন ভারতের প্রথম সারির বিপ্লবী নেতা। সে অরবিন্দকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করত। মতি ছুটল অরবিন্দ বাবুকে নিজের বাড়িতে আনতে। অতি গোপনে তাঁকে বাড়িতে এনে বৈঠকখানায় বসিয়ে সব দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু বৈঠকখানায় তো তাঁকে রাখা সম্ভব নয়। এ বাড়িতে সব সময় লোকজনের আনাগোনা। কেউ দেখে ফেললে মুস্কিল হবে। অরবিন্দবাবু নৌকা করে রানীঘাট থেকে মতির বাড়ি আসার সময়ই বলে দিয়েছেন, তাঁর কথা যেন অতি গোপন থাকে। মতিলাল ভাবতে লাগল কোথায় অরবিন্দকে রাখা যায়। দোতলায় একটা ঘর আছে। যেখানে কারখানার চেয়ার, ভাঙ্গা আসবাব রাখা হয়। ঘরটা বন্ধই থাকে। আপাতত ঐ ঘরেই তাঁকে রাখা যাক। মতিলাল চুপিচুপি দোতলায় গিয়ে ঘরের মেঝেটা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে একটা শতরঞ্জি বিছিয়ে নিচে ফিরে এল। চারিদিক দেখে নিয়ে চুপিসারে অরবিন্দকে সেই ঘরে নিয়ে গিয়ে বলল, “আপনি একটু বসুন, আমি আসছি।” ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরের বাইরের শেকল তুলে দিল।

চুপিচুপি দোতলা থেকে নেমে উঠোনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির মেয়েরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল মতিলাল। নাহ:, কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। হঠাৎ রাধারানী তার সামনে এসে দাঁড়াল। মতিলাল স্ত্রীর চোখের দিকে শঙ্কিত ভাবে তাকাল। রাধারানীর মুখে মৃদু হাসি। তবে কি সে দেখতে পেয়েছে? রাধারানী মতিলালের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল “খুব কাজ না?” মতিলাল জবাব দিতে পারল না। চট করে মিথ্যা তার মুখে আসে না। স্ত্রীর কাছে তো নয়ই। সে বুঝতে পারল না রাধা জানতে পেরেছে কী না। কী বলবে ভাবছে এমন সময় রাধারানী ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল “মাথায় ওটা কি?” মতিলাল অবাক। সে কিছু না বুঝে রাধারানীর দিকে তাকিয়ে রইল। রাধারানী এবার হাত বাড়িয়ে মতিলালের মাথা থেকে একটা মাকড়সার ঝুল সরিয়ে টেনে ফেলে দিয়ে বলল, “সকাল থেকে খালি কাজ আর কাজ। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই গুদামঘরে ঢুকেছিলে?”  মতিলাল হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আমি বেরোচ্ছি।” রাধারানী অবাক হয়ে বলল, “বেরোচ্ছ মানে? জলখাবার না খেয়ে কোথায় যাবে? যেখানেই যাও খেয়ে যাও।” মতিলালের মাথায় জলখাবারের কথা ছিলই না। সে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি দাও। আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”

জলখাবার তৈরিই ছিল। তৎক্ষণাৎ রাধারানী মতিলালের সামনে জলখাবারের রেকাবি হাজির করল। মতিলাল বলল। “আমি বৈঠকখানায় গিয়ে খাবো।” রাধারানী – “উফ তোমার কি একটু ধীর স্থির হয়ে বসে খাওয়ার সময় নেই?” মতিলাল আর কথা না বাড়িয়ে বৈঠকখানা ঘরে চলে এল। তারপর চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে নিল আশেপাশে কেউ আছে কী না। যখন দেখল রাস্তা পরিষ্কার তখন সে চুপিচুপি রেকাবি হাতে সোজা দোতলার ঘরে গিয়ে হাজির হল। দেখে অরবিন্দ মেঝেতে বজ্রাসনে বসে ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছেন। মতিলাল দেখল – অদ্ভুত তাঁর দৃষ্টি। সে বলল, “খেয়ে নিন। আমি আবার দুপুরে আসব।”

দুপুরে ফিরে স্নান সেরে মতিলাল খেতে বসল। কিন্তু ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। ওদিকে অভুক্ত অরবিন্দ দোতলার ঘরে রয়েছেন আর এদিকে মতিলাল খেতে বসেছে। গলা দিয়ে তার যেন ভাত নামছে না। অরবিন্দের নির্দেশ চিন্তা করে রাধারানীকে কিছু বলতে পারেনি। জলখাবার না হয় বৈঠক খানায় গিয়ে খাওয়া যায় তা বলে দুপুরের ভাত তো বৈঠকখানায় নিয়ে গিয়ে খাওয়া যায় না। সেটা করতে গেলেই ধরা পড়ার সম্ভাবনা। কিন্তু এভাবে অরবিন্দের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাই বা কি করে করা যাবে? মতিলাল যা হোক করে দু গ্রাস ভাত মুখে তুলেই উঠে পড়ল। রাধারানী অবাক হয়ে বলল, “কি হয়েছে বলো তো তোমার?” মতি সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “কিছু না।” তারপর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পাড়ার দোকান থেকে কচুরি কিনে নিয়ে অরবিন্দর কাছে গিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বলল, “আজ এর থেকে বেশি কিছু ব্যবস্থা করতে পারলাম না, এটা খেয়ে নিন।” অরবিন্দ একটু হেসে নির্বিকার মুখে বাসি কচুরি গলাধঃকরণ করতে লাগলেন। রাধারানী তখন রান্নাঘর পরিষ্কারে ব্যস্ত। খাওয়া হয়ে গেলে মতি অরবিন্দকে বৈঠকখানার ঘরে নিয়ে গেল। অরবিন্দও বাধ্য ছেলের মত মতি যা বলেছে তাই করছেন।

“আপনি চান করবেন তো?” অরবিন্দ বললেন, “করতে পারলে ভালই হয়।’

“কিন্তু কলতলায় তো আপনাকে চান করানো যাবে না। এই ঘরেই আপনার চান এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

