কলকাতা শহরের যেসব ঔপনিবেশিক বৈশিষ্ট্য এখনও অবশিষ্ট আছে তার মধ্যে অন্যতম হল কলকাতা শহরের স্যোশাল বা সামাজিক ক্লাব কালচার। ভারতবর্ষের বোধহয় আর কোনো শহরে এই ধরনের ক্লাব কালচার এখনো এত জনপ্রিয় নেই। ভারতবর্ষে যখন ইংরেজরা প্রথম আসে তখন তারা ছিল বণিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, “বণিকের দন্ড দেখা দিল রাজদন্ড হয়ে” এবং তা যখন হল, তখন ইংরেজরা এই দেশে নানারকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার প্রবর্তন করল। ক্রমশ, যখন ভারতবর্ষ জুড়ে ইংরেজ-রাজত্ব কায়েম হল, তখন ইংল্যান্ড থেকে বেশি সংখ্যায় সাহেবরা ভারতে আসতে শুরু করল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই কলকাতা শহরের রোশনাই বাড়লো। কলকাতা শুধু রাজধানী হয়ে রইল না, আক্ষরিক অর্থেই সে হয়ে উঠল “Second City of the British Empire”। ঊনবিংশ শতাব্দীতে “কলিকাতা”-র বাঙ্গালীদের মধ্যে এক ধরনের “বাবু কড়চা” শুরু হল। বাণিজ্যের জেরে বাংলা হয়ে উঠল ভারতের সবথেকে ধনী প্রদেশ; ইংরেজ শাসকদের কাছে কলকাতা তখন শুধুই একটি শহর হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তারা চেয়েছিল শহরটিকে এমনভাবে সাজাতে যাতে তা তাদের ঔপনিবেশিক রাজধানী হয়ে উঠবে। লন্ডনে যে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত, তা সবই কলকাতা শহরে ইংরেজরা স্থাপন করল। এর ফলস্বরূপ সামাজিক ক্লাব প্রতিষ্ঠা হল, যেখানে সাহেবরা নিজেদের মেলামেশার পরিধি বাড়াতে পারবে। এই ধরনের ক্লাবগুলো ক্রমশ হয়ে উঠল মনোরঞ্জনের জায়গা। সাহেবরা দিনের শেষে বা কখনো দিনের মাঝখানেও এসব ক্লাবে নিয়মিত আসত এবং নিজেদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিবারণের চেষ্টা করত। তবে এই ক্লাবগুলো শুধুই আনন্দের স্থান ছিল না; সেখানে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের সঙ্গেই চলত ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন। এই ক্লাবগুলি শুরুর দিকে শুধুই সাহেবদের জন্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে, পরের দিকে, কিছু ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার হয়। তবে সেই প্রবেশাধিকার সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্লাব সংস্কৃতির ইতিহাস পড়লে জানা যায় যে, সাহেবরা এই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিভাজন নীতি নিয়েছিল – সবাই সেখানে যেতে পারত না। এমনকি, ইউরোপিয়ানদের মধ্যেও বিভাজন ছিল। তাই কলকাতার এই সামাজিক ক্লাব-সংস্কৃতি প্রথম থেকেই ছিল সামাজিক গরিমার এক প্রতিভু যাকে ইংরেজিতে বলে “status symbol”।
ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বাড়ার সঙ্গে বেড়ে চলল এক অন্য ধরনের সামাজিক ভোগবাদ যার আদলটা ঠিক “ভারতীয়” ছিল না। এই ক্লাবগুলো রূপান্তরিত হল এক মোচ্ছবের প্রাণকেন্দ্র হয়ে; মদ খাওয়া, গান শোনা, অবাধ মেলামেশা নারী ও পুরুষ দুজনেরই – এ সবই ছিল এই ক্লাবগুলোর অঙ্গ। আসলে, প্রভু শ্রেণী হিসেবে ইংরেজরা নিজেদের সামাজিক জীবনকে নেটিভদের থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল নিজেদের মধ্যে একটা আমোদ-প্রমোদের ঠিকানা যেখানে তাদের চারিত্রিক দোষগুলো নেটিভদের কাছে, বিশেষত সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের কাছে ধরা পড়বে না। তারা চেয়েছিল শহরে অবস্থিত ইউরোপিয়ানদের জন্য একটি সামাজিক ঘেরাটোপ। এই ক্লাবগুলি সবধরনের বিলাসিতার আয়োজন করত এবং সেখানে জুয়া ও অন্য ধরনের বাজি ধরে খেলা খুবই জনপ্রিয় ছিল। সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিচার করলে জানা যাবে যে, ইংরেজরা এই ক্লাবগুলোর দ্বারা তাদের সঙ্গে নেটিভদের একটা ফারাক তৈরি করেছিল। বহু ক্লাবের বাইরে বড় অক্ষরে লেখা থাকত “Dogs and Indians are not allowed”। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদিও তারা কুকুরদের ব্যাপারে নিয়ম শিথিল করতে রাজি ছিল, কিন্তু ভারতীয়দের ব্যাপারে নৈব নৈব চ! বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অবশ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। তবে কলকাতার “বেঙ্গল ক্লাব” স্বাধীনতা পর্যন্ত কোনো ভারতীয়ের প্রবেশ করার অনুমতি দিত না।
কলকাতার ক্লাব সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে শহরের রাজনীতি ও অর্থনীতির যোগ ছিল। এইসব ক্লাবে মজলিসের আবহাওয়াতে বহু সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সাহেবদের নানারকম অর্থনৈতিক কাজকর্মের সাক্ষী এই ক্লাবগুলোতে প্রথমদিকে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে মহিলারা ক্লাবে ঢোকার অনুমতি পায়। যদিও প্রথমদিকে তারা ক্লাবের সভ্য হতে পারত না; কেবলমাত্র কোনো সভ্যের সাথে অতিথি হিসেবে ক্লাবে আসতে পারত। ক্লাবগুলো যত দিন গেল স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। ধীরে ধীরে সেখানে খেলাধুলার সরঞ্জাম যুক্ত হল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে সাহেবরা এই ক্লাবগুলোতে তাদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান পালন করা শুরু করল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ক্লাবগুলো যখন বেশি করে সভ্য নেওয়া শুরু করল, তখন বেশ কিছু ক্লাবে ভারতীয় সভ্য এল। কিছু ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল করার কারণ ছিল ভারতীয় অভিজাত সম্প্রদায়কে দলে নেওয়া। মনে রাখতে হবে, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই কলকাতার বাবুবাদ আস্তে আস্তে অস্তমিত হতে শুরু করল; কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোর মধ্যে অনেকগুলো তাদের আভিজাত্য হারাতে শুরু করল। তাদের জৌলুসের ছটা ফিকে হতে লাগল। সমান্তরালভাবে উঠে এল এক নব্য বাঙালি শ্রেণী। তারা সাহেবি কায়দা রপ্ত করে সাহেবদের মত জীবনযাপন করতে উদ্যত হল। যেহেতু এরা তখন সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ছিল এবং ইংরেজ শাসনকে সাহায্য করত, অনেক ক্ষেত্রে হয় চাকুরীরত অবস্থায় অথবা ব্যবসায়ী হিসাবে, তাই এই শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু আসনের কিছু লোককে ক্লাবগুলোতে সভ্য হবার সুযোগ দেওয়া হল। আর একটা ঘটনা ঘটল, যেটা “ক্যালকাটা ক্লাব” প্রতিষ্ঠার নির্ধারক হয়ে উঠল। বেঙ্গল ক্লাবের ভারতীয়দের প্রতি মনোভাব শহরের বনেদি অংশের একদল মানুষকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল। তারা ঠিক করল যে, এর জবাব দেবার জন্য তারা একদম ভারতীয় সভ্য নিয়ে একটি ক্লাব তৈরি করবে। ক্রমে এই “ক্যালকাটা ক্লাব” অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং আজকে বোধহয় কলকাতার এটাই সবথেকে জনপ্রিয় সামাজিক ক্লাব।
