আকাশের সিঁড়ি

সবই ছিল সাধারণ। খুব বেশী অবাক করার মত কিছুই ছিল না। সেই তো পাহাড়, পাহাড়ের ওপরে রিসোর্ট। নতুন আর তেমন কী! কিন্তু তারপরও স্নিগ্ধ নিরবিলি পরিবেশ। একে তো প্যান্ডেমিকের ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড তার ওপর আবার অফ টাইম। পুরো রিসোর্টটাই ফাঁকা।

একটুও চিন্তা যে লাগেনি তা না। কারণ, আসলেই কোথাও তো কেও নেই। যদি কোন কিছু হয়, লোকালয়ের কাওকে কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না। সব কিছু তো হাজারটা সিঁড়ির নিচে। আর বড়জোর ওই দূরের দুই একটা বাড়ি-ঘরে কয়েকটা মানুষ। কিন্তু কাঠের ছাদ, পরিপাটি চারিদিক, খুব অশান্ত মনকেও হঠাৎ শান্ত করে দেয়। হয়ত তাই এই চিন্তাটাও বেশিক্ষণ থাকেনি মনে।

সবচেয়ে অবাক তখন হলাম যখন টুপ করে সূর্যটা ডুবে যেয়ে ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক। কারণ, ওই পাহাড়ের কোণার ঘরের সামনে খোলা বাগান। আর তার কোল ঘিরে দাঁড়ালে দূরদূরান্তে আর কিছুই নেই – শুধু কিছু ঝিঁঝিঁপোকার ডাক ছাড়া!

যারা ছিল দু একজন কেয়ার টেকার তারাও চলে গেছে। কিন্তু ভয় লাগেনি, লেগেছিল এক অদ্ভুত বিস্ময়! কারণ, মেঘে ঢাকা আকাশে যদিও দেখা যাচ্ছে না একটা তারাও, তবু, একটু নিচে তাকালেই ওই দূরের পোখারা শহরের সবগুলো বাতি জ্বেলে যেন এক ঝাঁক নক্ষত্র তখন নিচে। অনেকটা যেন রূপকথার গল্পের মত। বিজ্ঞানের সংজ্ঞাকে যেন উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেন কোন এক অবাস্তব কল্পনাকে এক করতে স্বর্গরাজ্য থেকে মাথা নিচু করে দেখা যাচ্ছে এই এক ঝাঁক নক্ষত্ররাজি।

সারারাতে একবারও এই আলোগুলো নেভেনি। যতক্ষণ জেগে ছিলাম দেখেই গেছি পায়ের নিচে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা আলোগুলো। মাঝরাতে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলে মনে হল, বেশ ভালোই তো, এই সুযোগে যদি আকাশ থেকে মেঘ কেটে যায়! মেঘের দল থাকলে তো আর ওদিকের হিমালয় দেখা যাবে না। সারারাতের টিপটিপ করে পড়া বৃষ্টি আর ঝিঁঝিঁপোকার ডাকগুলো ছাড়া নিঃশব্দ চারিদিক। জানি দূরে অন্ধকারে ঘুপটি দিয়ে বসে আছে এক বিশাল হিমালয়।

একটু একটু করে রাত গড়াতে লাগল। যেন অন্য সব রাতের চেয়ে এটা একটু লম্বা রাত। ব্যস্ততা, কোলাহল আর সব তাড়াহুড়োকে সরিয়ে রাখলে যেন হঠাৎ করে সময়টা খুব ধীরে যায়। কিন্তু তারপরও অপেক্ষা তো সেই সকালের। দেখতে হবে সূর্যোদয়! এক দুই করে প্রহর গুনতে গুনতে এক সময় আরও জোরে বৃষ্টি নামল। ঘুমের জন্য মনে হলেও আদৌ ঘুমের জন্য না বোধহয় এই ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টি বুঝি শুধু জানিয়ে দিতে চায় যে এটা গৃহবন্দি হওয়ার সময়।

এরকম করে সূর্য ওঠার আগে এভাবে ঘুম থেকে কবে উঠেছি বলা সম্ভব না। সূর্যোদয় দেখার অনেক পরিকল্পনা করেও অনেক জায়গাতে শুধু ঘুম থেকেই ওঠা হয়নি। কিন্তু এবার বেশ ব্যতিক্রম। উঠেই গেলাম ঘুম থেকে। বাইরে হাল্কা আলো ফুটেছে কি ফোটেনি। ভীষণ উৎসাহ আর পরীক্ষা! মেঘগুলো কি সরে গেছে? সূর্যোদয় কি আসলেই দেখা যাবে? ওই দূরের বরফ ঢাকা হিমালয়ের চুড়াতে একটু করে ভেসে কি উঠবে আজ?