মতি কুয়োতলায় গিয়ে কুয়ো থেকে দু-বালতি জল তুলে চুপি চুপি বৈঠকখানা ঘরে নিয়ে এল। অরবিন্দর জামা খুলে বৈঠকখানার মেঝেতে একটা পিঁড়ের ওপর বসলেন। মতি প্রতিদিন তেল মেখে স্নান করে। রাধারানী মতিকে ভাল করে তেল মাখিয়ে দেয় স্নানের আগে। কিন্তু অরবিন্দকে তেল মাখানোর মত সময় নেই। মতি বলল, “আপনাকে আজ রুখুই চান করিয়ে দিচ্ছি। কাল থেকে আপনার ঘর থেকে তেল মাখিয়ে নিয়ে আসব।” অরবিন্দ বলল, “তার কোন প্রয়োজন নেই, আমি তেল মাখি না।” মতি কুয়োর ঠাণ্ডা জল অরবিন্দের মাথায় ঢেলে দিতে লাগল। অরবিন্দের শরীর ঠাণ্ডায় কেঁপে উঠল, কিন্তু ওনার মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোল না। স্নান হয়ে গেলে নিজের একটা ধুতি অরবিন্দকে পরিয়ে তাঁর ভিজে কাপড় বাইরে মেলে দিয়ে মতি যেমন এসেছিল তেমন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কারখানায় গিয়ে মতি ভেবে দেখল আজকে অরবিন্দকে অন্যত্র রাখাই ভাল। আজ যদি কেউ অরবিন্দকে মতিলালের সঙ্গে দেখে থাকে এবং তাঁকে চিনতে পারে তবে বাড়িতে পুলিশের তল্লাসি হতে পারে। উপরন্তু মতি অরবিন্দের খাবারদাবারের ব্যবস্থা ঠিক করে করে উঠতে পারেনি। হাতে দু-একদিন পেলে সে ব্যবস্থা করা যাবে।  সন্ধ্যেবেলা কারাখানা থেকে সোজা এক বিশ্বস্ত বন্ধুর বাড়ি গিয়ে হাজির হল। বন্ধুকে সব জানাতে সে রাজি হয়ে গেল অরবিন্দকে রাখতে। বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরে অরবিন্দকে সব জানাতে তিনি সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, “বেশ।” মতিলাল দেখেছে অরবিন্দ সাধারণত কম কথা বলেন। রাত দশটার পর চুপি চুপি অরবিন্দকে সেই বন্ধুর বাড়ি রেখে এল সে। রাতে ভাল করে ঘুম হল না। পরের দিনও অরবিন্দের চিন্তা করে কাটিয়ে দিল। সন্ধ্যে হতে না হতেই সেই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হল মতি। বন্ধুর বাড়ি মতির মত বড় নয়। সে একাই থাকে একটা ঘরে। কাল রাতে অরবিন্দের সাথে এক ঘরেই ছিল। মতিকে দেখেই অরবিন্দ বললেন, “তোমার ওখানেই আমায় নিয়ে চলো”।

মতি বুঝল অরবিন্দ নির্জনতা প্রিয় মানুষ, একা থাকতে ভালবাসেন। এই পরিষ্কার ঘরে অন্যজনের সঙ্গে থাকার থেকেও ধুলো যুক্ত ঘরে একা থাকা বেশি পছন্দের তাঁর। মতি আবার রাতের অন্ধকারে অরবিন্দকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। একটা মশারি জোগাড় করে অরবিন্দকে শতরঞ্জির ওপর শুইয়ে সে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। কিন্তু রাতে তার ঘুম এল না। ঐ অবস্থায় অরবিন্দের না জানি কত কষ্ট হচ্ছে। সকাল হতে না হতে সে গুদাম ঘরে গিয়ে দেখল অরবিন্দ নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছেন। অরবিন্দকে ডেকে সকালের প্রাতকৃত্যাদি সারিয়ে দুটো মুড়ি আর চা খাইয়ে মতি কারখানায় বেরিয়ে গেল।

রাধারানীর মাত্র দুটো লাল পেড়ে গরদের শাড়ীই সম্বল। তাই বাসি কাপড় ছেড়ে একটা গামছা নিম্নাঙ্গে আর একটা গামছা গায়ে জড়িয়ে ঠাকুর ঘরে পুজোর বাসন মাজার জন্য যায়, এর পর বাড়ির কোন না কোন ঘর ঝাড়পোঁছ করে স্নান সেরে অন্য কাপড় পরে। সেদিন ঠাকুর ঘরে যাওয়ার সময় রাধারানীর পুরনো চেয়ার রাখার ঘরের দিকে নজর পড়ল। অনেকদিন এই ঘরটা পরিষ্কার করা হয়নি। আবর্জনা ময়লা সে দেখতে পারে না। ঠাকুরে বাসন মাজা হয়ে গেলে একটা ঝাঁটা নিয়ে সে গুদামঘরের দিকে এগল। দরজা ভেজানো ছিল। দরজা খুলেই পুরো ঘরটা চোখে পড়ে না। সামনেই চেয়ারের স্তূপ। ঘরে একটু ঢুকেই সামনের দৃশ্য দেখে রাধারানী যেন পাথর হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে একটা শতরঞ্জি পাতা। শতরঞ্জির ওপর বসে এক পুরুষ। স্থির দৃষ্টিতে তিনি রাধারানীর দিকে চেয়ে আছেন। সেই দৃষ্টি যেন অন্তর্ভেদী।

রাধারানী এতটাই অবাক হয়ে গেল যে কয়েক মুহূর্তের জন্য তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে গেল। পা যেন নড়তেই চায় না। তারপর হঠাৎ পায়ে সাড় পেয়ে জিভ কেটে সে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঝাঁটা ফেলে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। বিস্ময়ে ও লজ্জায় সে একাকার হয়ে যায়। মাথা কিছু কাজ করে না। ওই ঘরে সে একজন অচেনা পুরুষকে দেখতে পাবে এটা তার কল্পনারও অতীত ছিল। এক হাত ঘোমটা ছাড়া যাকে বাইরের কোন পুরুষ দেখেনি সে কিনা দুটো গামছা পরে একেবারে অচেনা পুরুষের সামনে! লজ্জায় সে মরে যায়। কিন্তু কে ঐ ভদ্রলোক? কিছুক্ষণ পর তার মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হতে আস্তে আস্তে বিষয়টা অনেকটা পরিষ্কার হল। কাল বিকেলে সে দেখেছে বৈঠকখানা ঘরের মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে, উঠোনে একটা ভিজে কাপড় শুকচ্ছে, কুয়ো তলায় অসময়ে  জল পড়ে ভিজে আছে। এবার সে সবের কারণ বুঝতে পারল। স্বামীর ওপর তার রাগ হল। একি স্বভাব তার! স্ত্রীর কাছে গোপন করার মানে কি? সে কি কোন কাজে বাগড়া দেয়?

রাধা স্নান সেরে স্বামীর বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষা করতে থাকে। মতি বাড়ি ফিরতেই রাধারানী স্বামীকে আড়ালে ডেকে বলে, “তোমার আক্কেলটা কি বলো তো?” মতি বলে, “কেন?” রাধারানী রাগ দেখিয়ে বলে, “বুঝতে পারছো না? তুমি একজন বাইরের লোককে বাড়িতে এনে রেখেছো আমায় বলোনি কেন? উনি কে?” মতি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সত্যিই রাধারানীর কাছে এই সত্য গোপন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। মতিলাল বলল, “উনি অরবিন্দ ঘোষ। ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা। ওনার কথা মতই গোপন করছিলাম। কিন্তু যাক, তুমি জেনে গেছো এবার বাঁচলাম। তা, কি করে জানলে?” রাধারানী বলল, “সে কথা পরে বলব, তা ওনার খাওয়া দাওয়ার কি ব্যবস্থা করেছিলে?” মতি সব খুলে বলল। রাধারানী বলল, “থাক, আর ও নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না। এবার যা করার আমি করবো।”

মতিলাল একরকম নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। সে আর ভাবলই না রাধারানী এই টানাটানির সংসারে আর একজন লোকের গোপনে খাওয়ার ব্যবস্থা কি করে করবে। কয়েকদিন কাটল। মতি অরবিন্দকে নিয়ে এই ক’দিন আর ভাবেনি। এবার অরবিন্দকে অন্য যায়গায় স্থানান্তরিত করতে হবে। এক জায়গায় বেশিদিন রাখা নিরাপদ নয়। খবরের কাগজে বেরোচ্ছে ইংরেজ পুলিশ অরবিন্দকে পাগলের মত খুঁজছে। মতিলাল তার একজন বিপ্লবী বন্ধুর সাথে পরামর্শ করে তার বাড়িতে অরবিন্দকে পাঠানোর কথা ভাবল। রাধারানীকে বলাতে রাধারানী জিজ্ঞাসা করল,

“কোথায় নিয়ে যাবে?”

