সাহেবরা যখন কলকাতা শহরে বসবাস করতে শুরু করে তখন কলকাতা ছিল তিনটি গ্রামের সমষ্টি, ক্রমে এই শহর উন্নত হতে শুরু করল এবং পলাশীর যুদ্ধের পর যখন ইংরেজরা বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করল, তখন তারা কলকাতা শহরকেই তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলল। স্বাভাবিক ভাবেই শহরের বিস্তার ও প্রসার দুটোরই দরকার পড়ল।যখন ইংরেজরা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দখল নিল তখন কলকাতা হয়ে উঠল ভারতের রাজধানী এবং ” second City of British Empire”। শহর বাড়ার সাথে সাথে শহরের রাস্তা ও যানবাহনের দরকার পড়ল ও সুযোগ সুবিধা উন্নতিরও দরকার পড়ল। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার থেকেই যখন একদিকে ইউরোপিয়ানদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল এবং কলকাতায় বাবু ও জমিদার শ্রেণীর সংখ্যা বাড়তে লাগল, তখন বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের প্রচলন লক্ষ্য করা গেল।
কলকাতার আদিপর্বের যানবাহন ব্যবস্থা কেমন ছিল – এটা জানতে গেলে আমাদের দেখতে হবে তখন পথঘাট ছিল কি না। আগে পথ তারপর পরিবহন। রাস্তা না থাকলে মানুষ যানবাহনের উঠতেই পারবে না। শোনা যায় ১৭৬৬ সালে কলকাতায় “শহর উন্নয়ন কমিটি” তৈরি হয় এবং ১৭৮৪ সালে প্রথম টাকা তোলা হয়। এই টাকা তোলার কাজটি শুরু হয় শহরের উন্নতির কারণে, যার মধ্যে প্রধান ছিল রাস্তা নির্মাণ। এই শহর উন্নয়ন প্রকল্প চলতেই থাকে, কলকাতা শহর আয়তনে বাড়ে, ১৯১১ সালে “কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট” আইন পাস করা হয়। এই সবের সঙ্গে জড়িত কলকাতা শহরের যানবাহনের ইতিহাস।
স্মরণাতীত কাল থেকেই মানুষ বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে পালকির ব্যবহার করে এসেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে কলকাতায় পালকির ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করে, এদেশের লোকেরা তো চড়তই, সঙ্গে ইউরোপীয়রাও চড়ত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় কর্তারা নিজেদের জন্য পালকি ও বেহারা রাখতেন, আর ছোট কর্তা, মানে রাইকরদের, পালকি ও বেহারা রাখতে নিষেধ করতেন। কারণ পালকি রাখা শুধু ব্যয়বহুলই ছিল না, তার সঙ্গে চলে আসত মর্যাদার প্রশ্ন। আদতে ছোট – বড়, সরকারি -বেসরকারি সব সাহেবই পালকি ব্যবহার করতেন। ঘোড়ার গাড়ি জনপ্রিয় হবার পরও বহু সাহেব বাঙালি পালকি চরেছে। ডেভিড হেয়ার সাহেব পালকি ব্যবহার করতেন, বিদ্যাসাগর-মশাই খুব একটা ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার পছন্দ করতেন না।
প্রথম দিকে বাঙালি দুলে-বাগদি শ্রেণীর লোকেরা পালকি বাহকের কাজ করত। একটা জনপ্রবাদ আছে যে মহারাজা নবকৃষ্ণদেব বাহাদুর খুব সম্ভবত বাংলায় উড়িয়া পালকি বেহারার প্রচলন করেন। এরপরে আসে পশ্চিমী বা হিন্দুস্তানি বেহারা। সাহেবরা সাধারনত হিন্দুস্তানি বেহারা পছন্দ করত। ক্রমে উড়িয়া ও হিন্দুস্তানি বেহারাদের দাপটে বাঙালি বেহারাদের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ১৮৫০ সালে পালকি বেহরাদের মাইনে ছিল ৪-৫ টাকা। পালকি বানানোতে বেশ কারুকার্য ছিল সেই যুগে; পালকিতে গদি, তাকিয়া সবই থাকত। শোনা যায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কলকাতার বড়লোকেরা ৩০০০ টাকা দিয়ে একটা পালকি কিনেছে। রাজা মহারাজারা যে পালকি কিনতেন তা ছিল ঝালর দেওয়া এবং তার দাম ছিল আরও বেশি।
