প্রবাসের পুজো

এখানে পুজোর আর কিছু না থাক পুজোর আকাশটা আছে

কালকে ফেসবুক থেকে এই ৮ বছর আগের স্মৃতির বিজ্ঞপ্তি এল। এটা লিখেছিলাম সিঙ্গাপুরে কাটানো আমার প্রথম পুজোর সময়। এখন সুইডেনে বসে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হল যে কথাটি আজও প্রাসঙ্গিক। পুজো আসছে – এই দুটি শব্দ শুনলেই আপামর বাঙালির মন জুড়ে একটা অদ্ভুত আনন্দের সঞ্চার ঘটে। সারা বছরের যত দুঃখ, বিষাদ আর অবসাদ যেন এই কদিনের জন্যে পাশে সরিয়ে রেখে মায়ের আগমনে মেতে ওঠা। যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকেন, তারা এই আনন্দের বহিঃপ্রকাশটা তাদের পরিবেশে রোজ দেখতে পারেন। চারিদিকে পুজোর হোর্ডিং, দোকানে দোকানে মানুষের ভিড়, কুমোরটুলিতে সারিবদ্ধ প্রতিমা আর পাড়ায় পাড়ায় বাঁশ বাঁধা প্যান্ডেলের কাঠামোগুলো মনে করিয়ে দেয় যে পুজো আসছে। কিন্তু প্রবাসী বাঙালিদের এই আনন্দের ভাবটা মনের ভেতরেই সিঞ্চন করতে হয়। আমি একেবারে আক্ষরিক অর্থেই প্রবাসী বাঙালি। আমার জন্ম কলকাতাতে হলেও আমি জীবনের দীর্ঘভাগ সময়টি কলকাতার বাইরে কাটিয়েছি। কখনো আমার বাবার কর্মসূত্রে আর নিজের শিক্ষা আর কর্মের তাগিদে দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। 

আমার ছোটবেলার প্রাথমিক অংশটি কেটেছে দিল্লিতে। দুর্গাপুজোর সময় আমাদের স্কুলে দশ দিনের মতন ছুটি থাকত। ওই অল্প সময়ের ছুটিতে কলকাতা যাওয়াটা সম্ভব হতো না বলে পুজো দিল্লিতেই কাটানো হত। পুজোর সময়টা দিল্লিতে নবরাত্রির খুব রমরমা থাকত। চারিদিকে আলোয় সাজানো রাস্তা আর শেরাবলী মায়ের পুজোর আয়োজন। তারি মধ্যে আমাদের বাড়িতে পুজোর সূচনা হত মহালয়ার দিনে রেডিওতে সেই বিখ্যাত মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান শুনে। যদিও সেই বয়সে কিছুই বুঝতাম না তাও ওই গান আর চন্ডীপাঠ শুনলে কেমন একটা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। একটু বড় হওয়ার পরে যখন দুর্গা পুজোর গল্পগুলো পড়লাম, তখন খুব মন দিয়ে দুর্গা আর মহিষাসুরের যুদ্ধের জায়গাটা শুনতাম। চোখের সামনে যেন ছবিগুলো ভেসে উঠত। 

দিল্লিতে আমাদের পুজোর প্রধান কেন্দ্র ছিল দিল্লি কালী বাড়ি। ওখানে মন্দিরের পাশে মাঠে প্যান্ডেল বেঁধে খুব জমজমাট পুজো হত। সন্ধেবেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনেক নামিদামি শিল্পীরা আসতেন। একবার মনে আছে মাঠে বিশাল পর্দা খাটিয়ে রামানন্দ সাগরের রামায়ণের কিছু অংশ দেখানো হয়েছিল। ওই ছোট্ট বয়েসে বড় পর্দায় রাম রাবনের যুদ্ধ দেখে তাক লেগে গেছিল। ছোটবেলায় আমার তীর ধনুকের যুদ্ধ নিয়ে একটা উন্মাদনা ছিল। রামায়ণ আর মহাভারত যখন টিভিতে দেখাত তখন যুদ্ধের দৃশ্যগুলি রুদ্ধশ্বাসে দেখতাম। তখন আমার জীবনের একটা অন্যতম লক্ষ্য ছিল অর্জুনের মতন তীরন্দাজ হওয়া। দুর্গাপুজো সংলগ্ন যে মেলাটি হত সেখান থেকে প্রত্যেক বার তীর ধনুকের সেট কিনতাম আর বাড়িতে তীর চালানোর মহড়া দিতাম। একটু বয়েস বাড়লে যখন বই পড়ার নেশায় ধরলো তখন মেলায় স্থিত বইয়ের দোকানগুলি আমার প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াল। কালীবাড়িতে তখন খুব ভালো ভালো ইংরিজি বই বিক্রি হত। পুজোতে নতুন জামার থেকে নতুন বই পেলেই বেশি খুশি হতাম। 