“আপাতত নরেনের বাড়ি রেখে আসি। পরে দেখা যাবে।”

ঠিক হল গোপনীয়তার জন্য মতি নিজের গাড়িতে অরবিন্দকে রেখে আসবে। সেই দিন মাঝরাতে মতিলাল অরবিন্দকে নিয়ে চুপচাপ আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল। রাধারানী একটা হারিকেন নিয়ে তাদের এগিয়ে দিল। যাওয়ার সময় বলল, “সাবধানে যেও।” বাড়ি থেকে একটু এগিয়েই আস্তাবল। গাড়ির সহিস গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে জাগানোর প্রশ্নই নেই। অতি গোপনে কাজ সারাতে হবে। অরবিন্দকে একটু দূরে অপেক্ষা করতে বলে মতি চোরের মত নিজের আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল। ঘোড়া দুটো খুলে খুব আস্তে আস্তে গাড়ির সাথে জুড়ল। গাড়ি চালানো তার অভ্যাস নেই তবে চালাতে সে পারে। একটা ঘোড়া নতুন। এখনো ঠিক পোষ মানেনি। সে খালি নর্দমার দিকে গাড়িকে টেনে নিয়ে যেত। মতির একটু বুক দুরদুর করছিল। যাই হোক অত ভাবার সময় আর নেই। মতি অরবিন্দের সামনে এসে গাড়ি থামাল। তারপর তার এক বন্ধু আর অরবিন্দকে গাড়িতে তুলে ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষাল। রাতের অন্ধকারে ঘোড়া গাড়ি ছুটল গোন্দলপাড়ার দিকে। রাস্তা অন্ধকার। গাড়ির বাতিগুলোও জ্বালানো হয়নি। গাড়ি এঁকে বেকে ছুটছে। রাস্তা জনমানবশূন্য। যদি লোক থাকত তাহলে নির্ঘাত দু-একজন গাড়ি চাপা পড়ত। দু-একটা কুকুরের নিদ্রাভঙ্গ হওয়াতে তারা চেঁচিয়ে উঠল।

ফাল্গুনের শীতল রাতেও মতির কপাল দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। একে তো গাড়িকে বাগে রাখতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে উপরন্তু তার ভয় পথে কোন পুলিশের তল্লাসির মধ্যে পড়তে না হয়। কথায় আছে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়। হঠাৎ এক মোড়ে একটা আলো দেখতে পেল। রাস্তার মাঝ-বরাবর লাঠি হাতে একটা লোক টহল দিচ্ছে। একটু কাছে যেতেই সে বুঝল লোকটা পুলিশ। মতির শিরদাঁড়া দিয়ে হিম স্রোত বয়ে গেল। পুলিশটা  যদি গাড়ি থামাতে বলে তাহলে গাড়ির ভেতর তল্লাসি করবে নিশ্চয়ই। মতিলাল তা কোনমতেই হতে দিতে পারবে না। অরবিন্দের দায়িত্ব যখন সে নিয়েছে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও তার। মতি ঘোড়ার পিঠে জোরে চাবুক কষাল। ঘোড়া আরও জোরে ছুটতে লাগল। নিস্তব্ধ পল্লীকে খান খান করে এত রাতে গাড়ি আসতে দেখে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে গাড়ি থামাতে বলছে। মতি জানে গাড়ি সে কিছুতেই থামাবে না, দরকার পড়লে পুলিশকে চাপা দিয়ে চলে যাবে। পুলিশ চেঁচিয়ে বলছে, “এই রোককে, রোককে।” কিন্তু গাড়ি থামল না, পুলিশ কনস্টেবল শেষ মুহূর্তে লাফ দিয়ে রাস্তার পাশে সরে গিয়ে গালাগাল দিয়ে বলল, “শালা মাতাল, গাড়ির আলো জ্বালিয়ে যা।”  মতি হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। যাক পুলিশ অন্য কিছু সন্দেহ করেনি। গোন্দলপাড়ায় নির্দিষ্ট আস্তানায় অরবিন্দকে নামিয়ে তার যেন পিঠের এক বিশাল বোঝা নেমে গেল। এবার সে ধীরে সুস্থে বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরে ঘোড়া দুটোকে গাড়ি থেকে খুলে যথাস্থানে বেঁধে রেখে বাড়ির দরজায় টোকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। রাধারানী উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোনো অসুবিধা হয়নি তো?” মতিলাল বলল, “না তেমন কিছু নয়, কিন্তু তুমি এখনও জেগে বসে আছ যে?”

“কি যে বলো! তোমাদের এই অবস্থায় পাঠিয়ে আমার কখনো ঘুম হয়?”

মতি হেসে বলে, “আমাদের সহিস কিন্তু যেমন ঘুমোচ্ছিল এখনও তেমনই ঘুমোচ্ছে।” রাধারানী বলে, “তাহলেই বুঝে দেখো। কোনদিন চোর এসে ঘোড়া গাড়ি নিয়ে চলে যাবে কেউ টেরই পাবে না।” মতি শুকনো হেসে বলে, “ওকে আর কি বলি! বিনা মাইনেতে যে কাজ করছে এই অনেক।”

