করোনাভাইরাস (COVID-19) এবং শিশু স্বাস্থ্য – কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

করোনাভাইরাস শিশুর শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?

শিশু এবং সদ্যোজাত – এই দুইয়ের উপরেই করোনাভাইরাস প্রভাব ফেলতে পারে। ১১ মার্চ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) করোনাভাইরাসকে প্যান্ডেমিক বলে ডিক্লেয়ার করেছে। অনেক জায়গায় স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের সমাগম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং হচ্ছে। অনেক অভিভাবকই চিন্তিত তাদের বাচ্চাদের নিয়ে। ছোট শিশুদের মধ্যে রিস্ক ঠিক কিরকম এবং তাদের কীভাবে পরিচর্যা করা উচিত – এ প্রশ্ন অনেক বাবা-মায়ের মধ্যেই দেখা দিয়েছে।

করোনা সম্বন্ধে সাধারণ সচেতনতা প্রয়োজন

সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যানে মানুষ জানতে পারছে এই ভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব সম্বন্ধে। এক ধরনের দুশ্চিন্তা মনে তৈরি হচ্ছে, যখনই আমরা জানছি বিশ্বব্যাপী কতজন আক্রান্ত হয়েছেন বা কতজন প্রাণ হারিয়েছেন। এ কথা ঠিক যে এই ভাইরাস বিষাক্ত। কিন্তু এও ঠিক যে অনেক করোনাভাইরাসই আমাদের পরিমণ্ডলে অবস্থান করছে। মাঝে মাঝেই যে ইনফ্লুয়েঞ্জা (influenza) বা ফ্লু-জাতীয় রোগ আমাদের শরীরে হয় সেগুলো ঐ ভাইরাসের প্রকোপেই হয়ে থাকে। যদিও সেগুলো খুব মারাত্মক নয়। সাম্প্রতিক যে করোনাভাইরাস পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পরেছে সেটি নতুন, নাম SARS-CoV-2।

এই নতুন করোনাভাইরাস এক ধরনের SARS ভাইরাস। SARS, অর্থাৎ Severe Acute Respiratory Syndrome। সাধারণভাবে জন্তু-জানোয়ারের শরীর থেকে আসা এই ভাইরাসের সঠিক উৎপত্তিস্থল এখনও জানা যায়নি। ঠিক কোন পশুর শরীরে এই ভাইরাস বেশী পরিমাণে মজুত তা এখনও পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়ে ওঠেনি। এমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায়নি, যে পোষ্যপ্রাণী বা সহাবস্থান করা কোন পশু ক্যারিয়ারের মত মানুষের শরীরে ভাইরাসকে ট্রান্সফার করে দিতে পারে।

প্রথম যে সংক্রমণের ঘটনাটি ঘটেছিল সেটি ছিল চীনে, ২০০২ সালে। মাঝে মাঝে ছোটোখাটোভাবে ছড়িয়ে পরার খবর পাওয়া গেলেও ডিসেম্বর ২০১৯-এ চীনে অনেক বেশী সংখ্যক মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পরার খবর আসতে শুরু করে। ৩ মাসের মধ্যে প্রায় সমগ্র পৃথিবী এই ভয়াল ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

মানুষ থেকে মানুষে SARS-CoV-2 ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। এবং খুব বিস্তৃতভাবে।  যেহেতু বিক্ষিপ্তভাবে হয়নি তাই এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এবং, করে চলেছে। বিগত দু-দশকে যে কোন SARS ভাইরাসের তুলনায় এটি বেশী শক্তিশালী। যে ব্যক্তির মধ্যে এই রোগ দেখা দিয়েছে তার সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যান্য ভাইরাল ইনফেকশনের মতই।

