রচনা – অমৃতা দাস
আবিরা ভাল মেয়ে না।
আবিরার তাতে কিছু যায় আসে না।
আবিরা ভাবে ভাল হওয়ার সংজ্ঞাটা তো আসলে মানুষের নিজের গড়ে-পিটে তৈরি, নিজের স্বার্থে। তাই বোধহয় ভাল হতে গেলে মেনে নিতে হয় অনেক কিছু। আবিরা অনেক কিছু মেনেছে, আবার কিছুটা মানতে চায়নি বা পারেনি। তাই শেষ পর্যন্ত আবিরা ভাল মেয়ে হয়ে থাকতে পারেনি। আবিরা ভাল হয়ে থাকতে বা ভাল থাকতে কেন পারেনি তা নিয়ে অবশ্য কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। কেনই বা ঘামাবে, আবিরা কে?
পৃথিবীর অনন্ত কর্মযজ্ঞে মানুষ নিজের নিয়মে অবিরাম ঘূর্ণির মত পাক খেয়ে চলেছে। পৃথিবী জ্বলেছে দূষণে। সে দূষণ কখনো প্রকৃতিকে গিলেছে আর কখনো প্রকৃতি মানুষকে। জঙ্গলে কখনো বাঘ মানুষকে মেরেছে আবার কখনো মানুষ বাঘকে। প্রানশক্তির এই বিরাট রঙ্গমঞ্চে আবার পিঁপড়ের মতন কিছু অস্তিত্ব কয়েক মুহূর্তের জন্য জন্ম নিয়ে, তার স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনে হঠাৎই জ্বলে উঠে, কামড় দিয়ে, ক্ষণিকের জ্বালা উপহার দিয়ে পুটুস করে নিভে গেছে। মাটিতে মিশে গেছে চিরতরে। আবিরা তাদেরই একজন। অন্তত ও নিজে এমনটাই ভাবে। এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবননাট্যে ভাল হবার সমীকরণ মানতে হবে কে বলেছে?
ওর নাম আবিরা কে রেখেছিল তা ওর জানা নেই। কোনোদিন জানবার ইচ্ছেও হয়নি। আসলে আবিরা কোনকালেই কৌতুহলী স্বভাবের ছিল না। ইচ্ছে-টিচ্ছেও ওর বড় একটা হত না। কারণ যে দু-একটা খুচরো ইচ্ছে মনে আসত, তা জন্মাবধি ও কেবল দাবিয়ে রাখতেই শিখেছিল। ইচ্ছেকে দম দিয়ে চালু করতে শেখেনি। আবিরা দম দেওয়া পুতুল নয়। আবিরা ছিল কাঠের পুতুল। যে যেমন ভাবে সুতো টানত, আবিরাও তাদের তালে ঠিক তেমনি করে হাত পা নাড়ত। পুতুল খেলে তারা যখন হাঁফিয়ে যেত, তখন কাঠের হাতলে সুতো জড়িয়ে-পাকিয়ে শুকনো দোমড়ানো-মচকানো কাঠের পাটাতনের মতন আবিরা পড়ে থাকত মাটিতে। নিজের নামের মানে কি আবিরার তাও জানা ছিল না। একবার স্কুলের এক স্যার বলেছিলেন যে আবিরা শব্দের অর্থ নাকি রঙচঙে, বা রং, বা, এই জাতীয় কিছু… আজ আর ওর সেসব মনে পড়ে না ভাল। আজকাল চারপাশে রঙও ওর চোখে পড়ে না খুব একটা। সবটাই ধূসর ঘোলাটে ছাই-ছাই লাগে যার বাইরের পৃথিবীটা ওর কাছে আর একদমই আকর্ষণীয় নয়।
আগে অবশ্য আবিরার মনের ক্যানভাসের সবটাই রঙহীন ছিল না। আগে সবচেয়ে বেশি ফুটে থাকতো সাদা আর কালো। আবিরা ছিল সহজ তাই আবিরার কাছে মানুষও শুধু সাদা আর কালো এই সহজ ভাগে বিভক্ত ছিল। ওর মনে সাদা আর কালোর দুটো আলাদা তালিকা ছিল। ও আশপাশের মানুষগুলোকে নিজের ইচ্ছে মতন কখনো কালো বা কখনো সাদার তালিকায় জুড়ে দিত তাদের আচার-ব্যবহার অনুযায়ী। এই যেমন রুমি আপা সব সময় কালো তালিকাভুক্ত। আবিরাকে দুচোখে দেখতে পারত না। ওর নিজের চাচাতো দিদি – একসাথে এক বাড়িতে বড় হওয়া, কিন্তু আবিরার প্রতি ছোট থেকেই রুমির একটা চাপা আক্রোশ ছিল। আবিরাকে মার খাওয়াতে পারলে ও আনন্দ পেত। আবিরাকে কি আসলেই অনাথ বলা চলত? এতগুলো চাচা-চাচি, বেশ কয়েকজন ভাই-বোন, ভাবি। কিন্তু রুমি আপা সুযোগ পেলেই মনে করাতে ছাড়ত না যে আবিরা আসলে অনাথ, আবিরার মা বাড়ি পালানো আর ওর বাপটা মদ খেয়ে একদিন নদীতে ডুবে খালাস। আবিরা নিজের পরিচয়ের যে ছবিটা কোনদিন আঁকতে চাইত না, কেবল ভুলতে চাইত প্রাণপণে, রুমি আপা যেন বারবার সেই ছবিটাই ওর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে ওর চোখের পাতা টেনে ধরে বলত, “দেখ… ভাল কইরা চাইয়া দেখ তুই কাদের থেকে আইছিস।”
রুমি আপার মতন তার মা, অর্থাৎ, আবিরার বড়চাচিও অধিকাংশ সময় কালোর তালিকাতে থাকত। বড় চাচির ওর প্রতি আক্রোশের কারণ যদিও আবিরা জানত না। ও ভাবত বুঝি সবার বাড়িতে এমনটাই হয়। উঠতে-বসতে গায়ে হাত তোলা বুঝি সবারই বড়চাচির কথোপকথনের অন্যতম ধরন। মাতৃস্নেহ আবিরা চাচিদের থেকে আশা না করলেও কোনো ধরনের স্নেহই যে ওর কপালে জুটেছিল তা বলা মুশকিল। খুব ছোটবেলায় একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে সব মেয়েরা মিলে ঠেলাগাড়ির আইসক্রিম খাচ্ছিল। আবিরার কাছে পয়সা ছিল না। ওকে খাওয়াচ্ছিল ওর বন্ধু আমিনা। সেই দৃশ্য দেখে রুমি বাড়ি গিয়ে তার মায়ের কাছে নালিশ করল যে আবিরা নাকি রুমির জমানো পয়সা চুরি করে বাজারে আইসক্রিম কিনে ফুর্তি করেছে। সাগরমুখী নদীতে ভাসার সময় কুমিরের পালে পড়লে কুমির কি জ্যান্ত মাংসপিন্ডটাকে নিজেকে বাঁচানোর সুযোগ দেয়? বাড়ি ফেরার পর চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে মেঝেতে ফেলে চাচির সেই মার মনে পড়লে আবিরা বহুদিন বাদেও শিউরে উঠত। ছোটচাচি সেভাবে কোনদিন ওর গায়ে হাত তোলেনি। আসলে আবিরাকে নিয়ে তার তাপ-উত্তাপ কিছু ছিল না। তাই ছোটচাচিও আবিরার কালোর তালিকায় ছিল। বাড়ির কোণে-কোণে জমে থাকা ধুলোর মতনই আবিরা এক কোণে পড়ে থাকত। রাতের অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে নিজের শরীরে গা ঢাকা দিয়ে থাকা ক্ষতচিহ্নগুলোতে হাত বোলাতে বোলাতে ও ভাবতো এই কালো তালিকাটা কবে একটু ছোট হবে। নিজেকে প্রশ্ন করত মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন? কাউকে একটু ভালোবাসা দেওয়াটাই বা এত কঠিন কাজ কেন? আবিরা ভাবত বুঝি পৃথিবীতে আর সবার কাছেও ভালোবাসাটা এতটাই দুর্লভ! সেসময় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আবিরা অনেক চোখের জল ফেলেছে। আজ জল নেই। শরীর-মনের সবটাই শুকনো মরুভূমি।
অবশ্য ওর রাবেয়া আপা বরাবরই সাদা। রুমি আর রাবেয়া দুই বোন বিশ্বাস করতে আবিরার কষ্ট হত। রুমি আবিরার গোটা ছেলেবেলাটা বিষাক্ত করে দিয়েছিল। আর রাবেয়া এসে সবার অলক্ষে আবিরার বিষিয়ে যাওয়া ক্ষতে মলম লাগিয়ে যেত। রাস্তার ধারে অনাদরে পড়ে থেকে কুঁইকুঁই করা কুকুর বাচ্চার মত অসহায় চাচাতো বোনটাকে রাবেয়া কোনদিন সকলের সামনে আদর দিতে পারেনি। তবে আবিরার জন্য ওর বুক কাঁদত বটে। তাই সবার চোখের আড়ালে কখনো ওকে জড়িয়ে ধরত, মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, দুটো পয়সা স্কুলের ব্যাগে চুপিচুপি রেখে যেত, নিজের ভাগের কুলের আচার, মিষ্টি কিংবা ফল লুকিয়ে এসে আবিরার মুখে গুঁজে দিত।
চাচাদের সাথে ওর সম্পর্কটা ছিল দূরের দ্বীপের মতন। চাচারা শহরে কাজ করত। খুলনা, ঢাকা- এক-একজন এক এক জায়গায়। খুব অবস্থাপন্ন ওরা ছিল না। তবে কোনদিন খালি পেটেও ঘুমোতে হয়নি বাড়ির কাউকে। ওদের পৈতৃক বাড়িটা পুরনো হলেও ছিল বেশ বড়- অনেকগুলো ঘর, বড় ছাদ। চাচাতো ভাইগুলো বড় হবার পরে বাইরে চলে গেছিল বাপেদের মতো, কাজের খোঁজে। বাড়ির পুরুষদের অবর্তমানে সংসারের তখন সব আদেশ নিয়ম উপদেশের শেষ কথা বড়চাচি। তবে চাচারা বাড়ি ফিরলে কিন্তু চাচিদের গলা আর পাওয়া যেত না। এভাবেই এই লোকগুলোর হম্বিতম্বি, চেঁচামেচি, রোজনামচা, ভাইবোনেদের মারামারি দেখতে দেখতে যান্ত্রিক ভাবে কবে যে সতেরো পেরিয়ে আঠেরোর কাছাকাছি পৌঁছে গেল আবিরা টেরই পায়নি। রোগাটে শরীরে কখন যে জায়গায় জায়গায় চর্বি এসেছে, বুকের ওপরে দুটো ঢিবি উঠেছে আর কোথাও কোথাও দূর্বা ঘাস- তা নিয়েও আলাদা করে আবিরার বিশেষ কোনো অনুভূতি হয়নি। সাজগোজের বাহুল্য নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। ঈদের বরাদ্দ জামার বাইরে কেনাকাটার তাগিদও ছিল না। স্কুল গেছে, পড়া কিছুটা বুঝেছে, অনেকটা বোঝেনি। পরীক্ষা দিয়েছে, পাসও করেছে। কিন্তু আগামীকাল কি করবে, এই পড়াশোনা আগামী কালে কিসের কাজে লাগবে, কিভাবে কাজে লাগাবে কিংবা আগামীকাল ওর জন্য কি রেখেছে জমিয়ে, সেটাও ভেবে দেখেনি। আসলে আবিরা ভাবত যেভাবে চলছে এভাবেই বুঝি চলবে চিরটা কাল- সবার দৃষ্টির সামনে থেকেও দৃষ্টির বাইরে পড়ে থেকে, একই বাড়িতে একইভাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাচাতো দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল একজনের পর আরেকজনের। বাড়িতে নতুন ভাবিও এল এবং কয়েকটা নতুন বাচ্চা। তাদের বিনা মাইনের আয়ার কাজ করতে করতে, হাগা-মোতা সাফ করতে করতে, শীতকালে একগাদা করে কাঁথা কাচতে কাচতে আবিরা ভাবত এই এক নিঃশ্বাসে শেষ হয়ে যাবার মতন ছোট্ট মানুষগুলোরও অস্তিত্বের মূল্য এই বাড়িতে তার থেকে হাজারগুণ বেশি। আবিরার কাছে পরিবারের অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল চাচিদের চেঁচামেচি গালিগালাজ, রুমি আপার হিংসুটে ভাব, রাবেয়া আপার ক্ষণস্থায়ী লুকানো আদর এবং চাচাদের ধমক- “আবিরা কোথায় যাইতেছিস একা একা এমন সময়? সোজা ঘরে যা।” কিংবা “আবিরা তুমি সন্ধ্যাবেলা একা একা আমিনার লগে দেখা করতে যাবা না – এই আমার শেষ কথা”।
এমনই এক সন্ধ্যের কথা। বড় চাচা কদিন হল বাড়ি ফিরেছে শহর থেকে। সারা বাড়ি তটস্থ। বড় চাচির গলার আওয়াজ হঠাৎই যেন গায়েব হয়ে গেছে। সেদিন বিকেলে হঠাৎ সোহেল এল দলবল নিয়ে ওদের বাড়ি। সোহেল ওদের গ্রামের ছেলে হলেও সে বেশিরভাগ সময়েই থাকতো শহরে। এলাকায় তার সুনাম খুব একটা ছিল না। এলাকার লোকে সোহেলের চেলা-চামুন্ডাদের মেনে চলত এবং কিছুটা এড়িয়েও। সেদিন সোহেলের সাথে ভিতর ঘরে বসে বড় চাচা এবং ভাইদের কি সব আলাপ-আলোচনা হল অনেকক্ষণ। ওরা বিদায় নেবার পর চাচা বেরিয়ে এসে দালানে বড়দের সবাইকে জড়ো হতে বলল। চাচা তাদের কিছু খবর জানাল। সবশেষে ডাক পড়ল আবিরার। ওর বুকটা অজানা আশঙ্কায় কাঁপছিল। হঠাৎ ওকে আবার কি দরকার? আজ কি কোনো ভুল করেছে মারাত্মক? নাবিলা ভাবি যা যা কাজ দিয়েছিল সবই তো করেছে। বাচ্চাগুলোর দুধ আগের দিনের মতন বেশি গরম হয়ে যায়নি তো? নাকি সেদিন আমিনার সঙ্গে বাজারে গেছিল বলে চাচা রেগে গেছে? তবে কি এখন সবার সামনে মার পড়বে?