তবে দিল্লিতে পুজোর আসল জাঁকজমকটা দেখা যত দিল্লির বাঙালি পাড়া – চিত্তরঞ্জন পার্কে। সবাই বলত যে ওখানে নাকি একেবারে কলকাতার মতন পুজো হয়। আমার জন্য অবশ্য ওখানের বইয়ের দোকানগুলি বেশি আকর্ষণীয় ছিল কারণ ওখানে প্রচুর বাংলা বই বিক্রি হত। বাংলা বইয়ের নেশায় ডোবার পরে ওখানে গিয়ে সন্দেশ আর শুকতারা পত্রিকা কিনতাম আর বাড়ি ফিরে সেগুলো একেবারে গোগ্রাসে গিলতাম। চিত্তরঞ্জন পার্কে বেশ অনেকগুলো পুজো হত তাই ওখানেই প্যান্ডেল হপিং করা হত। ঠাকুর দেখার সময় আমার আর বাবার একটা খুব উদ্ভট কাজ ছিল। আমরা প্রত্যেকটা প্রতিমাতে লক্ষী ঠাকুরের পেঁচাটাকে খুব মন দিয়ে দেখতাম এবং সেটিকে কোনো একটা নাম দিতাম। শুধু দুটো নাম এখনো মনে আছে – পেঙ্গুইন পেঁচা আর বাদুড় পেঁচা। 

অষ্টমীর দিন আমরা যেতাম দিল্লির রামকৃষ্ণ মিশনে অঞ্জলি দিতে আর ভোগ খেতে। কিন্তু অঞ্জলীর আগে ঘন্টাখানেক ধরে গান আর উপাসনা হতো যেটা মাটিতে বসে শুনতে হত। ওইটুকু বয়েসে অতক্ষণ ধরে মাটিতে চুপচাপ বসে থাকাটা একেবারে দুর্বিষহ ব্যাপার ছিল। সময় কাটানোর জন্যে যে শতরঞ্চিতে বসতাম তার আলগা সুতোগুলো খুব মন দিয়ে টেনে টেনে বার করতাম। এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করার পরে পরের বছর থেকে আমার হাতে একটা গল্পের বই ধরিয়ে দেয়া হত। তাতেই দিব্যি সময়টা কেটে যেত। এই ব্যবস্থাটা না করলে হয়তো মিশন কর্তৃপক্ষকে  ছিদ্রযুক্ত সতরঞ্চির রহস্য সমাধান করতে বসতে হত। অঞ্জলীর শেষে বড় বড় মাটির ভাঁড়ে খিচুড়ি ভোগ দেয়া হত। আমার তখন খিচুড়ি জিনিষটা খুব একটা পছন্দের ছিল না। তার থেকে নবমীর দিন মাংস ভাত খাওয়াটা বেশি আনন্দের ব্যাপার ছিল। 