১৮২৭ সালে কলকাতার পালকি বেহারারা ধর্মঘট করে। এই ধর্মঘটে মূলত উড়িয়া বেহারাদের যোগদানই বেশি ছিল, ফলে যানবাহনের সমস্যা দেখা দেয়। মানুষ অসুবিধাতে পরে, পালকি বেহারারা অনেক সময় মানুষের কাছ থেকে কিছুটা জোর করে বেশি ভাড়া আদায় করত। সরকার সাধারণ মানুষের আবেদনে সাড়া দিয়ে বেহারাদের জন্য নিয়ন্ত্রণ আইন আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সেই আইনকে কেন্দ্র করে বিবাদ বাধে এবং বেহারারা অনেকে কাজ বন্ধ করে দেশে ফিরে যাবে বলে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কলকাতায় ঘোড়ার গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ে। পালকিতে কিছুটা পরিবর্তন করে কীভাবে ঘোড়ার গাড়ি করা হল সেই ইতিহাস বেশ মজাদার।
ব্রাউনলো সাহেব বলে এক ব্যক্তি মাথা থেকে বের করেন পালকির দুটো ডান্ডা খুলে সেখানে ৪টে চাকা লাগিয়ে একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি বানানো সম্ভব। তার নামেই গাড়িটির নামকরণ হয় “ব্রাউন বেরি”, সালটা সম্ভবত ১৮২৭। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়ার গাড়ি জনপ্রিয় হয়ে যায়, মানুষ এতে অনেক তাড়াতাড়ি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা যেতে পারে, এবং যাত্রাপথ আরও আরামদায়ক হয়। ফলে ঘোড়ার গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন মডেলের পরীক্ষাও বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে গ্রীনফিল্ড নামে এক সাহেব “ব্রাউনবেরি” র সাথে পালকি গাড়ি মিলিয়ে এক ধরনের দামী ঘোড়ার গাড়ি বের করলেন, যার নাম ছিল “গ্রীনফিল্ড” । আরও অনেক ধরনের গাড়ি বাজারে আসে যেমন “Hackney carriage”, “phaeton” (এই গাড়ির মাথা খোলা), “Victoria” (এই গাড়ির মাথাটা দুদিকে ঝুলিয়ে রাখা যেত)। আর অনেক গাড়ির মডেল প্রচলিত ছিল যেমন “Brougham”, “Landan”, “Tonga”, “Gig” , ইত্যাদি। এইসব মডেলের মধ্যে “Tonga” ছিল পশ্চিমে চলা দামী গাড়ি, কলকাতায় খুব একটা চলত না। সেই সময় কলকাতার কিছু স্বনামধন্য ঘোড়া গাড়ি নির্মাতাদের নাম হল – ” কলিন্স & কং” ,” এ জর্জ এন্ড কং” , “জে কার এন্ড কং” ইত্যাদি। এর মধ্যে সব থেকে নাম করা – “স্টুয়ার্ট অ্যান্ড কং”, এরা টিপু সুলতানের ছেলেদের জন্য পালকি তৈরি করেছে। সম্রাট এডওয়ার্ড যখন যুবরাজ হয়ে ১৮৭৫ সালে ভারতে আসে, তার হাতির পিঠে বসার জন্য হাওদা তৈরি করে, নেপালের রাণা ও কাবুলের আমিরকে বহু মূল্যবান গাড়ি তৈরি করে দেয়। এই সঙ্গে পেল্লা দিয়ে শহরের রাস্তাঘাটও বদলাতে থাকে, রাস্তাঘাট চওড়া হতে শুরু করে। এই সময় কলকাতার সব থেকে চওড়া রাস্তা ছিল নর্দার্ন এভিনিউ। সেই রাস্তায় চলত দুলিচাঁদ-এর ‘ষোল বজ্জার ঘোড়ার গাড়ি’। যখন স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা থেকে দেশে ফেরেন তখন তাকে এই গাড়িতে চড়িয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে গোপাল শীলের বাড়িতে আনা হয়।
