পীট ই পান্না, এ কোন রান্না!

রচনা – অন্বেষ মুখোপাধ্যায়

সুইডেনে থাকাকালীন অনেক রকমের রান্না খাওয়ার বা চাখার সুযোগ আমার হয়। তার মধ্যে কিছু কিছু উপভোগ করি, কিছু পছন্দ হয় না। যেমন, ব্লাড পুডিং – যে আমি মোটামুটি কোন কিছুই খেতে বাকি রাখিনি, সেই আমি মুখে তুলতে পারিনি এই অখাদ্যটি। কোন এক জন্তুর (নাম আর প্রকাশ করলাম না!) রক্ত দিয়ে বানানো এই কুখাদ্য। আবার তেমনি, ২০০৬ সাল হবে – অফিসের ক্রিস্টমাস পার্টিতে খেলাম রাইস পুডিং। কি সুস্বাদু! মনে হল কত বছর পর পায়েস খেলাম। তো এরকমই আর কি। কখনো ভালো, কখনো মন্দ। রবি ঠাকুরের কথায়, কান্না হাসির দোল দোলানো।

২০০৭-এর সময় থেকে আমার ভিতর বেশ একটা কেতা ভাব আসতে শুরু করে। ভালো জামা পড়ব, ভালো খাব, ভালো ঘুরব – এইসব নিয়ে আমি মেতে আছি। সেই কবে রায় সাহেবের এক সিনেমা দেখেছিলাম, গুগাবাবা। তার পর বাবাও বলেছিলেন বেশ মনে পরে – পড়তে, খেতে আর ঘুরতে পারলে মানুষ আর কিছু চায় না। এগুলোই হল আইডিয়াল জিন্দেগীর প্যারামিটার। বাবা আর আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল ছিল আর আছে। আমরা খেতে খুব ভালবাসি, কিন্তু খুব খেতে পারি না। তাই জন্য, বাড়িতেও অনেক সময় খাবার একদিনে শেষ হত না। পরের দিন তাকে নেড়েচেড়ে গরম করে খাওয়া হত। মা অনেক চেঁচামেচি করতেন, কিন্তু লাভ কিছু হত না।

এই যে পড়ে থাকা খাবার, এই নিয়ে আমার একটা কৌতূহল ছিল। বাড়িতে মা আর রেণু পিসি মিলে ওই আগের দিনের খাবারটা পরের দিনে অন্যভাবে প্রেজেন্ট করে দিত – দিব্বি লাগত। কিছু বুঝতে পারতাম না। কিন্তু, বিদেশে এসে আমি অনেকবার এই করতে গিয়ে চরম ঠকেছি। একবার ডিমের তরকারির আলুগুলো দিয়ে মুরগির মাংস বানাতে গেলাম – সোজা ধরণীতলে। কি যে বিদঘুটে খেতে হয়েছিল! একবার আবার চেষ্টা করলাম – মাছের ঝোল বানিয়েছিলাম, তাতে মাছ সব খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, শুধু ঝোলটা পড়ে ছিল। সেই ঝোলে আলু, বেগুন, সিম এইসব দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে খেতে গিয়ে দেখলাম, হল না। বিকট, বিচিত্র স্বাদ হল, জীবনেও ভাবিনি যা।

এর মধ্যে একদিন অফিসের ক্যান্টিনে দেখা হল এক খাবারের সাথে। ক্যান্টিনে সে দিন খুব ভিড়, অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে একটা ডিশের অপেক্ষায়। একটা ডিজিটাল স্ক্রিনে সুইডিশ ভাষায় নামটা লেখা। কলীগরা বলল, এটা পীট ই পান্না, তাদের নাকি ভীষণ প্রিয়। পীট মানে মূলত লেফট-ওভার, অর্থাৎ, যা পড়ে আছে। আর পান্না হল একটা প্যান, বা পাত্র, যাতে রান্না হয়। ই মানে ইন। সব মিলে যা দাঁড়ায়, তা হল, একটা প্যানে পড়ে থাকা খাবার রান্না করা।