যে কদিন অরবিন্দ মতিলালের বাড়ি ছিলেন তার সঙ্গে শুধুই আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আলোচনা করতেন। অন্য যে কয়েকজন বিপ্লবী বন্ধু মতির বাড়িতে অরবিন্দের সঙ্গে দেখা করতে আসত তাঁদের সঙ্গে বিপ্লব নিয়ে আলোচনা করলেও মতির সঙ্গে সে নিয়ে কথা বলতেন না। মতি অরবিন্দের প্রতি এমনই অভিভূত হয়ে গেছিল যে তাঁর কথা তন্ময় হয়ে শুনত। এতদিন যে গুরুর প্রতীক্ষা সে করছিল অরবিন্দের মধ্যে সেই গুরুকে দেখতে পেল। অরবিন্দের কথায় মনপ্রাণ জুড়িয়ে যেত। সময় কোথা দিয়ে কেটে যেত বুঝতে পারত না।  অরবিন্দ মতিকে বলতেন, “মন প্রাণ যদি তুমি কালীর সাধনায় ঢেলে দাও তাহলে উনিই তোমায় চালাবেন। এই যে আমি এখানে তোমার বাড়ি এসেছি, এও তাঁর ইচ্ছা। নয়ত তোমায় তো আমি চিনতামই না। তোমার স্ত্রী সাক্ষাত দিব্য মাতা। আমি তোমার মুখ দেখেই বলতে পারি তোমার মুক্তি সাধনায়। তুমি সাধনা ছেড়ো না।” নিরাপত্তার খাতিরে এরপর কখনো অরবিন্দ আর মতিলালের বাড়িতে থাকেননি। অন্য নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে থাকছিলেন। মতি অরবিন্দের থাকার সব বন্দোবস্ত করলেও অরবিন্দের সঙ্গে মাঝে বেশ কিছুদিন দেখা করতে যাননি। একদিন অরবিন্দ মতিকে ডেকে পাঠালেন।  মতি যেতে তিনি বললেন, “আমার ডাক এসে গেছে, এবার আমায় যেতে হবে। তুমি ব্যবস্থা করো।” মতি জানত এক না একদিন অরবিন্দ যাবেন কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যাবেন এটা কল্পনা করতে পারেনি। তার চোখে জল চলে এল। কিছু বলতে পারল না। অরবিন্দ তাই দেখে বললেন, “তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকবে সব সময়ে। কাল এসো একবার, কালই বলবো কি করতে হবে।” মতিলাল অরবিন্দকে প্রণাম করে বাড়ি চলে এল। পরের দিন গিয়ে অরবিন্দের নির্দেশ নিয়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলল। যেদিন অরবিন্দের যাওয়ার কথা, মতি সেদিন ঠিক করল অরবিন্দের সঙ্গে দেখা করবে না। অরবিন্দের চলে যাওয়া সে সহ্য করতে পারবে না। তার খানিকটা অভিমানও হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি তিনি চলে যাবেন সেটা মতিকে আগে জানাননি কেন? মাঝে সে অরবিন্দের সঙ্গে দেখা না করলেও জানত তিনি এখানেই আছেন। চাইলেই তাঁর কাছে যেতে পারবে কিন্তু তিনি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ভেবেই তার বুক ফেটে যাচ্ছে। মতিলাল চুপচাপ দিনটা কাটিয়ে রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল। রাধারানীকে কিছুই বলল না। রাত তখন অনেক, সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল রাধারানীর। মতিলালকে ডাকতে হল না, সে জেগেই ছিল। তড়াক করে লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ল। রাধারানীর দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে হয় শ্রীশ এসেছে। আজ অরবিন্দবাবু চন্দননগর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।” রাধারানী অবাক হয়ে বলল। “আজ অরবিন্দবাবু চলে যাচ্ছেন, আর তুমি খেয়ে শুয়ে পড়লে? এই জন্যই তো লোকে তোমায় ভুল বোঝে। তুমি সব করেও শেষটা করে উঠতে পারো না ঠিক করে। তাড়াতাড়ি যাও।” মতিলাল শশব্যস্ত হয়ে জামাটা গলিয়ে বেরিয়ে গেল। বোড়াইচন্ডীতলার ঘাটে অরবিন্দকে দেখে তার সব অভিমান দূর হয়ে গেল। অরবিন্দ বললেন, “আবার দেখা হবে। পৌঁছে আমি ঠিকানা জানিয়ে চিঠি দেবো।” দুজন বিপ্লবী বন্ধু অরবিন্দকে টিটাগড় অব্ধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিল। অরবিন্দের নৌকা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে মতিলাল বাড়ি ফিরে রাধারানীকে বলল, “বুঝলে, দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল।” রাধারানী মতির কথার মানে কিছু বুঝলো না। কিন্তু মতি জানে গত পাঁচ বছরে যেরকমভাবে সে দেশের কাজ করেছে তা আর হবে না। এরপর পথ অনেক বন্ধুর হবে। ঠিক তাই হল।

এর কিছুদিন পরই মতিলাল বুঝতে পারল পুলিশের দৃষ্টি তার ওপর পড়েছে। একদিন এক বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার সময় হঠাৎ সে খেয়াল করল দুটো লোক তার পিছু নিয়েছে। প্রথমে সে অত গুরুত্ব দেয়নি কিন্তু ফেরার সময়ও যখন সেই দুটো লোককে তার পিছনে আসতে দেখল তখন তার সন্দেহ বদ্ধমূল হল। এরপর সে দুপুর রোদে হোক, বর্ষার রাতে হোক, যখনই যেখানেই যাক, দুটো লোক সব সময় তাকে অনুসরণ করে। প্রথম প্রথম মজা পেলেও কিছুদিনের মধ্যে বিরক্তি ধরে গেল। নিরীহ বন্ধুবান্ধবের বাড়ি যেতে সে কুণ্ঠিত হয় পাছে তারাও পুলিশের নজরে চলে আসে। চন্দননগরের বাইরে আর সে যেতে পারে না। কারণ জানে ইংরেজ পুলিশ সেই প্রতীক্ষাতেই আছে। একবার ফরাসি সীমানার বাইরে তাকে পেলে হয়। সেই সময় বাংলায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চূড়ান্ত আকার ধারণ করল।

বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয় হল মতিলাল ও তার বন্ধুবান্ধবের বাড়ি। রাধারানী রাতে কান খাড়া করে শোয়। ওই হয়ত দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। বিপদের আশঙ্কায়  মতিলালকে এক ডাকে সাড়া দিতে বারণ করে সে। মাঝরাতে কেউ ডাকলে নিজে পা টিপে টিপে গিয়ে বাড়ির কেউ জেগে আছে কিনা দেখে মতিকে বাইরে যেতে দেয়। যেসব বিপ্লবীরা রাতের অন্ধকারে মতির আশ্রয় নিতে আসে বা দেখা করতে আসে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে। চুপিচুপি মাঝরাতে খিচুরি রান্না করে বাড়ির কলাগাছ থেকে কলাপাতা কেটে বিপ্লবীদের খাইয়ে তবে শান্তি পায়।  রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা মতিলালের সঙ্গে আলোচনা করে ততক্ষণ রাধারানী পাশের ঘরে জেগে বসে থাকে। মতিলাল দিনের বেলা ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকে আর রাতে স্বদেশী কাজ। পুলিশের চরকে ফাঁকি দিয়ে কখনো হেঁটে, কখনো সাইকেলে, কখনো নৌকায় নানা জায়গায় বিপ্লবের কাজে যায়। আবার ভোর হওয়ার আগেই ফিরে আসে। রাধারানী বিনিদ্র রজনী যাপন করে উৎকণ্ঠায়। ব্যবসা চালানোর যে দক্ষতা দরকার তা মতিলালের দাদার বা ভাইপোর ছিল না, মতি একা যতটা পারত চালাত। ক্রমেই ব্যবসার হাল খারাপ হতে লাগল আর সংসারে তার চাপ পড়তে লাগল। দিনের বেলায় মতির অনুগামী বাড়িতে লেগেই থাকত। বেশিরভাগই স্কুল কলেজের পড়ুয়া। মতির জ্বালাময়ী ভাষণে তারা খুব আকৃষ্ট হত। প্রতি রবিবার দুপুর থেকে রাত অব্ধি বাড়ির বৈঠকখানায় মতি নানা বিষয়ে কথা বলত, তারা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনত। শেষে রাধারানী দরজার আড়াল থেকে আওয়াজ করে মতিকে নিরস্ত্র করত। ভেতর গেলে অনুযোগ করত, “বাব্বা তুমি বকতেও পার। তোমার গলা শুকিয়ে যায় না? অন্যদেরও তো স্বামী আছে কিন্তু আমার মত চিন্তায় কেউ থাকে না।” মতিলাল বল্‌ “তোমার স্বামী আর অন্যদের স্বামী এক নয়। আবার আমার স্ত্রী আর অন্যদের স্ত্রী এক নয়।”