এই ঘোড়ার গাড়ি শুধু যানবাহনই ছিল না, এটা ছিল কলকাতার বাবুয়ানির একটা বিরল অঙ্গ। বাবুরা গিলে করা পাঞ্জাবি, কুচি দেওয়া ধুতির কোচা হাতে নিয়ে, কব্জিতে ফুলের মালা জড়িয়ে ঘোড়ার গাড়িতে মেজাজ ফুরফুরে করতে যেতেন। “হুতুম পেঁচার নক্সা” বইতে কালীপ্রসন্ন সিংহ কলকাতা শহর সম্পর্কে লিখেছেন-
“আজব শহর কলকেতা
রাঢ়ী বাড়ি জুড়িগাড়ি
মিছে বলার কি কেতা”
তাই জুড়ি গাড়ি কলকাতার বাবু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গাড়ি বনেদি সাহেব থেকে শুরু করে বড় শেঠ-সাহেব ব্যবহার করতেন। পালকি থেকে যখন শহর কলকাতা ঘোড়া গাড়িতে মন দিল, তখন শহরের জীবনযাত্রাও বদলাতে শুরু করেছে। বিলেতের শহরতলীর মত কলকাতার লোকেরা সান্ধ্য মনোরঞ্জন উপভোগ করত, তাতে প্রভুতভাবে সাহায্য করত এই ঘোড়ার গাড়ি। যে বাবুরা পালকিতে চড়তেন তারাই মাথায় করে নিলেন এই ঘোড়ার গাড়ি। গাড়ির কচোয়ান বাবুদের জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠল।
‘পরিবর্তন হল একমাত্র অপরিবর্তনীয়’-
নিয়ম এবং সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির উন্নতি হল এবং ঘোড়ার গাড়ি এক সময় হয়ে গেল ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি। ১৮৭৩ সালে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে আর্মেনিয়ান স্ট্রীট অব্দি ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি যাত্রা শুরু করল। প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে এই ট্রাম লাইন বসানো হয়। এর ফলে অফিস যাত্রীদের জীবনে সুবিধা হয়। এতদিনে রেল যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। রেল যাত্রীরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে শিয়ালদহ স্টেশনে আসতে শুরু করে। দেখতে দেখতে ট্রাম এর দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাদও যাত্রীতে ভরে গেল। এ বিষয়ে বলে রাখা ভালো যে ট্রাম গাড়িতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী ছিল এবং দ্বিতীয় শ্রেণীতেই ভিড় উপচে পড়ত।
১৮৭৮ সালে ট্রাম পরিবহনকে সম্পূর্ণভাবে চালাতে একটি সিন্ডিকেট বা কোম্পানি গঠন করা হয় যার নাম হয় – “কলকাতা ট্রাম কোম্পানি”। কিন্তু ঘোড়ায় টানা ট্রামগাড়ি চালানোর কিছু সমস্যা দেখা দেয়, এই ট্রামগুলো চালাত ঠান্ডা দেশের ঘোড়া, তাদের পক্ষে গরম কালে যাত্রী বোঝাই ট্রাম চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ত, ফলে অনেক ঘোড়া মারা যেতে লাগল। এই জন্যই ১৮৮২ সালে ট্রামকে পরীক্ষামূলক ভাবে স্টীমইঞ্জিন-এ চালানো হল। ১৮৯৬ সালে ফিলবার্ন কম্পানি বৈদ্যুতিক ট্রাম চালানোর জন্য দরখাস্ত করে এবং তা সার্থক হয় ১৯০২ সালের মার্চ মাসে( সম্ভবত ২৭/০৩/১৯০২)। খিদিরপুর লাইনে বৈদ্যুতিক ট্রাম চলে, Esplanade থেকে খিদিরপুর ফার্স্ট ক্লাস-এ ভাড়া ছিল তখন ২ আনা। ক্রমে