শান্তিনিকেতন ও বাউল সাধনা (পর্ব ১)

গানের মধ্য দিয়ে মানুষের সন্ধান

‘বাউল’ বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বিরল সম্প্রদায়। সে কেবলমাত্র গায়ক নয়, সে প্রকৃতির সাধক। সে শেখায়, উপদেশ দেয় না……প্রশ্ন রেখে যায়। বাউল সাধনা গানকে আশ্রয় করে, কিন্তু তার লক্ষ্য সুর নয়, বরং মানুষ। এবং মানুষ প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তার ঊর্ধ্বে নয়। এই কারণেই বাউল দর্শনের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি মানববাদ ও মুক্তচিন্তার এক স্বাভাবিক মিলন, যেটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু।

মধ্যযুগীয় বাংলায় পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে, যখন সমাজ ছিল জাতপাতের ও শাস্ত্রের কড়া কূ-সংস্কার আচ্ছন্ন বেড়াজালে বাঁধা, তখন বাউল দাঁড়িয়েছিল ঠিক তার বাইরে। সে প্রশ্ন তুলেছিল সরলভাবে। ঈশ্বর যদি সর্বত্র থাকেন, তবে তাঁকে দেয়ালের ভেতর খুঁজতে হবে কেন? সহজিয়া বৈষ্ণব ভাবধারা, সুফি সাধনা ও বৌদ্ধতান্ত্রিক চিন্তার মিলনে গড়ে ওঠে বাউল দর্শন। এখানে সাধনা মানে আচার নয়, নিজের ভেতরের দিকে তাকানো, নিজের বিশ্লেষণ করা। দেহই সাধনাক্ষেত্র। বাউল বিশ্বাস করে মানবদেহই সর্বোচ্চ সাধনাক্ষেত্র। দেহই আত্মার আধার। ঈশ্বর বাইরে নন, তিনি নিঃশ্বাসে, হৃদস্পন্দনে, চেতনার গভীরে, তিনি সত্তায়। এই সাধনার পথ সহজ, কিন্তু গভীর। লিখিত শাস্ত্র নেই, আছে গুরু–শিষ্য পরম্পরা। আড়ম্বর নেই, আছে প্রেম। যা একাধারে পথ এবং গন্তব্য। এই প্রেমের মধ্য দিয়েই বাউল খোঁজে ‘মনের মানুষ’, আত্মার আত্মীয়।

কোনো ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং মানুষের অন্তরের চেতনাসত্তা।

শান্তিনিকেতন

প্রশ্ন করার সাহস শান্তিনিকেতন বাউল তৈরি করেনি ঠিকই কিন্তু যা করেছে তা বিরল, সে বাউলের কথা শুনেছে, বুঝেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউল দর্শনে খুঁজে পেয়েছিলেন ‘মানুষের ধর্ম’। তাঁর কাছে বাউল সেই সাধক, যে ঈশ্বরকে খোঁজে মানুষের ভিতরে, মানুষের প্রেমে। আত্মায় ধারণ করে ঈশ্বরের ধারনা।

বিশ শতকের শুরুতে শান্তিনিকেতন এমন এক পরিসর হয়ে ওঠে, যেখানে বাউল আর কেবল লোকশিল্পী নন, তিনি এক চিন্তাশীল কণ্ঠ। বিশ্বভারতীর সাংস্কৃতিক পরিসরে বাউল গান জায়গা পায়, আর রবীন্দ্রসংগীতেও তার ছায়া পড়ে। একতারার এক সুর, বাউলের বাদ্যযন্ত্রও কম, কিন্তু অর্থ গভীর। একতারার একটিমাত্র তার স্মরণ করে যে সত্য এক। খমক, ডুগি, নূপুর, দেহের ছন্দ, জীবনের স্পন্দন। এই গান শোনার জন্য নয় – উপলব্ধির জন্য, নিজেকে প্রশ্ন করার জন্য।

আজকের বাস্তবতা হয়ত এটাই যে আজ বাউল গান অনেক সময় মঞ্চ ও বাজারের নিয়মে বাঁধা পড়েছে। এটা সত্য। সাধকদেরও পেট থাকে। তবু শান্তিনিকেতনের গুরুত্ব এখানেই। এই জায়গা আজও চেষ্টা করে চলেছে বাউলকে কেবল সম্পাদনকারী নয়, দার্শনিক মানুষ হিসাবে দেখতে। সাধক হিসাবে দেখতে। শান্তিনিকেতন বাউলকে বাঁধেনি, বরং একটু থেমে তার কথা শুনেছিল। এই থামাটুকুই আজ সবচেয়ে দামী। শেষ কথা বাউল সাধনা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এ এক মুক্ত মানবিক চর্চা। আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে বাউলের গান তাই এখনও জরুরি। সে মনে করিয়ে দেয়— মানুষই আসল পরিচয়, প্রেমই শেষ আশ্রয়। আত্মাই আত্মার আধার।

বাউল যখন বলে, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”, তখন তা কেবল কোনো দর্শনের উচ্চারণ নয়—এ এক গভীর জীবনের আহ্বান। তার গান মনে করিয়ে দেয়, অসংখ্য পরিচয় আর বিভাজনের ভিড়েও মানুষের অন্তরে কোথাও এক সহজ, নির্মল সত্য লুকিয়ে থাকে। আমার কাছে তাই বাউল কেবল লোকসংগীত নয়, সে এক চলমান প্রশ্ন, এক অন্তর্দর্শনের দরজা। এমনই এক সাধনের মার্গ যেখানে সাধক তার নিজের অজান্তেই সাধনা করে চলে। বাউলের গান থেমে গেলেও তার সুর আর ভাবনা দীর্ঘক্ষণ ধরে মনের গভীরে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকে। সে ভাবতে শেখায় খায়, নিজেকে বুঝতে শেখায়, চিনতে শেখায়।

তাই হয়তো কবিগুরু বলেছেন……

রাগ : বাউল তাল : দাদরা; রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) : 1317; রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) : 1910

[পরবর্তী খণ্ড শব্দ-র পরের সংস্করনে]

প্রবন্ধ রচয়িতা – পৃথ্বীজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.