যদিও, এটা জেনে রাখা দরকার যে এই রোগ সবচেয়ে সহজভাবে ছড়িয়ে পড়ে একজন মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া জলকণা বা ফোঁটা থেকে। ব্যাপারটা খুব সহজ – একজন যিনি খুব অসুস্থ নন তিনি হঠাৎ করে হাঁচলে বা কাশলে তাঁর দেহ থেকে কয়েক টন ভাইরাস বাতাসে ও পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। এই দূষিত বায়ু চারিপাশে অন্যান্য মানুষজনের মধ্যেও চলে আসে। এর মধ্যে আবার অল্প কিছু ভাইরাস, যা কোনো মানুষের গলায় বা নাকে কিছুক্ষণের জন্য ছিল, সেগুলো নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে আবার পরিমণ্ডলে বেরিয়ে আসে। এই বেরিয়ে আশা ভাইসারগুলি ভয়ঙ্কর। এগুলি কোথাও কোনো শরীরের ভিতরে না গিয়ে বিভিন্ন বস্তুর ওপরে নিঃশব্দে অবস্থান করে। আর অপেক্ষায় থাকে কেউ তাদের উপর হাত রাখবে। যে মুহূর্তে কেউ হাত রাখে এবং সেই হাত মুখে দেয় ভাইরাস সরাসরি তার দেহে প্রবেশ করে নেয়। ভাইরাসের পরিমাণ অর্থাৎ ভাইরাসের ডোস এবং মানুষের রোগ-প্রতিরোধ শক্তির উপর নির্ভর করে সেই মানুষটির শরীরে ভাইরাস কী প্রভাব ফেলতে পারে। যে মানুষের শরীরে প্রথম থেকে অন্যান্য রোগ বা শারীরিক জটিলতা আছে তাদের এই ভাইরাসের দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তবে এ বিষয়ে একটা কথা বলে রাখা জরুরী। এই ভাইরাস কিন্তু অন্যান্য SARS ভাইরাসের থেকে কম ভয়ঙ্কর। এবং সাথে সাথে এটাও বলে রাখা প্রয়োজন, এই ভাইরাস শিশুদের শরীরে আক্রমণ করার সম্ভাবনা যথেষ্টই কম।

ইনকিউবেশান (Incubation) পিরিয়ড – ভাইরাস যে সময়টা নেয়

সাধারণত, গড়ে পাঁচ দিন সময় লাগে লক্ষণগুলি পুরোপুরি দেখা দিতে। অর্থাৎ, সংক্রমিত হওয়ার পাঁচ দিন পরে। কিন্তু, তার পরেও সংক্রমণ ধরা পড়তে পারে। এক থেকে পনেরো (১ – ১৫) দিনের মধ্যে যে কোনো দিন সংক্রমণ হতে পারে। পনেরো (১৫) দিনের পর অবশ্য সম্ভাবনা খুব কমে যায়।

করোনাভাইরাস রোগের সময়কাল

এখনও পর্যন্ত এই রোগের বিস্তার সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে জানা হয়ে ওঠেনি। শিশুদের ক্ষেত্রেও তাই। তিনটে ধাপে বা স্টেজে SARS-CoV-2-কে ভাগ করা যেতে পারে। প্রত্যেক ধাপ বা স্টেজ মোটামুটি এক সপ্তাহ ধরে চলে।

স্টেজ ১ – এই স্টেজ সবচেয়ে প্রধান এবং মুখ্য। এক সপ্তাহের বেশী চলে। এই সময়ে শিশুর জ্বর আসে, তার সাথে মৃদু কম্পন। শুকনো খুক-খুকে কাশি, পেশীতে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং ডাইরিয়া দেখা দিতে পারে। এই সব সিম্পটম/লক্ষণ কিন্তু সবার মধ্যে আবার দেখা যায় না। কোনো একটা সিম্পটম বা বেশ কয়েকটা সিম্পটম/লক্ষণ রোগের সঠিক কারণ নির্ণয়ে সাহায্য করে – এরকমও বলা যায় না। যদিও, জ্বর আর গা-ব্যাথা সবথেকে সাধারণ সিম্পটম।

স্টেজ ২ – শিশু স্টেজ ২-তে যাবে কি না তা নির্ভর করে শিশুদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর এবং অবশ্যই ভাইরাসের বেড়ে ওঠার ক্ষমতার ওপর। এই স্টেজ ২-তে সর্দি, নাক দিয়ে জল পড়তে থাকা, গলাব্যাথা, এবং জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়া দেখতে পাওয়া যায়। যদিও রক্তের কাউন্ট এখনও নর্মালই থাকে।

যারা স্টেজ ৩-তে চলে যায় তারা গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পরে। অনেকেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট অনুভব করে। অনেকেরই শ্বাসক্রিয়া চালু রাখার জন্য সাপোর্ট নিতে হয়। এই স্টেজে রোগীকে হাসপাতালের সাহায্য নেওয়া উচিৎ।

করোনাভাইরাসের চিকিৎসা

ভ্যাক্সিন এবং ট্রিটমেন্ট সঙ্ক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে এখানে

