আজ বুধবার। সৌম্য খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। এত সাত সকালে ওঠার কারণ হল, ওকে আজ দশটার মধ্যে এল্গীন রোড পৌঁছতে হবে। আর পৌঁছে সোজা ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এই সপ্তাহের মধ্যে প্রোজেক্টের ফিডব্যাক না পেলে খুব ঝামেলায় পরবে সৌম্য। ঘটনা হল, যে কোন ছোট সফটওয়্যার কোম্পানিতে আজকাল কাজ পেতে গেলে একটা বা দুটো প্রোজেক্ট এক্সপিরিয়েন্স দরকার। কিন্তু চাকরিতে না ঢুকে কোথায় ভালো প্রোজেক্ট পাওয়া যাবে! কেউ সহজে নিতে চায় না। মুরগী আগে না ডিম আগে – কে কাকে বোঝাবে! সৌম্য অনেক চেষ্টা করে পেয়েছিল এই একটা প্রোজেক্ট। ছেলের চেষ্টার ত্রুটি নেই। মাথা কত শার্প বলা মুশকিল, কিন্তু ওই, একবার প্রেমে পড়লে নিজেকে তো নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হয়।
আজকের দিনটা সৌম্যর কাছে আরেকটা কারণেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজ কোয়েল ফিরছে ওর মামারবাড়ি থেকে। কোয়েল, মানে সৌম্যর প্রেম, ওর জীবন, ওর সব উৎসাহের উৎস। পাক্কা এক মাস দশ দিন পর – কীভাবে ও যে এতদিন কাটিয়েছে সে একমাত্র ওর প্রেম-দেবতা জানে। হ্যাঁ, আজকাল সৌম্যর লাইফে একটাই দেবতা – তিনি যিনি প্রেমে সাহায্য করেন। সৌম্য জানে, তিনি আছেন কোথাও। সকালে ঘুম থেকে তুলে দেন, শরীরচর্চা করার সময় পাশে থাকেন, যখন যেমন দরকার পড়াশুনোয় হেল্প করে দেন, আর একদিন ঠিক কোয়েলের সাথে মিলিয়ে দেবেন। দুটো জীবন এক করে দেবেন – কিন্তু সৌম্য অন্যদের মত কাজ ফুরিয়ে গেলে সেই দেবতাকে ভুলে যাবে না। একটা আঁকিয়েকে দিয়ে একটা ছবি বানাবে, ও মনে মনে জানে দেবতাকে কেমন দেখতে – সেইমত চিত্রকরকে বলে দেবে। আর তারপর সেই ছবিটা বাড়িতে ঢোকার মুখে টাঙ্গিয়ে রাখবে।
“মা, তাড়াতাড়ি খাবার দাও, সারে সাতটার বর্ধমান লোকাল মিস হলে আমার নামে মিসিং ডায়েরী করতে হবে।”
মা ধীরে ধীরে এসে খাবার টেবিলে বসলেন, সৌম্যকে খেতে দিলেন। তারপর খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগলেন। প্রথম পাতাটা মন দিয়ে দেখতে শুরু করলেন।
“কি এত রোজ খবরের কাগজ পড়ো তুমি?”