দিল্লিতে বাঙালির পুজোর পাশাপাশি নবরাত্রির অনুষ্ঠান চলত। তার মধ্যে প্রধান ছিল রামলীলা আর বিজয়া দশমীর দিন রাবন পোড়ানো। রামলীলার অনুষ্ঠান বেশ অনেক জায়গায় হত কিন্তু শিল্পের গুণগত মানের দিক থেকে সবথেকে উৎকৃষ্ট ছিল শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্র দ্বারা আয়োজিত রামলীলা। এনারা ২.৫ ঘন্টার একটি অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ রামায়ণ ভারতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় এবং লোক নৃত্যের মাধ্যমে মঞ্চস্থ করতেন। তারই সঙ্গে থাকতো খুবই সুন্দর মঞ্চসজ্জা  এবং বেশভূষা। সব কিছু মিলিয়ে একটা খুব দৃষ্টিনন্দন ব্যাপার ছিল। রাবন পোড়ানোটা আবার একটা অন্যরকমের চমকপ্রদ দৃশ্য ছিল। রাবন, কুম্ভকর্ণ আর মেঘনাদের তিনটে বিশাল আকারের পুতুল দাঁড় করানো হত যেগুলি বিভিন্ন রকমের বাজি দিয়ে ঠাসা থাকত। তারপরে রাম লক্ষণের বেশ ধারণ করে দুজন এসে সেগুলোর দিকে আগুনের তীর ছুঁড়তেন। তারপরে এই বিশাল পুতুলগুলি বাজির আগুন ছড়াতে ছড়াতে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। সেটা একটা দেখার মতন জিনিস। 

আমি যখন ক্লাস সেভেনে উঠলাম তখন খবর এল যে বাবার গুজরাটে বদলি হয়ে গেছে। আমাদের নতুন বাসস্থান হবে ভাবনগর। তখুনি ম্যাপ খুলে গুজরাটের ছোট্ট শহরটি খুঁজে বের করলাম। ভাবনগরে গিয়ে ভর্তি হলাম কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে । ওখানে আমাদের স্কুলের গানের শিক্ষিকা ছিলেন একজন বাঙালি – গোপা চট্টোপাধ্যায়। আমরা গোপা ম্যাডাম বলেই ডাকতাম। ভাবনগর ছোট্ট শহর হলেও বেশ অনেকজন বাঙালির বাসস্থান এবং তারা একটি দুর্গাপুজোর আয়োজন করতেন । পুজোটা হত একটি স্থানীয় স্কুলের উঠোনে। গোপা ম্যাডাম ছিলেন ওই পুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা। তার হাত ধরেই আমিও ওই অনুষ্ঠানের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।  

দিল্লিতে পুজোতে আনন্দ করতাম দর্শক হিসেবে আর এবারে ভাবনগরে এসে পুজোর অন্য দিকটা দেখতে পেলাম। সন্ধেবেলা রিহার্সাল দেওয়া, স্টেজ সাজানো আর হাসি আড্ডা মিলিয়ে পুজোর আগের দিনগুলি বেশ কেটে যেত। তারপরে একদিন ঠাকুর এনে  স্কুলের উঠোনে স্থাপনা করা হত। তখন ওই উঠোনটাই আমার কাছে পুজোর প্যান্ডেল হয়ে উঠতো। ওখানে প্রথম পুজোতে রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা কবিতাটা সম্পূর্ণ মুখস্থ করে আবৃত্তি করেছিলাম। স্থানীয় লোকজন আমার স্মরণশক্তি দেখে বেশ অবাক হয়ে গেছিলেন মনে আছে, এবং অনেকেই এসে আমাকে সাধুবাদ জানিয়ে গেছিলেন। সেবার পুজোতে আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলাম। অষ্টমীর দিন সা রে গা মা খ্যাত গুজরাটের গায়ক পার্থিব গোহিল অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন। আমার আর আরেকটি ছেলের কাজ ছিল স্টেজের পর্দা টানা আর খোলা। বলাই বাহুল্য যে আমি ওই দায়িত্ব খুব দায়িত্বসহকারে পালন করেছিলাম। 

ভাবনগরে ২ বছর থাকার পরে ১ বছর ছিলাম গুজরাটের আরেকটি শহর – রাজকোটে। এখানে একটি খুব সুন্দর রামকৃষ্ণ মিশন ছিল। সেখানে অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে আর ভোগ খেতে গেছিলাম। এবারে বয়েস একটু বেড়ে যাওয়ার দরুন আর শতরঞ্চির সুতো ছেঁড়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। বিজয়ার দিন বিল্বপত্রে শ্রী দুর্গা শরণম লেখার অভিজ্ঞতাও প্রথমবার এই মিশনেই হয়েছিল। রাজকোটে আরো দুটি পুজো হত – একটি করতেন স্থানীয় বাঙালিরা এবং আরেকটি করতেন ওখানের গয়নার দোকানের কারিগররা যারা বেশির ভাগ বাঙালি ছিলেন। তবে ওই ৩ বছর পুজোর সময় গুজরাটের নবরাত্রির জাঁকজমক দেখে একেবারে তাক লেগে গেছিল। সেই মাতৃবন্দনার উৎসব কিন্তু মেজাজটি সম্পুর্ণ ভিন্ন। দলে দলে লোক বয়েস নির্বিশেষে সুন্দর সব জামা পরে সারা রাত ধরে নাচ করছে। ভাবনগরে আমাদের স্কুলেও নবরাত্রির ছুটির আগে একদিন স্কুলে সব শিক্ষক-শিক্ষিকা আর ছাত্রছাত্রীরা মিলে গরবা নাচ করতাম। সেটা একটি খুবই আনন্দের ব্যাপার ছিল। 