ও আসার পর চাচা গম্ভীর গলায় বলল, “আবিরা তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে জরুরি। মন দিয়ে শুনো।”
আবিরা ঘাড় হেলালো। চাচা বলল, “তোমার এখন বয়স সতেরো বছর। তুমি আর দুই মাসের মাথায় আঠারোতে পড়তেছ।” আবিরা চমকে উঠল। ওমা, ওর জন্মদিন এসে গেছে খেয়ালই করেনি! তবে চমকটা কয়েক মুহূর্তের। ওর জন্মদিনের আর কি গুরুত্ব! বড় চাচি হাতে দুটো পয়সা ধরিয়ে দিয়ে বলবে বাজার থেকে কিছু খেয়ে আসতে। ও বাজারে গেলে আমিনা হয়ত ওকে কেক কিংবা অন্য কিছু কিনে খাওয়াবে। ওদের গ্রামের বাজারে ভালো কেক পাওয়া যায় না। তবে যা মেলে তাই সই। আমিনাটা বড্ড ভালো, আবিরার সাদার তালিকায় প্রথম নাম। গত বছর টিউশনের টাকা জমিয়ে ওকে একটা জামাও কিনে দিয়েছিল। আবিরা মুখে মানা করেছিল আর কখনো দিতে কিন্তু ওর সুপ্ত ইচ্ছে যে এবছরও আমিনা ওকে একটা জামা কিনে দিক। আমিনা তো টিউশন পড়িয়ে দুটো টাকা পাচ্ছে। আবিরার তো কিছুই নেই। দিক না ওকে একটা জামা কিনে, ক্ষতি কি? একটা হলুদ সালোয়ার কামিজ ফুল ফুল কাজ করা আর এক রঙা গোলাপি ওড়না- “মনের মতন” নাটকের নায়িকাটা যেরকম পড়েছিল। আবিরার বুকের অতলে আকাঙ্ক্ষার শিখাটা মিটিমিটি করে জ্বলে উঠল। ওর ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিয়ে চাচার গলা ভেসে এল। চাচার আদেশটা আবিরের কানে কেমন যেন হুংকারের মতো শোনাল। “শোনো, বয়স যখন হইয়া গেছে তখন আর দেরি কইরা লাভ নাই। তোমার সঙ্গে আমি সোহেলের বিয়ে ঠিক কইরা ফেলেছি। সোহেল তোমার অচেনা নয়। ও এলাকার ছেলে, তোমার বড় ভাইয়ের দোস্ত। এই বাড়িতেও আগে এসেছে। সে তোমারে দেখছে এবং তোমাকে তার মনে ধইরাছে। আমাদেরও তাই আপত্তির কারণ নাই। তোমারে বিয়া দিয়া আমি দায়িত্বমুক্ত হইতে চাই। ঠিক তিন মাস বাদে আমরা তোমার আর সোহেলের বিয়ের তারিখ ঠিক কইরাছি। বিয়ের পর সে তোমায় লইয়া ঢাকা চইলা যাবে।”
কথার মর্ম বুঝতে সময় লাগল আবিরার। তার বিয়ে? সোহেলের সাথে? কিন্তু সোহেলের একবার বিয়ে হয়েছিল না? সোহেল রানার এক বোন ওদের ক্লাসে পড়ত। সেই তো বলেছিল সোহেল নাকি নিজের ব্যবসার কোন কাজে বউকে লাগাতে চেয়েছিল। বউ রাজি হয়নি আর তারপর থেকে তার কোন খোঁজ নেই। সোহেল বলেছিল বউ পালিয়ে গেছে কিন্তু সত্যিটা কি আজ অব্দি কেউ জানে না। সেই বোনটা এরকমও জানিয়েছিল যে সোহেল নাকি কি কি সব খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। তাই তার আব্বা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেজন্য সে আর গ্রামে ফিরলেও বাড়িতে না থেকে তার বন্ধুবান্ধবদের বাসায় ওঠে। আর এই সোহেলের সাথে আবিরার বিয়ে?!
সাদা-কালো মিশে গিয়ে আবিরার কাছে চারপাশটা ধূসর হয়ে উঠল। বিনা দোষে বিচারাধীন আসামীর মতন নিজের ঘরে গিয়ে অন্ধকারে বসে ও দেওয়াল দেখতে থাকল। ওর মনে হল দেওয়ালটা যেন সামনের দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছে ওকে জ্যান্ত চাপা দিতে। এক সময় নাবিলা ভাবি এসে সমন শুনিয়ে গেল- “আম্মা কইলেন তোমারে কইয়া দিতে যে সামনে শনিবারে কেনাকাটা করতে বেরোনো হইবে। আগে থেকে কইরা না রাখলে সমস্যা হইতে পারে।”
আবিরাকে নিরুত্তর দেখে ভাবি চেঁচিয়ে চেয়ে উঠল, “আরে উত্তর নাই ক্যান? বোবা হইয়া গেলে নাকি? ভুইলা যাইও না। সামনের শনিবার তোমার বিয়ের কেনাকাটা। দুপুরবেলা আমরা সবাই একসাথে বাজার যাইবো। তুমিও সঙ্গে যাবা।”
আবিরা অন্ধকারে নিশ্চুপ বসে রইল। ভাবি গজগজ করতে করতে চলে গেল- “একটা কথা জিগাইলেও উত্তর নাই। চড় মারলেও কান্দে না। বিয়ের খবরেও হাসে না। এ কেমন মাইয়া জানিনা…”
পরে আমিনা খবর শুনে ফেটে পড়ল রাগে। “কি কইলি? সোহেলের সাথে তোর বিয়ে ঠিক কইরাছে ? ও আল্লাহ! তোর বড় চাচা কি এক্কেবারে পাগল হইয়া গেল? আর কাউকে পাইলো না শেষে কিনা ওই সোহেল? লম্পট কোথাকার একটা! তোর চাচা জানেনা ও আগে একবার বিয়ে কইরাছিল। বউটাকে তো রাখতে পারে নাই। একথা তো এখানে অনেকই জানে। আমার ভাবির দেশের মাইয়া ছিল। ভাবি আমারে কইছে যে সোহেল লোক ভাল নয়। ও শহরে বাজে ব্যবসা করে, মেয়েদের ভুলভাল কাজে নামায়। বউটাকেও নিজের কাজে লাগাইতে চেষ্টা কইরাছিল। পারে নাই বইলা বোধহয় হাপিস কইরা দিয়াছে। ভাবিদের গ্রামে লোকে নাকি বলাবলি করে সোহেল বিদেশে মেয়ে পাচার করে। তুই এই বিয়ে করিস না আবিরা। তোর বড় চাচারে কইয়া দে তুই বিয়ে করবি না।” আবিরা আমিনার কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তবে কাঁটাপথে চলতে চলতে এক এক একটা মোলায়েম ঘাসের বিছানা নিশ্চয়ই পড়ে। দিনকয়েক বাদে এক রবিবার বাড়ির মেয়েরা টিভি দেখছে একসাথে বসে। আমিনাও বসে আছে ঘরের পিছন দিকে – নাবিলা ভাবির বাচ্চাটাকে কোলে করে। ছোটভাই এসে একটা বাক্স আবিরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও ধরো, তোমার নতুন খেলনা।”
আবিরা অবাক হয়ে বলল, “কি এটা?”
-“কি বুঝছো না? এটা মোবাইল। আব্বা তোমারে দিতে কইলেন।”
_”মোবাইল? আমার?”
-“জি। সোহেল ভাই পাঠিয়েছে। তোমার তো ফোন নাই তাই। কইয়াছে যে সোহেল ভাই মাঝেসাঝে ফোন দিতে পারে। এই সুমি আপারে মোবাইল চালানোটা শিখায় দিস।” এই বলে ছোটবোনকে আদেশ দিয়ে ভাই বেরিয়ে গেল। আবিরা থতমত খেয়ে গেল। তার জন্য মোবাইল পাঠিয়েছে সোহেল? এমন দামি জিনিস ব্যবহারের মতন এত দামি সে কবে হয়ে উঠল? অতি উৎসাহিত সুমি ওর হাত থেকে মোবাইলটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে খুলে বের করে নাড়াচাড়া করতে করতে থাকল। ওপাশ থেকে রুমি বাঁকা হেসে বলল, “বাব্বা, আবিরা তোর তো ভাগ্য খুইলা গেল রে! বিয়ের কথা হইতে না হইতেই নতুন ফোন! এরেই কয় কপাল!” আবিরা কোনো মন্তব্য করল না। কিন্তু ভেতরে একটা চোরা ভালো লাগার স্রোত বয়ে গেল। না চাইতেই একটা মোবাইল ফোন। কেন পাবে না ও? ওর তো নেই। ওরই তো প্রয়োজন। ভাগ্য খুলেছে, বেশ করেছে! রুমি আপার এত গায়ের জ্বালা কিসের?
মোবাইল হাতে পেয়ে আবিরার সামনে নতুন দিগন্ত খুলে গেল। জলপ্রপাতে পড়ার আগে খরস্রোতা নদীতে ভেসে চলা খড়কুটোর মতন মোবাইলটাকে আঁকড়ে আবিরার দিনগুলো সুন্দর হয়ে উঠল। আবিরা জানতই না যে হাতের মুঠোর মধ্যে এতটা আনন্দ ধরা যেতে পারে। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার ধারে বিরাট শিউলি গাছের নিচ থেকে মুঠো মুঠো শিউলি ফুল কুড়িয়ে ফুঁ দিয়ে একে অন্যের গায়ে উড়িয়ে ফেলার চেয়েও যেন একটা নেশালো আনন্দ। মোবাইলের সাথে একটা কালো রঙের হেডফোনও এসেছে। আবিরা আজকাল গান শোনে। মোহময়ী রাতে জানলার জাফরির ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়া অধরা আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে আবিরা গান শোনে। বাংলা গান। কখনো কখনো রেডিওতে হিন্দি গান বাজে। হিন্দি আবিরা অল্পসল্প বোঝে। আমিনার বড় ভাই ইন্ডিয়া গেছিল কাজ খুঁজতে। রুনাই নদী পার করে। দূর উত্তরে বেশ কিছু মাস থেকে আবার একইভাবে সীমান্তসেনার পাহারা এড়িয়ে ফিরেও এসেছিল কিভাবে যেন। আমিনা বড়ভাইয়ের থেকে হিন্দি শিখে ক্লাসের মেয়েদের শিখিয়েছিল কিছু কিছু। আবিরা গান শুনতে শুনতে ভাবে যে ভাষায় কি এসে যায়। যা সুন্দর, তা সব ভাষাতেই সুন্দর। সেই সুন্দরের বর্ণনা করে যে শব্দগুলো সেই শব্দগুলো সব ভাষাতেই শ্রুতিমধুর। ঠিক তেমনি যে নির্দয় তার পরিচয় সব ভাষাতেই নির্দয় বলেই আছে। গানের সুর আবিরাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূর-দূরান্তে। আবিরার মন নিজের মোহনপুরের বাড়ির অন্ধকূপ ছেড়ে বেরিয়ে ঘুরে আসে দিকবিদিক। কখনো গান শুনতে শুনতে তলিয়ে যায় ঘুমের অতলে; আবার কখনো অজান্তেই দীর্ঘকালীন চেপে রাখা অনুভূতিগুলো, ভাবনাগুলো, কষ্টগুলো ফোঁটা ফোঁটা করে নোনাজল হয়ে নীরবে ঝোরে পড়ে গাল বেয়ে। তারপর বালিশে বিলীন হয়ে যায়। এই কান্না আজকাল ওকে অদ্ভুত এক প্রশান্তি দেয়। হাতের এক মুঠোয় এতটা খোলা বাতাস থাকতে পারে?
আবিরার পরিবর্তন বাড়ির লোকগুলো দেখল সবই। তাদের বিরক্তি ও চোখরাঙানি হাবেভাবে ফুটে উঠলেও কেউ মুখে বিশেষ কিছু বলল না। আপদ তো বিদায় হয়েই যাবে কদিন বাদে। সোহেল মোবাইল পাঠিয়েছে বলে কথা। কেড়েও নেওয়া যায় না। আজকাল অলিখিত নিয়মে অবিরার বাড়ি থেকে বেরনো একরকম বন্ধ। আমিনাকে ফোন নাম্বারটা দিয়েছিল আবিরা। আমিনা মাঝেসাঝে ফোন করত। আবিরাকে অনেক বোঝালো বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আবিরা নিরুপায়। তাই ও যতটা পারে বাস্তবটাকে ভুলে ওর নতুন পাওয়া খেলনায় মজে থাকল। গান শুনে, মোবাইলে এটাসেটা দেখে ভুলে যেতে চাইল মলিন বর্তমানটা। নিজেকে বলল হয়ত একটা চকচকে একদম নতুন ভবিষ্যৎ ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে।
এমনই একদিন বিকেলবেলা ফোনটা এল। অচেনা নম্বর। আবিরা ফোন ধরে হ্যালো বলার আগেই অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ বলে উঠল, “জয়িতা আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আর পারলাম না। এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। তাই শেষবার তোমায় বিদায় জানাতে ফোন করলাম। আমি চলে যাচ্ছি। আর দেখা হবে না। আর কথা হবে না কোনোদিন। এখানেই শেষ। আশা করব আগামী জীবনে যেন তোমার সাথেই থাকতে পারি। তুমি ভালো থেকো। সুখে সংসার কোরো।”
আবিরা থতমত খেয়ে গেল। এ আবার কে? অন্য কাউকে ফোন করতে গিয়ে ওকে করে ফেলেছে বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু লোকটা এভাবে কথা বলছে কেন? কোথায় চলে যাচ্ছে? তবে কি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে? কি সর্বনাশ! আবিরা ফোনটা কেটেও দিতে পারল না ভুল নম্বর বলে। অচেনা পুরুষের সাথে ফোনালাপের অভিজ্ঞতা ওর খুব একটা নেই। বিশেষত এমন অবাক করা অবস্থায়। ও অস্ফুটে বলল, “কে? কে বলছেন? আপনি এসব কি কথা কইছেন? চইলা যাচ্ছেন? যাত্রা শেষ?”