“তুই আর কি বুঝবি বল? একার সংসার। উনি গত হয়েছেন পাঁচ বছর হলো। ওনার বিষয় সম্পত্তি সব আমার দায়িত্বে। মেয়েটা অত দূরে থাকে, তোর এখনও কিছু হিল্লে হলো না। রাজনীতি, পাত্রী চাই, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে রাশিফল, সিনেমা সব একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নেওয়া দরকার। আজকালকার খবরের কাগজ তোর চোখ আর কান খুব ভালোভাবে খুলে দেবে। আর সব পড়া হয়ে গেলে দেখে নি আজকের তারিখটা। বয়স বাড়ছে। দিনক্ষণ সব মনে রাখা উচিত।” – মায়ের জবাবের দৈর্ঘ্য যতটাই হোক না কেন, সৌম্য, মানে আমাদের বুবুকে সবটা শুনতেই হবে। না শুনলেই ভয়ঙ্কর সমস্যা।
বুবু শুনল সব। খাবারটা শেষ করল। মাকে বলল, “বিকেল পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসবো।”
মা আর বুবুর সম্পর্ক খুব সুন্দর। একদম সিনেমায় যেমন হয়। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তো বুবু আরও সন্তর্পণে থাকে – মায়ের একটু কিছু হলেই ছেলে পাগল হয়ে যায়। বুবু জানে মা কত কষ্ট করে ওকে মানুষ করেছে। বাবা থাকত না, কাজের সুত্রে অন্য শহরে থাকত। মাঝে মাঝে আসত। মা বকাবকি করত বুবুকে, কিন্তু মারধর কোনদিন করেনি। বুবু পড়াশুনোয় মোটামুটি ছিল। কিন্তু মনোযোগের অভাব একটা চিরকাল ছিল – আসলে, বাবাকে খুব মিস করত। দেখত, ক্লাসের অন্যান্যরা কেমন বাবার সাথে স্কুলে আসে, ও দেখে মনে মনে দুঃখ পেত। কিছু একটা লিখতে বসেছে, টপিকটা ভেবেও নিয়েছে, মানে কোন প্রবন্ধ, বা উত্তর – হঠাৎ, মন চলে যেত বাবার কাছে। মুহূর্তের জন্য ভুলে যেত কি লিখছে। সবসময় একটা ছটফটে ভাব – সব কিছু করেও কিছু একটা ভুল হয়ে যেত। মা কাছে টেনে নিত, বুঝত ছেলের কষ্ট কোথায়। মা নিজের মনকে সান্ত্বনা দিত – কত পরিবারে তো বাবা থেকেও থাকে না। সারাদিন ঝগড়া-অশান্তি চলতে থাকে, তাদের সন্তানদেরও তো মানুষ করতে হয়।
যাই হোক, বুবু আমাদের চলল কলকাতার পথে। প্রথমে যেতে হবে স্টেশন। সাইকেলে চেপে কানে একটা ওয়াক-ম্যান লাগিয়ে ছুটল স্টেশনের দিকে। ‘সাথিয়া’ সিনেমার গানগুলো খুব প্রিয়। প্রথম গানটা চালিয়ে দিল। কিন্তু গানের বদলে শুরু হল কিছু কথা, “শোন বুবু, তোর মায়ের বয়স বাড়ছে। তোর বাবা অনেক টাকা রেখে গেছে। ওনার সারাজীবনের একটাই ঝোঁক ছিলো – রোজগার করা। ওই টাকা দিয়ে একটা পানের দোকান খোল। ভালো চলবে। আজ চলবে। কাল চলবে। পরশুও চলবে। লোক পান খাওয়া কোনোদিন ছাড়বে না। আর আমি ভেবে দেখলাম, তোর জন্য ওই মেয়েটাই ভালো। ওই যে কোয়েল। তোর সঙ্গে বাদ-বিবাদ করে কোন লাভ নেই। একটু আধটু বয়সে বড় হলে আজকালকার দিনে কিছু এসে যায় না। তবে হ্যাঁ, শর্ত একটাই, পানের দোকান। নে, এইবার গান শোন।”
সৌম্য অবাক হয়ে ভাবল, কি দুর্দান্ত সময়-জ্ঞান! একটা গানে এক মিনিটেরও কম একটা ইন্টারলিউড পিস ছিল। ওইটুকু সময়ের সদ্ব্যবহার মা কি নিপুণভাবে করেছে!