কলকাতার যেসব বিখ্যাত ক্লাব ব্রিটিশ আমল থেকে আজও এই শহরকে শোভিত করছে তা হল – “ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব”, যা ১৭৯২ সালে স্থাপিত এবং এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় ক্রিকেট ক্লাব। এছাড়া, “বেঙ্গল ক্লাব” (১৮২৭), “স্যাটারডে ক্লাব” (১৮৭৫), “রয়্যাল ক্যালকাটা গলফ্ ক্লাব” (১৮২৯) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেষোক্ত ক্লাবটির “রয়্যাল” নামকরণ হয় ১৯১১ সালে, যখন রাজা পঞ্চম জর্জ সস্ত্রীক এই ক্লাবে আসেন। এই ক্লাবের আগের নাম ছিল “দ্য ক্যালকাটা গলফ্ ক্লাব”। এখানে উল্লেখ্য, “রয়্যাল ক্যালকাটা গলফ্ ক্লাব” ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বাইরে প্রথম গলফ্ ক্লাব! একইরকমভাবে খ্যাত অন্য ক্লাবগুলোর মধ্যে আছে- “ক্যালকাটা রোয়িং ক্লাব” (১৮৫৮) যেটি সম্ভবত কলকাতা শহরের প্রথম রোয়িং ক্লাব, “ক্যালকাটা সুইমিং ক্লাব” (১৮৮৭), “ডালহৌসি ইনস্টিটিউট” (১৮৫৯)। এরা আজও কলকাতার সাহেবি সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এছাড়া আরো অনেক ক্লাব আছে, যেমন- “আউটরাম ক্লাব” ইত্যাদি। কলকাতার সামাজিক ক্লাবগুলো নিয়ে বলতে গেলে আলাদা করে বলতে হবে “টলিগঞ্জ ক্লাব” বা “টলি ক্লাব” সম্বন্ধে। এই ধরনের ক্লাব গোটা দেশে বিরল। এটি স্থাপিত হয় ১৮৯৫ সালে, মূলত ইউকেস্ট্রিয়ান ক্রীড়ার কেন্দ্র হিসেবে। এর একটি ক্লাবহাউস আছে যা দুশো বছরেরও বেশি পুরনো। বহু ধরনের ক্রীড়া ও প্রসাধনের সুবিধা এই ক্লাবে আছে। কলকাতার ক্লাব নিয়ে বলতে গেলে উঠে আসবে এইসব ক্লাবের খাদ্য তালিকা, বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের ব্যবস্থা, শারীরিক ব্যায়ামের সরঞ্জাম এবং সর্বোপরি এমন এক পরিবেশ যা সত্যি সারাদিনের চূড়ান্ত ব্যস্ততা শেষে মানুষকে শারীরিক ও মানসিক আরাম প্রদান করে। সত্যি কথা বলতে কি, সাহেবরা এটাই চেয়েছিল। সেই যুগের কলকাতা শহরের উৎকৃষ্টমানের সামাজিক জীবনের প্রতীক ছিল এই ক্লাবগুলো। সাহেবদের উৎসবগুলোর সবথেকে ভালো উদযাপন হত এই ক্লাবগুলোতেই। স্বয়ং বড়লাট উপস্থিত থাকতেন সেইসব অনুষ্ঠানে।
এক ধরনের বিশ্লেষক ধর্ম মতবাদ হল যে, কলকাতার ক্লাব সংস্কৃতির মধ্যে অনেক ধরনের সামাজিক দোষ আছে। সাহেবরা এই সংস্কৃতি শুরু করেছিল নিজেদের সামাজিক পরিমণ্ডল ব্যাপ্ত করবে বলে। কালের স্রোতে তা ভারতীয়দেরকেও প্রভাবিত করে। এই ব্যাখ্যা হয়ত কিছুটা ঠিক। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ-ভারতবর্ষে কলকাতার ক্লাবগুলো ছিল বিদেশি জীবনযাপনের স্বাদ পাবার কেন্দ্র। কলকাতার মত ভারতবর্ষের আর কোনো শহরের লোকেরা ক্লাব কালচার বলতে যা বোঝায় তার সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে পড়েনি। বোধহয় ভারতবর্ষের আর অন্য কোনো শহরে এত সংখ্যায় ইংরেজ আমলের সামাজিক ক্লাবও নেই। কলকাতা শহরের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলতে গেলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কথা আসবেই, কারণ আর কোনো ভারতীয় শহর এত ইংরেজ শাসনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি। তারই উদাহরণস্বরূপ আমরা দেখতে পাই যে, ইংরেজ আমলে স্থাপিত এইসব সামাজিক ক্লাবগুলি আজও রমরমিয়ে চলছে। সময়ের নিয়মে নিশ্চয়ই কিছু পরিবর্তন হয়েছে এবং নতুন জিনিস সংযোজিত হয়েছে। কিন্তু কলকাতার ক্লাব সংস্কৃতির ঐতিহ্যের পরম্পরা একইরকমভাবে ধাবমান। আজকের এই বিভিন্ন রকমের বিনোদনের সময়েও, কলকাতার ক্লাবগুলোতে সন্ধ্যেবেলা ভিড় জমে। আসলে কলকাতার ক্লাবগুলো সমাজের মননে ঠাঁই পেয়েছে এবং তাই একে এত সহজে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ থেকে যাবে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন হিসাবে; কলকাতার ক্লাব কালচার থেকে যাবে টেমসের পার আর গঙ্গার পারের সন্ধি হিসাবে।
Author : Sandip Banerjee