ওদিকের পুরুষকন্ঠটা চুপ হয়ে গেল। হয়ত নিজের ভুল বুঝতে লোকটা কয়েক মুহূর্ত সময়ে নিল। তারপর বলে উঠল, “এটা কি জয়িতার নম্বর নয়? জয়িতা এটা তুমি না?”
-“এটা জয়িতা নয়, আমার নম্বর।”
-“আপনি কে? জয়িতা কি ওর ফোনটা আপনাকে দিয়ে দিয়েছে? ওকে একবার দিন না। আমার ওকে খুব দরকার। যেগুলো এখন বললাম সেগুলো জয়িতাকে একবার বলতে চাই।” পুরুষকন্ঠে আর্তি ঝরে পড়ল।
-“জি আমি কোনো জয়িতাকে চিনি না। এটা শুরু থেকেই আমার নম্বর। আপনি ভুল নাম্বারে ফোন কইরাছেন।”
-“ও রং নাম্বার। তার মানে জয়িতা নম্বর বদলে ফেলেছে।” পুরুষকণ্ঠকে হতাশ শোনাল। এই মুহূর্তে ফোন রেখে দেবে নাকি কথা চালিয়ে যাবে বুঝতে না পেরে আবিরা বলল,” তা তো আমি জানি না ভাইয়া এই নম্বর কার ছিল। কিছুদিন হইল আমি এই নম্বর ব্যবহার করতেছি।” এই বলে একটু থেমে ও আবার বলল, “আপনি এইমাত্র কি কইতেছিলেন- চইলা যাইতাছেন? কি হইছে আপনার?”
-“সে আর আপনি জেনে কি করবেন আপা। জীবনে আনন্দই যদি না থাকে তবে আর সে জীবন রেখে কি হবে।” লোকটা হতাশ ভাবে বলল।
ওর কথার ধরনে আবিরার মায়া লাগল। মনে হল লোকটা বোধহয় ওর মতোই একা। চারদিক বন্ধ একটা খুপরিতে আটকে। ভেতর থেকে আরও কথা বলার তাগিদ অনুভব করল আবিরা। আগল খুলে অনেকগুলো কথা বেরিয়েও এল ঢেউয়ের মতন।
-“দেখেন ভাইয়া, আপনারে আমি চিনি না। আপনিও আমারে চিনেন না। তবুও বলি। নিজের জীবন নিবেন না দয়া কইরা। আপনার জীবনের কি গল্প তাও আমার জানা নাই। কিন্তু বিশ্বাস করেন আপনার মত আরও অনেকেরই জীবনে অনেক কষ্ট। তবুও তারা বেঁচে আছে যেমন কইরাই হোক। শেষ করেই যদি দিবার হত তবে আল্লাহ এই জীবন দিলেন ক্যান? একবার শুধু ভাবুন, শেষ কইরা তো দেওয়াই যায়। কিন্তু বলা যায় না – ভালো কিছু হইলেও তো হইতে পারে। শেষ কইরা দিলে সেগুলো তো আর জানাই হইবে না। দয়া কইরা নিজের জীবন নিবেন না।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবিরা থমকে গেল। কে জানে লোকটা কি ভাবছে।
খানিকক্ষণ চুপ থেকে লোকটা বলে উঠল, “বাহ্ আপা! আপনি তো অনেক ভারী ভারী কথা বলে ফেললেন। কিন্তু এই তিরিশটা বছরে আমার জীবন যে কত উঠানামা তা আর আপনাকে কি বলব। কত আফসোস, কত অনুতাপ। যাকে ভালোবাসলাম, ভাবলাম জীবন কাটাবো যার সাথে তাকেও রাখতে পারলাম না। সময় থাকতে যদি আমার দোকানটা দাঁড়িয়ে যেত তাহলে আজ তাকে অন্য কারো বউ হয়ে থাকতে হত না। কিন্তু না পারি ভুলতে, না পারি এগিয়ে যেতে। কত আফসোস… রাতে ঘুম হয় না। এত দুঃখ নিয়ে বেঁচে থাকার মানেই হয় না।”
-“তিরিশ বছর? ভাইয়া আমি আপনার থেকে অনেকটাই ছোট। দুনিয়া দেখিনি তেমন। কিন্তু সব খারাপ তো কারোরই লাগতে পারে না। আপনার জীবনের কিছুই ভালো লাগে না? আপনার কি পরিবার বলতে কেউ নাই? তাদের কাউকে ভালো লাগে না? গান ভালো লাগে? আপনার কি কোন প্রিয় বন্ধুও নাই, তার সাথে গল্প করতে ভালো লাগে না? রাতের বেলা একা শুইয়া গান শুনতে ভালো লাগে না? আকাশ দেখতে, রাতের তারা দেখতে ভালো লাগে না? আমার তো একা একা কাঁদতেও ভালো লাগে। কাঁদলে যেন মনটা হালকা লাগে। সব কষ্টগুলো বের হইয়া যায়। আপনিও কাইন্দেন কষ্ট হইলে। দেখবেন হালকা লাগতেছে। কিন্তু দয়া কইরা জান নিবার কথা ভুইলা যান। কাল কি আছে সুখ-দুঃখ কেউ বলতে পারবা না। আপনি তো তবু কাউরে পাইয়াছিলেন। কত মানুষ ভালোবাসা কি জানেই না। আল্লাহ আপনারে একবার ভালোবাসা দিয়েছেন। কে কইতে পারে যে আর দিবেন না।”
পুরুষকণ্ঠ মন দিয়ে ওর কথা শুনল। ধীরে ধীরে সেও অনেক কথা বলল। আবিরা জানত না যে ও নিজে এত স্বল্প পরিচিত কারো সাথে এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে। আরো খানিকক্ষণ কথোপকথনের পর ও ফোন রেখে দিল। সেদিন রাতে গান শুনতে শুনতে আবিরার লোকটার কথা মনে পড়ল। কে জানে সে এখন কি করছে। তার মন বদলাল কিনা। আজ রাতটাও তার নির্ঘুম কাটল কিনা। ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা ভারি হয়ে এল। ঘুমিয়ে আবিরা স্বপ্ন দেখল নদীর জলে ও সাঁতার কাটছে। ও খুব খুশি। আরো অনেক মেয়ে একসঙ্গে জল নিয়ে খেলা করছে। কেউ কেউ জোরে হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার কাটছে ঝপঝপ আওয়াজ করে। ওদের হাত পায়ের আন্দোলনে জল ছিটকে পড়ছে চারদিকে। আবিরা নিজেও হেসে উঠছে ওদের আনন্দ দেখে। আর দূরে কোথাও একটা নাম না জানা পাখি কাতর সুরে ডেকেই চলেছে একটানা।
পরদিন সন্ধ্যেবেলা ফোনটা আবার এল। বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যেয় লোডশেডিং-এর অন্ধকারে গা ডুবিয়ে জালিকাটা গ্রিলের সামনে বসে বৃষ্টির ছাঁট শরীরে মেখে আবিরা ফোনটা ধরল। আজ সেই পুরুষকন্ঠ অনেক শান্ত। সে ধন্যবাদ জানাল আবিরাকে। সেদিন ভুল করে নিজের প্রাক্তন প্রেমিকার জায়গায় আবিরার কাছে ফোনটা না এলে হয়তো সত্যিই আজ সে ফোন করার অবস্থাতেই থাকত না। ধন্যবাদ পেয়ে আবিরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ধন্যবাদ সে বড় একটা পায়নি কোনদিন। কি বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “আমারে ধন্যবাদ দিবার প্রয়োজন নাই ভাইয়া। আমার যা মনে আসছিল, আমি যেটুকু বুঝি তাই আপনারে কইয়াছিলাম। আপনি যে নিজের প্রাণ নিয়েন নাই এই যথেষ্ট।”
সেদিনের পর ফোনটা আবারও এল এবং তারপর মাঝেমধ্যেই আসতে থাকল। আবিরাও ফোন ধরতে থাকল। কথার পিঠে কথা এসে গেল সহজেই। মুহূর্তগুলো কেটে গেল নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতোই অগোচরে সহজ সাবলীল গতিতে। আবিরার পক্ষে সবসময় ফোনে কথা বলা সম্ভব নয়। কে কখন কি ঝামেলা করে কে বলতে পারে। মারও পড়তে পারে। তাই দুপক্ষ যুক্তি করে দিনের একটি নির্ধারিত মুহূর্তেই ফোন করবে ঠিক করল।
আবিরার জীবনের শামুকের গতিকে কে যেন এক ধাক্কা মেরে হঠাৎ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। আবিরার রাতে আর কান্না পায় না আগের মতন। বরং আজকাল রাতে ঘুমোবার আগে সারাদিনের বার্তালাপের স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। পরের দিন কি বলবে তা ভেবে রাখে। সেসব ভেবে ও নিজের মনে হাসে। ধুলো উড়ে গিয়ে বাস্তবটাকে আগের চেয়ে বেশি পরিষ্কার লাগে। আবিরা ভাবে যে ওর সাদা-কালোর লিস্টটা বেশ রঙিন হয়ে উঠেছে। যার ফোন আসার কথা ছিল সেই সোহেল আজ অব্দি ফোন করেনি। আবিরারও তাতে কিছু এসে যায়নি। বিয়ে যে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে এই সত্যিটা যেন হঠাৎ পাওয়া রঙিন মুহূর্তগুলো দিয়ে আবিরা চাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠল। পলেস্তারা খসে গিয়ে দেওয়ালের ফাটল বেরিয়ে পড়ার আগে কটা দিন যদি রংটা টিকে থাকে থাক না, ক্ষতি কি?
