আজকের বিষয় কফি, আর তার লাগি আমার হার্ট-ব্রেক। বার চারেক মত হয়েছে কফিকে কেন্দ্র করে আমার হৃদয়ের করুণভাবে ভেঙে পড়া। একে একে আসব, তবে এর মধ্যে বলে রাখা ভালো, আমি মূলত চায়ের ভক্ত ছিলাম, দেশে থাকাকালীন। চা খেতে শুরু করি ক্লাস ৭ নাগাদ মনে হয়। আসল ব্যাপার হল – বাবার চা খাওয়ার স্টাইল দেখে দারুণ লাগত, নকল করতে গিয়ে চা খাওয়া শিখে ফেলি।
ফিরে আসি কফিতে। কফি নাকি আফ্রিকা বা মধ্য-প্রাচ্যে কোথাও প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল। সে যেখানেই হোক, এক অপরিসীম প্রভাব জনমানসে সে যে বিস্তার করতে পেরেছে, তা ভাবলেও অবাক লাগে। যতদূর মনে পড়ে, অল্পবয়সে কফি খাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় কোনো একটা বিয়েবাড়িতে। সে এক বিরাট প্রাপ্তি ছিল; রোগা প্যাংলা গোছের হলে কি হবে, মোটাসোটা ছেলে মেয়েরা, যারা আমার বয়সী ছিল ওই অনুষ্ঠান বাড়িতে, তাদের বেশ কয়েক গোলে অনায়াসে হারিয়ে দিয়েছিলাম! এর পরে বেশ কয়েকবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তখন কলেজে পড়ি, একটা বিয়েবাড়িতে ওরকম একটা সিচুয়েশান তৈরি হল। কফির স্টল, সুগন্ধে চারিদিক ভরে গেছে, আর আমি কলকাতার হাওয়া গায়ে মাখিয়ে সবে একটু স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করছি। কফি খেয়ে চলেছি, সামনে বেশ কয়েকজন সুন্দরী রমণী। কত রকমের কায়দা করে কাপটা ঠোঁটে তুলে নিচ্ছি – একবার, অন্তত একবার, যদি একজনও তাকায়। জানিও না তারা কারা – মেয়ের বাড়ির না ছেলের দিকের। শুধু জানি, যশ চোপড়া ছবি বানিয়েছেন একের পর এক, যেখানে বিয়েবাড়িতে প্রেম অবশ্যম্ভাবী। ডান হাতে কফি কাপ, কিন্তু বাঁ হাত নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়া গেল। কোথায় যে রাখি ওটাকে। বইয়ে কোথাও পড়িনি। লাইফ সায়েন্সে লাইফের এত ইম্পরট্যান্ট একটা সমস্যা (এই, মানে, একটা আস্ত হাত ব্যাস্ত থাকলে আরেকটা হাত কোথায় রাখলে বায়োলজিক্যালী কারেক্ট হয়) সম্বন্ধে কিছুই পাইনি। সাহিত্য পড়েছি, কিন্তু সেখানে প্রেম-টেম ছিল না। নিজেকে কি করে স্মার্ট দেখাতে হয় সে সম্বন্ধে তো কিছুই লেখা ছিল না। এরকম ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেলে হাল ছেড়ে দিলাম। ফইজ সাহেবের কবিতা, তখন জানতাম না, এখন জেনেছি – শেষমেশ কাজ আর প্রেম দুটোই অপরিপূর্ণ অবস্থায় ছেড়ে দিলাম! কেউ তাকাল না, একজন ষণ্ডা মার্কা লোক একটু পরে এসে বলল, দুজন নাকি আমার নামে কমপ্লেন করেছে, হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম বলে। বাকি অন্য একজন তো চলে যেতে চাইছিল। কি বিপদ! সব দোষ ওই কফির। বা, ওই স্টাইল না জানার – বাবা বা অন্য কেউ যদি একটু বেশী কফি খেত তা হলে ভালো হত, নকল করতে পারতাম!