বৈদ্যুতিক ট্রাম ছড়িয়ে পরে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে। ১৯০৫ সালে শিয়ালদহ থেকে স্ট্রান্ড রোড , ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ অব্দি টালিগঞ্জ, বেলগাছিয়া , বাগবাজার, হ্যারিসন রোড, আলিপুর এবং বেহালা লাইন খোলা হয়। এ বিষয়ে জানা দরকার ট্রাম কোম্পানির প্রথম ম্যানেজার ছিলেন Mr. Maples এবং দ্বিতীয় Mr. M. Wells। ট্রামের এই বৈদ্যুতিকরণের জন্য শহরের জীবন ও জীবিকায় অনেক প্রভাব পড়ল। পেশাদার জীবনে অনেক সুবিধা এল, কারণ যাতায়াত অনেক দ্রুত হতে শুরু করল। সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হয়ে উঠল, কারণ পালকি ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ঘোড়ার গাড়ি কিছুটা সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্য সাধন করত, কিন্তু যখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক ট্রাম গাড়ি এল, তখন শহর ও শহরতলীর দু-পক্ষের সাধারণ মানুষই সুবিধা পেল। কলকাতার সাথে সাথে হাওড়ায় ট্রাম চলল ১৯০৮ সালে, যদিও এই ট্রাম পরিবহন বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭১ সালে।
যেহেতু কলকাতা শহর একসময় এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল, তাই মোটরগাড়ি চালু হবার পরে এখানেও তা খুব তাড়াতাড়ি চলে আসে। মোটরগাড়ি প্রথম কলকাতায় দেখা যায় ১৮৯৬ সালে, তখন নানা রকম দেখার মত বিদেশি গাড়ি কলকাতার শোভা বাড়াত। ব্রিটিশরা আংলো-আমেরিকান গারি বেশী পছন্দ করত। তাই ওগুলোর প্রচলন বেশী ছিল। জার্মান গাড়ি কিন্তু তাদের পছন্দ ছিল না। শহরে সব থেকে বেশি রোলস-রয়েস গাড়ি চলত। বাবু প্রদ্দুম্ন মল্লীক রোলস-রয়েস গাড়িতে ক্রিস্টাল এর দুর্গা মূর্তি চাপিয়ে শহর পরিক্রমা করিয়েছেন। রোলস-রয়েস গাড়ি তখন আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠল (বলা বাহুল্য, এখনও তাই)। গাড়ির কথা মাথায় রেখে তখন বিভিন্ন অভিজাত বাড়িতে গাড়ি-বারান্দা বানানো শুরু হল। বিভিন্ন বিদেশী গাড়ি, যেমন “ক্রাইস্লার”, “ওয়ান্ডারার”, কলকাতার অংশ হয়ে গেল। এছাড়া মূলত যে গাড়িগুলো খুব বেশীমাত্রায় জনপ্রিয় হল সেই সময়, তাদের মধ্যে ছিল বুইক, অস্টিন আর ক্যাডিলাক। মোটরগাড়ি ব্যক্তিগত আমোদ-প্রমোদের জন্য প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠল। এর সঙ্গে আর একটা ঘটনাও ঘটল – সাধারণের জন্য মোটরগাড়ির সুবিধা।
কলকাতার রাস্তায় ১৯০৫ সালে শুরু হয়ে গেল ট্যাক্সি পরিষেবা। চৌরঙ্গী থেকে প্রথম ট্যাক্সি চলত ব্যারাকপুর, বজবজ, দমদম প্রভৃতি জায়গায়, ভাড়া ছিল মাইল প্রতি আট আনা। কলকাতায় প্রথম মোটর চালিত যাত্রীবাহী বাস চালু হয় ১৯২২ সালে। এই বাস চালু হওয়ার ব্যাপারে প্রখ্যাত অভিনেতা অহিন্দ্র চৌধুরীর একটা দারুন বর্ণনা আছে – “কালীঘাট থেকে শ্যামবাজার গিয়ে আবার ফিরে আসা, এ তখন ছিল বহুদিনের সখ”। বাসের জনপ্রিয়তা এমন ভাবে বেড়েছিল যে ১৯২৪ সালে যেখানে মোট বাসের সংখ্যা ছিল ৫৫ , ১৯২৫ এ সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৩। ক্রমে বাস হয়ে উঠল শহর, শহরতলী ও গ্রামের প্রাণ ভোমরা, কারণ এর ফলে শহরের সঙ্গে অন্য জায়গার দূরত্ব অনেক কমে গেল।
