বাংলা সাহিত্যে ভূতের গল্পের ভাণ্ডার অপরিসীম। বিশেষত শিশু ও কিশোর সাহিত্য সাম্রাজ্যে।আর এই ভুতের গল্পগুলোর উৎস কিন্তু আসলে তথাকথিত “সত্যি ঘটনা”, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া খুঁটিনাটি ঘটনাগুলির মাঝে হঠাৎ কোন ব্যাখ্যাহীন, গা-ছমছমে অভিজ্ঞতাই এই সব কাহিনীর সম্বল, যার সঙ্গে মিশে যায় লেখকের কল্পনাশক্তি। এসব ঘটনা কি আদৌ ‘সত্যি’ – এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। তবে এসব সত্যি ঘটনা কিন্তু নিঃসন্দেহে পাঠকের কৌতূহল ধরে রাখে। আজ তাই ঘেঁটে দেখা যাক, এমনই কিছু “সত্যি-মিথ্যে” ভূতের গল্প।
সুকুমার রায়ের মত ছড়াকার বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি কি ভূতে বিশ্বাস করতেন? সুকুমার রায় লিখেছেন –
“প্রচণ্ড রাতে স্পষ্ট চোখে দেখলুম বিনা চশমাতে
পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জ্যোৎস্নাতে
শুনতে পেলাম ভূতের মায়ের মুচকি হাসি কটকটে
দেখছে নেড়ে ঝুঁটি ধরে বাচ্চা কেমন চটপটে।”
যারা ভূতে বিশ্বাসী তারা অনেক সময় গভীর রাতে, আশেপাশের বাড়ি ঘরের মানুষজন যানজট পেরিয়ে জনশূন্য হবার পর, হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে উঠে শুনতে পান বাড়ির নিচে বহুমানুশের কথাবার্তা, বাচ্ছার আওয়াজ – যেন হাট বসেছে। আর বিভিন্ন মানুষ রাতের অন্ধকারে সেখানে এসেছে বিকিকিনি করতে। কিন্তু উঁকি মেরে চাইলেই চোখে পড়বে যে আসলে সবই মিথ্যে। রাস্তাঘাটে যানবাহন, জনমানবের চিহ্ন নেই। সুকুমার রায়ের ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর মন। তিনিও হয়ত কোনদিন রাতের অন্ধকারে এমনি কথাবার্তা, জনকোলাহল শুনেছিলেন। তার হয়ত সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তার এই অদ্ভুতুড়ে ছড়ার জন্ম।
এবার আশা যাক রামকৃষ্ণদেবের কথায়। তাঁকে নিয়ে তো গল্পগাথা অন্তহীন। সময়টা ১৮৮২ বা ১৮৮৪। গোপালের মা একদিন শ্রীরামকৃষ্ণকে তার কামারহাটি বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজন সারবার আমন্ত্রণ জানালেন। গোপালের মা যেমন শ্রীরামকৃষ্ণকে সম্মান করতেন, তেমনি তিনিও গোপালের মাকে অন্তত স্নেহ করতেন। তিনি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। নির্দিষ্ট দিনে ঠাকুর কামারহাটি পৌঁছলেন। তাকে সঙ্গ দিলেন রাখালচন্দ্র যিনি পরবর্তী জীবনে স্বামী ব্রহ্মানন্দ নামে পরিচিত হন। দুপুরের আহারাদি সম্পাদনের পর ঠাকুর ও রাখাল একটি ঘরে গেলেন বিশ্রাম নিতে। দুজনেরই চোখ বুজে এসেছে আলস্যে। এমন সময় হঠাৎ ঠাকুর সারা ঘরময় একটা বিরাট দুর্গন্ধ পেলেন। এমনি দুর্গন্ধ যে ঘরে থাকলে প্রাণ বেরিয়ে আসবে। তিনি চোখ খুলতেই দেখলেন ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিকট রুপি মানবমূর্তি। রোগজীর্ণ কঙ্কালসার দেহ, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসছে। মূর্তি দুটো ঠাকুরকে ওই ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলল। ওনারা থাকায় তাদের নাকি খুব কষ্ট হচ্ছে। তারা এও জানাল যে তারা ওই ঘরেই থাকে। সামনে একটি কারখানার সাহেবরা যেসব খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেয় তার গন্ধ শুঁকে দিন কাটায়। ঠাকুর রাখালকে নিয়ে উঠে পড়লেন। ফিরে এলেন দক্ষিণেশ্বর, তবে রাখালের মাকে এই ঘটনার কথা কিছুই বললেন না।