কোয়েলকে সৌম্যরও খুব পছন্দ। তবে কোয়েলের কিছু খুঁত আছে। একটু থপ থপ করে হাঁটে। ছোটবেলা থেকে পরিচিতি। কচ্ছপ হত কোয়েল। আর বুবু হত খরগোশ। দুজনে মিলে সেই খেলাটা খেলত। মানে, কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়। আর সেই ছোটবেলা থেকেই একজন খরগোশের গুনগুলো নিজের মধ্যে নিয়ে বসে আছে, আর আরেকজন কচ্ছপের মতই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। টুক টুক করে সে মেয়ে অনেক দূর পৌঁছেছে। প্রথমে বি এ, তারপর এম এ এখন চলছে, পি এইচ ডি করবেএর পরে। বিষয় ভূগোল।
কোয়েল বুবুর থেকে এক বছরের বড়। ওদের গভীর আলাপ কোচিং ক্লাসে গিয়ে। সেও এক ঘটনা। চারুবাবুর কোচিং, বায়োলজি পড়াতেন উনি। বুবু সব বন্ধুদের জানাল কোথায়, কোন দিন চারুবাবু ক্লাস শুরু করবেন, কটার সময় যেতে হবে ইত্যাদি। এবার মজা হল, ওই একই দিনে ক্লাস ৯ আর ক্লাস ১০ – এই দুটো গ্রুপের সবাইকে দুটো আলাদা ঘরে উনি আসতে বলেছিলেন। বুবু সব জেনেছিল, শুধু ওইটুকু খেয়াল করেনি। সাইকেল রেখে হন্তদন্ত হয়ে কোচিঙে এসে সোজা গিয়ে ঢুকে পড়ল কোয়েলের গ্রুপে। “আচ্ছা, চারুবাবু এখানেই পড়াবেন না?” কে একজন বলেছিল – “হ্যাঁ, তবে আপনাকে না, আপনার দাদা, দিদিদের। আপনি এক কাজ করুন, পাশের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করুন, বছর ঘুরলে ওই ঘর থেকে এই ঘরে না হয় আসবেন।” কোয়েল অবশ্য এই কথায় হাসেনি, অন্যরা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। কোয়েলের সেদিনই ভালো লেগে যায় বুবুকে। মানে একটু বেশী করে। তারপর অবশ্য অনেক জল গড়িয়েছে, পড়তে গিয়ে বারবার দেখা হত, নোট্স দেওয়া নেওয়া হত। তবে অবাক করার বিষয় – কে যে কার ওপর ডিপেন্ড করত এটা কেউ বুঝতে পারত না। আসলে, বুবু একা থেকে থেকে খুব দায়িত্ববান হয়ে গিয়েছিল। আর ওর সবাইকে নিয়ে চলবার একটা সহজাত প্রতিভা ছিল। সেন্স অফ হিউমর খুব ভাল তার ওপর। এইসব ওর ফেভারে গেছে।
বুবু নির্ধারিত ট্রেনে চেপে কলকাতা পৌঁছল। হাওড়া স্টেশন থেকে বাস ধরল। বাসের কন্ডাক্টর খুব উৎসাহ দিলো বুবুকে। এক নিঃশ্বাসে বলে দিল, “ভাই এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও, একদম দাঁড়িয়ে থেকো না।” একদম শেষ সীটে গিয়ে বসতে পারল। বসে বসে ভাবতে লাগল, আজ দিনটা খুব স্পেশাল। আজ সন্ধেবেলায় সে কোয়েলকে অনেক দিন পর দেখবে। সজলকে বলে রেখেছে, ছ’টা নাগাদ পাড়ার মোরে দেখা করবে। সজল হল কোয়েলের খুড়তুতো ভাই। বুবুর খুব পেয়ারের লোক। এজেন্টের কাজ করে দেয়। পাশে বসা ভদ্রলোক কাগজ পড়ছিল। প্রথম পাতা। বুবুর নজর এড়াল না, ‘মহেশতলার এজলা গ্রামে এক ছেলে তার পাশের বাড়ির একটি মেয়ের সাথে পালিয়েছে।’