এরপরের গল্পটা আরেকটু দুঃখের।
তখন আমি আরেকটু ছোট, পুজোর সময়ের কথা। আমি আবার পুজোর দিনগুলোতে খুব সিরিয়াস হয়ে যেতাম। কে যেন বলেছিল, এই কদিন বেশীরভাগ ক্লাসমেটরা পড়াশুনো কম করে, বা করেই না। এই সুযোগ। এই সময়ে আমি যদি পড়া একটু এগিয়ে রাখতে পারি, তাহলে আমাকে দেখে কে! যদিও, পারতপক্ষে বড় একটা এগোতে পারতাম না। যাই হোক, পুজোর মধ্যে কোন একদিন বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করলাম ঠাকুর দেখতে বেরোবো। বেরোলাম, অনেক হেঁটে তারপর ক্লান্ত হয়ে একটা এগ-রোলের স্টলে দাঁড়িয়ে এগ-রোল খেতে শুরু করেছি, অমনি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি এসে পড়ল। কোচিং ক্লাসের একমাত্র ক্রাশ – আমাদের সামনে এসে উপস্থিত। পকেটে দশ টাকা, আর দোকানে কফি বিক্রি হচ্ছে। চাও ছিল, কিন্তু শুনেছি মেয়েটি বড়োলোক বাড়ির। কি জানি কি মাথায় হল, কফি বেটার হবে। নিলাম, হাল্কা চুমুক দিলাম, আর দেখছি তাকে। দেখছি বলা ভুল হবে, দেখে যাচ্ছি। এর মধ্যে ভাবলাম, একটু ইম্প্রেস করার চেষ্টা করি – পাশের বন্ধুর সাথে দুনিয়া-জাহানের বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলাম। চিনের সমাজবাদ কোনদিকে যাচ্ছে, বা ল্যাটিন-আমেরিকার ওপর কি প্রকার অত্যাচার হয়েছে, বা, ভারতবর্ষে জাতিভেদ কেন এখনও শেষ হল না – এইসব নিয়ে একের পর এক মতামত দিয়ে চলেছি। মানে, আমার বয়সের চেয়ে বড় বিষয়! উদ্দেশ্য একটাই – সে যেন আমার এত জ্ঞান শুনে আমাকে কিছুটা বুঝতে পারে। আর মনে মনে ভাবে, বাব্বা, বিজ্ঞানের ছাত্র হলে কি হবে, সব বিষয়ে কত মাথা! আর তখনকার দিনে নলেজ খুব আকর্ষণীয় ছিল। আমি বকবক করেই চলেছি, কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, এক চুমুক থেকে কমে সওয়া চুমুকে গিয়ে ঠেকেছে, কিন্তু জ্ঞানবর্ষণে কোন খামতি নেই। এরকম প্রায় এক ঘণ্টা মত চলল। অপরপ্রান্তের অপ্সরা আরেক বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল। এক কাপ চা হাতে নিয়েছিল। চা খাওয়া শেষে মুচকি হেসে বলল তার বন্ধুকে – কোচিং-ক্লাসে চুপ করে বসে থাকে আর বাইরে লম্বা-চওড়া বাত মারে এরকম মানুষদের আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না!
এখন এই বয়সে এসে একটু ঘাবড়ে গেলে ঘামতে থাকি, তখন, কান গরম হয়ে যেত। গেল গরম হয়ে। লাল হয়ে গেল। আর কিছু বলার থাকল না। রাগটা ঝাড়লাম কফির ওপর। না ওটা কিনতাম, আর না মনে একটা অভিলাষ তৈরি হত!