মতিলালের সঙ্গে অরবিন্দের চিঠিতে যোগাযোগ রইল। একদিন অরবিন্দের চিঠিতে তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা জানতে পেরে মতির দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। যাওয়ার সময় সে অরবিন্দকে কথা দিয়েছিল যতদিন না পন্ডিচেরিতে কোন ব্যবস্থা হয় ততদিন মতিলাল অরবিন্দকে খরচ পাঠাবে। এদিকে  নিজেদের সংসার ঠিক করে চলে না। ঘোড়া, গাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। গয়না বিক্রি হয়ে গেছে। বাড়ির এক অংশ বন্ধক রয়েছে। এরপর অরবিন্দকে কি করে টাকা পাঠাবে ভেবে মতি গুম হয়ে গেল।

স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়েই রাধারানী বুঝতে পারে কোন অঘটন ঘটেছে। রাতে মতিলাল চুপ করে কড়িকাঠের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে শুয়েছিল। রাধারানী কাজ মিটিয়ে ঘরে এসে স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে পাশে এসে বসল। বলল “কি গো কি হলঅ?” মতিলাল রাধাকে সব খুলে বলল। রাধারানী সান্ত্বনা দিয়ে বলল “তুমি চিন্তা কোরো না, ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” মতিলালের তবু কি চিন্তা যায়। শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল। পরের দিন মতিলাল বেরোতে যাবে এমন সময় রাধারানী তার হাতে একটা সোনার হার দিয়ে বলল, “এটা বিক্রি করে যা পাবে তা আপাতত অরবিন্দবাবুকে পাঠাও, পরে দেখা যাবে।” মতিলাল হারটা দেখে চিনতে পারল। এটা তার মেয়ের হার। মুখ দেখে সে এই হার দিয়েছিল মেয়েকে। মতিলাল বিহ্বল হয়ে রাধারানীকে বলে, “পিকলুর হার দিয়ে দিলে?” রাধারানী বলে- “ও হার আর কি হবে? একটা সৎ কাজে লাগলে আমাদের মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে।” মতিলাল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

এদিকে বাংলায় চরমপন্থী বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড চরমে। বহু যুবক ঘর ছাড়া। তাদের থাকা-খাওয়া, অস্ত্রশস্ত্রের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।  সেই টাকা জোগাড়ের জন্য ডাকাতি করতে শুরু করল বিপ্লবীরা। বড়লোকের বা সরকারে টাকা লুঠ করে বিভিন্ন গেরস্তের কাছে টাকা জমা রাখা হত, দরকার মত বিপ্লবের কাজে খরচ হত। মতিলালের কাছেও টাকা জমা থাকত। মতিলাল সেই টাকা রাধারানীর জিম্মায় রেখে নিশ্চিন্ত থাকত। নিজেদের চরম অনটনেও সেই অর্থে হাত পড়বে না – এটা মতি জানত। কিন্তু সবাই তো এরকম নয়। অনেক লুঠের টাকা অপচয় হতে লাগল। অরবিন্দের সঙ্গে মতিলালের চিঠি মারফত পরামর্শ চলতে লাগল। পরের বছর মতিলাল পন্ডিচেরি ঘুরে এল। ইতিমধ্যে অরবিন্দের এক বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। তিনি নিজে আধ্যাত্মিকতার দিকে চলে গেছেন, মতিকেও সেই দিকে যেতে বলেন। কিন্তু মতি এদিকে এমন জড়িয়ে পড়েছে যে সে কোনদিকে যাবে বুঝতে পারে না। মতি অরবিন্দকেই গুরু মেনেছে। আগের সব মন্ত্র আচার বাতিল করে অরবিন্দের দেওয়া মন্ত্রই রাত দিন জপ করে। অরবিন্দ মতিলালকে ইংরাজি চিঠি লেখেন, মতি সেই চিঠি অনুবাদ করে রাধারানীকে শোনায়। এই ভাবেই দিন কাটতে লাগল।

অরবিন্দ পন্ডিচেরী চলে গেছেন চার বছর হয়ে গেছে এমন সময়ে একদিন রাতে মতিলাল একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে। স্ত্রীর সঙ্গে অনেকদিন পর গল্প করার সুযোগ পেয়েছে। টেবিল থেকে সদ্য পাওয়া চিঠিটা তুলে মতিলাল স্ত্রীকে বলে “জানো অরো কি লিখেছেন?” রাধারানী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে চায়।  মতিলাল বলে,

“অরো তান্ত্রিক কর্ম ছেড়ে, বেদান্তের সাধনা করতে বলেছেন।”

রাধারানী ঠিক বুঝল না। বলল, “মানে?”

“মানে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ছেড়ে আধ্যাত্মিক জগতে মনোনিবেশ করতে বলেছেন।”

“তাই করো তাহলে। আমি তো সব সময়ে ভয়ে ভয়ে থাকি তোমার জন্য।”

মতিলাল একটু চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল “অত সহজ নয় গো, তুমি হয়ত সব জানো না, কিন্তু অনুশীলন সমিতির নাম তো জানোই। বলতে গেলে এই মুহূর্তে এদিকের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের আমিই পরিচালক। হঠাৎ দুম করে কি করে সবকিছু ছাড়ি? চন্দননগরে থেকে যে সুযোগ সুবিধা আমি পাই সেই সুযোগে কত বিপ্লবীকে আশ্রয় দিতে পারি, এমন অনেক কাজ করতে পারি যা কলকাতায় বসে করা সম্ভব নয়। তাই দুম করে এই পথ ছাড়া সম্ভব নয়। তবে আমার মন সহিংস আন্দোলনের দিক থেকে ক্রমশ সরে আসছে। আমার লেখালিখি করতে ইচ্ছা করে। দশজনকে স্বাবলম্বী করে তুলতে ইচ্ছা করে। একটা আশ্রম গড়ে তুলতে ইচ্ছা করে।” রাধারানী বুঝতে পারে স্বামীর ধর্মসঙ্কট। আজ দশ বছর এমন একদিনও যায়নি যেদিন তার স্বামীর সঙ্গে দেশের কাজে কেউ দেখা করতে আসেনি বা এই বাড়িতে আশ্রয় নেয়নি। নিজেরা খেতে না পেলেও বহু লোককে এই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। তার স্বামীর এক ডাকে একশ জন ছেলে জড়ো হয়ে যায়। তাকে মান্যি করে কত লোক। এই বাড়িতে শ্রী অরবিন্দের পদধূলি পড়েছে এই বিপ্লবের জন্যেই। তাই সে কি বলবে বুঝতে পারে না। মতিকে বলে, “তুমি বলেছিলে না অরবিন্দ বলেছিলেন সাধনা করলে কালীই পথ দেখাবেন। তুমি অরবিন্দের মন্ত্র জপে যাও।”