ওর নাম সাদিক। বাড়ি হাকিমপুর। আবিরাদের গ্রামের সামনে যে নদী তা পেরোলেই ওপরটা ভারতের হাকিমপুর। খুলনায় ওদের আদি বাড়ি। ওর আব্বা বহু বছর আগেই ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলেন। ওর মা ওখানকারই। ওখানেই ওর জন্ম, বড় হওয়া। ওটাই ওর দেশ। তবুও নাড়ির টানে মাঝেমাঝে ছুটি-ছাটায় খুলনায় আসে। সেখানে চাচারা আছে। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনরা আছে। তাদের বাড়িতে ওঠে। এরকমই এক ছুটির সময় ওর সাথে জয়িতার আলাপ। ওদেশে সাদিকদের কাপড়ের ব্যবসা। আবিরার মনে হয় হাত বাড়ালেই বুঝি ও সাদিককে ছুঁতে পারবে। ওদের গ্রামের শেষ প্রান্তে মোহনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। তা পেরিয়ে আরো মিনিট দশেক হাঁটলে ধানক্ষেত আর মাছের ভেড়ি পার করে ধূ ধূ প্রান্তরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে গাছগাছালিতে ঢাকা মোহনপুর পুরানো মসজিদ। মসজিদ পেরোলে শুধু মাছের ভেড়ি আর জলাজমি। মসজিদ বাঁদিকে রেখে সোজাসুজি চললেই অনতিদূরে রুনাই নদী। নদীর ওপারে ভারত। রুনাই নদীর মাঝ-বরাবর ভারত-বাংলাদেশ সীমানা জলে মিশে আছে। রুনাই নদী তার যাত্রাপথের এক-এক জায়গায় ভীষণ সরু, ঠিক যেমন পুরনো মসজিদের দিকটায়। এতই সরু যে মনে হবে এক লাফে ওপারে চলে যাওয়া যাবে। এই জায়গাটায় রোগাসোগা রুনাই নদীকে নদীর চেয়ে বেশি খাল মনে হয়। জায়গায় জায়গায় কচুরিপানা আর ঝাঁঝির ঝাঁক ভেসে রয়েছে। রুনাই নদী পেরিয়ে এপার-ওপার যাতায়াত কম হয় না। কখনো লোক ধরা পড়ে বিজিবির হাতে আবার অনেক সময় যাতায়াত চলে নির্বিচারে। কত মানুষ গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে ওপার থেকে। কিছু গেছে কিন্তু আর ফিরতে পারেনি বা ফিরতে চায়নি। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা এসব নিয়ে নির্বিকার থাকে। এগুলো তাদের কাছে খুব সাধারণ ব্যাপার। সাদিকের কাছে আবিরা শুনেছে যে ওপারে আগে নদীর ধারে সার সার মোবাইল আর সিম কার্ডের দোকান ছিল একটা সময়। নদী পেরিয়ে গিয়ে একটা ফোন ও সিম কার্ড কিংবা ভুয়ো পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু বিএসএফ ইদানিং নাকি সব দোকান ঝেঁটিয়ে সাফ করে দিয়েছে। তবে তাতেও দুনম্বরি ব্যবসা আটকায়নি পুরোটা। এখন বিএসএফের অধীনস্থ এলাকা পেরিয়ে দোকানগুলো আবার উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এবং এদের ব্যবসাও চলছে বেশ রমরমিয়ে। এমনও নাকি শোনা যায় যে শুধু মোবাইল আর সিম কার্ড বেচাই নয়, হাতে থোক টাকা ধরে দিলে এপার-ওপার যাতায়াতের ব্যবস্থাও এরা করে দেয়। কোন সময় পাহারা বদল হয়, কোন জায়গায় পাহারা থাকে না, রুনাই নদীর জলের স্রোত কোন জায়গায় কেমন, নদী কোথায় কতটা গভীর ইত্যাদি সব তথ্য ওদের নখদর্পণে থাকে। আবিরা নিজেও এক সীমান্ত গ্রামের মেয়ে। এই পারাপারের গল্প ও যে জানে না এমনটা নয়। এদিকে বিজিবি কড়াকড়িও ওর জানা। কিন্তু কোনোদিন এ বিষয়ে বিশেষ কৌতুহল ওর হয়নি। তবে আজ ঘটনার স্রোতে ও যেন এসব নিয়ে আরো জানতে হঠাৎই উৎসুক হয়ে উঠল।
ওদের ফোনালাপের দিনগুলোতে সাদিক খুলনাতেই ছিল। আসছে রবিবার ও হাকিমপুর ফিরে যাবে। এতদিন সাদিক একটা বাংলাদেশী নম্বর থেকে কল করত। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। এখন কথা বলার জন্য ইন্টারনেট লাগবে। তারও ব্যবস্থা হয়ে গেল। সাদিকের সাহায্যে আবিরা সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাকাউন্ট বানাল। অবশ্যই ছবি ছাড়া এবং বেনামে। সাদিক ওকে শিখিয়ে দিল কিভাবে একাউন্টে ঢুকতে বেরোতে হয়, মেসেজ কোথায় লেখা যায়, কিভাবে ইন্টারনেট অন করে ফোন করতে হয়, ভিডিও কল করতে হয়, ছবি পাঠাতে হয়। আবিরার কিছুটা ধারণা ছিল। ওর স্কুলের অনেক মেয়েদেরই ফেসবুক প্রোফাইল আছে। আবিরার এরকম বড় ফোনই ছিল না, ফেসবুক তো দূরের কথা। ইন্টারনেটের ঝলমলে জীবন থেকে আবিরা শত আলোকবর্ষ দূরে ছিল। সাদিকের সাহায্যে ও সহজেই আয়ত্ত করে নিল সবটা।
এতদিন শুধু গলা শুনেই একে অপরকে ভালো লেগেছে। এবার দেখার পালা। সাদিক নিজের বাড়িঘর ও আশপাশের অনেক ছবি আবিরাকে পাঠাল। আবিরা বারবার আয়েশ করে ছবিগুলো দেখল। নতুন করা একতলা পাকা বাড়ির সামনে বেশ বড় কাঁচা উঠোন। উঠোনের একপাশে আম-কাঁঠাল আর অন্য কোণে একটা বড় কাঁঠালিচাঁপা গাছ। আবিরার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল ওখানে যেতে। চোখ বুঝে ও দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করল। ও আর সাদিক কাঁঠালিচাঁপার তলায় বসে গল্প করছে। দৃশ্যটা ভেবে ভেবে ওর মনের ব্যাকুলতা কেবল বেড়েই গেল। কোনো উপায় কি নেই স্বপ্ন সত্যি করার? সাদিকের তরফ থেকে কোনো আহবান না এলে ও কিভাবে সব ছেড়ে যাবে? অথচ এখনও আবিরা সাদিককে বলে উঠতে পারেনি যে হাতে গুনে আর একটা মাস পরেই ওর বিয়ে। তারপর কে জানে কোনদিন সাদিকের গলাটাও আর শোনার সুযোগ হবে কিনা।
ইতিমধ্যে আবিরার বিয়ের কেনাকাটা হয়ে গেছে। কেনাকাটা বলতে আবিরা শুধু সঙ্গই দিয়েছে। কেনাকাটি যা করার তা বড় চাচি, নাবিলা ভাবি আর রুমি আপাই করেছে। ওরা যতক্ষণে আবিরার বিয়ের কাপড়ের রঙ ঠিক করেছে, ও ততক্ষন নাবিলা ভাবির পিচ্চি বাচ্চাটাকে আগলেছে। কোনো অলিখিত নিয়মে সকলেই ধরে নিয়েছে যে তারা আবিরার জন্য যা পছন্দ করবে আবিরারও তাই পছন্দ হবে। আবিরা ভাবে যে বিষয়টা আসলে পছন্দ-অপছন্দের নয়। ও তো এ বাড়িতে একটা বাড়তি বোঝা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই দয়া করে কপালে যা জুটছে তাতেই ও খুশি থাকবে, তাই পছন্দ করবে, আর তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে, এটাই ওর থেকে কাম্য। এক দুপুরে আবিরা নিজের ঘরে শুয়ে দিবাস্বপ্নে বুঁদ হয়ে গান শুনছে। এমন সময় রুমি আপা ঘরে একটা বড় ব্যাগ রেখে গেল। আবিরা বুঝল ওই ব্যাগেই আবিরাকে নিজের আঠেরো বছরের জীবনটাকে গুছিয়ে নিয়ে চলে যেতে হবে অন্য কারোর বাড়িতে, অন্য কারোর নিয়মে নতুন করে জীবন কাটাতে। বাদামি বর্ডার দেওয়া বড় কালো ব্যাগটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ভেতর থেকে কেউ যেন আবিরাকে জোরে ধাক্কা মারল। আবিরা সোজা হয়ে উঠে বসল। নাহ! আর সময় নেওয়া যাবে না। এবার সাদিককে সব জানাতেই হবে। এতদিন সাদিকই ফোন করতো ওদের নির্ধারিত সময়ে। আজ আবিরা সাহস করে ওকে ফোন করল।
নির্ধারিত সময়ের বাইরে আবিরার থেকে ডাক পেয়ে সাদিক বলাই বাহুল্য অবাক হল। তবে ও কিছু প্রশ্ন করার আগেই আবিরা এক নিঃশ্বাসে ওকে সব কথা খুলে বলল ঝড়ের মতন। এবার আবিরার অবাক হওয়ার পালা। সাদিক সব শুনে সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তাব দিল ওবাড়ি ছেড়ে চলে আসার। সাদিক কোনোরকম ঝামেলা না করে এত সহজে ওকে চলে আসতে বলবে আবিরা ভাবেনি। ও বিহ্বল হয়ে খানিকক্ষণ নিরুত্তর রইল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জলের ধারা নেমে এল।
এর পরের দিন সাদিকের হাকিমপুর ফিরে যাবার কথা। সাদিক কথা দিল যে আবিরাকে ঠিক ওই বাড়ি থেকে বের করে আনবে। সাদিক বড় সুন্দর কথা বলতে পারে। ওর কথা শুনতে শুনতে আবিরার মনে হল সত্যিই পৃথিবীটা সুন্দর, মানুষ সুন্দর, রুনাই নদীর ওপারের দেশটাও বড্ড সুন্দর। মনে হল সাদিকের সাথে ওর আগামীটাও সুন্দরই হবে। আবিরা আগামীর নেশায় বুঁদ হয়ে গেল। ওর নিজেকে প্রজাপতি মনে হল। এভাবে একটা একটা করে দিন পেরিয়ে ক্রমশ আবিরার বিয়ের দিন কাছে চলে এল। সাদিক সুন্দর কথা বলতেই থাকল। আবিরাকে স্বপ্ন দেখাতেই থাকল। কিন্তু স্বপ্নের রঙচঙে হাতছানিতে আবিরার অস্থিরতাও পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকল। কই সাদিক তো বলল না কবে ও এই বাড়ি থেকে বেরোবে। কথা ছিল সাদিক ওপারে সব ব্যবস্থা করে রাখবে। নির্ধারিত দিনে ও নির্ধারিত সময়ে আবিরা নদীর ধারে উপস্থিত থাকবে। রুনাই নদীর প্রান্তরে পুরনো মসজিদ পেরিয়ে ঠিক যেখানটায় নদী খুব সরু, দুদিকেই ঘন বাঁশঝাড় আর গাছ-আগাছার জঙ্গল, ঠিক সেখানটায় নৌকো তৈরি থাকবে। এপার থেকে টর্চের আলো দেখতে পেলে আর পাখির ডাক শুনলে জলে নামতে হবে। নদীর মাঝখানের সীমানা অব্দি গিয়ে মাঝনদী থেকে নৌকায় উঠে বাকিটা। চোখের নিমেষে পৌঁছে যাবে নীল স্বপ্নের দেশে। কিন্তু কই সাদিক তো এখনও বলল না কবে আসবে সেই দিন।
রুমি আপা বোধহয় কিছু আঁচ পেয়েছে। আবিরাকে যেন চোখের আড়াল করতে চায় না আজকাল। রুমিকে ও রান্নাঘরে চাচিদের বলতে শুনেছে, “মাইয়াটার চালচলন কিন্তু আমার ভাল্লাগতাছে না আম্মা। আব্বারে কও ওরে একটু চোখে চোখে রাখতে। আজকাল ঐ মোবাইলটা লইয়া সারাদিন পইড়া থাকে। সাত চড়ে যে মাইয়া কথা কইতো না সে আবার ফোনে কথা কয় কার লগে?! আমি নিজের কানে শুনছি ওরে ছাদে বইস্যা কথা কইতে। এই মাইয়া এত হাইসতে শিখল কবে? কার সাথে এত হাসি? ওই মুখপোড়া সোহেলের সাথে? সে তো কইয়া গেছে যে একেবারে সেই বিয়ের দিন আসবে। আর এলাকায় সোহেলের যা সুনাম তাতে তো লাগে না যে ও ফোন কইরা বউয়ের সাথে পিরিত করার মতন লোক। আবিরাকে চোখে চোখে রাখো আম্মা। পাখি উইড়া গেলে এতগুলো টাকা তো যাবেই, সঙ্গে, যে কয়টা টাকা আব্বাকে সোহেল দিয়া গেছে বিয়ের বন্দোবস্ত করার জন্য, সেগুলোও ফেরত করতে হইবে।”
সদ্য তালাকপ্রাপ্তা রুমি আজকাল এই বাড়িতেই থাকে। জামাইটা ভাল ছিল না। রুমিকে নাকি মারধর করত। এই নিয়ে একদিন বড়চাচিকে অন্যদের কাছে দুঃখ করতেও শুনেছিল আবিরা। দুটো ছেলে রুমির। এক রাতে নেশার ঘোরে রুমির গায়ে আগুন ধরিয়ে দিতে গেছিল জামাইটা। কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এলেও ছেলেদুটোকে আনতে পারেনি। কোনোদিন আর তাদের দেখা পাবে এমন সম্ভাবনাও কম। মামলা করার সামর্থ্য এই মুহূর্তে রুমির বাপের নেই। জোর করে ছিনিয়ে আনার তাগিদও কারোর নেই। তাতে রুমি ঠিক কতটা বিচলিত তা অবশ্য তাকে দেখে বোঝা যায় না। যে তেজ নিয়ে সে এ বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় তাতে তার কালশিটে পড়া বিবাহিত জীবনের কোনো ছাপ নেই।
ঝড়টা এল আবিরার বিয়ের দিন পনেরো আগে। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর যে যার ঘরে চলে গেছে শুতে। এমন সময় বাড়ির সদর দরজায় প্রবল করাঘাতের আওয়াজ এল। “আহ্ আসতাছি রে বাবা। থাম থাম। কে আবার আইল এমন অসময়ে…” বিরক্ত মুখে লুঙ্গির খুঁটটা শক্ত করে বেঁধে গজগজ করতে করতে বড়চাচা এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই হুরমুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ল সোহেল। সঙ্গে ওর ছায়াসঙ্গী অল্পবয়সী ছেলেটা। আবিরার ভাইরাও যারা বাড়িতে ছিল বেরিয়ে এল এত রাতে দরজা ধাক্কার আওয়াজে। এই অসময়ে সোহেলকে দেখে সকলে যারপরনাই আশ্চর্য। সোহেলের মাথায় ব্যান্ডেজ করা। জামার গোটানো হাতার নিচের অংশটায় দেখা যাচ্ছে জায়গায় জায়গায় কেটে ছড়ে গেছে। কলারের একপাশে লাল দাগ। রক্তের দাগই মনে হচ্ছে। আবিরাও বিছানা ছেড়ে উঠে এসে অন্ধকার ঘরের দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। সোহেলের এই রূপ দেখে ওর গলা শুকিয়ে গেল। আমিনার বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। একি অবস্থায় এসেছে সোহেল! কোথাও খুনোখুনি করে এসেছে নাকি? তবে কি আমিনার কথাগুলো সত্যি? সোহেল লোকটা এতটাই খারাপ যে মানুষ খুন করতেও বাকি রাখেনি? আর মাত্র কটা টাকার জন্য এই লোকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ওকে! এবাড়িতে নাহয় কোনোভাবে মাথা গুঁজে পড়েছিল এতকাল। কিন্তু এই লোক তো বোধহয় গলার স্বর একটু উঁচু করলেই গলাটিপে মেরে ফেলবে। আবিরার দুচোখ দিয়ে নোনাজল নেমে এল নিশব্দে।
সোহেল আর তার সাগরেদের সাথে কিছুক্ষণ চাপা স্বরে বড়চাচা আর ভাইদের কিসব কথাবার্তা চলল। কথাবার্তা শেষে বড়চাচার নির্দেশ মতো ছোটভাই ওদের খাবার জলে এনে দিল। ঢকঢক করে অনেকটা জল গলায় ঢেলে মুখ মুছে বড়চাচাকে ইশারাপূর্বক দৃষ্টিতে বিদায় জানিয়ে সোহেলরা চলে গেল। দরজা বন্ধ করে চাচা উত্তেজিত মুখে নিজের ঘরে চলে গেল। এদিকে আবিরাও অস্থির হয়ে উঠল জানতে যে এত রাতে হঠাৎ সোহেল এই অবস্থায় বাড়িতে কি বলতে এসেছিল। ও নিজের বিছানায় গিয়ে বসে রইল অন্ধকারে। ছোটবেলায় এই ঘরটায় রাবেয়া আর রুমি আপার সাথে আবিরা শুতো। রাবেয়া আর রুমির বিয়ে হয়ে যাবার পর বেশ কয়েক বছর হল বড়ভাইয়ের যমজ মেয়েদুটো এখানে ওর সাথে শুচ্ছে। বাচ্চাদুটো খাটের ওপরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নিচে মেঝেয় আবিরার বিছানা পাতা। খোলা জানলার জাফরির ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে। আলো-আঁধারিতে ঘরের পরিবেশ রহস্যময়। সেই রহস্যময় অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে আবিরার মনে হল চারপাশে যেন এক আদিম নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে। সময় যেন থমকে গেছে। সবকিছু অদ্ভুত রকম শান্ত। ঝড়ের আগে যেমনটা হয় আর কি।
এমন সময় হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে এসে দাঁড়াল বড়চাচি। আলো-আঁধারিতে বড় চাচির মোটাসোটা অবয়বটা মইনুলের গোয়ালের বিশালদেহী কালো গরুটার মতন লাগল আবিরার। কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকার পর আবিরা জেগে আছে বুঝতে পেরে বড়চাচি মৃদুস্বরে বলল, “তুমি জাইগা আছো, ভালই হইল।”
বড়চাচি একটু এগিয়ে এসে ওর সামনে বসল। বাচ্চাগুলোর ঘুম যাতে না ভাঙে তাই খুবই চাপা স্বরে বলল, “শুনো আবিরা, তোমার বিয়ে আগামী মাসের দশ তারিখে ঠিক ছিল। কিন্তু তারিখের একটু বদল হইছে।” আবিরার বুকটা ধরাস করে উঠল। চাচি বলল, “কিছু বিশেষ কারণে সোহেলকে পরশুদিনই ঢাকা চইলা যাইতে হইবে। মাসকয়েক তার আর এদিকে আসা হইবে না। সোহেল খুব তাড়ায় আছে। সে আর সময় নষ্ট করতে চাচ্ছে না। তাই তোমাদের বিয়েটা আগামীকাল হইব। তোমার চাচা আর ভাইরা মিলে এত রাতে তারই বন্দোবস্ত করতেছে।”
আবিরার মাথাটা কেমন যেন বোঁ করে ঘুরে গেল। বিয়ে? আগামীকাল? ঠিক শুনছে তো? চাচির কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? সত্যি কাল ওর বিয়ে? ও যে একেবারেই প্রস্তুত নয়। সাদিকের সাথে দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। এখন এই অবস্থায় সাদিককে কিভাবে সব জানাবে? চাচি আবারও কিছু বলল কিন্তু সেকথা আবিরার মাথায় ঢুকল না। ওর মনে হল ও কোথাও একটা হারিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলো এবার মেঘে ঢাকা পড়ে ঘরের অন্ধকারটা যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠেছে। আবিরার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। মনে হল সব শেষ হতে চলেছে। ও কি এভাবেই বোবা হয়ে থাকবে?