এর পরের গল্পটা মজার।
কলেজে থাকাকালীন একবার বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আসলে, আমার স্বভাবটাই ওইরকম। সহজে মিশতে পারি, ভালোও লাগে অন্য কাউকে জানতে, বুঝতে। আমি বেশ পপুলার ছিলাম সেই কারণে। ল্যাব, প্রোজেক্ট, লেকচার, সেমিনার এইসবের মাঝে সময় বের করতে পারা মুশকিল ছিল। তাও, একবার ক্লাসের কয়েকজন মিলে ডিসাইড করল, পার্কস্ট্রিটের কোন এক কফির দোকানে গিয়ে কফি খাবে। আমাকেও ডাকা হল। উদ্যোগ যিনি নিয়েছিলেন তিনি আমার বেশ ভালো বন্ধু, এক সাথে গ্রুপের কাজ করতাম। অনেক গল্প হত, ভালো লাগত সময় কাটাতে। তবে ওইটুকুই। অন্যান্য বন্ধুরা আমাকে ভালো করে বোঝাল, ভালো শার্ট পরে ওখানে যেতে বলল। তারপর চুল, দাড়ি যেন কেটে যাই। তাছাড়া, আরও কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে আমাকে, তার মধ্যে মূল যেটা, সেটা হল – বেশী জ্ঞানের কথা যেন না বলি। গান নিয়ে আলোচনা হলে তাতে যেন অংশ নি – ওই রফি, লতা, কিশোর, আশা, শুধু এই নিয়ে যেন না কচকচাই। আজকালকার গানও যে আমি জানি, আর ভালোই গাই, সেটা যেন সবাই বুঝতে পারে। আর বিশেষভাবে ওরা আমাকে অনুরোধ করল, সৌরভ আর সচিন এই তুলনায় যেন না যাই। মানে, যেটা দাঁড়াল, আমাকে নিজের ৭০% বাড়িতে ফেলে রেখে তবে যেতে হবে কফি খেতে। মেনে নিলাম, কেন না, উদ্যোগীনির প্রতি একটা অনুরাগ হয়ত মনে মনে ছিল। আমি দোকান থেকে একটা ভালো শার্ট কিনেই ফেললাম, তারপর একটা সেন্ট, একটু ক্রিম এইসবও কিনলাম। প্রস্তুত আমি। দু-দিন বাদে নতুন রকমের একটা অভিজ্ঞতা হবে – হাজার হোক, মফস্বলের ছেলে, কলকাতার বড় জায়গায় কফি খেতে যাবে। জিঙ্কস করতে চাইছিলাম না, কিন্ত মারফি সাহেব শেষ কথা বললেন। পরের দিন থেকে ধুম জ্বর, পেট ব্যাথা, আর লুজ মোশান! আর কি চাই! গেল কফি-যাত্রা নিপাতে। আরোহেই সুর ভুল! কতবার চেষ্টা করলাম বিছানা থেকে উঠে বাইরে ফোন বুথ থেকে কল করতে – তখন তো মোবাইল ছিল না। কিন্তু পারলাম না, উদ্যোগীনিকে জানানো পর্যন্ত গেল না। আবারও কফিকেই দুষলাম। কেন জানি না, তার কিন্তু এবারে, মানে অন্য সব বারের মতই, কোন দোষই ছিল না। যাই হোক, এর এক সপ্তাহ পরে কলেজে গিয়ে জানলাম, সে আর আমার গ্রুপে নেই, প্রোফেসরকে বলে গ্রুপ বদলে নিয়েছে। বন্ধুরা ছি-ছিক্কার করল – বলল, এতটাই নড়বড়ে আমি যে কোন রকমে দেখা দিতেও পারলাম না? কফি না হয় খেতাম না, অন্তত সশরীরে এসে একবার হাজিরা তো দিতে পারতাম? যিনি সব ঠিকঠাক করেছিলেন, প্ল্যান বানিয়েছিলেন, তিনি নাকি সারাক্ষন আমাকে পুরোদস্তুর মিস করে গেছেন! হায় রে!