রাজকোটে ১ বছর কাটানোর পরে কলকাতাতে ৩ বছর কাটিয়েছি। কলকাতার পুজোর ব্যাপারটা যারা ওখানে থেকেছেন তারা সবটাই জানেন। সারা শহর জুড়ে একটা সাজ সাজ রব আর মানুষের অদম্য উৎসাহ এই সব কিছু মিলিয়ে যে আশ্চর্য ব্যাপারটা হয় সেটা নিজে অনুভব না করতে পারলে বলে বোঝানো মুশকিল। আমার জন্য অবশ্য সব থেকে আনন্দের ব্যাপার ছিল সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা – যেটার সুযোগ পুজোর সময়ের আগে খুব কম পেতাম। কলকাতায় স্কুলের পাট চুকিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম তামিলনাড়ুর ভেলোর শহরে কলেজের পড়া আরম্ভ করতে। ভেলোরের নাম খ্রীষ্টান মেডিকেল কলেজ আর হাসপাতাল এর সৌজন্যে অনেক বাঙালিরাই জানেন। 

পুজোর সময় এলেই বাড়ি ফেরার জন্যে মনটা আকুল হয়ে উঠত। বিশেষ করে যখন বাড়িতে ফোন করলে আশপাশের আওয়াজ থেকে পুজোর পরিবেশটা বুঝতে পারতাম, তখন মনে হত যে এক ছুটে বাড়ি চলে যাই। তার মধ্যে আবার আমাদের কলেজে ঠিক এই সময়টাতেই পরীক্ষা থাকত। দক্ষিণ ভারতেও নবরাত্রি বড় উৎসব কিন্তু গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গের মতন অত রমরমা নেই। অষ্টমী থেকে দশমী এই তিন দিন ওদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।  ওই সময়টা ওখানে সরস্বতী পুজো আর আয়ূধ পুজো হয়। আয়ূধ পুজোটা অনেকটা আমাদের বিশ্বকর্মা পুজোর মতন ব্যাপার। এছাড়া ওরা নানারকমের পুতুল দিয়ে একটা সুন্দর আয়োজন করে যেটাকে গোলু বলে। কাজেই আমাদের অষ্টমী অব্দি পরীক্ষা হয়ে কিছু দিনের ছুটি থাকত কিন্তু দূরের ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হত না। বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে যে পুজোর জন্যে কেনা নতুন জামা পরে পরীক্ষা দিতে গেছি। 

কিন্তু বাঙালির দুর্গা পুজো ? সেটিও হত কিন্তু ভেলোরে না। ভেলোর থেকে ২৯ কিমি দূরে রানিপেট বলে একটা শহর ছিল যেখানে ভারত হেভি ইলেক্ট্রিক্যালস এর একটা বড় টাউনশিপ ছিল। সেখানের লোকেরাই একটি ছোট্ট পুজোর আয়োজন করতেন। আমরা সবাই দল বেঁধে অষ্টমীর দিন একটা বাসে চড়ে ওখানে ঠাকুর দেখতে যেতাম। যাওয়ার আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মিষ্টি খাওয়া। ওখানের আয়োজকরা প্রতি বছর কলকাতার মিষ্টির কারিগর আনাতেন এবং ঢালাও মিষ্টি বিক্রি হত। সারা বছরের বাঙালি মিষ্টি না পাওয়ার দুঃখটা ওই কদিনে পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করতাম। কলেজের শেষ বছরে পুজোটা ভেলোর শহরে হয়েছিল। একটা ছোট্ট রাস্তা জুড়ে পুজোর মেলাও বসেছিল। আলোর মালা, বাংলা কথা আর লোকজনের হৈচৈ মিলিয়ে যেন একেবারে কলকাতার পুজো। সেবারে মনে মনে ওই রাস্তার উৎসবের আমেজের ছবিটা সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে পুজোর আনন্দটা আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলাম। 