দিনদিন মতিলালদের ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। একজন মানুষের ভাতও অনেক মনে হয়। নিজেদেরই জোটেনা যখন তখন বাইরের লোকের থাকা খাওয়ার চাপ বাড়লে  অশান্তির সৃষ্টি হবেই।  বাড়িতে অশান্তি এমন চরমে উঠল যে মতিলাল একদিন দুম করে বলে বসল, “ঠিক আছে, আমাদের নিয়ে যখন এতই সংসারে চাপ পড়ে তখন আমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছি।” রাতে রাধারানী মতিলালকে সান্ত্বনা দেয়, বলে, “ওগো এরকম অশান্তি প্রতি বাড়িতেই হয়। কাল দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।” পরদিন বৌদির তরফ থেকে সন্ধির কোনরকম ইঙ্গিত না পেয়ে মতিলাল বুঝে গেল সময় এসে গেছে আলাদা হওয়ার। তাকে কিছু একটা করতে হবে যাতে দুজনের পেট কোনরকমে চলে যায়। রাধারানীর সকাল থেকে রাত অব্ধি খেটে খেটে রঙ পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। গলার হাড় বেড়িয়ে পড়েছে। আলাদা হলে এর থেকে খারাপ কিছু হবে না। দাদা পৃথক হতে না চাইলেও মতি বাধ্য হল আলাদা হতে। বিপর্যয় যখন আসে পর পর আসে। এই অবস্থায় মতির বাবাও মারা গেলেন। বাবার শ্রাদ্ধ করার মত টাকাও মতি বা তার দাদার কাছে ছিল না। মতির বন্ধুরাই এগিয়ে এসে শ্রাদ্ধের খরচ যোগাল।

আলাদা তো হয়ে গেল কিন্তু সংসার কি করে চলবে তার ব্যবস্থা হল না। কিন্তু কথায় আছে সৎ পথে থাকলে মধ্যরাত্রেও অন্ন জোটে। মতিলালের অনেক গুণমুগ্ধের মধ্য একজন ছিলেন সাগরকালী ঘোষ। তিনি শুনলেন যখন মতিলাল যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেছে তখন তিনি অযাচিত ভাবে এসে বললেন, “মতি, তুমি যে সৎকার্য করছো করে যাও, সংসারের চিন্তা তোমায় করতে হবে না। আমার রোজগার নেহাত মন্দ নয়, আমি প্রতি সপ্তাহে তোমায় তিনটাকা করে দেবো। আশা করি তোমার তাতে চলে যাবে।”  মতির কাছে ঐ টাকাই যথেষ্ট ছিল। অন্য কোন উপায় না দেখে মতি রাজি হয়ে গেল। কিন্তু অন্যের টাকায় তো চিরদিন বসে বসে খাওয়া যায় না। কয়েকমাস যেতেই মতি ঠিক করল কোন একটা ব্যবসা করবে। রাধারানী সব শুনে বলে, “টাকা কোথায় যে ব্যবসা করবে?” মতিলাল  উত্তর দেয় না কারণ সে নিজেই এর উত্তর জানে না।

শীত খুব পড়েছে। রাধারানী ঠিক করল স্বামীর জন্মদিন পালন করবে। ঐ সামান্য ১২ টাকার সংসার থেকেই কিছুটা টাকা সে বাঁচিয়েছিল। ২১-শে পৌষ মতিলালের জন্মদিনের দিন ক’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নেমন্তন্ন করা হল। সেদিন রাতে সাগরকালী বাবু, তাঁর স্ত্রী, আরও কয়েকজন সুহৃদ উপস্থিত হল। খাওয়া-দাওয়ার পর মতি বন্ধু সাগরকালীকে বলল, “তুমি আমাদের জন্য অনেক করেছো। আর তোমায় সংসার খরচ দিতে হবে না। আমি চাই এবার একটা ব্যবসা করবো।” সাগরকালী বলল, “সে করো কিন্তু যতদিন না কোন ব্যবস্থা হচ্ছে ততদিন যেমন চলেছে চলুক।”

অতিথিদের মধ্যে মতির ভাইয়ের মত মানিকলাল বলে এক সদ্য যুবক ছিল। সেও মতির ইচ্ছার কথা শুনল। পরের দিন সাত সকালেই মানিকলাল হাজির। মতিকে বলল, “কাল আপনি বললেন ব্যবসা করবেন তা কত টাকা লাগবে ব্যবসা করতে?” মতি বলল, “তা, দশ হাজার হলে ভালোভাবে শুরু করা যায়।”

“আপনার অত টাকা কোথায় যে ব্যবসা করবেন?”

“দেখি কোথাও থেকে জোগাড় করতে পারি কিনা।”

মানিকলাল কোঁচড় থেকে কিছু টাকা বার করে বলল, “এই ২০০ টাকা আমি জমিয়েছি, ঐ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করুন। আমিও কলেজ পাশ করে বসে আছি। আমি আপনার সাথে কাজ করব। আমায় কোন টাকা দিতে হবে না।” মানিকলালের নিঃস্বার্থ ভালবাসা দেখে মতির চোখে জল চলে এল। চোখ বুজে সে অরবিন্দকে স্মরণ করল। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল “কালী কালী”।  তারপর মানিকলালকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোমার মত ভাই থাকতে আমার চিন্তা কি? এই টাকাই অনেক।”

মতিলাল রাধারানীকে মানিকলালের কথা বলতেই রাধারানী খুশি হয়ে বলে উঠল, “মনে চাঙ্গা তো কাটেঙ্গা গঙ্গা। তুমি কাল থেকেই কাজ শুরু করে দাও।” মতি তার চেনা কাঠের আসবাবের ব্যবসাই শুরু করবে বলে স্থির করল। তাছাড়া চন্দননগরে তাঁতের মত কাঠের আসবাবেরও কদর আছে। কলকাতায় সাহেবদের বাড়িতে নৌকা করে চন্দননগরের টেবিল চেয়ার যায়।

এক বন্ধুর জমিতে হোগলার দুটো ঘর তুলে কারখানা হল। কালীবাবু নিজে খাতা লেখা শুরু করলেন।