এতদূর বুঝে নিয়ে আমি নেমে পড়লাম মাঠে। দাঁড়ালাম লাইনে। একটু একটু করে এগোচ্ছে লাইন, আর আমি দেখছি জনগণের অভিব্যক্তি। কী আনন্দ তাদের চোখে মুখে। বহু বছর যারা বিদেশে কাটায় তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তন আসে। তার মধ্যে একটা পরিবর্তন হল – একটু হলেও চুপচাপ হয়ে যাওয়া। পশ্চিম বিশ্ব – বিশেষত, স্ক্যান্ডিনেভিয়া – খুব শান্ত জায়গা। মানুষ কম কথা বলে। রেগে-মেগে গেলেও একটা অদ্ভুত বর্ধিষ্ণু ভাব থাকে। একটা গ্র্যাভিটি ভাব। ঠিক তেমনই, খুব উত্তেজিত হয়ে গেলেও কীরকম যেন সামলে নিতে পারে। এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমার, যে, এই বিশিষ্ট খাবারটি এখানের মানুষের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। বার বার দেখছিলাম উঁকিঝুঁকি দিয়ে, কি দিচ্ছে শেষমেশ পাতে।

যাই হোক, এরকম করতে করতে আমার টার্ন এল।

একটা ধবধবে সাদা থালাতে যা যা পেলাম তা হল – ডুমো ডুমো আলু ভাজা, শুয়োরের মাংস, তাও হাল্কা ভাজা, একটা তরতাজা ডিমের পোচ আর একটা বীট-রুট স্লাইস করে কাটা, মনে হল একটু বোধহয় ভাপিয়ে নিয়েছে। প্রথম দেখাতে প্রেম বা ভালো লেগে যাওয়া, এরকম অনেকবার হয়েছে আমার। মানে, জিনিস বা মানুষ দুই! কিন্তু এবার হল না। এবার হল না তার সঙ্গত কতগুলো কারণ আছে। প্রথমত, যে কোন খাবারের গুণাবলী বিচার করার আগে বিচার করার প্রয়োজন তার অবয়ব আর সুবাস। এক থালা জিনিসপত্র ভর্তি, অথচ, তা থেকে না আসছে পর্কের সুবাস, না ওই পোচের কোনো স্মেল। আলুগুলোতো দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না। আর বীটের ভক্ত আমি কোনদিন নই। বেশ মনে পড়ে মাকে অন্তত এক সপ্তাহ ধরে আমাকে বোঝাতে হয়েছিল ওই বীট জিনিশটা আসলে কি!

থালাটা নিয়ে বসলাম। একটু গ্লাসে জল নিয়েছিলাম। কলীগরা যথারীতি জিরো বিয়ার নিয়েছিল। আমি আবার ওই বস্তুটি কোনদিন খুব ভালবাসতে পারলাম না। বিয়ার যদি খাব তো কিক করানোর জন্যই খাব। নন-এলকহলিক বিয়ার!!! কী জানি। যদিও ওরা বলেই চলল এই পীট ই পান্না-র সাথে ওই বিয়ার নাকি খুব জমে যায়।

শুরু করলাম খাওয়া। কন্টিনেন্টাল খাওয়ার একটা পদ্ধতি আছে। পাতে যা আছে তাকে ছোট ছোট অংশে কেটে নিতে হবে। তারপর সবগুলো অংশ কাঁটা চামচের মধ্যে গেঁথে নিয়ে তারপর এক সাথে মুখে পুরে দিতে হবে। যদি সস থাকে তাহলে তাকেও একটু ছুঁয়ে দিতে হবে চামচে। মুল ব্যাপারটা হল, সব স্বাদগুলো একসাথে যেন মুখের মধ্যে গিয়ে পৌঁছয়। আর খাওয়ার পুরো সময়টা মুখ বন্ধ রাখতে হবে, একটু একটু করে খেয়ে যেতে হবে। গোগ্রাসে নয়, ধীরে ধীরে।