প্রিন্সিপাল সাহেব ঘরের ভিতরেই ছিলেন। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি বুবুকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলল। বুবু একটা সোফায় বসে ভাবতে লাগল, আজ সে কি বলবে কোয়েলকে। এক মাসের গল্প বাকি পরে আছে। কোথা থেকে শুরু করবে। মনে পড়ল স্টেশনের কাছে একটা ভালো ফুলের দোকান আছে। ওই দোকানের গোলাপ কোয়েলের খুব প্রিয়। খান-কতক কিনে নিয়ে যাবে? তারপর ভাবল, না। পিয়ারিমোহনের সিঙ্গারা এর চেয়ে ভালো হবে। কোন জামাটা পরবে? হাফ না ফুল হাতা? কোয়েলের কোনো প্রেফারেন্স নেই, বুবু জানে। কি যে করবে, আর কি যে করবে না, কিছুতেই গুছিয়ে ভেবে উঠতে পারল না। আসলে, বুবুর এইটাই তো সমস্যা! কাঁধে বড় হয়েছে, স্বভাবে হয়ে উঠতে পারেনি। হেড-স্যারের ঘরে ডাক পড়ল।
বুবুর আরেকটা সমস্যা – স্বপ্ন দেখে ফেলে তাড়াতাড়ি। একটা প্রজেকশান মনের মধ্যে বানিয়ে ফেলে। এটা হবে, তারপর এটা হবে, শেষে এটা হবে, এইরকম। আর এর মধ্যে কোন একটা না হলেই মনমরা! কোয়েল কতবার বলেছে, “বাস্তব দুনিয়ায় থাকো, বুবু।” কে কার কথা শোনে। কোয়েল বই এনে দিয়েছে, অ্যাটমিক হ্যাবিটস। সে বই জানলার এক কোণে পড়েই আছে! এখনও কত স্বপ্ন দেখতে লাগল, এইটুকু সময়ের মধ্যে। কোয়েলের এম এ হয়ে গেলে কোয়েল একটা জব শুরু করবে। ও পড়াতে ভালবাসে, একটা নীল চুরিদার পড়ে কোয়েল ক্লাস নিতে যাবে। হাতে একটা টাইটেনের ঘড়ি থাকবে, মাঝে মাঝে টাইম দেখবে। আঙুলগুলো ছোট আর সরু, কিন্তু তীক্ষ্ণ। ওইগুলো দিয়ে বোর্ডে ম্যাপ আঁকবে। ক্লাসের ছাত্রছাত্রী অবাক হয়ে বলবে, “ম্যাডাম, জিওগ্রাফী যে এত ইন্টারেস্টিং হতে পারে, আপনি না পড়ালে জানতে পারতাম না।” কিন্তু, এটা কোন ক্লাসে হবে? মাধ্যমিকে না উচ্চমাধ্যমিকে? কোয়েলের যা যোগ্যতা তাতে ওর হাইস্কুলে চাকরি করা উচিৎ – কিন্তু সেখানে তো কেউ এরকম প্যানপ্যানানি কথা বলবে না! তারা তো সব নিজের ইচ্ছাতেই ভুগোল নিয়েছে – তারা এইভাবে প্রশংসা কেন করবে! অন্য কিছু একটা হবে – কোয়েল পপুলার হবেই। ঠিক এই সময় স্যার ডাক দিলেন!
“না সৌম্য, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেলো না। তুমি প্রোজেক্ট করছিলে না তুফান মেল ছোটাচ্ছিলে? একটা কন্ডিশন সাপোর্ট করেছো তো একটা বাদ পরে গেছে। একটা পাথ ঠিক তো আরেকটায় ভুল। টেস্ট-কেসগুলো ঠিক মত লেখো নি। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ে কমেন্ট মিসিং। আমি তোমাকে পাশ তো করিয়ে দিচ্ছি। তবে এও বলে রাখছি, তোমার উচিত তোমার থেকে বয়সে বড় কাউকে বিয়ে করা। আসলে কি জানো, আমিও খানিকটা এরকমই ছিলাম। এখনও কিছুটা ওই তোমার মতই আছি। ইউ কান গো মাই বয়। উইশ ইউ গুড লাক।”
এই বলে প্রিন্সিপাল সাহেব খবরের কাগজে মনোনিবেশ করলেন। প্রথম পাতা। পরিষ্কার লেখা, “এবারের গঙ্গাসাগরের মেলায় রেকর্ড ভিড়”।
প্রিন্সিপালের সাথে বুবুর সম্পর্কটা একটা অন্য পর্যায়ের। প্রথমবার যখন বুবু প্রিন্সিপালকে দেখে ক্লাসে, তখন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। কোট-প্যান্ট পরা, মোটা ফ্রেমের চশমা, চুলে জেল লাগানো, মাঝে মাঝে তির্যক হাসি, গভীর গোঁফ – মানে যা যা দেখে ভয় লাগতে পারে সব ওনার মধ্যে দেখে ফেলেছিল বুবু। তবে, দিন যত এগোল, সম্পর্ক বেশ মধুর হয়ে উঠল। বুবু পরিশ্রমী ছেলে, বুদ্ধি যেমনই হোক। মানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে একটু ড্যাশি হতে হয়, ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় – সেটা