মতিলাল সহিংস আন্দোলন থেকে সরে আসার একটা উপলক্ষ পাচ্ছিল না। একটা ঘটনার পর সেই উপলক্ষ পেয়ে গেল। মতিলাল অনেক বিপ্লবীকে নিজের বাড়িতে, নয় অন্যের বাড়িতে, আশ্রয় দিত। এই সময় অনেকজন বিপ্লবী চন্দননগরে হাজির হল। মতিলালের বাড়িতে পুলিশের নজর পড়েছে, তাই সে নিজের বাড়িতে বিপ্লবীদের রাখা নিরাপদ হবে না মনে করল। তাছাড়া, এতজনকে লুকিয়ে রাখার মত জায়গাও নেই তার বাড়িতে। মতিলালের এক সুহৃদ রূপলাল নন্দীর বিশাল এক প্রাসাদোপম অট্টালিকা খালি অবস্থায় পড়ে ছিল। সেই গালাকুঠিতে বিপ্লবীদের রাখার ব্যবস্থা হল। এর কিছুদিন পরই এক ব্যক্তি হঠাৎ হাজির হল। সে পরিচয় দিয়ে বলল তার নাম কানাইলাল সাহা। ঢাকার অনুশীলন সমিতির সদস্য। এখানে আশ্রয় চায়। মতিলালের কিরকম যেন সন্দেহ হল সেই লোকটার হাবভাব দেখে। তার হাতে দামী সোনার আংটি। গায়ের পোশাকও খুব পরিপাটি। যে বিপ্লবীদের সঙ্গে মতিলালের ওঠাবসা তাদের সঙ্গে এই লোকটিকে ঠিক মেলাতে পারছিল না মতিলাল। এই লোকটি পুলিশের চর হতে পারে। গালাকুঠিতে একে রাখা উচিত হবে বলে মনে হল না। অনেক ভেবে সে তার অনুচর বিহারী বংশীলালকে ডেকে পাঠাল। বংশীলালের ওপর পুলিশের নজর ছিল না। বংশীলালের বাড়িতে কানাইলাল থাকলে সে গোপন কথা কিছু জানতে পারবে না। বংশীলালের সঙ্গে সেই লোককে তার বাড়ি পাঠিয়ে দিল। রাত দশটা নাগাদ হঠাৎ বংশীলাল তার স্ত্রীকে নিয়ে মতির কাছে হাজির। মতি দেখে বংশীর স্ত্রী অঝোরে কেঁদে চলেছে। কান্নাকাটি শুনে রাধারানীও ছুটে এসেছে। এরপর বংশীর কাছে যা শুনল তাতে মতিলালের সর্বাঙ্গ রাগে জ্বলে গেল। মতিলালের বাড়ি থেকে যাওয়ার পর বংশী কানাইলালের থাকার সব ব্যবস্থা করে কিছু জিনিস কেনার জন্য বাজার যায়। তখন বংশীর স্ত্রী একা বাড়িতে ছিল। সেই ঢাকার বিপ্লবী সুযোগ বুঝে তার স্ত্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বংশী ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরে আসায় সেই ভণ্ড বিপ্লবী কিছু করে উঠতে পারেনি। বংশী তৎক্ষণাৎ তাকে ঘরে আটকে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে মতিলালকে খবর দিতে এসেছে। রাধারানীর মুখ চোখ লাল করে মতিকে বলল “ছি: ছি: আজই তোমায় এর একটা বিহিত করতে হবে। নয়ত আমি অন্ন স্পর্শ করবো না।” মতিলালকে বলতে হল না, সে রাধারানীর কাছে বংশীর স্ত্রীকে রেখে বংশীকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রথম সারির কয়েকজন বিপ্লবীর কাছে গিয়ে বিষয়টা জানাল। সবাই এককথায় জানাল এর একটাই শাস্তি – মৃত্যুদণ্ড। মতি বংশীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে বাকি রাতটা কাটিয়ে ভোর হতেই বংশীর বাড়িতে গেল। মতিকে সেখানে দেখেই কানাইলাল সাহা মতির পায়ে এসে পড়ে ক্ষমা চাইল। কাকুতি মিনতি করে জানাল ভুল করে ফেলেছে আর কখনো এ ভুল হবে না। রাগে ঘেন্নায় মতি কি বলবে ভেবে পেল না।  তার নিজের মনে তখন ঝড় উঠেছে। নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। সে যদি বংশীর বাড়ি এই চরিত্রহীন লোকটাকে না পাঠাত তবে এরকম কাণ্ড ঘটত না। কানাইলাল সাহা নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা মতিলাল আর ভাবল না। যদিও পথভ্রষ্ট বিপ্লবীদের অন্য বিপ্লবীরা মৃত্যুদণ্ডই দিয়ে থাকে। মতিলাল কানাইলাল সাহার মুখ দর্শন না করে বলল, “চলে যাও এখান থেকে, আর যেন ওই মুখ কোনদিন না দেখি।” এই ঘটনার পর দুঃখে মতিলাল ঠিক করল বিপ্লবের পথ চিরদিনের মত ত্যাগ করবে। নিজের মনের যে বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ করবে। পত্রিকা প্রকাশ করবে, সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করবে। ১৯১৫ সালে মতিলাল কাগজ বার করল। নাম দিল “প্রবর্তক” । এর আগেও দুটো কাগজ প্রকাশ করেছিল কিন্তু সেগুলো খানিকটা সখের ছিল। এবার সে বাড়িতে প্রেস বসিয়ে কাগজ বার করা শুরু হল। কিন্তু তন্ত্র থেকে বেদান্তের পথ অত মসৃণ হল না। বছর খানেক পর সেই কানাইলাল সাহা পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। এবং বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের কথা ও মতিলালের নাম-ধাম সব পুলিশকে জানিয়ে দিল।   

পুলিশকে খুব ভয় করে রাধারানী। যার স্বামীর স্বদেশীদের সঙ্গে ওঠাবসা তার পুলিশের ভয় তো থাকবেই। যদিও মতি এখন সক্রিয় বিপ্লব থেকে সরে এসেছে।  কাঠের ব্যবসা থেকে মোটামুটি চলে যায়। প্রবর্তক কাগজ বার করে, এবং সাধনা করে।

মতি প্রতিদিনই সূর্যোদয়ের আগেই ঘুম থেকে ওঠে। যে ঘরে অরবিন্দ ছিলেন সেই ঘরটিই এখন তার সাধনা কক্ষ। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে ঐ ঘরে গিয়ে বসে। জানলা দিয়ে ভোরের প্রথম সোনালি সূর্যকিরণ তার কপালে পড়লে দেহটা জুড়িয়ে যায়। এই সময়টা তার খুব প্রিয়। মনটা খুব পবিত্র মনে হয়। বিছানা ছাড়ার সময় প্রতিদিন রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে বলে ওঠে। রাধা তখন একবার চোখ খুলে স্বামীকে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে দেয়। তারপর ভোরের আলো ফুটলে সেও উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরু করে। মতি বিপ্লবের পথ থেকে সরে এলেও পুলিশ এখনও তার পিছু ছাড়েনি। পুলিশের চরের ঘুরঘুর করা মতির গা সওয়া হয়ে গেছে। বিপ্লব ছেড়েছে দেড় বছর হয়ে গেছে এমন সময় একদিন সাধনা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যা দেখল এরকমটা আগে কখনও দেখেনি। শুধু তার বাড়ির ঘিরে ফেলেছে তাই নয়, সারা পাড়ায় গোরা পুলিশ ভর্তি হয়ে গেছে। মতি জানত ওরা আসবে। সে মনে মনে হাসল। সেও তৈরি আছে, পুলিশ করুক তল্লাশি। ফরাসি পুলিশ মহলের উপরের তলায় তার কিছু বন্ধু আছে। ইংরেজ পুলিশ তার শত্রু হলেও ফরাসি পুলিশ নয়। ইংরেজ পুলিশ তার বাড়িতে হানা দিতে পারে এই খবর সে আগেই পেয়ে গেছে। ফরাসি আইন অনুযায়ী বাড়ি খানাতল্লাশি করতে হলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে করতে হয়। তাই বেটারা রাতে আসেনি। ভোর হতে না হতেই হাজির হয়েছে। মতি পুলিশের বড়কর্তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে দু-তিনটে গাড়ি এসে তার বাড়ির সামনে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে বেশ কয়েকজন ইংরেজ ও ফরাসি পুলিশ কমিশনার মঁসিয়ে পমেজ নামলেন। কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার চার্লস টেগার্টকে মতিলাল চিনত, এছাড়াও হুগলী ও ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার ও ম্যাজিস্ট্রেটরা তার বাড়িতে সশরীর হাজির। মতিলাল খাতির করেই বাড়িতে তাদের আহ্বান করল। বৈঠকখানা ঘরে বসে টেগার্ট মতিলালের চোখে চোখ রেখে বলল, “মি রায়, আমাদের কাছে খবর আছে আপনার বাড়িতে ইংরেজ সরকার-বিরোধী কার্যকলাপ চলে। আপনার বাড়ি তল্লাসি করব আমরা। তল্লাশির অনুমতি আমাদের কাছে আছে।”  মতিলাল বিনীত ভাবে হেসে বলল, “স্বচ্ছন্দে করতে পারেন। তবে আমি কোন বিপ্লবী কাজের সঙ্গে যুক্ত ন্‌ আমি ধর্ম কর্ম নিয়ে থাকি।” টেগার্ট মতিলালের থেকে এমন নির্লিপ্ত জবাব আশা কর,নি। সে বাঁকা হেসে বলল, “ও তাই নাকি? তা ধর্মটা তো আপনার ছদ্মবেশ। আসলে আপনি একজন সন্ত্রাসবাদী।”

