সৈকত অনেক বছর ধরে ছবি বানাচ্ছে। মনের মত করে বানায়। বিষয়গুলো ভিন্নরকমের হলেও একটা যোগসূত্র থাকে – মানবিকতা। খুব ভালোভাবে ওর বিগত কয়েক বছরের কাজ দেখলে সহজেই বোঝা যায় পরিচালক, চিত্রনাট্যকার সৈকত দাস আসলে মানুষের মনের কথা তুলে ধরতে চায়। “মেঘের গল্প”, “অচিন পাখি” বা “ফিরে দেখা” হিউম্যান ইমোশানের চলমান চিত্র।
লালন-এ অন্যথা হয়নি। দুটি সম্পূর্ণ দুই মেরুর মানুষ হঠাৎ কোন সমাপতনের মাধ্যমে মিলিত হল। চারপাশের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। দাঙ্গা, হাঙ্গামার প্রেক্ষাপট। একজন একটি সম্প্রদায়ের, অন্যজন অন্য সম্প্রদায়ের। একজন ধর্মভীরু, চুপচাপ, সংবেদনশীল। দ্বিতীয়জন দুঃসাহসী, কিছুটা উন্মত্ত। এদের দুজনের সম্পর্ক তৈরি হয় ধীরে ধীরে। একে অপরকে বুঝতে সময় লাগে। একজন অপরজনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানতে পারে। এবং এই জানা-বোঝার পর্বেই “লালন” ছবিটি ধাপে ধাপে এক অন্য স্তরে পৌঁছে যায়। সহজ, স্বাভাবিক জীবন আপন গতিতে এগিয়ে চলবে, দাঙ্গা, হানাহানি আসবে যাবে। এক ভাই তার বোনকে ভালবাসবে। এক বিপথে চলে যাওয়া যুবকের খিদে পেলে সে হাতের কাছে যা পাবে তাই ছিনিয়ে নিয়ে খাবে। এবং সব শেষে, একজন অন্যজনের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সেই কবে প্রথম শোনা গানের লাইনগুলো মনে পড়ে যায় – মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।
লালনের বিভিন্ন চরিত্রগুলিতে অভিনয় দেখবার মত। সঞ্জয়, সুমন দুই অলটার-ইগো। সমসাময়িক, অথচ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করে। চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাগ, দুঃখ, হতাশা, ভয় ইত্যাদি ইমোশান-গুলো। একটি চরিত্র তখনই মানুষের মনে ধরে যায় যখন তাদের ডায়লগ ডেলিভারি বিশ্বাসযোগ্য হয়। অনেকদিন ধরে মনে রয়ে যায়। মূল দুই চরিত্র যে সংলাপ বলেছে, তা মনে হয়েছে তাদের নিজেদেরই বক্তব্য। আর সেখানেই সাক্সেস।
লালনের ক্যামেরা ওয়ার্ক এক কথায় অসাধারণ। রাতের অন্ধকার, স্টেশানের নিস্তব্ধতা, মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস – এ সব ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। কিছু কিছু শটে মনে হয়েছে দর্শক হিসেবে আমরা মনে হয় ঐ স্টেশানেই চলে গেছি! আবহ সঙ্গীত গল্পের মুডকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। সৈকত বিশেষভাবে ধন্যবাদ পাবে তার কন্ঠে গাওয়া লালনের একটি গান আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। গানটা হল “icing on the cake”!
লালন রাজনৈতিক ছবি। এক কঠিন রাজনৈতিক বক্তব্য আমাদের সামনে তুলে ধরে। মানবিকতার রাজনীতি। সব “বাদ”, সব “ism” – এর ওপরে তার জায়গা।