জীবনে আমি অনেকবার অবাক হয়েছি। এবং আগামী দিনেও হব। আমি স্বপ্নবিলাশি, কিছুটা আবেগপ্রবণ চিরকাল। বেশী ভেবে ফেলি, বেশী প্রত্যাশা আমার, ধাক্কাও বেশী খাই। কিন্তু, কখনো কখনো এমনও হয় – আমি ভাবি ভুল হল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ঠিক হয়ে গেল। যে খাবারটা কিনে চরম ভুল হয়ে গেছে মনে হচ্ছিল, ক্ষুধা-দেবীর পরম আশীর্বাদে সেই খাবার যেন অমৃত-সমান মনে হতে লাগল। ছোট ডুমো আলুগুলো নরম, রসালো অথচ নিজের মত। কোনভাবে পর্কের স্বাদের সাথে মিশে যায়নি। আবার ডিমের পোচ কতই তো খেয়েছি, কিন্তু যতবার খেয়েছি একইরকম লেগেছে। এবারে একটু অন্য ঠেকল। জাস্ট একটু অন্য। এই অন্য লাগাটা কেন হল বলা মুশকিল। মোটের ওপর বলতে গেলে মনে হয় ওই ডিমের হলুদ অংশের সাথে মাংসের টুকরো মিলেমিশে একটা নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। এখনও কিন্তু একটা আইটেম বাকি রয়ে গেছে – ওই বীট রুট! বীট যে এত সুস্বাদু হতে পারে জানা ছিল না। আসলে, বীটের নিজস্ব কোন গুণাবলী তো কোনদিন চোখেই পড়েনি। শেষমেশ এমন হল, কাঁটা চামচে একটু পর্কের পিস, একটু আলু, একটু ডিম আর একটু বীট – এইসব একসাথে গেঁথে খেতে লাগলাম। আর এখানেই আমার পয়সা উসুল!

এর মধ্যে একটা কথা বলা হয়নি। কন্টিনেন্টাল খাবারে, বিশেষ করে যদি মীট থাকে ডিশে, সেক্ষেত্রে নুন আর মরিচ খুব জরুরি হয়ে পড়ে। এই পিট ই পান্না-র ক্ষেত্রেও তাই। একটু মরিচ দিলে একেবারে জমে যায়। প্রথমবার অতটা খেয়াল করিনি বা বুঝিনি, পরে কয়েকবার যখন খেলাম তখন বুঝলাম। যাই হোক, পাত সাফ হয়ে যায় যতবার খাই। আমার প্রিয় খাবারের একটা। তবে এই পেটুক আমি কিন্তু নিজে কোনদিন এই রান্নাটা চেষ্টা করিনি। করবও না। তার কারণ প্রথমত, এটা কোন রান্নাই নয়! এটা অনেকটা সেই লেগোর মত, পিসগুলো কোনভাবে জুড়ে দাও, একটা কিছু হয়ে যাবে। না, ও আমার ধাতে সইবে না! কিন্তু তাই বলে কি কেউ করে দিলে খাব না? না, তা হবে না। যেখানেই হোক, ছুটে যাব। কিছু একটা সহজ সরল ব্যাপার আছে এই রান্নায়। অনেকটা রায়-সাহেবের কথায় – কঠিন সিনেমা বানানো সহজ, কিন্তু সহজ সিনেমা বানানো কঠিন। একদম এলেবেলে প্রস্তুত প্রণালি, অথচ, সব সমেত একটা দুর্দান্ত কম্বিনেশন।

পীট ই পান্না/ অতি সহজ এক রান্না!

পুনশ্চ, টিপ্স – আগ্রহী বন্ধুরা অবশ্যই এটি চিকেন, মটন অথবা ল্যাম্বের কুঁচো দিয়েও বানাতে পারেন। বহু বছর যাবৎ আমি পর্ক খাই না, তাই বাকিগুলো দিয়েই কাজ চালাই, বেশ লাগে!

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.