কলেজের পাট চুকিয়ে এবারে পাড়ি দিলাম সিঙ্গাপুরে পিএইচডি র ডিগ্রী অর্জনের জন্যে । দেশ ছেড়ে এবারে সত্যি প্রবাসে যাওয়ার পালা এল। ভারতবর্ষে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও নবরাত্রি বা দুর্গা পুজোর সময়টা কোনোরকম ভাবে উৎসবের আমেজটা বোঝা যেত। সেটা পুজো প্যান্ডেল, গরবা নাচের আসর বা রাবন পোড়ানো থেকেই হোক না কেন। কিন্তু দেশের বাইরে পুজোর পরিবেশটা পাওয়া খুবই দুষ্কর। সিঙ্গাপুরে প্রথম বছর খুব দেশের কথা মনে পড়েছিল। সেবার মহালয়ার দিন ইউনিভার্সিটি যেতে গিয়ে আকাশের দিকে চোখ পড়েছিল। নীল আকাশে সাদা তুলো পেঁজা মেঘের আনাগোনা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম যে পুজো আসন্ন। 

লেখার শুরুতে ফেসবুকের যে স্মৃতিটার উল্লেখ করেছি সেটি তখন লেখা। অবশ্য বাঙালিরা বিশ্বসংসারে যেখানেই আছে সেখানেই পুজোর পরিবেশটা নিজের মতন করে গড়ে তুলেছেন। সিঙ্গাপুর সেটার ব্যতিক্রম না। ১৯৫৬ এ প্রতিষ্ঠিত সিঙ্গাপুর বেঙ্গলি এসোসিয়েশনের উদ্যোগে ওখানেও বেশ সুন্দর একটি পুজো হত। সিঙ্গাপুরে পুজোটা দিনক্ষণ মেনেই ওখানের লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় স্থিত একটি স্কুলে হত। অনেকটা আমার দেখা ভাবনগরের পুজোর মতন। পরে অবশ্য এই পুজোটা বেশ বড় করে মাঠের একটি এসি প্যান্ডেল খাটিয়ে হত। সামনের দিকে পুজো হত আর পেছনের দিকে খাবারের এবং নানারকমের দোকান থাকত। একবার আমার এক মালায়ালী বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পুজো দেখতে গেছিলাম। ওই ছেলেটি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে রোজ বাড়িতে পুজোআচ্চা করত। দুর্গা পুজো প্যান্ডেলে গিয়ে একই ছাদের নিচে পুজো আর অন্যদিকে আমিষ খাবার ভর্তি স্টল দেখে সে খুবই আশ্চর্য হয়ে গেছিল। তখন তাকে বাঙালির ভোজনপ্রীতির ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হয়েছিল। 

তবে সিঙ্গাপুরে সবথেকে সুন্দর পুজোর পরিবেশটা হত ওখানকার রামকৃষ্ণ মিশনে। আমি সিঙ্গাপুরে যে কটা বছর ছিলাম একেবারে নিয়ম করে অষ্টমীর দিন ওখানে অঞ্জলি দিয়ে ভোগ খেতে যেতাম। ওখানে যেহুতু পুজোর ছুটির কোনো ব্যাপারই ছিল না তাই অনেক কায়দা করে ছুটি ম্যানেজ করতে হত। অন্যান্য রামকৃষ্ণ মিশনের মতন ওখানেও খুব সুন্দর করে গান আর  উপাসনা হত। ওখানে প্রথমবার পুজো দেখতে গিয়ে একটা জিনিস দেখে খুব মজা লেগেছিল। পুস্পাঞ্জলির সময় যখন ফুল দেয়া হল তখন দেখলাম তার মধ্যে বেগুনি রঙের অর্কিড আছে। অর্কিড ফুল দিয়ে অঞ্জলি দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। আমার ঠাকুর্দাকে ফোন করে এই ব্যাপারটা বলতে উনি হেসে বলেছিলেন “যস্মিন দেশে যদাচার…”। তবে দিল্লি, গুজরাট আর সিঙ্গাপুরের রামকৃষ্ণ মিশনে যে সাদৃশ্যটি লক্ষ্য করেছি সেটা হচ্ছে যে পুজোর সময় অত্যন্ত শান্তির একটি পরিবেশ ওখানে সৃষ্ট হয়। 