কলকাতার মোটর গাড়ি নিয়ে বলতে গেলে অনেক গল্প বলতে হবে। যেমন হৃষীকেশ লাহা তাঁর রোলস রয়েস গাড়ি নিয়ে দিল্লী গেছিলেন পঞ্চম জর্জের দরবার দেখতে, তাও আবার কলকাতা থেকে। আবার শ্রীরামপুরের তুলসি চরণ গোস্বামী তাঁর গাড়িতে নম্বর লিখতেন। তিনি লিখলেন T C G, বলা হত তিনি নাকি লাট সাহেবের আদলে তা করতেন।
উত্তর কলকাতার এক বনেদি বাড়িতে একটি ‘এডলর’ গাড়ি ছিল যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের কাছ থেকে ব্যবহারের জন্যে ইংরেজ সৈন্যরা দরখাস্ত কর। যখন তারা সেখানে উপস্থিত হয় তখন তাদের মনোরঞ্জনের অছিলায় গাড়িটিকে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। আর বলা হয় যে সেখানে কোন গাড়ি নেই। পরে তা আবার মাটি থেকে তোলা হয়। বর্তমানে গাড়িটি আছে গদাইচাঁদ দে মহাশয়ের কাছে। মেদিনিপুরের ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরী একটি ‘স্টোয়ার’ গাড়ি কেনেন ১৯০৭ সালে যা সেই সময় এসে পৌঁছোয় চারজন ইঞ্জিনিয়ার আর দুজন ফিটার সমেত। এই গাড়ি পরে অবশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে ব্যবহার হয়েছে। গাড়িটি এখনও বর্তমান। আনন্দ চৌধুরীর কাছে আছে, যিনি ওই পরিবারেরই একজন।
কলকাতা শহরের গাড়ির গল্প হবে অথচ প্রদ্যুম্ন মল্লিক আসবেন না তা কি হয়! ওনার স্বভাব ছিল শুক্রবার করে গাড়ি কেনা। প্রতি শনিবার ৫০ খানা গাড়ির শোভাযাত্রা বেড়ত ইডেন উদ্যানের কাছে, তাঁর গাড়িদের তিনি গঙ্গার হাওয়া খাওয়াতে নিয়ে যেতেন। সুভাষ বোস বাঙ্গালী আবেগে অন্য স্থান গ্রহণ করে আছেন। তিনি তাঁর ভাইপো ড শিশির বোসের সাহায্যে ১৯৪১ সালে Wanderer গাড়ি চড়ে সেই বিখ্যাত মহানিস্ক্রমনে বেরিয়ে পড়েন।
কলকাতা শহরে প্রথম ট্যাক্সি যখন আসে তখন দুটি মার্কিন গাড়ি ব্যাবহার হয়। একটি পন্টিয়াকে, আরেকটি শেভ্রলেট । ১৯৫৪ সালে ড বিধান চন্দ্র রায় ‘বেবি ট্যাক্সি’ যা ‘স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানি’ তৈরি করত, তা প্রচলন করেন। ১৯৫৬ সাল থেকে কলকাতা শহর দেখে ল্যান্ড মাস্টার ট্যাক্সি যা ১৯৫৮ সাল থেকে Ambassador ট্যাক্সি হিসেবে জনপ্রিয় হয়।
এবারে আসা যাক পুরনো কলকাতার কিছু বিখ্যাত লোকেদের গাড়ির কথায়। তৎকালীন কলকাতার পুলিস কমিশনার পি কে সেন লালবাজার যেতেন রোলস রয়েস গাড়িতে। বিধান রায় কালো বুইক গাড়ি নিয়ে মহাকরণে যেতেন। কলকাতার বিখ্যাত জেসন পরিবারের Mercedes Range গাড়ি ছিল যার আবার ইঞ্জিন ছিল পিছনের দিকে। তাতে এয়ার ফ্রস্টের মত পাখা নড়ত গাড়ি ঠান্ডা রাখার জন্য। বিষ্টু ঘোষ মহাশয় বলে একজন ভদ্রলোক মরিস গাড়িতে চড়ে ঘুমতেন। জাস্টিস যে পি মিটারের ছিল সেযুগের অত্যন্ত বিরল ফোরড সুপার ৮ গাড়ি। কালাজ্বরের ঔষধ আবিস্কারকে কেন্দ্র করে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীকে তৎকালীন বাংলার ছোটলাট একটি রোলস রয়েস গাড়ি উপহার দেন, এটি চড়ে তিনি আর জি কর হাসপাতালে পড়াতে আসতেন। বাঙালীর চিরকালের নায়ক উত্তমকুমার বিভিন্ন গাড়ি চালিয়েছেন। যা মূলত মার্কিন, যেমন ‘র্যাম্বলার’, ‘স্টুডিবেকার’, ‘ইম্পালা’। আবার এই গাড়ি চালাতে গিয়েই মৃত্যু হয় আর এক জনপ্রিয় অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের, জাগুলিয়ার কাছে।