এই মুহূর্তে করোনাভাইরাসের কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ভাইরাসের বিরুদ্ধে Antibiotic কাজ করে না। Antiviral থেরাপিও কার্যকরী হয় না। একমাত্র চিকিৎসা বিশ্রাম নেওয়া, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ করা আর পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় গ্রহণ করা। ওষুধ যা যতটুকু দেওয়া হয়ে থাকে তা ব্যথা আর জ্বর থেকে নিরাময় পাওয়ার জন্য। শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাহায্য করে, শরীরকে সময় দেয় যুদ্ধ করতে। একবার রোগ শনাক্ত হওয়ার পরে রোগীকে আলাদা করে রাখা খুব জরুরী। ট্রিটমেন্টের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক এটি। অন্যান্য লোকের থেকে রোগীকে পৃথকভাবে রাখা দুভাবে সাহায্য করে থাকে। এক, ভাইরাসটা ছড়িয়ে পড়তে পারে না। দুই, রোগী অন্যান্য রোগ-জীবাণু থেকে দূরে থাকতে পারে। রোগীরা এমনিতেই খুব দুর্বল হয়ে পরে এই সময়। নতুন কোন জীবাণু শরীরে ঢুকলে সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধের কয়েকটি উপায়

১। ভ্যাক্সিন – কাজ চলছে! https://www.childhealth-explanation.com/coronavirus-disease-vaccine-and-treatment-important-update.html

২। দূরপাল্লার যাত্রা না করাই ভালো।

৩। অনেক জনসমাগম থেকে দূরে থাকা উচিৎ!

৪। মাঝে মাঝেই হাত ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষত খাওয়ার আগে এবং মুখে হাত দেওয়ার আগে।

৫। প্রয়োজনে সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করুন, পাবলিক প্লেসে সাহায্য করতে পারে।

৬। কারুর মধ্যে যদি সিম্পটম দেখেন তার থেকে দূরে থাকুন।

৭। বন্যপ্রাণী বা খামার প্রাণীর থেকে দূরে থাকাই ভালো।

৮। আগামী সপ্তাহগুলি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করুন, পাব বা পার্টি এড়িয়ে চলুন।

৯। সমস্যা দেখা দিলে ভয় না পেয়ে, অস্থির না হয়ে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

References:

1. Chih-Cheng Lai, Tzu-Ping Shih, Wen-Chien Ko, et al. Severe acute respiratory syndrome coronavirus 2 (SARS-CoV-2) and coronavirus disease-2019 (COVID-19): The epidemic and the challenges. International Journal of Antimicrobial Agents, Volume 55, Issue 3, 2020, https://doi.org/10.1016/j.ijantimicag.2020.105924.

2. Lauer SA, Grantz KH, Bi Q, et al. The Incubation Period of Coronavirus Disease 2019 (COVID-19) From Publicly Reported Confirmed Cases: Estimation and Application. Ann Intern Med. 2020; Epub ahead of print 10 March 2020. doi: https://doi.org/10.7326/M20-0504

3. Q&A on coronaviruses (COVID-19); 9 March 2020, WHO

Original text : https://www.childhealth-explanation.com/how-will-corona-virus-affect-my-child.html?fbclid=IwAR0a_uWM1oJ0ZJD_aVIpKieebN9YhEv2Mo-wlqsuNhokEY_bMmrkwXymX8s

Original Author : Dr Renuka Chatterjee

Translation by : Team Shobdo

Dr Renuka Chatterjee
(dr.renuka_chatterjee@yahoo.co.in)
Pediatrician, Blogger, Author

6 thoughts on “করোনাভাইরাস (COVID-19) এবং শিশু স্বাস্থ্য – কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  1. নতুন নর্মালের সাথে থাকতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে এই পোস্টে।

  2. প্রথমে বলি, পত্রিকার নাম টি খুব সুন্দর । নামের মধ্যে পেন এর ছবি টা ও খুব symbolic. খুব সুন্দর idea.
    খুব ভালো লাগলো short story গুলো পড়ে। মন ছুঁয়ে গেল।
    স‍্যামন মাছের সুস্বাদু experience ও খুব ভালো লাগলো।
    কবিতা গুলো তো খুব মিষ্টি।
    সব শেষে বলি, এই মারণ ভাইরাস নিয়ে লেখা খুব উপকারী আমাদের মত পাঠকদের। আরো কিছু information পেতে ইচ্ছুক।
    এই পত্রিকার জন্য আমার অনেক শুভকামনা ও শুভেচ্ছা রইল।

    1. শব্দ-র তরফ থেকে অনেক ধন্যবাদ। এক বিরাট পাওনা। নিশ্চয়ই, আমরা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, বিশেষত করোনা ভাইরাস নিয়ে, আরও লেখা পোস্ট করার চেষ্টা করব। এই রোগ ছড়িয়ে পরার জন্য মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে একটা রচনা শীঘ্র আসবে।

Leave a Reply to shobdothemagCancel reply

Discover more from Shobdo

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading