আচ্ছা, যদি বলি কলকাতার বিরিয়ানি, কত্থক নৃত্য ও ঠুমরী গান, উর্দু কবিতা, তুন্ডে কাবাব ও ভারতবর্ষের প্রথম ব্যাক্তিগত চিড়িয়াখানা- এসব কেবল একটা লোককেই কেন্দ্র করে, এবং এ সবগুলোর মধ্যে এক আশ্চর্য কানেকশান আছে, অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। কিন্তু আসলে একটা মিল আছে এসবের মধ্যে এবং সেই মিলের যোগসূত্রটা হলো নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ।
লখনৌ এর নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ছিলেন এক আশ্চর্য মানুষ। তাঁর চরিত্রের মধ্যে একটা বৈপরীত্য ছিল যা তাঁকে এক বিচিত্র বর্ণময় চরিত্র করে তুলেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর ভারতের নবাবদের মধ্যে লখনৌ-এর এই নবাব ছিলেন একটু আলাদা। একদিকে যেমন তিনি লখনৌতে রোশনাই জ্বালিয়েছিলেন, অন্যদিকে তিনি আবার কিছুটা আত্মসমর্পণ করেই তাঁর লখনৌ নগরী ছেড়ে চলে এসেছিলেন। তিনি যখন ইংরেজদের চাপে নতি স্বীকার করে তাঁর প্রিয় শহর ছেড়েছিলেন তখন তাঁর হৃদয় কেঁদেছিল- “যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী/ তব হাল কেয়া হুয়া দিল কা”।
ওয়াজিদ আলি শাহের বড় ভক্ত বা সমর্থক উনাকে খুব দক্ষ প্রশাসক বা চতুর কূটনীতিবিদ বা দুর্দান্ত সেনাপতির আসনে বসাবে না – এটা ঠিক। কিন্তু উনি এমন এক রাজা ছিলেন যিনি প্রজাদের কাছে প্রিয় ছিলেন এবং সে কারণে মানুষ তাঁর লখনৌ ছেড়ে যাওয়াতে চোখের জল ফেলেছিল।
যখন একসময় লখনৌ ছেড়ে কলকাতা শহরে ঘাঁটি তৈরি করলেন তখন বহু লোক তাদের প্রিয় নবাবের সঙ্গে থাকবে বলে কলকাতা শহরে পাড়ি দিয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে নবাব ছিলেন কতটা জনপ্রিয়। এমনকি, ইংরেজদের রাজনৈতিক চক্রান্ত সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা ফেলতে পারেনি। আসলে ওয়াজিদ আলি শাহ শুধু একজন রাজা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ধরনের শিল্পী যিনি জীবনটাকে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন নানা রঙে। আর তাই বোধহয় তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল নানা ঘটনার সাক্ষী এবং তার বেশীরভাগই অরাজনৈতিক বা রাজতন্ত্র-ব্যতীত। সে কারণেই এই নবাবের জনপ্রিয়তা কালের সীমানা ছাড়িয়ে আজকের দিনেও প্রবাহমান; তাঁর সম্বন্ধে আমরা জানতে চাই, তাঁর জীবনের নানা গল্প আমাদের উৎসাহ ও আলোচনার বিষয়।
যখন ১৩ই মে ১৮৫৬ সালের এক গরম ও আর্দ্রতা ভরা দিনে ওয়াজিদ আলি শাহ ম্যাকলেয়ড স্টিমার থেকে বিচালি ঘাটে নামলেন, তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি যে তাঁকে তাঁর জীবনের শেষ ৩১টা বছর এই কলকাতা শহরেই কাটাতে হবে এবং তিনি আর কোনদিন তাঁর প্রিয় লখনৌতে ফিরে যেতে পারবেন না।
তিনি তাঁর পুরো দলবল নিয়ে উঠলেন সেই সময়কার এশিয়ার সবথেকে আরামদায়ক হোটেল ‘স্পেন্সে’তে। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে তিনি তৎকালীন বড়লাট লর্ড ক্যানিংকে বোঝাতে পারবেন যে লখনৌকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করাটা ঠিক হয়নি, অপশাসনের অজুহাতে। যখন নবাব ক্যানিং-এর সাথে দেখা করতে গেলেন, তাঁকে ২১ বন্দুকের অভিবাদন জানানো হল। আবার ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নবাবকে ফোর্ট উইলিয়ামের ভেতরে আর্মহারস্ট হাউসে ছাব্বিশ মাস নজরবন্দি করে রাখা হল। নবাব ততদিনে বুঝে গেছেন যে লখনৌ তাঁর চিরকালের মতো হাতছাড়া হয়ে গেছে। ভারাক্রান্ত মনে নবাব বাস্তবকে মেনে নিয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলকে বেছে নিলেন তাঁর থাকার জায়গা হিসেবে।