শেষ গল্পটা মজা আর দুঃখ মিশিয়ে একটা জগাখিচুরি গোছের।
আরও কয়েক বছর কেটে গেছে। কর্মসূত্রে কলকাতার বাইরে। কাজের জায়গায় বন্ধু হয় না বড় একটা, তবে হয়ে গেলে দারুণ ব্যাপার। আমার হয়েছিল, মিথ্যে বলব না। বেশ ভালোই বন্ধুত্ব। এক সাথে সকালে অফিসে আসা, লাঞ্চ করা, বাড়ি ফেরা, মাঝে মাঝে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া – মন্দ চলছিল না। আমি আর সে, দুজনেই একটু একটু করে গ্রো করছিলাম, কাজের জীবনে আর নিজেদের জীবনে। ইন ফ্যাক্ট, কাজে উন্নতি হচ্ছিল। মন দিয়ে কাজ করতাম, আর ওকে অনেক হেল্প করতাম, ও তা স্বীকারও করত, বলত, আমি একদিন দারুণ পদে পৌঁছে যাব, ইত্যাদি। একদিন ঠিক করলাম কফি খেতে যাব, আর ওইদিনেই প্রপোজ করে দেব। প্রেম জীবনে একটাই দেখেছি – উত্তম-সুচিত্রার প্রেম। ইন্দ্রাণী, বিপাশা, চাওয়া-পাওয়া, সপ্তপদী – এই বইগুলো ল্যাপটপে দেখলাম। ডিভিডি ছিল। উত্তমকুমারকে নকল করব ঠিক করলাম, মুচকি হাসি, একটু হাল্কা চাউনি, আর গলার আওয়াজকে বাড়ানো, কমানো – আহা কি মাদকতা, কি অভিব্যাক্তি। অন্তত ১০% যদি আয়ত্ত্ব করতে পারি তাহলেই কেল্লা ফতে। দিন ঠিক হল, সে রাজীও হল এক কথায়। তারপর প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলাম, কাজে ফার্স্ট হতে হবে। সে আর আমি তো একই টীমে, তাগিদটা পুরো অন্য লেভেলের। সেদিন সে যখন ম্যানেজারের ঘরে যাচ্ছিল, আমার সাথে দেখা করতে এল। আমি কাজে ডুবে, মাথা তোলবার অবকাশ নেই। নতুন কোড লিখছি, একদম নিজের স্ট্যাম্প ফেলতে হবে সিস্টেমে। কথা বলতে পারলাম না, শুধু বললাম, সন্ধেবেলা দেখা তো হচ্ছেই, তখন অনেক কথা বলা যাবে। আমি একটু আগে বেরোলাম, একটা মেল লিখে দিলাম ওকে, কখন কটার সময় দেখা হবে সব জানিয়ে। আমি পৌঁছলাম নির্দিষ্ট সময় কফি শপে। এত ফ্রেশ আমাকে কখনো লাগেনি। বারবার টয়লেটে যাচ্ছি আর নিজেকে দেখছি আয়নার সামনে – আর কীভাবে চোখটা ইউজ করা যায়, দু তিনবার মক অভিনয় করলাম, কি বলব, আর কি বলব না ঝালিয়ে নিলাম একটু। ফিরে এসে বসলাম, ঘড়ি দেখলাম, দেরি করছে কেন! এক ঘণ্টা, দু ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা পেড়িয়ে গেল, এল না সে। হারালো কি আঁধারেতে – কি জানি, কী ভুল করলাম। কী করা উচিৎ ছিল! তবে কি আরও আগে বলে দেওয়া উচিৎ ছিল, তোমাকে ভালবাসি, মন দিয়ে ফেলেছি। বাড়ি ফিরে এলাম। দুঃখ নিয়ে ঘুমোতে গেলাম, পারলাম না। পরের দিন অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে যাব, আরেকজন কলীগ এসে জানাল – প্রোজেক্ট পরের মাসে শেষ, আমাদের অন্য প্রোজেক্ট খুঁজতে হবে। সে কি! তাহলে আমার কাজটা, যেটা শুরু করেছিলাম, যেটা শেষ করলে আমাকে ক্লায়েন্ট খুব তারিফ করবে, সেটার কি হবে! আমি জিজ্ঞেস করলাম – বাকিরা কোথায় যাবে? সে বলল, গতকাল আমাদের মধ্যে কেউ একজন ম্যানেজারের সাথে কথা বলে অন্য প্রোজেক্টে চলে গেছে। কিউবিকালে মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, সে নেই। বুঝতে অসুবিধে হল না, আমার সাথে সে কেন কাল কফি খেতে আসেনি। আমাকে আর তার দরকার নেই। দুনিয়া এরকমই। যাক এবার আর কফিকে দোষ দিলাম না!
পুনশ্চ – যদিও লেখাটা প্রথম পুরুষে, অর্থাৎ, ‘আমি’ করে লেখা, এই ঘটনাগুলোর সাথে আমার ব্যাক্তিগতভাবে কোন যোগাযোগ নেই। এগুলি সবই কাল্পনিক। চরিত্রগুলিও সব কাল্পনিক। তবে, কোনটাই অবাস্তব নয়। সমাজে কফি আছে, এইধরনের ঘটনাও আছে, আমি আছি, আমরা সবাই আছি, আর উপরোল্লিখিত বিবরণে যে মানুষগুলোকে পাওয়া যাচ্ছে, তারাও আছেন! বাকিটা পাঠকদের ওপর ছেড়ে দিলাম!
লেখক – অন্বেষ মুখোপাধ্যায়