পিএইচডি করার পর থেকেই আমি কর্মসূত্রে সুইডেনের দক্ষিণে অবস্থিত লুন্ড শহরে গত ৫ বছর ধরে বসবাস করছি। সুইডেনে থাকলেও ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন আমাদের খুবই কাছে। ওখানে দুটি পুজো হয়। সম্প্রতি দক্ষিণ সুইডেনের হেলসিংবর্গ শহরেও একটি পুজো আরম্ভ হয়েছে। এক বছর আমরা বন্ধুরা মিলে এই দুটো দেশের তিনটে পুজোতে ঘুরেছিলাম। আন্তর্জাতিক প্যান্ডেল হপিং বলা যেতে পারে। সেবারে একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। ডেনমার্কের একটি পুজো একেবারে দিনক্ষণ মেনে হয় আর অন্যটি সপ্তাহান্তে ২ দিন ধরে হয়। কাজেই সেবারে পুজোর অনুষ্ঠানগুলি ঠিক ধারাবাহিক ভাবে দেখা হয়নি। প্রথম পুজোতে যখন গেলাম তখন সেখানে দশমীর পুজো হচ্ছে। সেটা দেখা শেষ করে যখন পরের পুজোতে গেলাম তখন সেখানে অষ্টমীর পুজো শেষ হয়ে সন্ধি পুজোর তোড়জোড় চলছে। কি আর করা যাবে – যস্মিন দেশে যদাচার। 

এত বছর প্রবাসী হিসেবে পুজো কাটিয়ে এখন আর নতুন করে পুজোর সময় খুব একটা মন খারাপ হয় না। বাড়ির কথা মনে পড়ে ঠিকই কিন্তু ওই যে শুরুতে বললাম, প্রবাসীদের পুজোর আনন্দটা মনের ভেতরেই রেখে দিতে হয়। পুজোর ভাবটা মনের মধ্যে এলেই তার চিহ্নগুলি আমরা আসে পাশে ঠিকই খুঁজে নিতে পারি। এবছর যেমন মহালয়ার দিন এখানে দেখলাম সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ্দুর, নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা আর বাতাসে একটু হিমেল পরশ। ঠিক যেন একেবারে অক্ষর মেনে দুর্গা পুজোর সূচনা হল। ভেবে দেখলে পুরাণ হিসেবে কিন্তু মা দুর্গার আরেক নাম জগদ্ধাত্রী অথবা জগন্মাতৃকা – তিনি জগতের মাতা। কাজেই আমরা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই থাকি না কেন, মা তার আসার সময় হলেই ঠিক সেখানে চলে আসবেন। হয়তো কোথাও একটু ঢাকঢোল সহকারে আসবেন আবার কোথাও শুধু প্রকৃতির সাহায্যে নিজের আগমনী ঘোষণা করবেন। আমাদের শুধু অন্তরের চোখটা খোলা রাখতে হবে । তাহলেই তার আসার সূচনা আমরা পেয়ে যাবো। মহালয়ার দিন আমার স্ত্রীর সাথে এখানে স্থানীয় পার্কে বিকেলে হাঁটতে গেছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো যে অবিকল কাশফুলের মতন দেখতে একগুচ্ছ গাছ পড়ন্ত সূর্যের আলোয় আস্তে আস্তে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। এই দৃশ্যটি দেখে আমরা দুজনেই দুজনের দিয়ে তাকিয়ে একটু হাসলাম। মনের মধ্যে একটাই কথা এলো – পুজো এসে গেছে। 

Author Shubhabrata Sen

Shubhabrata Sen (shubhabrata.sen@gmail.com)
PhD, Technical Researcher, Traveler, Author

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.