আবিরা আর পারল না। অস্থিরভাবে বলে উঠল, “ক্যান চাচি? আমার সাথে এমনটা ক্যান করতেছো? আমারে তোমরা ভালোবাসো না জানি, কিন্তু এমন শাস্তি ক্যান?”
রোকেয়া এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
আবিরার তরফ থেকে তো নয়ই। ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা সামলে রোকেয়া কোনোমতে বলল, “ক্যান মানে? আমরা তোকে শাস্তি দিতেছি? এই ভাবিস তুই?”
আবিরার স্বাভাবিক শান্ত ভাবটা কেউ যেন টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিল এক মুহূর্তে। গলার ভেতর দলা পাকানো কান্নার মন্ডটা গিলে নিয়ে ও বলল, “শাস্তি নয় তো কি? সোহেল কেমন লোক তোমাদের জানা নাই? পাড়ার লোকে ওরে লইয়া কি কি কয় তোমরা শুনো নাই বুঝি? ওর কীর্তিকলাপ, যা এলাকার সব লোক জানে, তা তোমাদের একদম অজানা এ তো হইতে পারে না। ভাইরা এসে গল্প করে নাই তোমাদের কাছে ওর কীর্তিকলাপ নিয়ে? কিন্তু সব জাইনা শুইনা তোমরা আমায় ওই শয়তানটারই হাতে ফেলে দিতেছ। আমারে একবারও মানুষ ভাবলে না তোমরা? কাঠের পুতুল আমি তাই না? ভালো দাম পাইছো, তাই বাজারে বেচে দিতেছ। এভাবে আমারে লইয়া দালালি করতে তোমাদের লজ্জা লাগল না?”
-“কি কইলি তুই? আমরা দালাল? আমরা তোরে ভালো দাম পাইয়া বেচে দিতেছি?”
-“অবাক হইও না চাচি। আল্লাহর কসম খাইয়া কও, নাওনি তোমরা সোহেলের থেকে টাকা আমার বদলে? তোমাদের কাছে তো আমি মানুষ নয়। আমি তো একটা পুতুল, একটা বাজারের মাইয়া। যার থেকে সবচেয়ে ভালো দাম পাইছো তার হাতে দিয়া দিতেছ। সব তোমরা টাকা ভালোবাসো। টাকার জন্য যা ইচ্ছা করতে পারো…” আবিরা কথা শেষ করার আগেই ঠাস করে একটা চড় ওর গালে এসে পড়ল। আচমকা আঘাতে ওর মুখ দিয়ে “আহ্” বেরিয়ে গেল। ওর চুলের মুঠি টেনে ধরে রোকেয়া চাপা গলায় গর্জে উঠল, “হারামজাদি! তোর লজ্জা হইল না এসব কইতে? এতকাল তো গলা দিয়ে আওয়াজ বের হইত না। আজকে গলা উঁচু কইরা আমাদের দালাল কইলি তুই? এত সাহস তোর? শোন তবে… বেচে দিতেছি তো? বেশ করছি তোরে বেচে দিতেছি। টাকা ভালবাসি আমরা না? হ্যাঁ বাসি আমরা ভালো। আঠেরোটা বছর ধইরা আমাদের বুকের ওপর বইসা গিললি, তখন টাকা লাগে নাই? তোর জামাকাপড়, ইস্কুলের পড়ার খাতা-বই তোকে দেই নাই আমরা? তখন লাগে নাই টাকা? তোরে যে এতদিন বাঁচিয়ে রাখলাম, এতদিনের তোর খাবার হিসাব কে দিবা? বেইমান কোথাকার… বাপের সাথে তুইও তো জলে ভাইস্যা যাইতে পারতিস। যাস নাই ক্যান? তোরে বাঁচিয়ে রাইখা খাবার দিয়া এতদিন ধইরা কে পুষলো রে হারামজাদি? আমরা.. তোর চাচারা। আর আজকে যদি তোর বদলে দুটো টাকা আমরা পাই তাতে ক্ষতি কি? কিরে এখন চুপ ক্যান? এখন গলা দিয়ে আওয়াজ বার হইতাছে না?! আর তোমার পিরিতের খবর আমার জানা নাই ভাবছো? আমি সব জানি। রুমি আমারে সব কইয়া দিছে। মনে খুব ফুর্তি জাগছে তোমার না? তাইতো এ বিয়েতে তোমার ইচ্ছা নাই। বেহায়া কোথাকার! আমি আগে ভাবতাম মা-বাপ নষ্ট তাতে কি, তোর চরিত্র হয়তো ভালো হইবে। কিন্তু তুই আসলেই একটা খারাপ মাইয়া… তোর বড়চাচার হাতে কাম নাই। বড়ভাইটার তিনটা বাচ্চা। তোর ছোটচাচা দুমাস ঘরে টাকা দেয় নাই। কিন্তু তোর কি তাতে ভাত কম পড়েছে হারামজাদি? কোনোদিন ভাবছিস বাড়িতে এতগুলো পেট চলে কিভাবে কার টাকায়? তোমার চাচারা, ভাইরা সব রাতের ঘুম নষ্ট কইরা পেটের ভাট জোগাড় করতেছে আর তুমি সকলকে ফাঁকি দিয়া পিরিত করতেছো? নির্লজ্জ বেইমান…” এতদূর বলে রোকেয়া আরো জোরে আবিরার চুল খামচে ধরল। ওর মুখ দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে এল। রোকেয়া একহাতে আবিরার চুলের মুঠি টেনে ধরে অন্য হাতে ওর গালটা চেপে ধরে ওকে নিজের দিকে নিয়ে এল। রোকেয়ার হাতের আঙুলগুলো আবিরার গালে বসে গেল। নিষ্ঠুর ক্রোধ ছলকে পড়ল রোকেয়া বেগমের সর্বাঙ্গ থেকে। “তোর ছোটভাইকে সোহেল শহরে কাজ দিবে কইয়াছে। সঙ্গে এতগুলো টাকা একসাথে ধইরা দিয়া গেছে। যা দিয়াছে তা তোর মতন বেইমান মাইয়ার দামের থেকে অনেক বেশি। ক্যান নেব না আমরা? বেশ করছি নিয়েছি। তোরে যদি বারবার বেইচা বারবার টাকা পেতে পারতাম তবে তাই করতাম, বুঝলি?”
চাচির কথাগুলো তরল বিষের মতন গড়িয়ে পড়ল আবিরার কানে। চাচি এক নিঃশ্বাসে সবটা বিষ ঢেলে দিয়ে ওর চুলের মুঠি ছেড়ে দিল। ওর গাল থেকে হাত সরিয়ে চুকচুক করে সান্তনার ভঙ্গিতে বলল, “এমা, তোর গালে যে আমার আঙ্গুলের দাগ বসে গেল। ও কিছু হবে না। সাজগোজের নিচে ঢাকা পইড়া যাবে।”
আবিরার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না। কেবল গরম অশ্রুস্রোত বাঁধভাঙ্গা বন্যার মতন বইতে লাগল। রোকেয়া এবার ওর কানের কাছে মুখে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “আহা কি এমন করলাম! এর চাইতে অনেক বেশি মার তুই আমার হাতে খাইয়াছিস। কান্দস না মাইয়া, কান্দস না… তুই ভাবছিস যে আমরা তোরে শাস্তি দিতেছি, তোরে বেইচা দিতেছি। কিন্তু আসলে আমরা তোর জীবনভোরের ভাতের বন্দোবস্ত কইরা দিতেছি বুঝলি?”
প্রত্যুত্তরে এবারও আবিরার আর মুখ দিয়ে শুধু গোঙানি বেরোল। রোকেয়া বলে চলল, “তুই যা ভাবছিস ব্যাপারটা অত কষ্টেরও নয় রে। বিয়া হইবে। এইখানে যেমন ঘরের কাজকাম করতিস, ওখানেও ঘরের কাজকাম লইয়া থাকবি। জামাই যা কয় শুনবি। প্রশ্ন করবি না পাল্টা। বেশি গলা উঁচু কইরা জামাইয়ের লগে কথা কইবি না। ঝগড়াঝাঁটি করবি না। কথা কম কাজ বেশি। জামাইয়ের বাইরের জীবনে নাক গলাবি না। আর মাঝেসাঝে যখন তোর জামাই চাইবে পা দুইটা ফাঁক কইরা দিবি। ব্যাস্, দেখবি নিজের ঘরে নিজের মতন কইরা থাকতে পারবি।” এই অব্দি বলে রোকেয়া আবিরাকে হালকা ঠেলা মেরে উঠে দাঁড়াল। আবিরার মনে হল ওর শরীরের আর কোনো ভারসাম্য নেই। ও মৃত মানুষের মতন বিছানায় ঢলে পড়ল। রোকেয়া উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আগে বলে গেল, “অনেক রাত হয়েছে। আজ ঘুমাইয়া পড়। কাল সকাল সকাল উইঠা গোছগাছ কইরা নিস কেমন?” এই বলে দরজাটা ভেজিয়ে রোকেয়া চলে গেল। আবিরাকে অন্ধকার জাপটে ধরল।
কিছুক্ষণ বেহুঁশের মতন নোনাজল মেখে পড়ে থাকার পর অবশেষে উঠে বসল আবিরা। সব জল বেরিয়ে যাবার পর চোখ মুছে ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাহ্! এই শেষ। এখানে এভাবে আর না। ওকে আজ পালাতেই হবে। একবার বাঁচার শেষ চেষ্টাটুকু করতেই হবে। অন্ধকার হাতড়ে মোবাইলটা তুলে ইন্টারনেট খুলে সাদিককে ফোন লাগাল। দেখল সাদিক অনলাইন নেই। আবিরা বুঝতে পারল না এ অবস্থায় সাদিককে কিভাবে সব জানাবে। কিন্তু আর যে দেরি করা চলবে না। আজ রাতটুকুই সময়। আবিরা মুহূর্তের মধ্যে স্থির করে নিল ও কি করবে। ও মেসেজ লিখল কাঁপা হাতে-
“আর সময় নাই। কি কারনে জানিনা কিন্তু কালকে আমার বিয়ে। আজ রাতটুকুই আমার কাছে সময় পালানোর জন্য। আমি আজকেই আসতেছি তোমার কাছে। আমারে তুমি ফিরায় দিও না। আমায় দয়া কইরো একটু।”
এইটুকু লিখে পাঠিয়ে দিয়ে আবিরা উঠে দাঁড়াল। এ বাড়িতে তার নেবার বিশেষ কিছু নেই। শুধু ফোনটা নিয়ে যাবে। একটা প্লাস্টিকে মুড়ে ফোনটা বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিল। বিনুনি করার রুক্ষ চুলের গোচ্ছাটা মাথার উপর খোঁপার মতন করে জড়িয়ে নিল। সালোয়ারের ওড়না কোমরে বেঁধে নিল। তারপর যথাসম্ভব শব্দ না করে পা টিপেটিপে অতি সন্তর্পনে পিছনের দরজা খুলে বাইরে এল। সদর দরজায় তালা খুলতে গেলে আওয়াজ হতে পারে। পিছনের দরজাটা রান্নাঘরের দিকে। সেই দরজায় সব দিন তালা পরেও না কারণ তালা দেওয়ার দায়িত্বটাও আবিরার। আজ এভাবে নির্দ্বিধায় তালা খুলে বেরিয়ে যেতে ওর নিজেরই অবাক লাগল। কেন যে এতদিন এখানে পড়েছিল!