না, সেসব কিছুই হয়নি। জীবনের সেই ঠেকাই নেই যে সে আমাদের পরিকল্পনার ধার ধারবে। সে চলে তার নিজের মর্জিতে। আজ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যতই ঝুপ করে বৃষ্টি নামিয়ে, আকাশ কাঁপিয়ে রাত পার হোক না কেন, আকাশের মেঘগুলো আজ সরবে না। থাকবে তারা মেঘলা।

তবে তাই হোক!

অনেক সময় সুন্দরকে অনুভব করতে তার সৌন্দর্য লাগে না, লাগে দেখার চোখ। সাহিত্যে আছে – Beauty lies in the eyes of the beholder। একই জায়গায় যেয়ে দুজন মানুষ কখনও একই জিনিস দেখে না। তাদের অভিজ্ঞতাও এক হয় না। তবে এখন আর কেন সেই নিয়মের ব্যতিক্রম? তাই শুনে আসা সব গল্প ফেলে, আশার ঝুড়িটাকে বিসর্জন দিয়ে, আমার জন্যে যা ছিল অপেক্ষায় তার জন্যেই অনেক উৎসাহে একবার রিসোর্টের এই কোণায় দৌড়াদৌড়ি করতে থাকলাম। কোথা দিয়ে কী দেখা যায়, কোন মেঘ কোথা থেকে উঁকি দেয়, কোন মেঘের ফাঁকা দিয়ে আলোটা সবার আগে এই পাহাড়ে আসে তা যেন আমাকেই দেখতে হবে আজ। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার একার এই রিসোর্টে দৌড়াদৌড়ি দেখবে এমন কেও ছিল না। তাই বোকার স্বর্গে আমি একাই ভীষণ খুশি!

এটা আমাদের মানুষদের দোষ! আমরা কী চাই আর কী পেলে খুশি হব তা আমরা আগে থেকেই হিসেব করে রাখি। তাই আর জীবনের খুব বেশী একটা সুযোগ হয় না আমাদেরকে খুশি করার। সেই জন্যই হয়ত কবি বলে গেছেন – যা চাই তা পাই না, আর যা পাই তা চাই না। তাই ভাবলাম হিসাবের খাতা সরিয়ে রেখে এবার দেখি আশেপাশে আসলেই আর কী আছে মুগ্ধ হওয়ার মত।

খুব বেশী দূর দেখতে হল না। নিচে তাকিয়ে দেখি খণ্ডখণ্ড ঠিক তিনটা মেঘ ভেসে যাচ্ছে ফেওয়া লেকের ঠিক ওপর দিয়ে। বেশী না, আবার কমও না। ঠিক তিনটা ছোট মেঘের ভেলা। যেন বড় বড় মেঘের দল থেকে খেলতে খেলতে ছুটে বের হয়ে যাওয়া দুষ্ট মেঘের ছানা এই তিনজন। তারা যেন শহরতলির দিকে একা যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না তাই বলতে গেলে স্থির হয়ে আছে লেকের পানির ওপর।

আর ওই যে দূরের একরোখা বড় মেঘগুলো, তারা একটু একটু করে সরতে লাগল, এক ঝলকে একটুখানি দেখিয়ে গেল দূরে বরফে ঢাকা ওই হিমালয়ের কিছুটা। আর ওই মেঘগুলোকে ছিন্ন করে ছুটে আসা কয়েকটা মাত্র সূর্যের রোশনি। একটু একটু করে সকাল হল। একটা হাল্কা আলোর ছটাতে চারিদিক নরম নরম আলোতে ভরে গেল।

সবগুলো পাখি জেগে গেল, তারা জেনে গেল এটা সকাল! সবগুলো ফুল জেনে গেল, এটা সকাল। হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া ওই তিনটা মেঘের ছানারাও জেনে গেল মিশে যেতে হবে তাদের ওই বিরাট মেঘের দলে……যেন প্রকৃতি ঠিক জানে যে রাতের রহস্যকে এখন সব লুকিয়ে ফেলতে হবে, আবার প্রতিদিনের সকাল আর তারপর একটা সাধারণ দিনে ফিরিয়ে দিতে হবে।

তারপর? তারপর আর কী? আমি আর মেঘমালারা, আমরা সবাই আর দশটা সাধারণ দিনের অংশ হয়ে গেলাম।

Author – Momota Hena Juthi

Email – momotahena2015@gmail.com

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.