ওর মধ্যে পরিপূর্ণ ছিল। স্যারের একটা কথা বুবুর খুব ভালো লেগেছিল – “ইঞ্জিনিয়ারিং যখন পড়তে এসেছো তখন এক হাতে নোংরা ঘাঁটতে হতে পারে, আবার সেই হাত ধুয়ে নিয়ে ড্রয়িং করতে হতে পারে। আরেকটা হাত টীমমেটদের আগলে রাখতে ব্যবহার করতে হতে পারে।” একবার কলেজে একটা সেমিনারে বুবু খুব খাটল – যে ঘরে হবে সেটাকে ঠিকঠাক করা, চেয়ায়, টেবিল সব সেট করে রাখা, কে কোথায় বসবে তা মার্ক করে দেওয়া, জল, স্নাক্স ঠিক জায়গায় রাখা – এইসব প্রায় একা হাতে সামলাল। কিন্তু নিজের যে অংশটা প্রেজেন্ট করতে হত সেখানে সব গুলিয়ে ফেলল। স্যার রেগে গেলেন, তারপর দুঃখ করলেন। বললেন, “সৌম্য, নিজের দিকটা তো আগে দেখতে হয়! তাছাড়া, মনে রেখো, সব দিক সমানভাবে সামলাতে হয়। কিছু ওভার-লুক করতে নেই।”
যাক, যতই বকুক, সেদিনের কাজটা বুবুর মিটে গেল। এক মজারু এবং দয়ালু মানুষের দয়ায়। এবার সে ঝাড়া হাত পা। এবার শুধু চাকরি খুঁজতে হবে। জোর কদমে। কোয়েলকে বলবে না। ওকে বলা মানেই জ্ঞান শোনা। মেয়েমানুষের জ্ঞান শুনে শুনে বুবু অতিষ্ঠ। কিন্তু কি করবে। হাজার হোক, প্রেয়সী তো। দেখা হলেই কোয়েলের প্রথম কথা, “দৌড়াদৌড়ী বেশী করো না। যেখানে গেলে কাজ হবে, সেখানে যাও। যেটা করলে ফল মিলবে তাড়াতাড়ি, তার দিকে নজর দাও। দেখো আমাকে। কেমন আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছি। আমাকে দেখে শেখো। আর যে কাজটা করবে তাতে মন দাও। মিষ্টির দোকান, আলোর কারখানা, ওষুধের দোকান – যাতে হাত দেবে, তাতে মন দেবে। সিনেমা দেখতে গেলে শুধু সিনেমাই দেখবে, আসে পাশে দেখবে না। ফুটবল খেলার সময় শুধু ফুটবলই খেলবে, স্টাইল মারবে না। খবরের কাগজ পড়ার সময় তারিখ, দিন থেকে শুরু করে সব কটা পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বে।”
বুবু-কোয়েলের এই সম্পর্ক আকাশে বাতাসে এক অপরূপ অনুভূতি নিয়ে আসত। সেদিন সেই বিকেলেও এনেছিল। এই ধরনের সম্পর্কগুলো সাধারণত এমনই করে থাকে। অনুভূতি থেকে আসে আবেশ, আবেশের হাত ধরে আসে একটু নিদ্রা, আর নিদ্রার পরেই আসে খিদে। ফেরার ট্রেনের মাঝপথে বুবুর খুব খিদে পেয়ে গেলো – হঠাৎ করেই।
ট্রেনে একটা ঝালমুড়ি-ওলা উঠেছিলো। বুবু ছেলেটাকে ডাকল। একটা ঝালমুড়ি চাইল। ছেলেটা বেশ পরিষ্কার একটা কাগজকে তেকোনা করে একটা ঠোঙা তৈরি করল। তার মধ্যে তেলে বজবজে মুড়ি, আনুষঙ্গিক কয়েকটা দ্রব্য আর এক ফালি নারকেল পুরে বুবুর হাতে দিল। খবরের কাগজের ঠোঙাটা ধরে বুবু দু-খাবল মুখে দিল। খুব খিদে ছিল। নিমেষে শেষ হয়ে গেল ঝালমুড়ি। হঠাৎ বুবুর চোখ পড়ল ঠোঙাটার ওপর। আরে, এত আজকের কাগজটাই! ছেলেটির সঙ্গে ওর কি মিল! ছেলেটি হয়ত দেখার সময়ই পায় নি যে এটা আজকেরই কাগজ। ওই তো, মেয়ে পালানোর খবরটা নিচের দিকে, আর গঙ্গাসাগর ওপর দিকে। আর ওটা কি লেখা? আজকের তারিখটা কি? আরে, আজ তো তেরোই মার্চ। যাহ, এত বড় ভুল? কোয়েল তো বিশে মার্চ, মানে ,পরের বুধবার ফিরছে!
মনে মনে বুবু কিছু একটা বলল। কেউ শুনতে পেল না, কেবল একজন ছাড়া – ওর সেই প্রেম-দেবতা।
লেখক – অন্বেষ মুখোপাধ্যায়