বাইরে কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে শেষ বারের মত তাকাল। আজ যদি ফেলে যাবার কিছু থাকে তবে পুরনো আবিরাকে – যে মুখে রা করলেই মার খেত।
কাঁচা রাস্তাটা পেরিয়ে বড় রাস্তা ধরে নদীর দিকে কিছুটা এগোলেই ক্ষেত পড়বে। মাঠের উপর দিয়ে চলতে থাকলে ভেড়ির পাশ দিয়ে রাস্তা বেঁকে এক সময় আসবে বাঁশবাগান ও অন্যান্য গাছগাছালিতে ঢাকা পুরনো মসজিদ। সামনেই রুনাই নদী। পুরনো মসজিদের সামনে বিজিবির লোক থাকে না। মসজিদকে বাঁয়ে রেখে নদীর ধারে গেলে ঘন বাঁশ বাগান। সেখানে নদী এতই সরু যে ওপারের নদীর ধারের বাড়িঘরগুলো দেখা যায়। সাদিক বলেছিল ওপারে ঠিক রাত বারোটায় পাহারা বদল হয়। সেসময় কিছুক্ষণের জন্য হলেও জায়গাটা শুনশান থাকে। ওই সময়েই নদী পেরিয়ে যেতে হবে। ওপারে গিয়ে খুঁজতে হবে প্রাইমারি স্কুলটা কোথায়। তার পাশেই নাকি সাদিকের বাড়ি। রঙিন ভবিষ্যতের ঝলমলে স্বপ্নটা আবিরা একরকম জোর করেই চোখের সামনে টেনে নামিয়ে আনল। এই স্বপ্নটা ওর কাছে বর্মের মতন। এই স্বপ্নের আবরণে থেকে ওর হঠাৎই নিজেকে খুব সাহসী মনে হল। তারপর দ্রুত শঙ্কিত পদক্ষেপে ও সামনের দিকে চলতে থাকল।
কিন্তু কয়েক পা চলার পরেই পিছনে পদশব্দ পেয়ে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আবিরা। ও পিছনে ঘুরে তাকাবার আগেই রুমি ওকে বজ্রমুষ্টিতে ধরে ফেলল। বিষাক্ত সাপের মত হিসহিস করে রুমি বলল, “কোথায় যাইতেছিস তুই? পালাইতেছিস? ভেবেছিস সবাই ঘুমাইয়া পড়সে? পালিয়ে পার পেয়ে যাবি ভাবলি তাই না? পালানো বের হইতেছে। আমি ঠিক জানতাম যে তুই পালানোর চেষ্টা করবি। আমি আম্মারে কইয়াছিলাম তোরে চোখে চোখে রাখতে। আমি থাকতে তোর পালানো হইবে না। নির্লজ্জ বেহায়া মেয়ে কোথাকার! চল বাড়ি চল। আজ তোকে আম্মা শেষবারের মতো ধোলাই দিবে। চল…”
হ্যাঁচরপ্যাঁচর করে কোনোমতে নিজেকে রুমির হাতের শিকল থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল আবিরা। ওর রোগাটে শরীরটা রুমির সাথে লড়াই করল বাঁচার তাগিদে। ও চেঁচিয়ে উঠল, “ছাইড়া দাও আমায়… আমায় যেতে দাও। ছাইড়া দাও…”
-“ক্যান ছাইড়া দিব না? তুই গেলে কাল কার বিয়ে হইবে? তোরে না দিলে সোহেল আমাদের ছাইড়া দিবে? চল বাড়ি চল…” রুমি ওকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
-“ছাইড়া দাও গো… কিসের এত জ্বলন তোমার আমার লগে? আমায় তুমি সহ্য করতে পারোনা ক্যান? কি করছি আমি? ছাইড়া দাও আমায় আপা। ছাইড়া দাও…”
আবিরা কেঁদে উঠল।
-“ইসস্! আমার নাকি জ্বলন তোর লগে! তোর সাথে আমার তুলনা?! কোথায় তুই আর কোথায় আমি! একটু চাইয়া দেখ। আর এত মুখে মুখে কথা কওনের সাহস তোর কোথা থেকে আইল? আজ আমি তোর শেষ দেইখা ছাড়বো। তোরে সহ্য করতে আমার বইয়া গেছে।”
ধস্তাধস্তির মধ্যেই আবিরা আচমকা সজোরে কামড়ে দিল রুমির হাতে। রুমি ককিয়ে উঠে ওর হাত ছেড়ে দিল। আর এদিকে আবিরা ছাড়া পেয়েই রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা ইঁটের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে সজোরে রুমির মাথায় মারল। “আহ্” করে যন্ত্রণায় মাথা চেপে ধরে রুমি ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে কাতরাতে থাকল। আবিরা সামনে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। ও কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রুমির অবস্থা দেখল। তারপর একপা-দুপা করে পিছন করে হাঁটতে থাকল। আবিরার চোখদুটো আগুনের মতো জ্বলছে। শরীর-মনে এত জোর ও আগে কোনদিনও অনুভব করেনি। রুমি ওর দিকে চেয়ে মাথা চেপে ধরে বলল, “যাসনা আবিরা। আমি মানা করছি। তোর ভালো হইবে না…”
আবিরা হিসহিসিয়ে বলে উঠল, “যাইতেছি। তোমার সামনে দিয়া চইলা যাইতেছি। চাইয়া দেখো। আটকাবে আমারে? আসো আটকাও। আবার মারবো।”
রুমির মাথা থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। ও মাথাটা ধরে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু না পেরে আবার ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল।
রুমির দিকে চেয়ে আবিরা বলল, “আমার ভালো হইবে কি হইবে না সে দেখা যাবে। তবে যাবার আগে একটা কথা কইয়া যাই যা কোনদিনও কইতে পারি নাই। আমার লগে তোমার এত সমস্যা ক্যান জানো? কারণ তুমি আর আমি এক্কেবারে এক জায়গায় আছি। আমি যেমন অভাগা, সংসারের এক কোণে পইড়া থাকা আবর্জনা, তুমিও তেমনি বাপের সংসারে পইড়ে থাকা একটা অকাজের জিনিস। আমায় লইয়া কারু মাথাব্যথা নেই। আমি তো বাজারে বেচবার কাঠের পুতুল। তোমার অবস্থাও একইরকম। তুমি ভাবখান এমন দেখাও যেন তোমার জীবনে কিছু খারাপ হয় নাই, যেন বাপের সংসারে সবাই তোমারে মাথায় কইরা রাখে। কিন্তু তুমি নিজে ভালো কইরা জানো যে আসলে না কেউ তোমায় নিয়ে ভাবে আর না ভাবতে চায়। নিজের পেটের মাইয়া তো, তাই তোমার আম্মা তোমারে ফেলতে পারেনা। তোমার কথা ওরা ভাবলে তোমার ছেলেদুইটাকে আনবার চেষ্টা একবার তো কেউ করত! তুমি আমারে দেখতে পারোনা কারণ আমায় দেখলে তোমার মনে পইড়া যায় যে তোমার অবস্থা একেবারেই আমার মত। আমারে দেইখ্যা তুমি ভয় পাও। কে জানে একদিন হয়তো তোমার আব্বা আমার মতন তোমারেও কারো হাতে বেচে দিবে বিয়ের নাম কইরা। কি কইলা তুমি তখন, কোথায় তুমি আর কোথায় আমি? চাইয়া দেখো ভালো কইরা- আমরা দুজন এক্কেবারে এক জায়গায় আছি, রাস্তার ধুলোতে।”
রুমি কোনো উত্তর দিতে পারল না। কেবল হিংস্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আবিরার দিকে। আবিরা আর দাঁড়াল না। এবার সামনে ফিরে দৌড়াতে শুরু করল যত জোরে পারে। ওর কানে এল পিছনে রুমি পাগলের মতন চিৎকার করছে- “আব্বাআআ… আম্মাআআআ… আবিরা চইলা গেল… পালাইয়া গেল… মাইরা ফেললো গো আমায়! আম্মা তাড়াতাড়ি আসো…”
আবিরা পাগলের মতন নদীর দিকে ছুটে চলল। ছুটতে ছুটতে একবার আছাড় খেল। কিন্তু কোথায় কাটল-ছড়ল তার তোয়াক্কা না করে উঠে দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করল। মাঝে একবার বিজিবির লোককে এড়াতে মাঠের পাশে ঝোপের মধ্যে শুয়েও পড়তে হল। এভাবে অবশেষে ও পুরনো মসজিদ পার করে নদীর পারের বাঁশবাগানে এসে পৌঁছাল। গাছের ডাল ছিঁড়ে-ঠেলে কোনোমতে জলের দিকে এগিয়ে গেল আবিরা। এমনসময় অনেকগুলো মানুষের গলার আওয়াজ ভেসে এল পেছন থেকে। সম্ভবত ওকে ধাওয়া করেই একটা দল ছুটে আসছে এদিকে। বেশ দ্রুত এগিয়ে আসছে ওরা। ওদের গলার আওয়াজ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। স্নায়ুকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে আবিরা জলের দিকে এগিয়ে গেল। নদীর পাড়ের কাদামাটিতে ওর পা বসে গেল। জলের ছোট্ট ঢেউ এসে আরাম-ছোঁয়া দিয়ে গেল। বুকের ভেতর থেকে প্লাস্টিকে জড়ানো ফোনটা বার করে একবার ইন্টারনেট খুলে দেখল সাদিকের কোনো উত্তর এল কিনা। কিন্তু সাদিক এখনো নিরুত্তর। কাদামাটিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে জলের আরাম খেতে খেতে আবিরা ভাবল সাদিক নিশ্চয়ই ওকে ফিরিয়ে দেবে না। যে ওকে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখাল, সে কি পরভূমে ওকে একা ছেড়ে দেবে? কখনোই না! আবিরা এক পলকের জন্য পিছনে ফিরে চাইল। দলটা খুবই কাছাকাছি এসে পড়েছে। ওদের হাতে জোরালো আলোর টর্চ। পিছনে ফেরার পথ বন্ধ। এবার যা হবার হবে। নদী পেরোতেই হবে। আবিরা ফোনটা প্লাস্টিকে মুড়ে আবার বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে জলে গা ডুবিয়ে দিল। খানিকটা পাঁকের মধ্যে হেঁটে যাবার পর জলস্তর ক্রমশ ওর গলা ছাপিয়ে উপরে উঠে গেল। আবিরা সাঁতার দিতে শুরু করল। পায়ে একবার ঝাঁঝির ঝাঁক এসে আটকাল। একবার সর্পিল কিছু একটা ওকে ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। সেদিকে মন না দিয়ে ও সামনের দিকে এগোতে থাকল। মাঝনদীতে লম্বালম্বি একটা দড়ির মতন ফেলা সীমানা স্বরূপ। তার ওপর দিয়ে ও সাঁতরে পেরিয়ে গেল। জল আছড়ে শব্দ করে সাঁতার কাটার বদলে পা দিয়ে জল নিচের দিকে ঠেলে সাঁতার কাটল আবিরা। একসময় ও পায়ের নিচে জমি অনুভব করল। পাঁকে পা দিয়ে হেঁটে শরীরটাকে টেনে নিয়ে গিয়ে পাড়ে উঠে একটা বড় গাছের পিছনে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। হাঁফাতে হাঁফাতে ও দেখল ওপার থেকে অনেকগুলো টর্চার আলো জলের ওপর পড়ে খুঁজছে পলাতক পাখিকে। আবিরা গাছের গায়ে গা এলিয়ে হাঁফাতে থাকল।
ওপাশ থেকে অস্পষ্ট শোরগোল ভেসে আসছে এখনও। একটু ধাতস্থ হবার পর ভাল করে লক্ষ্য করল আশেপাশে কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে কিনা। কাউকে দেখতে না পেয়ে ও উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে চলতে শুরু করল। এই তবে সেই নীল স্বপ্নের দেশ। এখানে খুঁজে নিতে হবে সাদিককে যেমনভাবে হোক। খানিকক্ষণ কাঁচা রাস্তা দিয়ে এগোনোর পর দূরে একটা আলোর রেখা চোখে পড়ল। রাস্তার আলো মনে হচ্ছে। জোরে পা চালিয়ে রাস্তায় উঠল আবিরা। এমন সময় কাছাকাছি কোথাও থেকে একটা বাইকের আওয়াজ ভেসে এল। আবিরা দেখল রাস্তার বাঁপাশে একটা ছোট্ট গুমটি মতন দোকানঘর। তাড়াতাড়ি রাস্তা থেকে নেমে ও দোকানঘরের পিছনে গিয়ে লুকালো। ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে বাইকে করে দুটো ইউনিফর্ম পরা লোক চলে গেল। এরাই তবে বিএসএফ। আবিরার বুকের ভেতর হাতুড়ি পিঠছে। বেশ কিছুক্ষণ দোকানঘরের পিছনে লুকিয়ে থাকার পর ও বেরিয়ে এসে দোকানের সামনের নড়বড়ে বেঞ্চিটায় বসে পড়ল। খুব ক্লান্ত লাগছে। কিভাবে যে পাহারা এড়িয়ে সামনে এগোবে এত রাতে বুঝতে পারছে না। এই অন্ধকারে কোথায় খুঁজবে প্রাইমারি স্কুল আর সাদিকের বাড়ি! গায়ের জামাটা এখনো ভিজে জবজব করছে। এভাবে ভিজে অবস্থায় থাকতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। তেষ্টাও পেয়েছে খুব। কিন্তু সামনে অনেক জল থাকলেও তা খাবার উপায় নেই। এত রাতে কি প্রাইমারি স্কুল খুঁজতে এগিয়ে যাওয়া আদৌ ঠিক হবে? কোনোমতে পাহারা বাঁচিয়ে এতদূর এসেছে। কিন্তু বিএসএফের হাতে পড়লে তো সব শেষ। তবে কি ভোরের আলো ফোটা অব্দি অপেক্ষা করবে? বেঞ্চে বসে দোকানঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাজারো চিন্তার পুঁটলিটার জট খুলতে খুলতে আবিরার চোখ লেগে এল।
-“এই কে গো তুমি? এই মেয়ে, ওঠো ওঠো… কাদের মেয়ে গো! ভিকিরি নাকি?! এখানে ঘুমিয়ো না। এটা কি ঘুমানোর জায়গা? ওঠো ওঠো…” পুরুষকন্ঠের ধাতানিতে আবিরার ঘুমটা ভেঙে গেল। গতরাতে বেঞ্চে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে এতই গভীর ঘুমিয়েছে যে এক ঘুমে রাত কেটেও গেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে ও উঠে বসল।
-“কে গো তুমি? এখানে কেন ঘুমোচ্ছ? দেখে তো ঠিক ভিকিরি মনে হচ্ছে না। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি?” সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা বৃদ্ধ প্রশ্ন করল। আবিরা একটু সময় নিল উত্তর দিতে। তারপর ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, “না মানে… মানে…”
-“মানে মানে করছ কেন গো? সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ নাকি!” বুড়োর কপালে ঈষৎ ভাঁজ পড়ল।
আবিরা ইতস্তত করে বলল, “”হ্যাঁ পালিয়ে এসেছি… বাড়ির লোক বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল তাই… রাতের অন্ধকারে কোথাও যাবার জায়গা না পেয়ে দোকান ঘরে… আচ্ছা এখন কয়টা বাজে চাচা?”