বিরাট শহর কলকাতায় পুরনো ঘরবাড়ি, আর বিল্ডিং-এর সংখ্যা কম নয়। এমনি কিছু বাড়ির “ভূতের বাড়ি” নামে অপবাদ আছে – যেমন রাইটার্স বিল্ডিং, আকাশবাণী ভবন, জোরাসাঁকো ঠাকুরবাড়ি ইত্যাদি। স্টেটসম্যান হাউসও কলকাতায় ভূতের বারি হিসেবে চিহ্নিত। স্টেটসম্যান লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যেত ৬:৩০। এমন বহু মানুষ আছেন যারা হয়ত ৮:৩০-৯ টার সময় ওই লাইব্রেরিতে চেয়ার সরানোর বা টাইপ করার শব্দ পেয়েছেন। স্টেটসম্যান টেলিফোন অপেরাটররা বলেছেন যে মাঝে মাঝেই রাত ১০টা নাগাদ লাইব্রেরি থেকে ফোন আসে কিন্তু কেউ কথা বলে না। অঞ্জন চক্রবর্তি স্টেটসম্যানের চিফ রিপোর্টার থাকাকালীন একদিন নাইট ডিউটি সেরে বারি ফিরছেন। পিছনের লিফট দিয়ে নিচে নেমে পিছনের দরজায় দাঁড়ানো গাড়িতে উঠবেন। চারতলা থেকে তিনতলায় নামবার পর সাদা পোশাক পরিহিত একজন লিফটে উঠলেন কিন্তু লিফট নিচে নামার পর অঞ্জন আর কাউকে দেখতে পেলেন না। পরে খবর নিয়ে জেনেছিলেন মানুষটি অনেকদিন আগেই মারা গেছেন এবং মাঝে মাঝে রাতে দেখা দেন। আকাশবাণী ভবনে বহু কর্দমী দরজা ভেজানো ঘরের ভিতর থেকে বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনেছেন, যেন এখনি কোন অনুষ্ঠান শুরু হবে। অনেকে ছায়ামূর্তিও দেখেছেন, কিন্তু দরজা ঠেলে দেখেছেন ঘরের ভিতর কেউ নেই।
এখন প্রশ্ন হল কেন এমনটা হয়, কেন মানুষ এমন কিছু দেখে যা আসলে নেই? সবই কি কল্পনা? অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে, আমাদের মস্তিষ্কে রয়েছে “auto stimulation” জোন। হঠাৎ ভয় পেলে এই অংশটি কাজ করতে শুরু করে। আর তখনই সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাক-এর মতন সেই সব মানুষ চোখের সামনে ধরা দেন যারা পৃথিবীতে আর নেই, আর তখনই আমরা ভাবি ভূত দেখলাম। দার্শনিক মতে আত্মা অবিনশ্বর। পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না বলেই নিরালশ্ব শরীরে বারবার ফিরে আসতে চায় পৃথিবীতে। তাদের প্রিয় মানুষের কাছে – নানাভাবে চেষ্টা করে তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে।
এবারে যাওয়া যাক কলকাতা শহরের আরও কিছু “ভূতের বাড়ির” আঙ্গিনায়। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আসবে মহাকরণের নাম। ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর স্বাধীনতাকামী যুবত্রয়ী বিনয়, বাদল, দিনেশ রাইটার্স বিল্ডিং-এ ঢুকে তৎকালীন পুলিশের জেনারেল ইন্সপেক্টর সিম্পসনকে হত্যা করে। প্রবাদ আছে ইন্সপেক্টরের আত্মা নাকি এখনও মহাকরণের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই শুনেছে গুলির আওয়াজ, অদৃশ্য মানুষের পায়ের শব্দ ইত্যাদি। আলিপুরে বানানো ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেবের বাসভবন “হেস্টিংস হাউস”, যা বর্তমানে একটি মেয়েদের কলেজ, সেখানে বহু ছাত্রীর চোখে ধরা দিয়েছে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেরানো এক ব্যাক্তি। লর্ড হেস্টিংস শেষ বয়সে অবসাদ্গ্রস্থ অবস্থায় মারা যান। লোকের মতে ওটি অবসাদ্গ্রস্থ মৃত সাহেবের আত্মা। ন্যাশনাল লাইব্রেরির ভিতরে ঘটে চলা অলৌকিক ঘটনাবলির কথা সুবিদিত, ১৮৩৬ সালে নির্মিত ভবন থেকে প্রায়ই ভেসে আসে মহিলার হাসি কান্নার শব্দ, রাগী কণ্ঠস্বর। লোকের মতে ঐ আওয়াজ লর্ড মেটক্যাফের স্ত্রীর। ২০১০ সালে ভবনের মেরামত চলাকালীন ১2 জন