মতি জবাব দিল না, শুধু হাসল। টেগার্ট পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করল। মতি আড়চোখে দেখল সেটা একটা ম্যাপ এবং তার বাড়িরই ম্যাপ। একটা ঘরে লাল কালিতে দাগ দেওয়া আছে। মতি বুঝল পাকা খবরের ভিত্তিতেই টেগার্ট হানা দিয়েছে। টেগার্ট বলল, “তবে যাওয়া যাক। মি: রায় আপনি আসতে পারেন আমাদের সঙ্গে কিন্তু কোন কাজে বাধা দিতে পারবেন না।” মঁসিয়ে পমেজ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মতির দিকে তাকালেন। মতি চোখের ইশারায় তাঁকে আশ্বস্ত করল। ইংরেজে পুলিশের ভারী বুটের আওয়াজে মতির বাড়ির অলিন্দ কেঁপে উঠল। মতির কিছু করার ছিল না টেগার্টকে অনুসরণ করা ছাড়া। কয়েকটা ঘরে তল্লাসি করার পর যখন টেগার্ট রান্নাঘরের সামনে এল তখন টেগার্ট অবাক হয়ে দেখল এক ভারতীয় রমণী রান্নাঘরের দরজা আটকে দাঁড়িয়ে। এ তো অবিশ্বাস্য। টেগার্টের কল্পনাতেও ছিল না এরকম  শীর্ণ চেহারার কোন নেটিভ গৃহবধূ তার পথ আটকাতে পারে বলে। মতিও হতবম্ভ হয়ে গেছে। এরকম কিছু রাধারানী করতে পারে বলে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। যে মহিলা কোনদিন তার বন্ধুদের সামনে এসে দাঁড়ায়নি সে একজন গোরা সাহেব, তাও পুলিশের সামনে, এসে দাঁড়াল কি করে! মতি দেখল, রাধারানী মাথায় ঘোমটা থাকলেও তা মুখ ঢাকেনি। মাথায় জ্বল জ্বলে করছে সিঁদুর, চোখ দীপ্তিময় । স্থির দৃষ্টিতে টেগার্টের চোখে চোখ রেখে  বলল, “এ ঘরে আপনার ঢোকা চলবে না, এ আমার রান্নাঘর। এ ঘরে আমি কাউকে ঢুকতে দেবো না।” তার গলার স্বর শান্ত কিন্তু তাতে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে জাঁদরেল পুলিশ অফিসার টেগার্ট একটু থতমত খেয়ে মতিলালের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করল, “হু ইজ শি?” মতিলাল, “উনি আমার সহধর্মিণী।”

টেগার্ট সাহেব কয়েক মুহূর্ত কি একটা ভেবে মতিলালকে অবাক করে পুলিশ সঙ্গীদের বলল, “অলরাইট, এই ঘরে ঢোকার দরকার নেই।” মতিলাল রাধারানীর এরকম দীপ্তিময়ী রূপ আগে কখনও দেখেনি। শ্রদ্ধায় তার মন ভরে গেল। মনে মনে বলল তুমিই বিপ্লবীর যোগ্য সহধর্মিণী। তল্লাসিতে বাড়িতে কিছুই পাওয়া গেল না। মতির কাঠের কারখানায় হানা দিল পুলিশ। কাঠের কারখানাতেও অকাট্য প্রমাণ কিছু পাওয়া গেল না। টেগার্ট বলল, “আপনি খবর পেয়ে সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলেছেন তা আমি জানি। তা আপনি ফরাসি পুলিশকে কত টাকা খাইয়েছেন? ফরাসি এলাকায় না থাকলে আমি এখুনি আপনাকে গ্রেপ্তার করতাম। তবে ফরাসি এলাকায় আছেন বলে ভাববেন না পার পেয়ে যাবেন। আপনাকে হাতে না মারতে পারি ভাতে মারব।” মতি টেগার্টের দিকে চেয়ে বলল, “মি: টেগার্্‌ আপনি নিজের দেশকে ভালবাসেন না? আমি নিজের দেশকে ভালবাসি সেটা কি অপরাধ? যদি সেটা অপরাধ হয়ে তবে আমি অপরাধী। আপনি যা করার করতে পারেন।” টেগার্ট মতির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল, “গুড বাই, মিঃ রায়।” মতি দেখল টেগার্টের চোখের চাহনিটা অন্যরকম। সম্রাট আলেকজান্ডার পুরুর দিকে হয়ত এরকম ভাবেই তাকিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই রংপুরের পুলিশের দপ্তর থেকে মতির কাছে একটা বিরাট টেবিল চেয়ারের অর্ডার এল।

“কাকাবাবু, কাকাবাবু – অনেক বেলা হল। মুখে কিছু দিয়ে নিন।” একটা কোমল নারী কণ্ঠের ডাকে মতিলালের হুঁশ ফিরল। মতিলাল দেখল সে ১৯১৬-তে নয়, ১৯২৯-এ রয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখল। দূরে বড় বড় থাম দেওয়া অলিন্দে হাতে খাবারের রেকাবি নিয়ে ও কে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে? চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, জলে তাই পরিষ্কার দেখতে পেল না। শুধু দেখল তার মাথায় জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর। ঠিক যেমন সে দেখেছিল বাড়িতে পুলিশের তল্লাশির দিন রান্নাঘরের সামনে!

সমাপ্ত।

পুনশ্চ: শ্রী মতিলাল রায়ের লেখা “জীবনসঙ্গিনী” থেকে ঘটনাপঞ্জী নিয়েই বেশিরভাগটা লেখা, তবু কিছু কল্পনা আছে। তাই এই কাহিনীকে ঐতিহাসিক সত্য না মনে করে গল্প মনে করাই ভাল।

Author : Avijit Singha Roy

Avijit Singha Roy (singharoy@gmail.com) Author, Essayist, Service Holder

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.