-“এই পাঁচটা বাজতে দশ। তা কোথাকার মেয়ে তুমি? বেঞ্চিতে পড়ে পড়ে রাতে তো ভালোই ঘুমুলে। এখন যাবে কোথায়? এদিকের মেয়ে তো নও। তাহলে তো এখানে শুয়ে ঘুমুতে না। এদিকে কেউ চেনা-টেনা আছে?”
-“বাড়ি অনেক দূর। এই এলাকায় একজন চেনা আছে।” আবিরা যথাসম্ভব এদিককার ধাঁচে কথা বলার চেষ্টা করল।
-“কে চেনা আছে? কাদের বাড়ি যাবে? ঠিকানা জানো তো ঠিক করে নাকি অর্ধেক জেনেই এসে হাজির হয়েছে?! আসলে অনেক তো দেখলাম এরকম… ঠিকানা জানা থাকলে তো আর আমার দোকানে পড়ে ঘুমুতে না।” বুড়ো দোকান খুলে চারদিকে জলের ছিটে দিতে দিতে বলল। বুড়োর স্বরে হালকা বিরক্তি ফুটে উঠল, যেন আপদ বিদায় হলে বাঁচে।
-“ঠিকানা জানি। আসলে ফোন নেই তো কাছে। তাই অন্ধকারে অত রাতে ঠিক চিনতে পারিনি বলে এই দোকানে… আচ্ছা এখানে প্রাইমারি স্কুলটা কোথায় কইতে পারেন চাচা? ওখানে সাদিক ওসমান নামে একজন থাকে, চেনেন? ওই প্রাইমারি স্কুলের কাছেই বাড়ি।”
-“প্রাইমারি স্কুলের কাছে বাড়ি? কি নাম বললে সাদিক ওসমান? উমম… আখতারের ছেলে কি? না না… সে তো বাচ্চা ছেলে, স্কুলে যায়। তাকে তুমি কি করে চিনবে! আর কে আছে সাদিক ওসমান নামে… কিরকম বয়স বলতো?”
-“এই ধরুন তিরিশ হবে। ওদের কাপড়ের দোকান আছে শহরে।”
-বুড়ো খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবল। তারপর বলল, “ওহো মনে পড়েছে। হ্যাঁ হ্যাঁ সাদিক ওসমান। ওর কাকার নাম মোহাম্মদ ওসমান যাদের কাপড়ের ব্যবসা। ইদানিং খুব অবস্থা ফিরেছে। মাঠের দিকে এখন নতুন বাড়ি তুলেছে। সেই তো?”
-“হ্যাঁ হ্যাঁ সেই।” আবিরার চোখমুখ ঝলমলিয়ে উঠল। যাক, সাদিকের হদিস তবে পাওয়া গেল। কাল রাতের পর থেকে এই প্রথম ভিতর-বাহির সব দিকেই একটু আলোর দিশা পেল আবিরা।
-“তাহলে আর কি! এবার মানে মানে কেটে পড়। এক্ষুনি আবার আমার খদ্দেররা সব আসতে শুরু করবে। তোমায় দেখে আবার পাঁচ লোকে পাঁচটা প্রশ্ন করবে। বাড়ি পালানো কেস। থানা-পুলিশ হতে কতক্ষণ! আমি মাঝখানে ফাঁসব। না বাবা, এসব ঝামেলা আগে অনেক দেখেছি। লোকের ভালো করতে গিয়ে নিজের পেছনে বাঁশ খেতে হয়। কিছু না জানলেও অনেক হ্যাটা পোহাতে হয়। আর না! এবার তুমি এসো।” গনগনে আগুনের শিখার উপর বিশাল ডেকচিতে চা চাপিয়ে বুড়ো বলল।
আবিরাও দেখল আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই অনুভব করল যে খিদে আর তেষ্টা বেশ ভালোরকমই পেয়েছে। ইতস্তত করে বলল, “চাচা একটু জল হবে?” বুড়ো সবুজ প্লাস্টিকের জগটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে হঠাৎ তীক্ষ্ণ চোখে প্রশ্ন করল, “এই মেয়ে তুমি সত্যি করে বলত বাড়ি কোথায়? তোমার কথা শুনে একটু কিরম কিরম লাগছে। কথার ঢংটা যেন একটু অন্যরকম। অনেক দৌড়ঝাপ করে এসেছ বোঝাই যাচ্ছে।ওদিক থেকে জল পেরিয়ে আসোনি তো?”
আবিরা চমকে উঠলেও যথাসম্ভব স্থির গলায় উত্তর দিল, “না না আমি এদেশেরই মেয়ে। বসিরহাটের।” সাদিকের মুখেই একবার বসিরহাট নামটা শুনেছিল। বসিরহাটে সাদিকের বড়ভাইয়ের দোকান আছে। তাই সেটাই বলে দিল।
-“ও বসিরহাট! হ্যাঁ ওদিকেই কোথায় ওদের একটা দোকান আছে শুনেছিলাম। তা এত রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে কেমন করে এলে একা একা?”
-“এলাম অনেক কষ্টে।”
আবিরার উত্তরে বুড়ো যে সন্তুষ্ট হল না সেটা তার মুখের ভাবে ফুটে উঠল। বুড়ো বলল, “ভেঙ্গে বলবে না তাইতো? ঠিক আছে। আসলে এপার-ওপার যাতায়াত, প্রেম-পিরিতি, ছেলেধরা-মেয়েধরা এসব তো আর এত বছরে কম দেখলাম না। এটা বর্ডার এলাকা। বিএসএফের এলাকা বুঝলে? যে কোনো ঝামেলায় বিএসএফ নদীর ধারে আমাদের মতন ছোটখাটো দোকানদারদের এসে প্রশ্ন করে। যাগগে! আমার দোকানে এসে পড়েছ যখন তুমি একরকম আমার খদ্দের। সকাল সকাল বাসিমুখে খদ্দের বিদায় করলে পাপ লাগবে। এক কাপ চা খেয়েই যাও।”
-“কিন্তু আমার কাছে তো টাকাপয়সা নেই। কিছুই আনতে পারিনি।”
-“সে থাক। এককাপ চায়ের দাম না নিলে আমি গরিব থেকে হদ্দ গরিব হব না।” আবিরা বুড়োর প্রস্তাবে মনে মনে খুশি হল। খানিকক্ষণ বসে কাঁচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর তিনটে বিস্কুট খেয়ে বুড়োর থেকে দিক নির্দেশ ভালোভাবে বুঝে নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পা চালাল। রাস্তার বাঁকে আবিরার অবয়বটা মিলিয়ে যেতেই বুড়ো দ্রুত হাতে গেঞ্জির পকেট থেকে একটা ছোট্ট পুরনো মোবাইল ফোন বের করে বোতাম টিপে নম্বর ডায়াল করল।
-“গুড মন্নিং স্যার! খগেন বলছি। বলছিলাম কি যে এলাকায় নতুন পাখি দেখা গেছে…”
-“…”
-“হেঁ হেঁ, জানি তো স্যার। বলছি, সব বলছি। আগে আপনি বলুন আমার মালটা আজকে ছাড়া পাবে তো?”
-“. . .”
-“আরে না না, ওসব ভাবতে হবে না। আপনারা যদি দেখতেই না পান তাহলে আর ঝামেলা কিসের! দেখতে না পেলে ধরবেন কি! আজ ঠিক রাত বারোটায় মাল চলে যাবে। কোনো সমস্যা হবে না। আপনারা শুধু একটু দেখতে পাবেন না ব্যাস্!”
-“…”
-“হাকিমপুর প্রাইমারি স্কুলের পাশের রাস্তা দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাঁদিকে রেখে মাঠের উপর দিয়ে গিয়ে একতলা পাকা বাড়ি। সাদিক ওসমান। বাকিটা আপনারা গেলেই বুঝে যাবেন।”
-“. . . “
-“ঠিক আছে স্যার। ওই কথা রইল। হেঁ হেঁ…” এঁটো হাসি হেসে বুড়ো ফোন কেটে দিল।
ওদিকে আবিরা চলেছে সাদিকের কাছে। মাথার ওপর আকাশ ধীরে ধীরে আরো পরিষ্কার হচ্ছে। রাস্তায় একটা-দুটো সাইকেল-বাইক পাশ দিয়ে সাঁই করে চলে গেল। পাখির ডাক ভেসে আসছে আশপাশের গাছগাছালি থেকে। সব মিলিয়ে ভোরের পরিবেশ মনোরম। বুড়ো দোকানদারের নির্দেশ মত প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে ঢুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাঁয়ে রেখে ডানদিকে মাঠের রাস্তায় উঠল আবিরা। ক্ষেতের পাশে কয়েকটা টালির বাড়ি ছেড়ে ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরই মাঝে একটা একতলা পাকাবাড়ি চোখে পড়ল। বাড়িটার সামনে উঠোনকে ঘিরে অনুচ্চ ইঁটের পাঁচিল। উঠোনের একপাশে আমগাছ, পেয়ারা গাছ, কাঁঠাল গাছ আর অন্যপাশে একটা বড় কাঁঠালিচাপা আদুরে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবিরার চোখ চকচক করে উঠল। ওই তো! ওটাই তাহলে সাদিকের বাড়ি। চারপাশের গতিপ্রকৃতি ওর আর কিছুই নজরে পড়ল না। রঙচঙে ভবিষ্যতের সেই ঝলমলে স্বপ্নটা ভোরের আকাশ ফুঁড়ে ওর চোখের সামনে নেমে এল। সেটাকে আবার বর্মের মতো গায়ে জড়িয়ে আবিরা হেঁটে চলল। ওর বুকের ভেতর উথালপাথাল ঢেউ। এতদিনের জমিয়ে রাখা সহস্র অনুভূতির পাহাড়টা গলা বরফের মতন ওর চোখ বেয়ে নেমে এল। আগুনমুখী মোহগ্রস্ত পতঙ্গের মতো আবিরা ছুটল সাদিকের বাড়ির দিকে। বাড়িটার গায়ে সরল গার্হস্থের ছাপ। উঠোনের সামনে টিনের গেটটা সশব্দে ঠেলে আবিরা ঢুকে দাঁড়াল। ওর মনে হল নিজের হৃদযন্ত্রের ওঠানামার আওয়াজে ওর নিজের কানেই তালা লেগে যাবে।
ওর গেট খোলার আওয়াজে বাড়ির পেছন দিক থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এল। মেয়েটা বয়সে ওর চেয়ে কিছুটা বড় হবে। গায়ের রং পরিষ্কার। তার মধ্যযৌবনের লালিমায় কায়িক পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট। একটা নেতিয়ে যাওয়া সুতির শাড়ি পরনে। আঁচলটা মাথার উপর ফেলা। ঘোমটার নিচ দিয়ে না আঁচড়ানো উশকো-খুসকো চুলগুলো বেরিয়ে আছে। দুহাতে দুটো করে সবুজ চুড়ি। বউটা ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কাকে চাই?”
-“এটা কি সাদিক ওসমানের বাড়ি?” আবিরা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল। ওর চোখ এদিক-ওদিক ঘুরে খুঁজে নিতে চাইছে ওর কাম্য ব্যক্তিটিকে।
-“হ্যাঁ তারই বাড়ি। কেন কি দরকার?” মেয়েটার গলাটা বেশ কর্কশ।
-“সাদিক বাড়ি আছে?”
-“আছে। বাড়ি থাকবে না তো কোথায় যাবে এমন সময়!”
-“সাদিককে একটু ডাকেন না। ওকে আমার খুব দরকার।”
-“এখন ডাকা যাবে না। সাদিক এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। কি দরকার আমায় বলো। কাপড় নিতে এসেছো নাকি?”