শ্রমিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। শোনা যায় তাদের আত্নারাও নাকি ঘুরে বেরায় লাইব্রেরির আনাচে কানাচে। কলকাতা মেট্রো লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম না। তাই মেট্রো স্টেশনগুলি রাত ১০টার পর এক রকম ভৌতিক চেহারাই নেয়। এর মধ্যে সব থেকে কুখ্যাত রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন। সেখানে নাকি রাত্রিবেলা সব আত্মহত্যা করা মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। এর পরেই আসবে সাহেবদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থান “সাউথ পার্ক স্ট্রীট সেমেট্রি”। বহু মানুষ দেখতে যান এই জায়গাটি, তবে আজ অব্দি কারুর কোন ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। উইপ্রো কোলকাতা বোধহয় এক মাত্র অফিস যেখানের কিছু অংশে যেতে সম্পূর্ণ নিষেধ আছে। স্থানীয়দের মতে যে জায়গায় আজকে অফিস আছে সেখানে নাকি আগে একটি গোরস্থান ছিল। ফাঁকা জায়গাটায় খুন ধর্ষণ এর মতো অনেক খারাপ ঘটনা ঘটেছে। আজও অফিসের ওয়াশরুমগুলোতে নানান অদ্ভুতুরে ঘটনা ঘটে। হেতুয়া এলাকার পুতুল বাড়ির কথা আজ আর কারো অজানা নয়। অনেক লেখালিখিও হয়েছে এই বাড়ি নিয়ে। পুতুল বাড়ির পুতুলের সংগ্রহই শুধু না, এখানের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপও এই বাড়িকে লোকমুখে জীবন্ত করে তুলেছে। বাড়ি থেকে ভেসে আসে মহিলা কণ্ঠের হাসি, ছুরি নূপুরের আওয়াজ। এসব ঘটায় নাকি সেই সব বারবনিতা, বা মেয়েদের আত্মার্ যারা তৎকালীন পয়স,ওয়ালা বাবুদের লালসার স্বীকার হয়েছিল। উত্তর কলকাতার নিমতলা শ্মশান ঘাট কলকাতার প্রাচীনতম শ্মশান ঘাট। কালীপূজোর রাতে নাকি অঘোরী সাধুরা সেখানে মৃত ব্যাক্তিদের না-পোড়া দেহাংশ ভক্ষণ করে। ভাবলেই যেন শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায়!
এবারে সব শেষে আসবে হাওড়া ব্রীজের কথা। ১৯৪৩-এ নির্মিত এই ব্রিজ যে কেবল স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিখ্যাত তাই নয়, এর আশপাশের ভূতের ঘটনার কথাও বহুল প্রচলিত। এই ব্রীজ থেকে অগুনতি মানুষ গঙ্গায় ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ভোররাতে ব্রীজের কাছে যেসব কুস্তীগিররা অনুশীলন করে তারা দেখেছে নদীর অপর দিয়ে ভেসে আসছে কোন মানুষের হাত। ওরা গিয়ে দেখেছে আসলে কেউ নেই! প্রায়ই নাকি দেখা যায় ব্রীজের ওপর সাদা থান পরে হেঁটে চলা ক্রন্দনরতা এক মহিলাকে। এছাড়াও কলকাতার বুকে ছড়িয়ে আছে এমনই নানান জানা অজানা স্থান, এবং বাড়ি। যেখানে জীবন-মৃত্যু এক করে ভেসে আসে অদৃশ্য মানুষের নিশ্বাস প্রশ্বাস!
ভূত আছে কি নেই, এই তর্কের কোনদিন অবসান হবে না। কেউ বলে আছে, আবার কেউ বলে এসব রটনা। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে ভূত থাকুক কি না থাকুক এই সব “ভূতুরে” জায়গা দিয়ে রাত্রিবেলা একা যেতে সকলেরই বুক কাঁপবে।
আসলে যা কিছু মানুষের অজানা বা অদৃশ্য তাই তো মানুষকে টানে, তা ভূত হোক বা ভগবান। সেই জন্য বোধহয় নোটে গাছ মুড়নোর পরেও ভূতের গল্প ফুরোয় না।
Author Sandip Banerjee


Bhoot r golpo porte moja lage.
Bhoot bole kicchu aache Ami Biswas korina.
Putul bari bole kothito bari Amar barir ulto deka, onek ei ashten dekte.
Kono bhoot dekte pai ne.
Ota amader adda r bari chilo.
LikeLike