সত্যজিৎ রায় নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ এর ওপর “শতরঞ্জ কি খিলাড়ি” সিনেমা করেছিলেন। সেই কারণেই শুধু নয়, আসলে নবাবের জীবনটা ছিল অনেকটা গল্পের মতন এবং তাতে বহু ভিন্নধর্মী ঘটনাপ্রবাহ আছে, ঘাত-প্রতিঘাত আছে যা মানুষকে বারবার তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। কলকাতায় নবাবের জীবন খুব কম রোমাঞ্চকর ছিল না। তিনি কলকাতা শহরের মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলকে একটি “ছোট লখনৌ” বানিয়ে ফেললেন। নবাব যখন কলকাতায় এসেছিলেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় অসংখ্য জীবজন্তু। সে যুগে মেটিয়াবুরুজ অঞ্চল ছিল সবুজে ঢাকা; বিস্তৃত রাজকীয় বাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে ছিল একটি জায়গা যেখান থেকে হুগলি নদীর উল্টো দিকে অবস্থিত বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবুজের সমারোহ দেখা যেত। এই হুগলি নদী আসলে নবাবকে মনে করাতো লখনৌ শহরের গোমতী নদীর কথা।
নবাবের মেটিয়াবুরুজে অবস্থানের সঙ্গে সেই জায়গার পরিবর্তন ঘটা শুরু হল। যখন লখনৌ শহর থেকে প্রচুর লোক মেটিয়াবুরুজ আসতে শুরু করল তখন এলাকা জুড়ে উর্দু ভাষার একটা প্রসার দেখতে পাওয়া গেল। ক্রমশই সে ভাষা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার অন্যান্য প্রান্তে। নবাব কবি ছিলেন এবং বিভিন্ন ধরনের কবি সম্মেলন বা “মুশায়রা” আয়োজন করতে লাগলেন; কাওয়ালী গানের আসর বসিয়ে তাকে জনপ্রিয় করে তুললেন। এই সবকিছুর প্রভাব কলকাতা শহরের সংগীত ও সাংস্কৃতিক আঙিনায় পড়তে শুরু করল। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ যথার্থভাবেই উর্দু ভাষা প্রচলন ও গান-বাজনার ঘরানার প্রচলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এইসব প্রচলিত জিনিসগুলি আজকের দিনেও উপস্থিত।
এখনো মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের কিছু পরিবার আছে যাদের মধ্যে খানদানি আদব-কায়দা লক্ষ্য করা যায় এবং এই আদব-কায়দা কিন্তু নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।
শুধু মেটিয়াবুরুজ বা কলকাতা শহরের জীবনযাত্রায় নয়, নবাবের অবদানের পরিসর আরও বৃহৎ ছিল। কত্থক নাচের জনপ্রিয়তার পেছনে নবাবের পৃষ্ঠপোষকতার একটা বিরাট ভূমিকা আছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল নবাব নিজে মুসলমান হলেও তিনি কত্থক, যা মূলত হিন্দু নাচের শৈলী, তাকে জনপ্রিয় করেন। এটাই ছিল তাঁর সত্যিকারের শিল্পীসত্তা। সারা ভারতের বিখ্যাত গাইয়ে ও বাদ্যিরা কলকাতা শহরের জড়ো হল নবাবের ডাকে এবং তার ফলে কলকাতার গানবাজনার জগৎ ভীষণভাবে পুষ্ট হল; শহরে সঙ্গীত অন্য উচ্চতা পেল। এর থেকে বেশ কিছু স্বনামধন্য সঙ্গীতজ্ঞ উপকৃত হলেন যাদের মধ্যে উল্লেখ করা যায় রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের নাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গান শিখিয়েছিল যিনি, সেই পন্ডিত যদুভট্টের নাম। আরো ঘটনা ঘটল, কলকাতার সেকালের বাবুদের বাইজি নাচ দেখা ও বাইজি রাখার উৎসাহ বেড়ে গেল; নবাবের লখনৌ ঘরানার সংগীত পরিবেশন দেখে বাবুরা জলসাঘর তৈরি করতে লাগলেন!