-“আপনি ওকে একটু ডাইকা দেন। ওর জানা দরকার যে আমি এখানে আইসা পড়সি।”
-“এইখানে আইসা পড়সো! জানা দরকার! মানে? অ্যাই মেয়ে… কে তুমি? কি চাও এখানে? সাদিককে কি করে চিনলে গো?” মেয়েটা এবার বেশ রেগে গিয়ে গলার স্বর চড়াল।
-“আপা আপনি কি সাদিকের বোন? সাদিককে আমার খুব দরকার। আপনি ওরে একটিবার ডাকেন। ও এলেই আপনি সব বুঝতে পারবেন। দয়া কইরা ওরে ডাকেন। আপা আমি অনেক দূর থেকে আসছি। আমি আর দেরি করতে পারতেছি না। সাদিককে একবার ডাকেন।” আবিরা হাতজোড় করে আকুল স্বরে বলল।
মেয়েটা প্রচন্ড রেগে হাতের ঝাঁটা মাটিতে ফেলে ওর দিকে এগিয়ে এসেছি চেঁচিয়ে উঠল, “এই মেয়ে, সাতসকাল এসে যাত্রা করছো? যাত্রা হচ্ছে এখানে? আমার বাড়িতে এসে আমার লোককে খুঁজচো আবার বলছোও না কি দরকার। অনেক দূর থেকে এসেছো? এতই যদি তাড়া তাহলে আমায় বলো না কি দরকার! ভোরবেলা লোকের বাড়ি এসে ছ্যাঁচড়ামি হচ্ছে? সাদিককে তোমার কি কামে লাগবে আমায় না বললে বেরোও বাড়ি থেকে। আগে আমায় সব কথা বলবে তারপর অন্য কথা।” মেয়েটার গলার স্বর আরও চড়ল। তার গলার আওয়াজে ইতিমধ্যে আশপাশের কাঁচা বাড়িগুলো থেকে কিছু বউ-ছেলে এগিয়ে এসে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে থেকেই একটি মোটাসোটা মাঝবয়সী মহিলা উঠোনে ঢুকে এসে বলল, “কি হয়েছে রে? চেঁচাচ্ছিস কেন এমন সময়?”
-“আরে দেখো না কাকি, সবে উঠে ঝাঁট দিচ্ছি। এতো কাজ পড়ে আছে। আর এই মেয়েটা সাতসকালে এসে তখন থেকে সাদিক-সাদিক করে যাচ্ছে। বললাম সাদিক ঘুমোচ্ছে। কাল কত রাতে ফিরেছে। একটু না ঘুমালে কি করে কাজে যাবে। ডাকা যায় বলো? এত করে জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু কি দরকার আমাকে কিছুতেই বলছে না। অথচ ওর নাকি সাদিককে খুব দরকার, ও নাকি অনেক দূর থেকে এসেছে। তুমি বলো এই মেয়েকে আমি বাড়িতে ঢুকতে দিয়ে দেবো?” মেয়েটা ঝাঁজিয়ে উঠে বলল।
-“ওমা, এ আবার কি কাণ্ড গো! ও মেয়ে, কে তুমি? কি চাও? সাদিক কে হয় গো তোমার? রহিমাকে বল না। রহিমা না হয় সাদিককে বলবে।” ভদ্রমহিলা ততোধিক জোরে বলল।
আবিরা আর কোনো উত্তর না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল “সাদিইইইক…. সাদিইইইইক…” পিছন থেকে বউ দুটো হাঁইহাঁই করে উঠল। “আরে ডেকো না… একি অসভ্য মেয়েগো…চেঁচাচ্ছো কেন… চুপ করো…”
চেঁচামেচির আওয়াজে একটি বছর তিরিশের যুবক ঘুম চোখে আড়মোরা ভাঙতে ভাঙতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। হালকা হাই তুলে সে বলল, “সকাল সকাল কি ঝামেলা শুরু করেছো তোমরা? কি হলোটা কি? সারারাত খেটেখুটে এসে মানুষ একটু ঘুমোবে, তা না চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। কি হয়েছে? কে মরেছে?” এই বলে চোখ কচলে ভালোভাবে সামনে চাইতেই ছেলেটার মুখ শুকিয়ে গেল।
আবিরা ওকে দেখে ওর দিকে ছুটে গেল অনাবিল আনন্দে। একলাফে বারান্দায় উঠে ছেলেটার হাত ধরে বলল, “সাদিক আমি… আমি আইসি… আমি সব ছাইরা আইয়া পড়সি… আমি পেরেছি পালাইয়া আসতে… কেউ আটকাইতে পারে নাই আমায়। অনেক বিপদ এড়াইয়া আমি আইসি। আমি সত্যিই আইসি! আমি তোমারে মেসেজ দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি অনলাইন ছিলে না। আমার হাতে সময়ও ছিল না তাই আগে জানাইতে পারি নাই।” আবেগে আবিরার গলা ভারি হয়ে এল। ওদিকে এতক্ষণ যারা বাইরে থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারছিল তারাও বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়েছে। সকলে জড়ো হয়ে আয়েশ করে নাটক দেখছে।
-“কি হইলো, তুমি চুপ ক্যান? কিছু কও! সাদিক আমি আবিরা। আমি আগাম জানাইতে পারি নাই। সময় ছিল না। কোনমতে প্রাণ বাঁচাইয়া আইয়া পড়সি। কিভাবে যে আইলাম তুমি ভাবতেও পারবা না। আমারে তুমি ফেরাবে না জানি। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। সাদিক কিছু কও…” আবিরা অস্থির হয়ে বলল। শাড়িপরা মেয়েটা বারান্দায় উঠে এসে সাদিকের হাত আবিরের হাত থেকে ছাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাইইই… এই মেয়েটা কে? এসব কি বলছে ও? পালিয়ে এসেছে কেন? কে হয় ও তোমার? কোথা থেকে পালিয়ে এসেছে? কি জানাবে তোমাকে আগে থেকে? তোমাকে মেসেজ করেছে বলছে। তুমি চেনো ওকে? মুখে কথা নেই কেন? কি সম্পর্ক ওর সাথে তোমার?”
সাদিক ঢোঁক গিলে বলল, “ও কেউ না… আমার কেউ না… তুমি শান্ত হও। ও আবার আমার কে হবে! আমার সাথে ওর কোনো সম্পর্কই নেই। আমার বন্ধুর বোন। ওর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল তো তাই পালিয়ে এসেছে বোধহয়।”
-“বন্ধুর বোন? বন্ধুর বোনের সাথে তোমার এত পিরিত কিসের? কোন বন্ধুর বোন? বাপের জম্মে তো এর কথা কোনোদিন শুনিনি! আর এই ভোরবেলা এসে তোমার বাড়িতে হাজির হয়েছে কেন? তুমি কি করবে? তোমার হাত ধরে এরকম করে কথা বলছে তুমি বলছ সম্পর্ক নেই? অ্যাইই হারামজাদা… কি ঝামেলা পাকিয়ে রেখেছো তুমি? সত্যি করে বলো। এর সাথে তুমি লটরপটর চালাচ্ছো না তো? একটা মিথ্যে বললে কিন্তু আজকে তোমাকে শেষ করে আমি নিজে শেষ হবো এই বলে দিলাম…” মেয়েটা প্রবল আক্রোশে সাদিকের গেঞ্জি খামচে ধরল।
-“আহ্ রহিমা ছাড়ো। সত্যিই আমার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। আরে আমি ওর দাদার মতন। ওর বাপ-মা কেউ নেই। বাড়ি অনেকদূরে। তুমি চিনবে না ওদের। একদিন কথায় কথায় বলে ফেলেছিলাম যে কোনো সাহায্য লাগলে আমার কাছে আসতে। আমার নাম্বারটা বোধহয় ওর দাদার থেকে পেয়েছে। মুখ চেনে তো আমাকে, তাই এরকম করে কথা বলছে। ওর বাড়ি থেকে ওর অমতে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল তো তাই বোধহয় আজকে পালিয়ে এসেছে। আমি কিছুই জানি না। কাল তো তুমি নিজে দেখলে আমি কত রাতে ফিরলাম। এসে খেয়েই শুয়ে পড়েছি। আমি যদি জানতাম ও আসবে আমি কি পড়ে পড়ে ঘুমোতাম? কেন মিথ্যে বলব আমি তোমায়?”
আবিরার মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। কি বলল সাদিক? কোনো সম্পর্ক নেই? বন্ধুর বোন? আবিরার সর্বাঙ্গে কেমন জ্বালা করতে লাগল। প্রচন্ড অস্বস্তি হচ্ছে। রঙচঙে স্বপ্নের বর্মটা সরে গিয়ে সূর্যের আলো হঠাৎই ওর চোখ ধাঁধিয়ে দিল। আশপাশের ফিসফাস-কানাকানি বিষের তীরের মতন ওকে ছুঁয়ে বেড়িয়ে যেতে থাকল। বারবার মনে একটাই কথা ঘুরতে লাগল “সম্পর্ক নেই!”
সাদিক বলল, “দেখ বোন, এই এমন সময় পালিয়ে আমার বাড়িতে চলে এলে ভালো দেখায় বল? তোমার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক! হ্যাঁ একদিন না হয় আমি তোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলেছিলাম যে সাহায্য করব। তখন তোমার বাড়িতে পরিবেশ ঠিক ছিল না, তোমার মনের অবস্থা ঠিক ছিল না। তাই বলেছিলাম আর কি। কিন্তু আমি কি করতে পারি বলো? আমার কি ক্ষমতা? হঠাৎ করে যে এসে হাজির হলে, এখন তুমি কোথায় যাবে? আমি তো তোমায় কোনো কাজ দিতে পারবো না এখানে। আর এই ছোট্ট বাড়িতেই বা তোমাকে রাখবো কোথায়। লোকে কি বলবে। তার চেয়ে বরং বাড়ি ফিরে যাও। আমি পরে গিয়ে তোমার দাদাদের বোঝাবো। এখন যাও। সময়মত ফিরে যেতে পারলে ওরা হয়তো তোমাকে ঘরে তুলেও নেবে।”
আবিরা পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। রহিমা চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাইই মেয়ে, শুনলে তো আমার বর কি বলল? এ বাড়িতে জায়গা হবে না। কোথাকার কে! কেউ তাকে চেনে না, মুখ উঠিয়ে চলে এলেই হল নাকি! নিজের ব্যবস্থা নিজে করো গে। তোমার বিয়ের ঝামেলায় আমরা জড়াবো কেন? যাও যাও… আমার বরের সঙ্গে বোঝাপড়া আমি করছি। তুমি এখন বিদায় হও। আর শোনো, আর কোনোদিন দুমদাম ওরকম লোকের কথায় ভরসা করে এদিক-ওদিক চলে যেও না। যাও এখন।”
আবিরা মরা মুরগির মতন সাদিকের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চাইল। রহিমা ওকে আবার ধাতানি দিল। “কি হলো? কথা কানে যাচ্ছে না নাকি? আমরা কোনো সাহায্য করতে পারবো না। এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। এখানে জায়গা হবে না। যাও যাও… যেখান থেকে এসেছো সেখানে ফিরে যাও…”
উঠোনে দাঁড়ানো লোকজনের মধ্য থেকেও একটা সমর্থনের ঢেউ উঠল। আবিরা সাদিকের দিক থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে একপা-দুপা করে বারান্দা থেকে নামতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক পা নামার পর ও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হঠাৎই উঠোনের একপাশে গাছের সামনে পড়ে থাকা কাস্তেটা উঠিয়ে নিয়ে সোজা পেছনে ঘুরে ছুটে গিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে সাদিকের বুকে কোপ বসিয়ে দিল। সাদিকের বউ চিৎকার করে কেঁদে উঠে ওকে আটকাতে গেল। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনেরা ছুটে এসে ওকে ধরে সরিয়ে নেবার আগেই আবিরা শরীর-মনের শেষ জোরটুকু দিয়ে সাদিকের বুকের ভেতর কোপ বসিয়ে গেল। এক দুই তিন চার পাঁচ… ওর নিজেরও আর মনে পড়ে না কতগুলো। চারপাশে চিৎকার-চেঁচামেচি আর কান্নার রোল উঠল। আবিরা উন্মাদের মত সাদিকের বুকে কোপ বসিয়ে গেল। ওর গলা দিয়ে একটা রক্ত জল করা আর্তনাদ বেরিয়ে এল-“অ্যাআআআআ…..”!
এরপর বাকিটা ধোঁয়াশা। কিভাবে যেন খবর পেয়ে সেই সময়ই বিএসএফের লোক এসে হাজির হয়েছিল সাদিকের বাড়িতে। তারপর লোহার বেড়ার অন্তরালে একটা একটা করে দিন পেরিয়েছে। একটা লোহার বাক্স থেকে আর একটা লোহার বাক্সে ওর স্থানান্তর হয়েছে। আবার সেখান থেকে আর একটা বাক্সে। নিজের বিচার নিয়ে, শাস্তি নিয়ে আবিরা আর ভাবিত নয়। ও দোষী সাব্যস্ত হল কিনা তাতেও ওর আর কিছু যায় আসে না। ওর সেই সাদা-কালোর লিস্টটা আবিরা মন থেকে মুছে ফেলেছে। আবিরা এখন জানে যে সাদা আর কালো বলে আসলে কিছু হয়ই না। আবিরা এও ভাবে যে বোধহয় ভালো আর মন্দ বলেও কিছু হয় না। যে ভাল থাকতে চায় তার মন্দ হতে কতক্ষণ লাগে? ভাল থাকতে চাইলেই কি ভাল থাকা যায়? হয়ত পৃথিবীর চোখে আবিরা ভালো মেয়ে না। কিন্তু তাতে ওর আর কিছু যায় আসে না।

এক সিটিং -এ পরে ফেলা গেল। খুব গ্রিপিং।
আবিরা বেশ আটকে ধরে রাখে শেষ পর্যন্ত। শেষে গিয়ে বেশ একটু খারাপ খারাপ লাগে। মানে যখন জীবনে কাউকে অন্তত একবার জিতিয়ে দিতে ইচ্ছে করে কিন্তু পারা যায় না কারন কলমটি তোমার বদলে লেখকের আঙুলে সেরকম ধরনের খারাপ লাগা। বাকি সব ফার্স্ট ক্লাস । 👍
LikeLike
Khub mon kharap kora golpo. Abirar dukhyo gulo attyo nipunata r sathe bakhya krechish j nah chaileo dube gachi tar Jontronay protyek line e lekha gulo tir hoye bidheche. Lekhikar toh sarthokota ae khane e bodhoy.. Etuku e bolbo Bondhu hisebe Gorbito ami. Pashe achi thakbo. 🩷
LikeLike