সে যুগে দুই মহিলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ড শোভা ঘোষ ও ড মিসেস পিল্লাই নিজেরা গাড়ি চালিয়ে রুগি দেখতে যেতেন। যেমন এটা অনেকের অজানা যে সে যুগের প্রখ্যাত অভিনেত্রি মঞ্জু দে কার রেসিঙে অংশগ্রহন করতেন। রামকৃষ্ণ মিশনের দুই মহারাজ স্বামি নিত্যস্বরুপানন্দজি ও স্বামি লকেশ্বরানন্দজি যথাক্রমে মরিস ও স্টুডিবেকার গাড়ি চড়তেন। আবার পঞ্চাশ, ষাটের দশকে খেলার সময় আকাশবাণী ভবনের সামনে রেনো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে অনেকেই বুঝে ফেলতেন যে বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিয়ারসন সুরিটা ভিতরে আছেন।
কলকাতা শহরের সারজেন্টরা মূলত দু ধরনের বাইক চড়ত। হারলেডেভিডসন ও নরটন। আচার্য জগদিশ চন্দ্র বসু দেশাত্মবোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সাইকেল চড়ার জনপ্রিয়তার বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেষ্ট হন। তাঁর বন্ধু এইচ বসে সাহেবকে অনুপ্রাণিত করেন এই সাইকেল বিক্রির ব্যাপারে। এখানে উল্লেখ্য যে রবীন্দ্রনাথের কথায় আমরা জানতে পারি যে লেডি অবলা বসু ও নীলরতন সরকার মহাশয়ের মেয়ে কল্যাণী সে যুগে সাইকেল চালিয়ে ব্রহ্মসমাজের সভায় যেতেন।
কলকাতার যানবাহনের ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই শহরের বেড়ে ওঠা, এই শহরের সামাজিক পট-পরিবর্তন। উনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান যুগ অব্দি কলকাতা শহরের বাণিজ্য বিস্তার তার যানবাহনের ইতিহাসের সাথে জড়িত। এই প্রসঙ্গে উল্লেক্ষ্য যে কলকাতার যানবাহন যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা সাধারণতান্ত্রিক। পালকি থেকে মোটরগাড়ির আধুনিকীকরণ শহরের জীবনযাত্রাকে দারুনভাবে নাড়া দিয়েছে। এই চলমান ইতিহাস কলকাতা শহরের বিবর্তনের ইতিহাস যা অতীত ও বর্তমানকে প্রতিনিয়ত যুক্ত করে চলেছে।
Author – Sandip Banerjee


Wonderful and very interesting. Very well written with lots of useful information. The writer deserves compliment from the core of my heart since I am a Calcutta born having crossed 75
LikeLiked by 1 person
Thank you for your valuable comments. Will share the same with Sandip babu. Shobdo is ever so grateful to Mr Banerjee for his regular contribution to the magazine.
LikeLike
Just beautiful. So simple and lucid. The whole history can be visualised through the writing. A nostalgic tune made the writing live. Feel good sensation. Regards to author, awaiting for the next …….
LikeLiked by 1 person
Thank you Sir for your kind words! We will inform Sandip Sir about this. Please stay with Shobdo and its journey.
LikeLike