আমার মনে পড়ে, কলকাতার “বাকচক্র” বলে একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর এক বংশধর, শাহেনশা মির্জা সাহেবের স্পিচে উল্লিখিত হয়েছিল যে, নবাব ঘুড়ি ওড়ানো জনপ্রিয় করেছিলেন এবং জামাকাপড় তৈরীর ব্যাপারে লখনৌয়ের চল প্রবর্তনে এক বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আসলে নবাব তাঁর সঙ্গে সূচিশিল্প লখনৌ থেকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। ক্রমে লখনৌ থেকে অনেক দর্জি কলকাতায় আসে এবং মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এইভাবে ওই অঞ্চলে জামাকাপড় তৈরীর কাজ প্রচলন হয়। বংশানুক্রমে বহু লোক এই পেশা বেছে নেয় এবং সময়ের সঙ্গে ওই এলাকায় জামাকাপড় তৈরীর প্রচুর দোকান গড়ে ওঠে এবং বৃহৎ ভাবে তৈরীর জন্য কারখানাও গড়ে ওঠে। আজকের মেটিয়াবুরুজ এলাকা এশিয়ার একটা বৃহৎ জামাকাপড় তৈরীর জায়গা, বিশেষত সেই জামাকাপড় যার নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি বা ব্র্যান্ড নেই। একইরকমভাবে মেটিয়াবুরুজ এলাকাতে ঘুড়ি তৈরির কাজ এখনও খুব জনপ্রিয়। সেইভাবে দেখতে গেলে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ মেটিয়াবুরুজকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক উন্নতির ও জীবিকার সন্ধান দেখিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে কলকাতা বা বাংলার ক্ষেত্রে উপকারী ছিল।
নবাবকে নিয়ে কথা হবে আর খাবার নিয়ে কথা হবে না তা কি হয়? কলকাতার বিরিয়ানি অনেকের মতে সবথেকে সুস্বাদু বিরিয়ানি। সে তো এক প্রকার নববেরই দান। এর সবথেকে আলোচিত দিক হল, কীভাবে লখনৌ বিরিয়ানির সঙ্গে আলুসেদ্ধ মিশে গিয়ে কলকাতার বিরিয়ানি তৈরি হল। এ গল্প বহুল চর্চিত ও বর্ণিত। লখনৌতে নবাবের প্রাসাদে (যা ইংরেজরা ধ্বংস করে ১৮৫৭ সালে) যে নবাবি রসুইখানা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসত চিকন এবং বিভিন্ন ধরনের কাবাব যা সে সময় লখনৌ রইসদের রসনা তৃপ্তি করত।
এর এক অনবদ্য উদাহরণ হল তুন্ডে কাবাবি ঘরানার “গলঔটি কাবাব”। শোনা যায় যে, পান খেয়ে নবাবের দাঁত এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে তাঁর জন্য খুব নরম কাবাব বানানো জরুরী হয়ে পড়েছিল। খানসামারা অনেক মাথা খাটিয়ে এই কাবাব তৈরি করলেন যা কাবাবের স্বাদ অক্ষত রেখে নরম পাকে বানানো। এই তুন্ডে কাবাব ঘরানার প্রবর্তক ছিলেন হাজী মুরাদ আলি। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ যখন লখনৌ থেকে কলকাতা চলে গেলেন, তখন তাঁর কিছু খাস খানসামা তাঁর সঙ্গে এসেছিল। তারা কলকাতায় বসে বানাতে লাগল নবাবের পছন্দের খাবার, যেমন- পোলাও, কোরমা, রোঘনী রোটি, শীর মল ইত্যাদি। এসব খাবার ক্রমে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল এবং ধীরে ধীরে বাঙালির খাদ্যতালিকা দখল করে বসল। আজকের দিনেও এসব খাবার যথেষ্ট জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায় যখন আমরা বর্তমান কলকাতার বেশ কিছু নামজাদা রেস্তোরাঁয় আওয়াধ-এর বা লখনৌ ঘরানার খাবারের ব্যবস্থা দেখি।
নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ লখনৌ এর নবাব হলেও তাঁর সঙ্গে কলকাতার এক নিবিড় সম্বন্ধ ছিল এবং তা এখনও রয়ে গেছে। আজকে যখন আমরা “কুর্তা-পাজামা” বা “শেরওয়ানি” পরি, তখন আমরা নবাবের লখনৌ ঘরানার পোশাক যা তিনি কলকাতা এনেছিলেন, তাকেই অনুসরণ করি। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ কলকাতার শিল্পে, সংগীতে, পোশাকে, আদব-কায়দায়, খাবারের নবাবীয়ানায় ভীষণভাবে উপস্থিত। নবাবের জীবন হয়তো ততটা সুখকর হয়নি যতটা তিনি চেয়েছিলেন। তাঁর নবাবী হারিয়ে তিনি ইংরেজদের কাছ থেকে পেনশনের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাঁর পরিবার বিরাট ছিল। শোনা যায় তার উপপত্নীর সংখ্যা তিনশোর বেশি ছিল! তাঁর বিবাহিত পত্নী বেগম হযরত মহল লখনৌতেই থেকে গেছিলেন। নবাব ইংরেজদের কাছ থেকে বন্দুকের অভিবাদন নিতে ভালোবাসতেন, কিন্তু যখন দরকার পড়েছিল তিনি বন্দুক তুলে নিজের রাজ্যকে রক্ষা করতে পারেননি। কিন্তু এতকিছুর পরেও নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ একজন আলোচিত চরিত্র হিসেবে থেকে যাবেন।
এই কলকাতার মননে তিনি এমনভাবে থেকে গেছেন যে তাঁর পরম্পরা দৃষ্টান্তমূলক ভাবে বর্তমান।
Author : Sandip Banerjee

Academician and Author
